বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রকৃত অর্থে গ্রামীণ অর্থনীতি। বাংলাদেশের উন্নয়ন বলতে বোঝায় গ্রামীণ এলাকার উন্নয়ন তথা গ্রামীণ জনগণের উন্নয়ন। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আজও ক্ষয়িষ্ণু সামন্তবাদী অর্থনীতির শোষণ ও নিষ্পেষণ বজায় আছে। এ শোষণ ও নিষ্পেষণ দূর করা গেলে গুচ্ছগ্রামভিত্তিক স্বনির্ভর এলাকা গড়ে ওঠার দারুণ সম্ভাবনা ছিল।

বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের অনেক আগে গ্রামগুলোয় সামন্তবাদী শাসন ও শোষণ বিদ্যমান ছিল। আজকের চার-পাঁচটি উপজেলা মিলে যে এলাকা গঠিত, প্রায় সেই একই সমান আয়তনের এলাকাজুড়ে সামন্ত শাসনের এলাকা নির্ধারিত ছিল। অর্থাৎ চার-পাঁচটি উপজেলার আওতাধীন এলাকা নিয়ে গঠিত অভিন্ন এলাকার চাহিদা অনুযায়ী ফসল উৎপাদন, কুটির শিল্পের মাধ্যমে নিত্যব্যবহার্য দ্রব্যাদি উৎপাদন, গো-মহিষ পালন, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিচালন, বিভিন্ন উৎসব পালনের ভিত্তিতে এলাকাকে সার্বিকভাবে স্বয়ম্ভর করে গড়ে তোলা হতো। এ কথা সত্য, ওই এলাকায় সামন্তবাদী অর্থনীতির মাধ্যমে তীব্র শোষণও বিদ্যমান ছিল। কিন্তু মূল বিষয় যা এ নিবন্ধে তুলে আনার চেষ্টা করা হয়েছে তা হলো, নদীবেষ্টিত সুজলা-সুফলা জমি, জননন্দিত নদীবন্দর, কুটির শিল্প, শস্য ও ফসল, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি, ফলফলাদি উৎপাদন করার পরিকল্পনা করে ওই এলাকাগুলোকেই সুবিন্যস্ত করে শোষণহীন সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করা। যে শাসন ব্যবস্থা দরকার বর্তমানে তা নেই। তাহলে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যা দরকার তা কি অসম্ভব? যদি অসম্ভব হয় তাহলে যা দরকার তা হলো সংগঠন, আন্দোলন, লড়াই। আর এ লড়াই বাঁচার লড়াই, দেশ বাঁচানোর লড়াই। আর এক্ষেত্রে শোষণ ও নিষ্পেষণ সামনে তুলে এনে বলতে হবে গ্রামীণ অর্থনীতিতে শোষণ ও নিষ্পেষণকে অপসারণ করতে না পারলে শিল্পায়ন করা যাবে না, শিল্প-সহায়ক বিদ্যুতায়ন করা যাবে না, তাতে চাকরির সুযোগ বাড়বে না, বেকার সমস্যার সমাধান হবে না, মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও বাড়বে না। তত্ত্ব, তথ্য ও সত্য অনুসন্ধানের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করে স্পষ্টায়ন করতে হবে যে প্রগতিশীল ধ্যানধারণা ও অগ্রসর চিন্তাধারার ধারক-বাহকদের শাসন ব্যবস্থায় না বসাতে পারলে গ্রাম বিদ্যুতায়ন তথা শিল্পায়ন বাস্তবায়ন করে বর্ণাঢ্য গ্রামীণ অর্থনীতি উন্নয়ন করা যাবে না।

আরো সুনির্দিষ্ট করে বলা যায়, বাংলাদেশের আদি গ্রামীণ সমাজ ব্যবস্থার যে আর্থিক কাঠামো, যে কাঠামোয় শোষণ ছিল, ছিল অত্যাচার ও নিষ্পেষণ, দীর্ঘদিনের শোষণ ও নিষ্পেষণে যে সামন্ত অর্থনীতি বিদ্যমান ছিল, তা আরো বিকৃত হয়ে আজ সাম্রাজ্যবাদী ও মুত্সুদ্দি বুর্জোয়াদের লগ্নি পুঁজির অনুপ্রবেশে ধ্বংসের পথে। এ ক্ষয়িষ্ণু সামন্তবাদী ব্যবস্থা গ্রামীণ অবকাঠামো যেমন ধরে রাখতে পারেনি, তেমনি জাতীয় বুর্জোয়াদের বিকাশ না হওয়ার ফলে সব ধরনের গ্রামীণ উৎপাদন বিশেষ করে শস্য উৎপাদন, কুটির শিল্প, গো-মহিষ, ছাগল, মত্স্য, হাঁস-মুরগি, ফল-ফলাদি উৎপাদনের পরিমাণও আজ ক্রমঃক্ষয়িষ্ণু। বাংলাদেশের পুরো সক্ষমতায় যেমন মাছ আহরণ করতে পারছে না, তেমনি সবচেয়ে উর্বরা জমি ও সেচের সুবিধা থাকা সত্ত্বেও প্রতি হেক্টরে ধান উৎপাদন করতে পারছে মাত্র ৪ দশমিক ৫ কেজি আর অন্যান্য দেশ যেখানে করছে ৮ থেকে ১০ কেজি। উল্টো এ দেশের হরেক রকম শস্যদানাকে ধ্বংস করে, ভূমির উর্বরা বিনাশ করে সাম্রাজ্যবাদীদের ওপর নির্ভরশীল করায় হাইব্রিড শস্যদানা, রাসায়নিক সারসহ নদী, খাল-নালা, বিল এবং ভূ-উপরিউস্থ পানি সেচ বাতিল করে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের জন্য মোটর, ডিপ টিউবওয়েল বিক্রির পাঁয়তারাসহ এ দেশকে পানিশূন্য করে আরো মুনাফা লাভের জন্য গ্রামীণ অর্থনীতিকে একেবারেই ধ্বংসের কিনারায় এনে দাঁড় করিয়েছে। বিশ্লেষণ করলে এটা অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠবে যে এর উদ্দেশ্য শুধু সাম্রাজ্যবাদীদের কর্তৃক আমাদের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদের ওপর আগ্রাসনই নয়, এ দেশকে তথা দেশের জনগণকে সাম্রাজ্যবাদীদের ওপর নির্ভরশীল করে তাদের  পণ্য অনাদিকাল ধরে ব্যবহার করার এক হীন চক্রান্ত। আজ এজন্যই এ দেশ স্বয়ম্ভর হয়ে উঠতে পারছে না, জনগণ অর্থনৈতিক স্বাধীনতা পাচ্ছে না। সামন্তবাদ না থাকলেও সামন্ত শোষণের নিগড়ে গ্রামীণ জনশক্তি ধুঁকে ধুঁকে মরছে।

গ্রামে বসবাসকারী কৃষক-শ্রমিক-ধনী কৃষক, ক্ষেতমজুর, ছাত্র, যুবাদের সঙ্গে নিবিড় আলোচনা করে আমরা এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারি যে গ্রামীণ অর্থনীতি আজ ধ্বংসপ্রায়। এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, গ্রামীণ অর্থনীতির বন্ধ্যত্ব ঘুচাতে পরিবেশবান্ধব, সাশ্রয়ী পরিকল্পিত বিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনপূর্বক কৃষিনির্ভর শিল্প উৎপাদন বাড়ানো, দূষণমুক্ত গ্রামের নদী-খাল-বিল-হাওরকেন্দ্রিক গ্রামীণ কুটির শিল্পসহ আধুনিক মত্স্য প্রজনন, গো-মহিষ পশুপালনসহ শ্রমনির্ভর গ্রামীণ শিল্পায়নের ব্যাপক প্রসারণ, সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপক বিস্তৃত পরিকল্পিত বনায়ন প্রয়োজন। তাহলে এক বর্ণাঢ্য অর্থনীতির গ্রাম, এক নতুন বাংলাদেশ, জনগণের বাংলাদেশ তৈরি হবে।

মূল প্রশ্নটি যে সমাধানের কেন্দ্রবিন্দুতে এসে দাঁড়াবে তা হলো, এক সমৃদ্ধ বাংলাদেশ, এক সমৃদ্ধ গ্রামীণ বাংলাদেশ, এক সমৃদ্ধ শিল্পায়িত বাংলাদেশ গঠনে যে উপাদনগুলো কাজ করবে, তা কীভাবে সমাধান করা যাবে?

পদক্ষেপগুলো হলো:

(ক) অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিদ্যুৎ তথা শিল্পসহায়ক পরিকল্পিত মানসম্মত বিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন এক অপরিহার্য, গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক পদক্ষেপ। নানা রকম অব্যবস্থাপনা ও সীমাহীন দুর্নীতিতে গ্রামীণ অর্থনীতি আজ ধ্বংসের মুখে। ফলে বাংলাদেশের ব্যাপক জনগণ এক চরম মানবেতর জীবন যাপন করছে। বাংলাদেশে ব্যাপক জনগণ গ্রামীণ জনগণ, সুতরাং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মুক্তি তথা জনগণের সার্বিক অর্থনৈতিক মুক্তির প্রশ্নটি কেন্দ্রীয়ভাবে গ্রামীণ অর্থনীতির মুক্তিকেই বোঝায়। অপরিকল্পিতভাবে প্রকল্প করে গ্রামকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলা হচ্ছে। আমরা দেখছি আজ ‘শতভাগ বিদ্যুতায়নের’ নামে অপরিকল্পিতভাবে গ্রামে গ্রামে নকশাবহির্ভূতভাবে দুর্নীতি-সম্পৃক্ত নিম্নমানের বিদ্যুতের লাইন স্থাপন করে গ্রামকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলা হচ্ছে। এতে গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নে যে পদক্ষেপগুলো নিচে বর্ণিত আছে সেগুলো ভেস্তে যাবে। গ্রাম তথা দেশ আজ যে অবস্থায় আছে, তাই থেকে যাবে; বরং আরো খারাপ হবে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানিকে ভিত্তি ধরে গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নে পদক্ষেপগুলো হলো: ১. কৃষির ব্যাপক বিস্তৃতির লক্ষ্যে ভূমি সংস্কার, ২. গ্রামীণ কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির বিস্তার, ৩. কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন, ৪. ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের ব্যাপক প্রসার, ৫. পশু পালন ও প্রজননের বিস্তার, ৬. গ্রামীণ শিল্পায়ন ও কৃষির স্বার্থে নদীবন্দর ও নদী-খালের পুনরুদ্ধার, ৭. গ্রামীণ জনপদে আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক শিক্ষার বিস্তার, ৮. ক্রীড়া ও সংস্কৃতির বিস্তার, ৯. চিকিৎসাসেবাসহ মানুষের জীবনের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা বিধান।

উপরের কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নে অবশ্যই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করতে পদক্ষেপগুলো হলো:

১. পরিবেশবান্ধব প্রাথমিক ফুয়েল নির্বাচন। আণবিক ও জীবাশ্ম জ্বালানি সম্পূর্ণ বর্জন করতে হবে। নির্মিতগুলো জনস্বার্থে ভেঙে ফেলতে হবে। এগুলো শুধু জন-জল-জমিবিনাশীই নয়, পরিচালনও অনেক ব্যয়বহুল। পরিবর্তে সৌর, বায়ু ও নদীর স্বাভাবিক স্রোতে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে হবে। এগুলো অনেক সাশ্রয়ী, পরিবেশ ও জনবান্ধব, পরিচালন ব্যয় প্রায় ‘শূন্য’। বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় কর্তৃক নির্বাচিত বিশ্বের স্বনামধন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এনআরইএল দুই বছরব্যাপী সমীক্ষা করে ২০১৮ সালে বাংলাদেশের বায়ুবিদ্যুতের সম্ভাবনার ওপর একটি প্রতিবেদন দাখিল করে। সমীক্ষা অনুযায়ী তাতে সারা বাংলাদেশে ৩০ মিটার হাব হাইটে অতিসহজেই স্বল্প সময়ে ৩৪ হাজার মেগাওয়াট ও ৮০/১০০ মিটার হাব হাইটে ৬২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব, যার গড়পড়তা ট্যারিফ হতে পারে ২ টাকা/কিলোওয়াট-ঘণ্টা। ২০১৬ সালে বাপা কর্তৃক সৌরবিদ্যুতের ওপর আয়োজিত একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে আমি, সালিমুল হক, ফয়সাল রহমান, রেবেকা শিরলি, ড্যানিয়েল এম কামিন, কেনজি সিরাইসি বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনার ওপর ভিন্ন ভিন্ন দুটি প্রতিবেদন দাখিল করি। উভয় সমীক্ষাতেই বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা ১৫ হাজার মেগাওয়াট বলা হয়। বর্তমানে সৌর সেলের ২৫০ শতাংশ দক্ষতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে সমীক্ষাকৃত ১৫ হাজার মেগাওয়াট ন্যূনতম ৩০-৩৫ হাজার মেগাওয়াটে দাঁড়াবে, যার গড়পড়তা ট্যারিফ ২ টাকা/কিলোওয়াট-ঘণ্টার বেশি হতে পারে না। ২. টেকসই, সাশ্রয়ী, নির্ভরশীল ও দক্ষ বিদ্যুৎ ব্যবস্থার বাস্তবায়ন। ৩. স্বয়ম্ভর অর্থনৈতিক এলাকা গড়ে তোলা, যার প্রধান নির্দেশিকা হবে বিদ্যুৎ বিতরণ ও উৎপাদন ব্যবস্থা, যাতে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে যৌক্তিক করা যায়। ৪. এলাকাগুলো এমনভাবে বিন্যস্ত করা, যাতে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা কারিগরিভাবে অপটিমাইজড হয় এবং শিল্প, কৃষি, অন্যান্য উৎপাদনমূলক ব্যবস্থা স্থাপনে সাশ্রয়ী হয়ে ওঠে। ৫. বর্তমান ব্যবস্থা এমনভাবে সংস্কার করা যেন অহেতুক অর্থের অপচয় না ঘটে। ৬. বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নির্মাণে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ৭. শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করা সম্ভব। কারণ বাংলাদেশে সোলার ইনসোলেশন গড়ে প্রায় ৪ দশমিক ৬৫ কিলো-ঘণ্টা/বর্গকিলোমিটার, যা বিশ্বে অত্যন্ত উঁচু মানের। ২০১৯ সালে সোলারের দক্ষতা বৃদ্ধি ৪৮ শতাংশ হওয়াসহ মূল্যহ্রাসের ফলে এখন ৩ দশমিক ৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার সোলার বসাতে প্রয়োজন এক একর জমি। মূল্য পড়ে ৭ কোটি টাকা/মেগাওয়াট। জীবাশ্ম জ্বালানির স্থান একটু কম লাগলেও মূল্য পড়বে প্রায় ১২ কোটি টাকা/মেগাওয়াট। জীবাশ্ম জ্বালানির পরিচালন ব্যয় অনেক বেশি। পরিবেশ দূষণের কথা নাই-বা বললাম। ৮. সংস্থাগুলোর সার্বিক দক্ষতা বৃদ্ধিসহ দক্ষ যন্ত্রপাতি ও অ্যাপ্লায়েন্স ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ মূল্য জনগণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে হবে।

 

বি.ডি. রহমতউল্লাহ: সাবেক মহাপরিচালক, পাওয়ার সেল