দৈনন্দিন খবর পড়লেই বোঝা যায় সারা দেশ থেকে মাল আসছে ঢাকা শহরে। আসছে বিরতিহীনভাবে। চাল আসছে, শাকসবজি আসছে। মাছ আসছে, মুরগি আসছে, ডিম আসছে, আসছে আম, কাঁঠাল, জাম, লটকন থেকে শুরু করে নানা ফল। আসছে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। সবারই গন্তব্য ঢাকা, ঢাকা মহানগরী। আসছে নগরীর বাসিন্দাদের ভোগের জন্য। এটা হচ্ছে দেশের ভেতরের খবর। বিদেশ থেকে যে ভোগ্যপণ্য ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আসছে তার গন্তব্যও ঢাকা। তারপর অন্যত্র। এই যে এত মাল আসছে, তার কারণ কী? কারণ তো খুব সহজেই বোধগম্য। এখানেই বিশাল ক্রয়ক্ষমতা। দেড় কোটি, দুই কোটি লোক যা খায় তার পরিমাণ কত? এর হিসাব আমার কাছে নেই। সরকারের কোথাও না কোথাও নিশ্চয়ই আছে। তবে আমার জানা নেই। জানা থাকলে বুঝতে পারতাম ঢাকা মহানগরীর লোকেরা দেশে উৎপাদিত ভোগ্যপণ্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য এবং বিদেশ থেকে আমদানীকৃত নিত্যপ্রয়োজনীয় ও ভোগ্যপণ্যাদির কত অংশ ভোগ করে। তাহলেই বোঝা যেত বাকি দেশের লোক কত অংশ। শুধু তো নিত্যপ্রয়োজনীয় ও ভোগ্যপণ্য দ্রব্যাদি নয়, ঢাকাবাসীর জন্য লাগে যাতায়াত ব্যবস্থা, সুপেয় জল। বিদ্যুৎ, গ্যাস, চিকিৎসার সুযোগ, লেখাপড়ার সুযোগ, আবাসন ব্যবস্থা, পয়ঃপরিষ্কারের ব্যবস্থা থেকে শুরু করে সব নাগরিক সুবিধা। এসবের মূল্য কত? আরেকভাবে জিজ্ঞেস করা যায় ঢাকার অধিবাসীদের পেছনে বছরে সরকার কত খরচ করে? উন্নয়ন বাজেটের টাকা রয়েছে, রয়েছে রাজস্ব বাজেটের টাকা, বড় বড় মেগা প্রকল্পের খরচ আছে, বৈদেশিক ঋণের টাকা আছে, ঋণপ্রাপ্তির বিষয় আছে—এসবে ঢাকাবাসীর হিস্যা কত বা আরো একটু বড় করে বললে বলতে হয় ঢাকা জেলার হিস্যা কত? মাথাপিছু কত টাকা এর জন্য ব্যয় হয়, বিনিয়োগ হয়? বিপরীতে প্রশ্ন এসবে সারা দেশের ১৬ কোটি লোকের হিস্যা কত? এসব জটিল প্রশ্ন। উন্নয়নের পাশাপাশি, চমকপ্রদ উন্নয়নের পাশাপাশি আজকের দিনে এসব নিয়ে ভাবতে হচ্ছে। কারণ দৃশ্যতই দেখা যাচ্ছে, ঢাকা শহর সবকিছুতেই মাত্রাতিরিক্ত হিস্যার মালিক। অনেকেই বলছেন ঢাকা শহরের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, উন্নয়ন ব্যয় হিসাবের বাইরে চলে যাচ্ছে। শহরটি অতিবৃদ্ধির (ওভার গ্রোথ) শিকার। হাজার হাজার কোটি টাকা বছর বছর খরচ করার পরও দেখা যাচ্ছে ঢাকা শহর বসবাসযোগ্য নয়। আন্তর্জাতিক জরিপ তাই বলছে। এর বায়ুদূষণ তীব্র, শব্দদূষণ তীব্র। যানজট অসহনীয়। আবাসনের অভাবে লাখ লাখ লোক বস্তিবাসী। হাসপাতালে চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা নেই। ডেঙ্গুতে এ কথা আবার প্রমাণিত। বিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থার অভাব, গ্যাসের অভাব। শিক্ষার গুণগত মান এ শহরেই নিচুতে। নাগরিক সুবিধা মানুষের যা পাওয়ার কথা তার দারুণ অভাব। শহরের অলিগলি চলাচলের অনুপযোগী, জীবনধারণের ব্যয় অসম্ভব। এভাবে বিচার করলে দেখা যাবে হাজার হাজার কোটি টাকা ঢাকা মহানগরীর পেছনে খরচ করেও শহরটি বাসযোগ্য হচ্ছে না। আবার পাশাপাশি বর্ধিত, বর্ধিষ্ণু ঢাকা মহানগরীর বিপরীতে সারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের উন্নয়ন বিঘ্নিত। তারা বলা যায় অবহেলিত। সার্বিকভাবেই অবহেলিত। তাহলে কী দাঁড়াল? যে শহরের জন্য এত বিলিয়ন বিলিয়ন (এক বিলিয়ন সমান শতকোটি টাকা) টাকা বার্ষিক খরচ, যে শহরের নাগরিকদের জন্য মাথাপিছু সর্বোচ্চ সরকারি খরচ ও বিনিয়োগ তার অবস্থাও আশাপ্রদ নয়, আবার দেশের অন্যান্য অঞ্চলও বঞ্চিত এবং অবহেলিত। বলা যায় ঢাকাকে ধরে রাখতে, তার রক্ষণাবেক্ষণ করতে, তার আয়তন বৃদ্ধি করতে গিয়ে, তার নাগরিকদের সব সুবিধা দিতে গিয়ে সারা দেশ হচ্ছে বৈষম্যের শিকার, অবহেলার শিকার। এখানেই প্রশ্ন, এ অবস্থা কি কাম্য অবস্থা। নিশ্চয়ই নয়।
অনেক আগে থেকেই শুনে আসছি একটা কথা। সারা শরীরের রক্ত যদি মুখমণ্ডলে আশ্রয় নিয়ে তাকে রক্তিম দেখায়, তাহলে এটা স্বাস্থ্যের লক্ষণ নয়। রক্ত থাকতে হবে, চালু থাকতে হবে সারা শরীরে। রক্ত চলাচল হতে হবে নির্বিঘ্ন। তাহলেই নীরোগ থাকা যায়। আমাদের উন্নয়নের ক্ষেত্রে মনে হয় এদিকটাই বিবেচিত হচ্ছে না। আমরা ঢাকাসহ বড় বড় নগরীর দিকেই নজর বেশি দিচ্ছে।
বড় বড় মেগা প্রকল্পের দিকেই আমাদের নজর বেশি। দেশে যে ছোট ছোট সমস্যা আছে, দেশটি যে ১৮ কোটি লোকের দেশ—তা মনে হয় আমরা মাথায় রাখছি না। শহর বাড়াতে গিয়ে, শহর বড় করতে গিয়ে এবং এসবের রক্ষণাবেক্ষণ করতে গিয়ে আমরা বিদেশী ঋণ ও স্বদেশী ঋণেও ভারাক্রান্ত হচ্ছি। বৈষম্যের শিকার হচ্ছে সারা দেশ। অথচ এটা কাম্য নয়।
সারা দেশে ভোগ্যপণ্য যা মানুষ ভোগ করে অথবা ব্যবহার করে, তার বিরাট অংশ যদি ঢাকা শহরে, বাকি অংশ সারা দেশে তাহলে তা যেমন কাম্য নয়—তেমনি ব্যাংক আমানতের অর্ধেকের চেয়েও বেশি যদি হয় ঢাকা শহরে তাহলে তাও কাম্য নয়। দেখা যায় ব্যাংক আমানতের সিংহভাগ ঢাকা শহরে। একই অবস্থা ব্যাংকঋণেরও। ব্যাংকঋণের সিংহভাগও এখানে। এতে অসুবিধা কী? দৃশ্যত অসুবিধা সেই। কিন্তু একটু ভেতরে গেলে বোঝা যাবে এতে লুক্কায়িত বৈষম্যের চিত্র। এর অর্থ হচ্ছে, দেশের আর্থিক শক্তির সিংহভাগ ঢাকা শহরভিত্তিক লোকেরা ভোগ করছে। সর্বোত্তম শিক্ষা, সর্বোত্তম চিকিৎসা, সর্বোত্তম সুরক্ষা ভোগ করছে ঢাকা মহানগরীর লোকেরা। অবস্থা এমন যে ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসার জন্যও মফস্বল থেকে রোগীরা ঢাকায় আসে। সামান্য ফিজিওথেরাপি নিতেও রোগীদের ঢাকা শহরে আসতে হয়। সামান্য একটু ব্যতিক্রমী অসুখ-বিসুখ হলে চিকিৎসার জন্য ঢাকা আসতে হয়। স্বাধীনতার ৫২ বছর পরও আমরা শত চেষ্টাও নাগরিক সুবিধা দেশের সব অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দিতে পারছি না। শুধু নাগরিক সুবিধা কেন, অনেক অর্থকরী ও রোজগারের পথও দেশে আমরা উন্মুক্ত করতে পারিনি। সেখানে দেখা যায়, অনেক সুযোগ-সুবিধা বিশেষ বিশেষ অঞ্চলে সীমাবদ্ধ। যেমন রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়। দেখা যায়, এই ক্ষেত্রে সারা দেশের কোনো উপস্থিতি নেই। কিছু অঞ্চলের লোকেরা এর সুবিধা ভোগ করছে। উত্তরবঙ্গ, দক্ষিণবঙ্গের অংশগ্রহণ এতে কম। ফলে প্রবাসী আয়ের অঞ্চল অধিকতর গতিতে উন্নতি করছে, বাকি দেশ রয়ে যাচ্ছে উপেক্ষিত। আজকের দিন পর্যন্ত গ্যাস আমরা নির্বিঘ্নভাবে দেশের উত্তরাঞ্চলে পৌঁছাতে পারিনি। ফলে সেখানে শিল্পায়ন হচ্ছে না। এসবের মধ্যে যে চিত্রটি ভেসে ওঠে তা হচ্ছে ঢাকা মহানগরীর জৌলুস বাড়ছে, দেশের কিছু অঞ্চল সুযোগ-সুবিধা পেয়ে উন্নত হচ্ছে। বাকি দেশ রয়ে যাচ্ছে অপেক্ষাকৃত অনুন্নত। ধরা যাক উন্নয়ন বরাদ্দের কথা। সরকারি হিসাব কী বলে? উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলের জন্য মাথাপিছু উন্নয়ন বরাদ্দ কত? দেখা যাচ্ছে, এখানেও বিরাট বৈষম্য। শুধু উন্নয়ন বরাদ্দে নয়, রাজস্ব বরাদ্দের ক্ষেত্রেও তাই। কারণ যেসব ক্ষেত্রে কম মূল্যের নয় তার বেশির ভাগ সুবিধাই ঢাকা শহর ও অন্যান্য শহরের জন্য ব্যয় হয়। ঢাকা শহরের উন্নয়নের নামে আমরা জানি নানা আবাসিক এলাকা গড়ে তোলা হচ্ছে। কাগজে দেখলাম ঢাকা শহরের ভেতরেই আরেকটি বড় আবাসিক এলাকা গড়ে তোলা হবে। এর মানে কী? এগুলো বরাদ্দ পাবে প্রভাবশালী লোকেরা। নানা শ্রেণী-পেশার কিছু নির্বাচিত লোক। শোনা যায় অনেকেই এখন বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় জমিজমা বিক্রি করে বিদেশে পাড়ি দিচ্ছেন। সরকারি বিনিয়োগে, সরকারি আনুকূল্যে দেখা যাচ্ছে এক শ্রেণীর ঢাকাবাসী কোটি কোটি টাকার মালিক হচ্ছে। বিপরীতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ, যাদেরকে তাদের বাপ-দাদার সম্পত্তি ছাড়তে হচ্ছে।
আমার কাছে বোধগম্য নয় ঢাকা শহরকে বড়, আরো বড় করে কার লাভ? এটা ‘অতিবৃদ্ধির’ শিকার একটি শহর। এর পেছনে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের উপযোগিতা কী, অর্থনৈতিক লাভ কী, কারা এতে লাভবান তার ওপর গবেষণা-জরিপ হওয়া দরকার। যদি এমন হতো যে বিশাল বিনিয়োগের পর ঢাকা মহানগরী সুন্দর হচ্ছে, বাসযোগ্য হচ্ছে, প্রশংসা করার মতো শহর হচ্ছে, তাহলেও একটা সান্ত্বনা পাওয়া যেত। কিন্তু তা তো হচ্ছে না। এ অভিজ্ঞতার আলোকে বিশাল বিশাল বিনিয়োগের গন্তব্যস্থল কি গ্রামাঞ্চল হতে পারে না? সরকার দেখা যাচ্ছে, এ ব্যাপারে সজাগ। আমার গ্রাম, আমার শহর-এ জাতীয় প্রকল্প আছে। পরিকল্পিত গ্রাম উন্নয়নের জন্য বিশাল বিশাল অনেক প্রকল্প হাতে নেয়া যেতে পারে। ২০-৫০ বছরের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করলে ফল লাভ অবশ্যই সম্ভব। এতে অবাধ বিনিয়োগে অনেক বেশি লোকের কর্মসংস্থান হবে। গ্রামে বর্তমানে অনেক পেশা মারা যাচ্ছে, যেমন তাঁতি, জেলে, কামার, কুমার, মাঝি এরা ধীরে ধীরে বিলীন হচ্ছে। কারণ বিবিধ। প্রযুক্তি একটি, প্রকৃতি একটি, বিদেশী প্রতিযোগিতা একটি। এসব কারণে এসব পুরনো অনেক পেশা মারা যাচ্ছে। এ পেশাজীবীদের জন্য নতুন নতুন কাজ দরকার। সামান্য বিনিয়োগে তা করা সম্ভব। কৃষিতে অনেক বেশি বিনিয়োগ দরকার, ঋণ দরকার। ‘অতিবৃদ্ধির’ শিকার ঢাকা শহরের পেছনে নিতান্ত প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোনো টাকা খরচ না করে সেই টাকা বিনিয়োগ করা দরকার গ্রামে, গ্রামাঞ্চলে—উত্তরাঞ্চলে, দক্ষিণাঞ্চলে এবং অবহেলিত ও অনুন্নত অঞ্চলে। ফলে ঢাকা শহর বসবাসযোগ্য হতে পারে, কারণ গ্রাম থেকে অবিরত লোক আসা বন্ধ হবে। বরং কিছু লোক ঢাকা ছেড়ে গ্রামে যেতে আগ্রহী হবে। অতএব, সব সুবিধা শুধু ঢাকা শহরে, কিছু অঞ্চলে সীমাবদ্ধ না রেখে ওইসব সুবিধা সারা দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা নেয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। সুন্দর সুন্দর উপশহর গড়ে উঠতে পারে সারা দেশে। দক্ষ রেল ও সড়ক যোগাযোগের মাধ্যমে সেগুলো সংযোজিত হলে সবারই উপকার।
ড. আর এম দেবনাথ: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক










