কম জমি থেকে বেশি খাদ্য উৎপাদনই বর্তমানে বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতি বছর ১ শতাংশ হারে জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। অন্যদিকে প্রতি বছর ১ দশমিক ৪৪ শতাংশ হারে জনসংখ্যার জন্য খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে হচ্ছে। ফলে পতিত জমি চাষের আওতায় আনার পাশাপাশি এক ফসলি জমিকে দুই বা তিন ফসলিতে রূপান্তরে উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। গত বুধবার বণিক বার্তায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই ও তিন ফসলি জমির পরিমাণ বেড়েছে, যা আমাদের খাদ্যনিরাপত্তা ধরে রাখতে বড় ভূমিকা রাখছে। উদ্বেগেরও কারণ রয়েছে কিছু। অধিক ফসল উৎপাদন করতে গিয়ে জমির উর্বরা শক্তি হ্রাস, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার মতো ক্ষতিকর বিষয়গুলো সামনে আসছে। এক্ষেত্রে ফসল বৈচিত্র্যায়নের মাধ্যমে জমির উর্বরা শক্তি ধরে রাখা, পানির স্তর নিরাপদ রাখার পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

কৃষি উৎপাদন শিল্পের মতো উপকরণ বা বিনিয়োগ বাড়ালেই ক্রমাগত উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি হতে থাকে না, একটা পর্যায়ে গিয়ে ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উৎপাদনশীলতা দেখা দেয়। সুতরাং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে জমির প্রাপ্যতা বা ব্যবহার কৌশলও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে জমির প্রাপ্যতা বৃদ্ধির সুযোগ নেই; বরং শিল্পায়ন, নগরায়ণ, রাস্তাঘাট নির্মাণ এবং অপরিকল্পিত ভূমি ব্যবহারের কারণে প্রতি বছর কৃষিজমির পরিমাণ কমছে। এটি কৃষির একটি বড় চ্যালেঞ্জ, যা মোকাবেলা চলমান পরিস্থিতিতে প্রায় অসম্ভব। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে সাগর উপকূলে যেসব চর জেগেছে বা জেগে উঠছে, তার প্রায় অধিকাংশই সরাসরি বা জেগে ওঠার ন্যূনতম সময়ের মধ্যে কৃষি চাষের উপযুক্ত হয় না। তাহলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে কৃষিজমির সর্বোত্তম ব্যবহারের বিকল্প নেই। জমির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, অর্থাৎ একরপ্রতি উৎপাদন বৃদ্ধি যত কঠিন, পতিত জমি আবাদ কিংবা একই জমিতে একাধিক ফসল উৎপাদন করা ততটা কঠিন নয়। অথচ এক্ষেত্রে আমাদের অর্জন আশানুরূপ নয়, বরং হতাশাজনক। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে যেখানে নদ-নদী, খাল-বিলের সংখ্যা বেশি, সেসব এলাকায় শস্য নিবিড়তা অপেক্ষাকৃত কম। তার মানে কম ব্যয়সাপেক্ষ ভূ-উপরস্থ পানির উৎস ব্যবহার করা হচ্ছে না সঠিকভাবে। একসময়কার প্রবাদ বাক্য ‘ধান নদী খাল, এই তিনে বরিশাল’। সেই বৃহত্তর বরিশালে অনেক আবাদযোগ্য জমি পতিত পড়ে থাকে। অথচ ২০১৯ সালের কৃষিশুমারির প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী বরিশাল বিভাগে কৃষিখানার সংখ্যা সর্বাধিক ৬৬ শতাংশ। এখন বরিশাল নয়, বরং উত্তরাঞ্চল বা পশ্চিমাঞ্চলকে বাংলাদেশের শস্যভাণ্ডার বলা হয়, যেখানে চাষাবাদ হয় মূলত ভূগর্ভস্থ পানির সেচ দিয়ে। এক্ষেত্রে বরেন্দ্র অঞ্চলের কথা স্মরণ করা যেতে পারে। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলের জেলাগুলোয় বহু বছর আগে থেকেই অনুপস্থিত ভূমি মালিকানার জন্য কৃষিজমিতে সঠিক মাত্রায় চাষাবাদ হতো না। অনেক আবাদযোগ্য জমি পতিত অথবা সাময়িকভাবে পতিত পড়ে থাকত। সে অবস্থার উন্নতি খুব একটা হয়নি। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সরকারিভাবে কৃষিতে ভূগর্ভস্থ পানি সেচের ব্যবস্থা নিরুৎসাহিত করা হলেও দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোয় ভূ-উপরিস্থ পানি সেচের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদনের প্রচেষ্টা জোরদার হওয়ার প্রমাণ মেলে না। অন্যদিকে বর্তমানে বেশি শস্য নিবিড়তাসম্পন্ন জেলাগুলোর দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যাবে, সেখানেও গত কয়েক বছর শস্য নিবিড়তা বাড়েনি। রাসায়নিক সারের অতিব্যবহারে জমির উর্বরা শক্তিও কমছে। উপকরণ ও প্রযুক্তির ব্যবহারসহ যান্ত্রিকীকরণের স্বল্পতাও রয়েছে। 

বাংলাদেশে বর্তমানে ফসলের নিবিড়তা ১৯০ শতাংশ। দুই বছর আগেও শস্য নিবিড়তা ছিল ১৯৫ শতাংশ। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রতিটি জমিতে গড়ে বছরে দুটির কিছু কম, অর্থাৎ ১ দশমিক ৯টি ফসল চাষ হচ্ছে। দেশে বর্তমানে যেসব জমিতে দুটি ও তিনটি ফসল চাষ হচ্ছে, সেসব জমিতে চারটি ফসল চাষ করা যাবে। এতে ফসলের নিবিড়তা হবে ৪০০ শতাংশ। এজন্য আরো জমি সেচের আওতায় আনতে হবে। জীবনকাল কম এমন ফসল চাষ করতে হবে। কম জীবনকালের ফসলের জাত উদ্ভাবন করা প্রয়োজন। সাধারণত শাকসবজিসহ কম জীবনকালবিশিষ্ট ফসলের জাত ফসল বিন্যাসে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এক্ষেত্রে ফসল চাষে বৈচিত্র্যকরণ জরুরি। বড় বিষয় হলো, চার ফসল মডেলে সব ধরনের ফসল চাষ করা যাবে না। বিশেষ করে তিন মাসের বেশি জীবনকালসম্পন্ন ফসল। তবে জেনেটিক্যালি জীবনকাল কমিয়ে আনা সম্ভব। এরই মধ্যে কম জীবনকালসম্পন্ন অনেক ফসলের জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। এজন্য বন্যামুক্ত উঁচু জমি প্রয়োজন। তবে এখন দেশের অধিকাংশ জমি বছরে ৯-১০ মাস শুকনো থাকে। এসব জমিতে সহজেই বছরে চারটি ফসল চাষাবাদ করা সম্ভব। তবে প্রতিটি জমিতে দু-এক বছর পরপর সবুজ সার তৈরি করলে মাটির উর্বরা ও উৎপাদন ক্ষমতা রক্ষা করা যাবে। ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য এখন দুটি উপায়। একটি হচ্ছে ফলন বাড়ানো, অন্যটি ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি। ফলন বাড়ানোর জন্য অনেক উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। কিন্তু ফসলি জমি হ্রাস ও জনসংখ্যা বৃদ্ধি হারের চাহিদা পূরণের মতো ফলন বাড়ছে না। ফলে ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি ও বৈচিত্র্যায়নের মডেল দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে খুবই প্রয়োজন। তবে অবশ্যই তা জমির উর্বরা শক্তির ক্ষয় করে নয়।

সরকার এখন জমিকে চার ফসলিতে রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে। অধিক ফসল ফলানো যেমন ভালো তেমনি কিছুটা খারাপ দিকও আছে। দেশে ক্রমে ধানসহ নানা রকম ফসল উৎপাদন বাড়ছে। এক ফসলি জমিতে বছরে দু-তিন ফসল পাচ্ছেন কৃষক। উচ্চফলনশীল ও হাইব্রিড জাতের প্রসার ঘটছে। এ কারণে দেশে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা বৃদ্ধিকালেও খাদ্য ঘাটতি মেটানো সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু অধিক ফসল উৎপাদন ঠিকই হচ্ছে, বিপরীতে জমির পুষ্টি ও উর্বরা শক্তি কমছে দিনের পর দিন। গবেষকরা বলছেন, একই জমিতে অধিক ফসল ফলানোয় খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে বটে, কিন্তু মাটির জৈব উপাদান আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। এতে মাটির উর্বরা শক্তি যেমন কমছে, তেমনি ক্রমাগতভাবে মাটির উর্বরা শক্তি হ্রাসের ঝুঁকি বাড়ছে। ভূগর্ভস্থ-নির্ভর সেচের কারণে পানির স্তরও নেমে যাচ্ছে। এতে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। সব দিকে ব্যাপক পরিকল্পনা করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষকের জমিতে চার ফসল চাষের ক্ষেত্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন। তবে খাদ্য চাহিদা পূরণের জন্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা চিন্তা করে চার ফসল মডেল বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। 

করোনা মহামারীকালে প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার দুটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন—এক. এক ইঞ্চি জমিও অনাবাদি ফেলে না রাখা এবং দুই. ফসলের বহুমুখীকরণ। দেশ খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও প্রকৃৃতিনির্ভর কৃষি উৎপাদনের গ্যারান্টি দেয়া যেমন অসম্ভব তেমনি সময়মতো, পরিমাণমতো ও সুবিধামতো শর্তে চাল আমদানি করারও নিশ্চয়তা নেই। সুতরাং করোনা মহামারী বা অন্য যেকোনো ধরনের দুর্যোগকালীন বা দুর্যোগোত্তর পরিস্থিতি মোকাবেলায় শস্য নিবিড়তা বৃদ্ধির মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন ও মজুদ ক্ষমতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই। খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টিনিরাপত্তা বিধানকল্পে সব আবাদযোগ্য জমি চাষের আওতায় আনতে হবে এবং শস্য নিবিড়তা বাড়াতে হবে। সেই সঙ্গে বসতবাড়ি ও ভিটার অব্যবহূত জমিতে নানা জাতের ফল ও সবজি আবাদ করতে হবে। এটি স্পষ্ট যে অল্পসংখ্যক জমিতে ফলন আরো বাড়াতে জমিতে আধুনিকায়ন ও ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই। পাশাপাশি বাণিজ্যিক কৃষিকে উৎসাহিত করতে হবে। বিভিন্ন ফসলের স্বল্পমেয়াদি জাতসহ খরা, বন্যা এমনকি লবণাক্ততাসহিষ্ণু জাত উদ্ভাবনে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। এছাড়া কৃষিবিষয়ক সংস্থাগুলোর কার্যক্রমে আরো সমন্বয় প্রয়োজন। গবেষণা ও সম্প্রসারণে দ্রুত সংযোগ ঘটাতে পারলে কৃষির উন্নয়ন টেকসই করা সম্ভব হবে।