আর কয়েকদিন পরই আসছে ২০২৩-২৪ সালের নতুন বাজেট। না জানি কী আছে বাজেটে। বিশেষ করে গরিব, অতিগরিব ও মধ্যবিত্তের জন্য। এ প্রশ্ন মনে, কারণ বাজেট নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে সবসময়ই একটি আতঙ্ক থাকে। এবার এ আতঙ্ক আরো বেশি। এটা আইএমএফের তীক্ষ্ণ খবরদারির জন্য। তারা বলেছে রাজস্ব বাড়াতে হবে আরো বেশি। অথচ ২০২২-২৩ অর্থবছরেই রাজস্ব ঘাটতি হবে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক অনেক বেশি। এ অবস্থার মধ্যে কম আমদানি, স্থবির রফতানি, হুন্ডি আক্রান্ত রেমিট্যান্সের পরিপ্রেক্ষিতে কীভাবে রাজস্ব বাড়ানো হবে এটাই বড় দুশ্চিন্তা। এমনটা না হয় যে কোনো পথ না পেয়ে, ধনীদের ওপর ট্যাক্স বাড়াতে না পেরে, ব্যবসায়ীদের ট্যাক্স বাড়াতে না পেরে শেষ পর্যন্ত সরকার গরিব ও মধ্যবিত্তের পকেটের দিকে তাকায়! এমনিতেই মধ্যবিত্ত সর্বস্বান্ত। গরিব তো বটেই। কেমন সর্বস্বান্ত তা বোঝা যায় একজন প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) এক জরিপ থেকে। শিল্প প্রতিমন্ত্রী কয়েকদিন আগে বলেছেন মানুষ বাজার করতে গিয়ে কাঁদছে। সবকিছুতে সিন্ডিকেট কাজ করছে। কোনো কিছুরই অভাব নেই। কিন্তু জিনিসপত্রের উচ্চমূল্য। এদিকে বিআইডিএস বলেছে, ঢাকা শহরের দরিদ্রদের মধ্যে অর্ধেকই ‘‌নতুন দরিদ্র’। এই নতুন দরিদ্র কারা? এটা বুঝতে কি কষ্ট হয়? পরিষ্কার বোঝা যায় নিম্নবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত দিন দিন দরিদ্রের কাতারে নাম লেখাচ্ছে। এ কথা বহুদিন ধরেই আমরা লিখে যাচ্ছি যে বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থায়/বাস্তবতায়, মূল্যস্ফীতিতে, মজুরি স্থবিরতায় মধ্যবিত্ত নিম্নমধ্যবিত্ত হচ্ছে, নিম্নমধ্যবিত্ত নিম্নবিত্ত হচ্ছে, নিম্নবিত্ত দরিদ্র হচ্ছে, দরিদ্র অতিদরিদ্র হচ্ছে। সংসার চালাতে না পেরে তারা ভোগ কমাচ্ছে। ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার খরচ কমাচ্ছে, চিকিৎসায় খরচ কমাচ্ছে, মূল ঢাকা থেকে চলে যাচ্ছে মিরপুরে এবং তদ্রূপ জায়গায়। খরচ যত কমানো যায় আর কী? কিন্তু এর তো একটা শেষ আছে। শেষটা কোথায় তাই বোঝা যাচ্ছে না। তবে এ ক্ষেত্রে আমি অভিজ্ঞতার আলোকে মধ্যবিত্তকে কয়েকটি কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই।

আগামী কয়েক বছরের মধ্যে মধ্যবিত্তের ফ্ল্যাট কেনার স্বপ্নও বাদ দিতে হবে। ভালো স্কুলে ছেলেমেয়েদের পড়ানোর চিন্তা বাদ দিতে হবে। গাড়ি কেনার চিন্তা করা যাবে না। চিকিৎসার জন্য ভালো হাসপাতালমুখী হওয়া যাবে না। এমনকি ব্যাংকে টাকা রাখলে কোনো সুদ নাও মিলতে পারে। যারা সঞ্চয় করে অবসর গ্রহণের পর ওই টাকা ব্যাংকে রেখে অর্জিত সুদ দিয়ে সংসার চালাতে চান, তারা তা পারবেন না। স্বয়ংক্রিয়তার যুগে বেকার হয়ে, দক্ষতা অর্জনে ব্যর্থ হয়ে হতাশার জীবন কাটাতে হবে। আরো কত কী? আমি কী করে এসব অগ্রিম কথা বলছি, তার ভিত্তি কী? এবার একটা কথা বলি। ছোটবেলায় দেখেছি, পাকিস্তান আমলে দেখেছি অবসরপ্রাপ্তরা অবসর গ্রহণের পরে একখণ্ড জমি কিনে ছোট্ট একটা বাড়ি করতেন। অনেক বাড়িতে পুকুরও থাকত। আমি যে শান্তিনগরে থাকি, সেখানে পুকুরওয়ালা বাড়ি ছিল অনেক। গাছপালা তো বটেই। স্বাধীনতার পর দেখতে দেখতে ফ্ল্যাটের চাহিদা বেড়েছে। জমির দাম আকাশচুম্বী। ‘‌পাকিস্তান’ আমলে ধানমন্ডি গুলশানে বড় বড় সরকারি কর্মকর্তা ৫-১০-২০ কাঠা জমি নিতেন সরকারের কাছ থেকে অল্প টাকায়। তারপর হয় বনানী, উত্তরা, পূর্বাচল। ধীরে ধীরে জমির প্রাপ্যতা হ্রাস পেয়েছে। মধ্যবিত্ত ফ্ল্যাট বাড়ির দিকে ধাবিত হয়। ধীরে ধীরে ফ্ল্যাটের দাম বাড়তে বাড়তে এখন তা মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে। নিম্নবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্তের পক্ষে তো অসম্ভব কল্পনা। মূল ঢাকার বাইরে আশ্রয় হতে পারে তাদের। অথবা বিদেশে উন্নত দেশের মতো মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্তের আশ্রয় হবে ছোট ছোট খুপরিতে। চাকরিজীবীরা থাকবে হয়তো দোতলা, তিনতলা ফ্ল্যাটে। ঘর-সংসার ধীরে ধীরে হবে আমেরিকানদের মতো। করতে হবে ‘‌মাদার্স ডে’ ‘‌ফাদার্স ডে’, কারণ বাবা-মা কারো সঙ্গে থাকবে না। অথচ এখনো তারা আমাদের সঙ্গেই আছেন—বৃহত্তর পরিসরে। জাপানে শুনেছি ছেলেমেয়েরা বিয়েশাদি করে না। ইউরোপ-আমেরিকায়ও নাকি তাই। ঘর নেই, সংসার নেই, মুক্তবিহঙ্গ। দুমুঠো ভাতের জন্য তারা দিনরাত ছুটছে। আমাদের মধ্যবিত্তের পরিণতি বর্তমান নীতি চালু থাকলে তাই হতে পারে। গ্রামে গিয়ে বাড়ি করার ইচ্ছা হতে পারে। কিন্তু গ্রামের জমির দাম কত তা আজ সবার জানা। এদিকে ভালো একটা স্কুলে পড়ানো, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ছেলেমেয়েদের পড়ানো মধ্যবিত্তের স্বপ্ন। বর্তমান মূল্যস্ফীতি অব্যাহত থাকলে ওইসব স্কুলে পড়ানোর স্বপ্ন বাদ দিতে হবে। চিকিৎসার ক্ষেত্রেও তাই। এখন তো মধ্যবিত্ত রোগ-শোকে একটা বেসরকারি হাসপাতালে যেতে পারে চিকিৎসা সেবা নেয়ার জন্য। এক-দেড় দশক পর তাও অসম্ভব হয়ে পড়বে বলে সহজেই অনুমান করা যায়। বস্তুত বাজার অর্থনীতি, আগ্রাসী বাজার অর্থনীতির দেশগুলোয় যা হচ্ছে আমাদের দেশেও তাই হবে বলে আশঙ্কা। উন্নতি হবে ঠিকই, কিন্তু তার সুবিধা পাবে একটা গোষ্ঠী। সাধারণ মানুষের ভাগ্যে যে কষ্ট সেই কষ্টই থাকবে। এর মূল কারণ কী? আয় ও ব্যয়ের পার্থক্য। যে আয়-রোজগার মধ্যবিত্ত করবে খরচ হবে তার চেয়ে বেশি। আমেরিকা ও ইউরোপে এ পার্থক্য ঘোচায় ঋণ। সেসব দেশে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত ঋণ আর ঋণ। লেখাপড়ার জন্য ঋণ, বাড়ি করার জন্য ঋণ, গাড়ি কেনার জন্য ঋণ, সব ক্ষেত্রেই ঋণ। আমাদের দেশে এখনো এ অবস্থা হয়নি। তবে সবকিছু ঋণনির্ভর করার একটা প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। ব্যাংকগুলো ধীরে ধীরে এদিকে এগোচ্ছে বলে দৃশ্যমান।

মধ্যবিত্তের কাছে আরেকটি জিনিস পরিষ্কার থাকা দরকার। সেটা হচ্ছে মূল্যস্ফীতি। আমরা সারা দিনই চাই জিনিসপত্রের দাম কমুক। কিন্তু বুঝতে পারছি না এটা হওয়ার নয়। কম-বেশি মাঝারি মূল্যস্ফীতি হতে থাকবে। এর থেকে মুক্তি নেই। মূল্যস্ফীতি কখনো একটু কমবে আবার বাড়বে। এভাবে গড়ে মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখীই থাকবে। এখানেই মূল সমস্যা। আমরা ‘‌পাকিস্তান’ আমলে এমনকি স্বাধীনতার পরে রাস্তায় নেমেছি স্লোগান নিয়ে—দ্রব্যমূল্য কমাতে হবে, নইলে গদি ছাড়তে হবে। আজ ৫০-৬০ বছর পর বুঝতে পারছি দ্রব্যমূল্য বাড়বেই, গদি কেউ ছাড়বে না। মূল্যস্ফীতিকে বলা হচ্ছে উন্নয়নের সহযোগী বন্ধু। অতএব মধ্যবিত্তকে মূল্যস্ফীতির বিষয়টি মাথায় রেখেই ঘর-সংসার করতে হবে। এর সঙ্গে মারাত্মক আরো একটা বিষয় আছে। আমরা যেহেতু ‘‌টয়লেট’কে ‘‌ওয়াশরুম’ বানিয়ে ফেলেছি, যেহেতু ‘‌ফ্লোর’কে ‘‌লেভেল’ বানিয়ে ফেলেছি, অতএব চাকরির ক্ষেত্রেও হতে পারে সব চুক্তিভিত্তিক চাকরি। লাইফ লং এমপ্লয়মেন্ট নয়—একমাত্র সরকারি চাকরি ছাড়া। ঘণ্টাপ্রতি, সপ্তাহপ্রতি বেতন—আর কী। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) আসছে। প্রস্তুতি তার জন্যও দরকার। আমরা ঘনজনবসতির দেশ। আমেরিকা-ইউরোপ ইত্যাদি দেশ নই যারা জনশক্তি আমদানি করে। যত দক্ষতা বৃদ্ধির কথাই বলা হোক না কেন, যতই বিকল্প ব্যবস্থার কথা বলা হোক না কেন ‘‌এআই’ চাকরি ক্ষেত্রে কী অবস্থার সৃষ্টি করবে তা কেউ অনুমান করতে পারছে না। স্বয়ংক্রিয় মেশিনের ফলে একমাত্র তৈরি পোশাক শিল্পেই আগামী ১০ বছরে নাকি অর্ধেক কর্মী ছাঁটাই হবে। এটাই ভবিষ্যদ্বাণী। কৃষিতে যন্ত্র ব্যবহার হচ্ছে। দৃশ্যত উপকারী। কিন্তু কৃষিতে ছয় মাস কাজ, বাকি ছয় মাস লোক বেকার—এ কথা মানতে হবে। এসব কারণেই কিন্তু দিন দিন ‘সামাজিক নিরাপত্তা বলয়’ বাড়ছে। এটাও উন্নয়নের ফসল। এ ধরনের উন্নয়নে কিছু মানুষ কর্মচ্যুত হবে, বেকার হবে, কর্মহীন অসহায় থাকবে। তাদের জন্য আর কী করা যাবে ভাতার ব্যবস্থা ছাড়া।

যে কথা বলছিলাম, বলছিলাম মূল্যস্ফীতির কথা, যা আজকের দিনে আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা। মূল্যস্ফীতি জনমানুষের, মধ্যবিত্তের শত্রু (ধনী লোকের লাভ), কিন্তু এতৎসত্ত্বেও তা থাকবে। ১৯৭২ সালে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিই, তখন আমার বেতন ছিল মাত্র ৫০০ টাকা। এ দিয়ে সংসার চলত। বাংলাবাজার থাকতাম। সেখানে থেকে রিকশা করে নীলক্ষেত যেতে লাগত মাত্র ৭৫ পয়সা। বাড়ি ভাড়া, তরিতরকারি, মাছ-মাংস ইত্যাদির বাজার ছিল সহনীয়। স্বাধীনতার পর একটা দেশী বড় মুরগির দাম ছিল এক-দেড় টাকা। একটা ইলিশের দাম ছিল ২-৪-৬ টাকা। এক ভরি স্বর্ণের দাম ছিল ১৪০-১৫০ টাকা। দেশের বাড়ি থেকে লাল বিরুই চাল আনতাম, ছোট লাল গোলআলু আনতাম সস্তায়। খেয়ে-পরে তখন আরাম ছিল। সেই বাজার পরিস্থিতি আজকে কোথায়? জানি না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রভাষক এখন কত টাকায় চাকরিতে যোগদান করেন। শুনেছি ৩০-৩৫ হাজার টাকা। তাহলে স্বাধীনতার পর বেতন বাড়ল কত গুণ। ৫০০ টাকার জায়গায় ৩৫ হাজার টাকা। ৭০ গুণ। বিপরীতে জিনিসপত্রের দাম? চালের দামটা কম গতিতে বাড়ছে। কিন্তু বাকি জিনিসের দাম বাড়ছে অসম্ভব হারে। যে মাছ ১-২ টাকা দিয়ে কেনা যেত এর দাম এখন ৩০০-৩৫০ টাকা। খাসির মাংস, গরুর মাংসের দাম একই হারে বেড়েছে। ২৫ পয়সা, ৫০ পয়সা সেরে তরিতরকারির দাম হয়েছে ৮০-৯০ টাকা কেজি। লাউ, পেঁপে, ঝিঙা এসব কেউ খেত না। এসবের দামও আকাশচুম্বী। ধরা যাক একজন পলিশওয়ালার কথা। বায়তুল মোকাররমে ভালো পলিশওয়ালারা জুতো পলিশে স্বাধীনতার পরে নিত ১ টাকার মতো। এখন কত হবে? বিপরীতে জিনিসপত্রের দাম? একমাত্র সস্তা জামা-কাপড় তুলনামূলকভাবে। তাও দুই নম্বরির ফলে। পোশাক শিল্পের মালিকরা শুল্কমুক্তভাবে কাপড় আনেন বিদেশ থেকে জামা বানিয়ে বিদেশে পাঠাবে বলে। তারা একাংশ/পুরোটা খোলাবাজারে বিক্রি করে দেয়। এতে জামা-কাপড় একটু সস্তা। এভাবে দেখলে বোঝা যাবে গরিব, নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্তের জীবনে ধীরে ধীরে কীভাবে অনিশ্চয়তা নেমে আসছে। কীভাবে তাদের জীবন ধীরে ধীরে দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। পাশাপাশি আবার একশ্রেণীর লোক চুটিয়ে টাকা কামাই করছে, বিদেশে টাকা পাচার করছে, দুর্নীতি বাড়ছে। কোনো কিছুতেই আমরা স্থির হতে পারছি না। ১৯৪৭ সাল থেকে আজ কতদিন? আমরা আজ পর্যন্ত ‘‌সাংবিধানিক বিতর্কেরই’ শেষ করতে পারলাম না। এতদিন সংবিধান কী হওয়া উচিত তা নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে। এই যে অনিশ্চয়তা, তা মধ্যবিত্তের জীবনকে দুর্বিষহ পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। এ কারণেই আমি মধ্যবিত্তকে কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক করলাম। আয়-ব্যয়ের মধ্যে সমন্বয় করতে না পারলে তাকে দরিদ্রের খাতায় নাম লেখাতে হবে। আয় বাড়ানো কঠিন কাজ, ব্যয় কমানোও কঠিন কাজ। অথচ এ দুটোর মধ্যে একটা ‘‌গোল্ডেন মিন’ না আনতে পারলে মধ্যবিত্তকে ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যেতে হবে। আরো বেশি এ কারণে যে মধ্যবিত্তের প্রতি সরকারি দৃষ্টি কম। সরকারের কোনো কার্যক্রমেই তার কোনো উপস্থিতি নেই। এমতাবস্থায় দেখা যাক ২০২৩-২৪-এর বাজেটে তার জন্য কী থাকে?

ড. আর এম দেবনাথ: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক