২০১৩
সালকে ঘোষণা
করা হয়
আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান
বর্ষ। বাংলাদেশ
সরকার সে
বছরের ২৭
ফেব্রুয়ারি জাতীয়
সংসদে পরিসংখ্যান
আইন পাস
করে। ফলে
জাতীয় পরিসংখ্যান
প্রতিষ্ঠান হিসেবে
পরিসংখ্যান ব্যুরো
আইনগত ভিত্তি
লাভ করে।
পরিসংখ্যানবিদ ড.
একেএম গোলাম
রব্বানী বিভিন্ন
মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন
পরিসংখ্যান সংস্থাগুলোকে
সমন্বয় করে
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান
ব্যুরো গঠনের
প্রস্তাব করেন।
তারই ফসল
পরিসংখ্যান ব্যুরো।
পরিসংখ্যান আইন,
২০১৩ অনুযায়ী
আদমশুমারির নতুন
নামকরণ হয়
জনশুমারি। দেশের
সব উপাত্ত
যেমন জনসংখ্যা,
স্বাস্থ্য, শিক্ষা,
প্রজনন, বিপণন,
শ্রমশক্তি, উৎপাদন
ও প্রশাসনের
বিভিন্ন তথ্য
সংগ্রহের লক্ষ্যে
১০ বছর
অন্তর এ
শুমারি পরিচালিত
হয়। ১৮৮১
সালে এ
ধরনের শুমারির
সূচনা, ব্রিটিশ
আমলের সর্বশেষ
শুমারি পরিচালিত
হয় ১৯৪১
সালে। দ্বিতীয়
বিশ্বযুদ্ধের কারণে
এ শুমারি
বিঘ্নিত হয়।
তার ধারাবাহিকতায়
১৯৭১ সালের
নির্ধারিত শুমারিও
অনুষ্ঠিত হয়নি
মুক্তিযুদ্ধের কারণে।
যুদ্ধোত্তর পাঁচটি
জনশুমারির তথ্য
(১৯৭৪, ১৯৮১,
১৯৯১, ২০০১,
২০১১) হাতে-কলমে
সংগ্রহ করা
হয়। এবার
তথ্য সংগৃহীত
হবে ডিজিটাল
পদ্ধতিতে। এবারের
শুমারিকে বলা
হচ্ছে ডিজিটাল
গণনা। এতে
বাংলাদেশে অবস্থানকারী
বিদেশীদের শুমারির
আওতায় আনা
হচ্ছে, একই
সঙ্গে বিদেশে
অবস্থানরত বাংলাদেশীদেরও।
আগে যাকে
বলা হতো
আদমশুমারি ও
খানাশুমারি, ২০১১
সাল থেকে
তার নামকরণ
করা হয়
আদমশুমারি ও
গৃহগণনা। ২০১৩
সালের আইন
অনুযায়ী এবার
তারই নামকরণ
করা হয়েছে
জনশুমারি ও
গৃহগণনা ২০২২।
শুমারি ও
গণনা একই
অর্থ বহন
করে, শুধু
পার্থক্য হলো
শুমারি ফার্সি
আর গণনা
সংস্কৃত শব্দ।
খানা ও
গৃহ একই
অর্থ বহন
করে, পার্থক্য
হলো খানা
ফার্সি, গৃহ
সংস্কৃত শব্দ।
এর সহজ
নামকরণ হতে
পারে জন
ও গৃহগণনা।
নামকরণে বারবার
পরিবর্তন এসেছে
কিন্তু একটি
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
বারবার উপেক্ষিত
থেকেছে। সেটি
হলো, গৃহগণনার
ক্ষেত্রে শুধু
সংখ্যা নিরূপণ
করা হয়;
তার জন্ম-মৃত্যু
হিসাব করা
হয় না।
জনগণনায় গুরুত্ব
পায় জন্ম
ও মৃত্যুতারিখ
কিন্তু গৃহগণনায়
তা গুরুত্ব
পায় না।
অথচ মানুষের
যেমন জন্মকাল,
গৃহের ক্ষেত্রে
তেমনি তার
নির্মাণকাল গুরুত্বপূর্ণ।
খানা ও
গৃহের মধ্যে
সংজ্ঞাগত পার্থক্য
করাও সম্ভব।
খানা সম্পর্কিত
খানেওয়ালার সঙ্গে
আর গৃহ
ব্যবহূত হয়
আরো বৃহত্তর
অর্থে। খানা
শব্দটি থাকবস্ত
জরিপ আমলের
(১৮৪৫-১৮৭৭)
পরিভাষা, যখন
মৌজা দিয়ে
গ্রামের সীমানা
চিহ্নিত করা
হতো। ফার্সি
থাক অর্থ
সীমানা পিলার,
মৌজা বৃহত্তর
অর্থে গ্রাম।
সে সময়
খানা ক্ষুদ্র
অর্থে ব্যবহূত
হতো। বর্তমানকালে
গৃহ অর্থে
বসতবাড়ি হতে
পারে নিজের
বাড়ি অথবা
ভাড়া বাড়ি।
এমনকি তার
সঙ্গে বিদ্যুৎ,
গ্যাস ও
পানির সংযোগও
গণনার অন্তর্ভুক্ত
হয়। গণনায়
স্থান পায়
গৃহটি পাকা,
সেমি-পাকা,
কাঁচা নাকি
ঝুপড়ি। কিন্তু
যে গুরুত্বপূর্ণ
তথ্য আজও
গৃহগণনায় অন্তর্ভুক্ত
হয়নি, তা
হলো গৃহের
নির্মাণকাল ও
তার স্থায়িত্ব।
সময়ের অগ্রগতির
সঙ্গে গৃহের
সংজ্ঞায় পরিবর্তন
এসেছে। সময়ের
অগ্রগতির সঙ্গে
সঙ্গে গৃহের
বর্ণনায় তার
নির্মাণকাল উল্লেখ
করাও জরুরি
হয়ে পড়েছে।
খানাশুমারিতে খানার
আয়-ব্যয়
জরিপ করা
হয়। দারিদ্র্য
বিমোচনের লক্ষ্য
থেকে দেশের
সব খানাচিত্রের
সঙ্গে দরিদ্র
খানাগুলো চিহ্নিত
করা হয়।
যেমন কুড়িগ্রাম,
দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও,
লালমনিরহাট, মাগুরা,
বান্দরবান, খাগড়াছড়ি,
শরীয়তপুর সবচেয়ে
দরিদ্র এলাকা।
এ ধরনের
জরিপ থেকে
বিভিন্ন এলাকার
দারিদ্র্য হার
পাওয়া যায়
কিন্তু এর
মাধ্যমে দারিদ্র্যের
কারণ চিহ্নিত
করা যায়
না। নদীভাঙন,
ভূমিকম্প, ভূমিধস,
বন্যার ইতিহাস
জানার পরই
দারিদ্র্যের কারণ
জানা সহজতর
হয়।
নির্মাণকাল ব্যতীত
কী নগর
কী গ্রাম,
কারো প্রকৃত
চিত্র পাওয়া
সম্ভব নয়।
উদাহরণ হিসেবে
বলা যায়,
যদি নীলক্ষেত
এলাকার নগরায়ণের
চিত্র পেতে
চাই তাহলে
স্থাপনাগুলোর নির্মাণকাল
জানা জরুরি
হয়ে পড়ে।
একটি পরিসংখ্যান
নেয়া যাক।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের
সময় নীলক্ষেত
এলাকার ফাঁকা
মাঠটিতে অগণিত
বাঁশের ঘরের
মধ্যে স্থাপন
করা হয়
ফিল্ড হাসপাতাল।
এখনকার সার্জেন্ট
জহুরুল হক
হল (ইকবাল
হল) ও
কলাভবন এলাকা
ছিল গাছপালায়
ভরা মাঠ,
যা চারণভূমি
হিসেবে ব্যবহূত
হতো। প্রকৃতই
আমেরিকার নিগ্রো
সৈন্যদের আত্মগোপনের
জন্য উপযুক্ত
স্থান। সেখানে
আরো ছিল
ছাত্রদের সুইমিং
পুল ও
খেলার মাঠ।
এক কথায়
চল্লিশের দশকে
নীলক্ষেত ছিল
সত্যিকার অর্থেই
ক্ষেত। পঞ্চাশের
নগরায়ণের রেখাটি
এ রকম—নিউমার্কেট
স্থাপিত হয়
১৯৫২ সালে,
যদিও তার
আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন
হয় ১৯৫৪
সালে। ইকবাল
হল নির্মিত
হয় ১৯৫৭
সালে, নায়েম
১৯৫৯ সালে।
নীলক্ষেত কলাভবনের
নির্মাণকাজ শুরু
হয় ১৯৬৩
সালে। ১৯৬৭
সালের মধ্যে
এ ভবনের
তৃতীয় তলা
পর্যন্ত নির্মাণকাজ
সম্পন্ন হয়।
তবে র্পূণাঙ্গভাবে
নির্মাণকাজ সম্পন্ন
হওয়ার আগেই
১৯৬৫ সালে
বর্তমান ভবনে
কলাভবনের কয়েকটি
বিভাগ স্থানান্তরিত
হয়। এসব
প্রতিষ্ঠানের নির্মাণকাল
জানার পরই
স্পষ্ট হয়ে
ওঠে নীলক্ষেত
এলাকার প্রকৃত
চিত্র।
সৌভাগ্যের বিষয়
বর্তমানকালে গৃহগণনায়
বসতবাড়ির তালিকায়
যুক্ত হয়েছে
প্রতিষ্ঠানের নাম।
যেমন স্কুল,
কলেজ, মাদ্রাসা,
হল, হোস্টেল,
পাগলাগারদ বা
পুনর্বাসন কেন্দ্র।
সরকারি বাধ্যবাধকতার
কারণে আমাদের
দেশে স্কুল-কলেজগুলো
তাদের প্রতিষ্ঠাকাল
ও প্রতিষ্ঠাতার
নাম লিপিবদ্ধ
করে। এটি
ওই প্রতিষ্ঠান
সম্পর্কে একটি
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
কিন্তু বসতবাড়ি
গণনার বেলায়
সেটি আমাদের
দেশে হতে
দেখা যায়
না। সরকারি
কোনো বাধ্যবাধকতা
নেই, তা
সংরক্ষণের কোনো
চেষ্টাও পরিলক্ষিত
হয় না।
অথচ বসতবাড়ি
স্থাপনের তথ্য
থাকলে একটি
গ্রামের প্রতিষ্ঠাকাল
বের করা
সহজ হয়।
শহরেও এসব
তথ্য হাতে
থাকলে নগরের
বিস্তৃতি, প্রসার
সম্পর্কে সম্যক
জানা যায়।
তাতে হয়তো
সংসদীয় এলাকা
সম্পর্কে প্রাক্কলন
করাও সহজতর
হতো।
নাম-ঠিকানার
অনুপস্থিতি ইতিহাস
বিকৃতিরও জন্ম
দিতে পারে।
১৯৫২ সালের
ভাষা আন্দোলনের
সময় কলাভবন
ছিল ফুলবাড়িয়া
রেলস্টেশনের কাছে
মেডিকেল কলেজে।
তখন নীলক্ষেত
কলাভবনের স্থানে
ছিল মন্ত্রীর
বাসভবন। বর্তমান
প্রজন্ম ভাষা
আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত
কলাভবন বলতে
বোঝে নীলক্ষেত
কলাভবনকে। অথচ
এর নির্মাণকাজ
শুরু হয়
ভাষা আন্দোলনের
এক যুগ
পর ১৯৬৩
সালে। ১৯৩৯
সাল থেকে
অল ইন্ডিয়া
রেডিও স্টেশন
ছিল নাজিমউদ্দিন
রোডে। পুলিশের
গুলিবর্ষণের তাত্ক্ষণিক
বিরোধিতা করেন
রেডিওর কলাকুশলী
ও শিল্পীরা।
বর্তমান প্রজন্ম
মনে করতে
পারে রেডিও
পাকিস্তানের শাহবাগ
কেন্দ্র (১৯৬০)
থেকে এ
বিরোধিতা করা
হয়। ভাষা
আন্দোলনের সময়
ফুলবাড়িয়া রেলওয়ে
স্টেশন ও
রেডিও স্টেশন
দুটিই ছিল
মেডিকেল কলাভবনের
কাছে। সেখানেই
তৈরি হয়েছে
শহীদ মিনার।
জগন্নাথ হলে
ছিল প্রাদেশিক
পরিষদ। এটি
নির্মাণ করা
হয়েছিল ছাত্রদের
কমনরুম হিসেবে।
কাজেই একটি
দেশের ইতিহাসের
সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে
জড়িত তার
স্থাপনাগুলোর নির্মাণকাল
নথিভুক্তকরণ অত্যন্ত
জরুরি।
খানা গণনায়
আয়-ব্যয়ের
হিসাব করা
হয় সামাজিক
নিরাপত্তাবেষ্টনী তৈরির
জন্য। ইতিহাসের
নিরাপত্তার জন্য
এখন দরকার
তার সঙ্গে
নির্মাণকাল সংযোজন।
নতুবা এটি
হবে একটি
অসম্পূর্ণ গৃহগণনা।
জরুরি ভিত্তিতে
এ ধরনের
গৃহগণনা এ
বছর থেকেই
চালু করতে
পারলে ভালো
হতো।
ড. মাহমুদ নাসির জাহাঙ্গীরি: অধ্যাপক ও সাবেক বিভাগীয় প্রধান, বাংলা বিভাগ, মিরপুর কলেজ










