ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, অগ্নিনিরাপত্তায় অতিঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা ঢাকার চেয়ে চট্টগ্রামে বেশি; যা উদ্বেগজনক। অধিকাংশ বহুতল ভবনে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নেই। নেই ঠিকঠাক জরুরি নির্গমন ব্যবস্থাও। ভবন নির্মাণ ও সম্প্রসারণে নিয়ম না মানা, অগ্নি প্রতিরোধ এবং নির্বাপণসংক্রান্ত আইন ও বিধিমালা না মানার ফলে বারবার মানুষের জীবন বিপন্ন হচ্ছে। অগ্নিকাণ্ডের ফলে প্রাণহানি, আহত হওয়ার ঘটনা ও সম্পদের ক্ষতি বাড়ছে। ফলে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের চিহ্নিত করা ভবন দ্রুত অগ্নিঝুঁকিমুক্ত করা প্রয়োজন। দ্রুতই তাদের সুপারিশ মেনে ভবনগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং সংস্কারের অযোগ্য ভবন ব্যবহার বন্ধ করা হোক। এক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের সক্রিয়তা জরুরি।

অগ্নিকাণ্ডকে নিছক দুর্ঘটনা বলা চলে না, এটা কাঠামোগত ত্রুটির বহিঃপ্রকাশ। দেশে প্রতিনিয়তই ছোট-বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এর বেশির ভাগই ঘটে সংশ্লিষ্টদের অবহেলা আর অসতর্কতার জন্য। বড় কোনো অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে অবহেলা আর অনিয়মের কথা জানা যায়। গত বছর ৮ জুলাই নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে একটি কারখানায় অগ্নিদুর্ঘটনায় ৫২ জন মারা যাওয়ার পর জানা যায়, সেখানে ঝুঁকি নিরসনের তেমন কোনো ব্যবস্থা ছিল না। প্রশ্ন হচ্ছে, অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিতে থাকা ভবনগুলোর মালিক বা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়া হয়। ফায়ার সার্ভিস ভবন পরিদর্শনের পর ঝুঁকি চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্টদের চিঠি দিয়ে দায়িত্ব শেষ করে। সংশ্লিষ্টরা ব্যবস্থা নিল কি নিল না, সেটা তারা দেখে না। ভবনের ধরন ভেদে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের সেটা তদারকির কথা। কারখানাগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তরের। তারাও বিভিন্ন সময় কলকারখানার অগ্নিঝুঁকি নিয়ে জরিপ করেছে। তবে কারখানাগুলোর ঝুঁকি প্রশমনে তাদের দায়িত্ব-কর্তব্যে অবহেলা রয়েছে বলে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। কখনো কখনো অগ্নিঝুঁকিতে থাকা ভবন মালিক ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে নামমাত্র ব্যবস্থা নেয়া হয়। বহুতল ভবনটির নকশায় জীবন সুরক্ষার বিষয়টি পুরোপুরি উপেক্ষিত থাকছে। এজন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর দায়িত্বশীলতা ও সদিচ্ছার অভাবকে দায়ী করা যায়। অগ্নি শনাক্তকরণ ব্যবস্থা ও পর্যাপ্ত অগ্নি বহির্গমন পথ থাকলে মানুষ আগুন লাগামাত্রই সতর্কসংকেত পেত এবং ভবন থেকে বেরিয়ে যেতে পারত। হয়তোবা দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনাও সম্ভব হতো। এক্ষেত্রে অগ্নিঝুঁকি প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। এজন্য সংশ্লিষ্টদের সময় বেঁধে দিতে হবে। নির্দিষ্ট সময়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া না হলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। প্রয়োজনে অগ্নিকাণ্ডের অতিঝুঁকিতে থাকা ভবন সিলগালা করে দিতে হবে।

উন্নত দেশগুলোয় আবাসিক ও বাণিজ্যিক দুই ধরনের ভবন নির্মাণেই আগুন নেভানোর সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়। এ ব্যবস্থাকে বলা হয় অগ্নিনিরাপত্তা ও অগ্নিব্যবস্থাপনা। বহুতল ভবনে এসব ব্যবস্থা ছাড়া ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ভবন নির্মাণ ও ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই। দুর্ভাগ্যক্রমে যদি আগুন লেগেই যায়, তাহলে আগে থেকে টের পেতে ব্যবহার করা হয় ফায়ার অ্যালার্ম, স্মোক ডিটেক্টর ও টেম্পারেচার ক্যাপচার। এ প্রযুক্তিগুলো ঘরের সিলিংয়ের সঙ্গে জুড়ে দেয়া হয়। কোনো কারণে দালানে আগুন লাগলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ঘরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। এটি জানান দেয় ফায়ার অ্যালার্ম ও টেম্পারেচার ক্যাপচার। মানুষ নিরাপদে সরে যাওয়ার সুযোগ পায়। ব্যবহার করা হয় স্মোক ডিটেক্টর। ঘরে ধোঁয়ার অস্তিত্ব টের পেলেই এটি সচল হয়ে যায়। এসব প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত থাকে ওয়াটার স্প্রিঙ্কলার ও ফায়ার সাপ্রেশনার। দালানে আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গেই এগুলো চালু হয়ে যায় এবং তীব্র বেগে পানি ও আগুন নেভানোর বিশেষ রাসায়নিক ঝরতে শুরু করে। আগুন পুরোপুরি না নিভলেও পানি ও বিশেষ রাসায়নিক ফোম আগুন ছড়াতে দেয় না। এসব স্প্রিঙ্কলার চালু রাখতে দালানে রাখা হয় বিশেষ রিজার্ভ পানির ট্যাংক। মোটর দিয়ে এ ট্যাংক থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পানি উঠে এসে আগুন নেভাতে শুরু করে। বিদ্যুৎ না থাকলেও যেন এসব মোটর এক মুহূর্ত বন্ধ না থাকে, সেজন্য থাকে জেনারেটরের ব্যবস্থা। এছাড়া প্রতিটি ভবনে বিশেষ দরজা বা বেরোনোর পথ থাকে। আগুন লাগলেই ভবনের ভেতরের মানুষ এসব দরজা দিয়ে দ্রুত বের হয়ে যেতে পারে। থাকে গ্রিল ছাড়া বিশেষ জানালা। জরুরি প্রয়োজনে এসব জানালা ভেঙে ভেতরে মানুষ যেমন বেরিয়ে আসতে পারে, তেমনি ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরাও এ পথে দ্রুত ভেতরে প্রবেশ করতে পারেন। দেয়ালে দেয়ালে থাকে প্রয়োজনীয়সংখ্যক অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র; যাতে ছোটখাটো আগুন লাগলে শুরুতেই নেভানো যায় বা আগুন ছড়ানোর মাত্রা কমিয়ে রাখা যায়। দেশেও অনুরূপ অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

দেশের বিদ্যমান আইনে বহুতল ভবন, শিল্প-কলকারখানা ইত্যাদি স্থাপনে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই যে তা মানা হচ্ছে না, বিশেষজ্ঞরা আলোচনায় বিষয়টি বারবার স্পষ্ট করেছেন। বস্তুত ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ও জাতীয় বিল্ডিং কোডে এ বিষয়ে নির্দেশনা থাকলেও তা বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকা পালন করছেন না সংশ্লিষ্টরা। হাউজ বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউশনের মাধ্যমে সব পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ নিয়ে পূর্ণাঙ্গ বিল্ডিং কোড প্রণীত হয়, যা মাঠ পর্যায়ে প্রয়োগের জন্য ২০০৬ সালে আইনগত ভিত্তি পায়। কিন্তু বিল্ডিং কোড প্রয়োগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এখন পর্যন্ত কোনো প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা হয়নি। জাতীয় বিল্ডিং কোড তথা ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় বলা হচ্ছে, সাততলা পর্যন্ত ভবন নির্মাণের সময় ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর, গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিভাগের ছাড়পত্র নেয়া বাধ্যতামূলক। এর চেয়ে উঁচু ভবনের ক্ষেত্রে এসবের সঙ্গে ফায়ার ডিটেক্টর, স্মোক ডিটেক্টর, উচ্চগতির পানি স্প্রে সিস্টেম ও কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন সিস্টেম থাকাও বাধ্যতামূলক। কিন্তু রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন নগরীর বেশির ভাগ ভবন নির্মাণে এসবের তোয়াক্কা করা হচ্ছে না। আইনে বলা আছে, যদি কেউ জাতীয় বিল্ডিং কোডের অংশবিশেষও সঠিকভাবে মানতে ব্যর্থ হন, তাহলে তিনি কমপক্ষে সাত বছরের জেল অথবা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এর প্রয়োগও দৃশ্যমান নয়। নগরের বিভিন্ন সেবাপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়হীনতাও জাতীয় বিল্ডিং কোড বাস্তবায়নের অন্তরায়। বিদেশে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসসহ সব সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান মেয়রের নিয়ন্ত্রণে থাকে। প্রয়োজনে দেশের সব নগরে একই রকম নগর সরকার গঠন করে সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসতে হবে।

নতুন ভবনের ক্ষেত্রে সঠিক নকশা ও নির্মাণ পদ্ধতি অনুসরণ করলে অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। কিন্তু এরই মধ্যে যেসব ভবন নির্মাণ হয়েছে, সেগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা যায়? এটা বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। নির্মিত অধিকাংশ ভবনের কাঠামোগত পরিবর্তন জটিল ও ব্যয়বহুল, পারফরম্যান্স বেজড রেট্রোফিটিং করা যেতে পারে। শহরগুলোয় বিশেষত সুউচ্চ ভবনের এলাকাগুলোয় ফায়ার হাইড্রেন্ট স্থাপন এবং বিদ্যমান ভবনে পর্যাপ্ত পানির আধার বা ট্যাংক না থাকলে দু-একটি তলা ভেঙে ফেলে পানির আধার নির্মাণ করা যেতে পারে। বাস্তবসম্মত বিকল্প ব্যবস্থা না করা গেলে উপযুক্ত সফটওয়্যারের মাধ্যমে অধিবাসীদের বহির্গমনের গতিবিধি সিমুলেট করে ভবনের যত তলা পর্যন্ত মানুষের নিরাপদ বহির্গমন সম্ভব হবে, তত তলাই ব্যবহারের অনুমতি পাবে। আগুন ও ধোঁয়া যাতে ছড়াতে না পারে এবং করিডোর ও সিঁড়িঘরে যাতে আগুন ও ধোঁয়া ছড়াতে না পারে, সেজন্য পর্যাপ্ত ফায়ার সেপারেশন ও ধোঁয়া নির্গমন পথের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। সুউচ্চ ভবনের ক্ষেত্রে ফায়ার লিফট রাখা বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। বহুতল ভবনগুলোয় অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা ও নিয়মিত ফায়ার ড্রিল অনুশীলনের ব্যবস্থা রাখা জরুরি। নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে রাজউক ও ফায়ার সার্ভিস বিভাগ নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে ফায়ার সনদ দেয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। আসল কথা হলো, ইমারত নির্মাণ বিধিমালা মেনে চলতে হবে, ভবনগুলোকে নিরাপদ করতেই হবে।

অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি কমাতে অগ্নিপ্রতিরোধ ও নির্বাপণ নামে একটি আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। এ আইন অনুযায়ী বহুতল ভবন নির্মাণে ফায়ার সার্ভিস থেকে ছাড়পত্র নিতে হবে। মূলত ভবনের সামনে সড়কের প্রশস্ততা, নকশা অনুসারে ভবনের অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা, ভবন থেকে বের হওয়ার বিকল্প পথ, কাছাকাছি পানির সংস্থান, গাড়ি ঢুকতে পারবে কিনা—এসব বিষয় পর্যবেক্ষণ করে ছাড়পত্র দেয় ফায়ার সার্ভিস। তার পরই এ ছাড়পত্র দেখিয়ে ভবনের নকশার অনুমোদন নিতে হয়। এরপর ভবনের নির্মাণকাজ শুরু করতে হয়। নির্মাণকাজ আংশিক বা পুরোপুরি শেষ হওয়ার পর ভবনটি ব্যবহারের জন্য বসবাস বা ব্যবহারের সনদ নিতে হয়। এ সনদ দেয়ার সময় নকশা অনুযায়ী ভবনটি নির্মাণ হয়েছে কিনা, তা দেখার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। কিন্তু এ ব্যাপারে কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ দৃশ্যমান নয়। এজন্যই জাতীয় নির্মাণবিধি অমান্য করে গড়ে উঠছে বহুতল ভবন। শুধু রাজধানী ঢাকা নয়, বিভাগীয় শহরেও গড়ে উঠছে অসংখ্য বহুতল ভবন। এসব ভবনে কতটুকু ভূমিকম্প ও অগ্নিঝুঁকি মোকাবেলার ব্যবস্থা আছে তা জানা নেই। তবে এসব এলাকায় নারায়ণগঞ্জ বা বনানীর মতো অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটলে তার পরিণতি ঢাকার চেয়েও যে ভয়াবহ হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই ঢাকাসহ দেশের সব নগরে বিল্ডিং কোর্ডের নিয়মকানুন যথাযথভাবে অনুসরণ করেই যাতে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।