বর্তমানে দেশে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের ঘটনায় দ্রুত বিচার নিশ্চিতে সব পেশার মানুষ সোচ্চার। প্রতিদিন মানুষ রাস্তায় প্রতিবাদ করছে দ্রুত ও কার্যকর বিচারের জন্য। ২০১৭ ও ২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে ধর্ষণের ঘটনা প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের হিসাবমতে, ২০১৯ সালে ১ হাজার ৭০৩ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। তার মধ্যে ২৩৭ জনকে গণধর্ষণ ও ৭৭ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। ১৯ জন নারী ধর্ষণের ঘটনার ফলে পরে আত্মহত্যা করেন। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট ২০২০ পর্যন্ত ৮৮৯ জন নারী ও শিশুকে ধর্ষণ করা হয় এবং ৪১ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। নয়জন ধর্ষণের ফলে আত্মহত্যা করেন। পরিসংখ্যান মতে, ৩৬৩ শিশুকে ধর্ষণ করা হয়। অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে ১১১ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। আসকের আরেকটি পরিসংখ্যান মতে, ৮০ শতাংশ ধর্ষক ভিকটিমের পরিচিত ব্যক্তি, অর্থাৎ আত্মীয়স্বজন, বাড়ির লোক এবং প্রতিবেশী হন। ধর্ষণের ফলে চিকিৎসার জন্য সারা দেশে ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টার আছে ১১টি। এ বছর জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত যৌন সহিংসতার শিকার হয়ে চিকিৎসা গ্রহণ করে ১ হাজার ৪০৬ জন ভিকটিম (প্রথম আলো, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২০)।

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলায় গত ২ সেপ্টেম্বর রাতে এলাকার সন্ত্রাসী দ্বারা ধর্ষণের চেষ্টা ও তাকে বিবস্ত্র করে পৈশাচিক আচরণের ভিডিও ধারণ করা হয়। ৩২ দিন পর ৪ অক্টোবর ওই ভিডিও ফেসবুকে প্রকাশ হলে তা ভাইরাল হয় এবং সারা দেশের মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। ভিকটিম নারী জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে জানায়, এর আগেও ধর্ষক দেলোয়ার তাকে জোরপূর্বক দুবার ধর্ষণ করে। এ ঘটনা সারা দেশের মানুষের মধ্যে ব্যাপক নাড়া দেয়। কয়েক দিন আগে সিলেটের এমসি কলেজ ও খাগড়াছড়িতে একজন নারীকে গণধর্ষণ আমাদের সমাজ ব্যবস্থাকে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দেয় নারীর নিরাপত্তা নিয়ে। এমনকি করোনাকালেও সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে।

মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’-এর প্রতিবেদন মতে, ২০১৭ সালে ৭৮৩ জন, ২০১৬ সালে ৭৫৭ জন, ২০১৫ সালে ৭৮৯ জন, ২০১৪ সালে ৬৬৬ জন, ২০১৩ সালে ৮১৪ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। উল্লিখিত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১৯ সালে বাংলাদেশে ধর্ষণের হার দ্বিগুণ বেড়েছে। বিশেষ করে কন্যাশিশুদের ক্ষেত্রে ধর্ষণের হার অধিকমাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। শিশুরা যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে খুবই স্পর্শকাতর অবস্থায় আছে। এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত একজন নারী শিক্ষার্থী সন্ধ্যার পর ঢাকায় ধর্ষণের শিকার হওয়ায় দেশব্যাপী ধর্ষণের বিচার দ্রুত নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আন্দোলন শুরু হয়। বিশেষ আদালত ও ট্রাইব্যুনাল গঠনের জন্য বিভিন্ন সংগঠন থেকে জোর দাবি জানানো হয়।

বাংলাদেশের ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের বিচারের লক্ষ্যে ২০০০ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন প্রণয়ন করা হয়। ২০০৩ সালে ওই আইনের সংস্কার করে বিশেষ সংশোধনী আনা হয়। ওই আইনের অধীনে নারী ও শিশু নির্যাতনের বিচারের লক্ষ্যে জেলা ও দায়রা জজ পদমর্যাদার বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাকে দিয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করা হয়। ২০১৮ সালে নতুন করে ৪১টি এবং ২০২০ সালে ছয়টি ট্রাইব্যুনাল বাড়ানো হয়। বর্তমানে ১০১টি ট্রাইব্যুনালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের অধীন দায়েরকৃত প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার মামলার বিচার কার্যক্রম চলমান। ওই পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমানে প্রতিটি ট্রাইব্যুনালে গড় বিচারাধীন মামলার হার প্রায় ১ হাজার ৬৮৪ হয়। ১০১টি ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে এই বিপুলসংখ্যক মামলার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব। তার পরও সাম্প্রতিক সময়ে দেশব্যাপী চাঞ্চল্যকর নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলা, রুপা গণধর্ষণ ও হত্যা মামলা, রিফাত শরীফ হত্যা মামলাসহ বেশকিছু মামলায় দৃষ্টান্ত হিসেবে দ্রুতগতিতে নিষ্পত্তি করা হয়।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ পর্যালোচনায় দেখা যায়, ওই আইনের ৯ ধারা অনুযায়ী দ্য পেনাল কোড, ১৮৬০-এর ৩৭৫ ধারায় বর্ণিত ধর্ষণের সংজ্ঞাকে নতুন করে নির্ধারণপূর্বক শাস্তি বর্ধিত করা হয়। আইনের ৯(১) উপধারা মতে, ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত আসামি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। ৯(২) উপধারা মতে, ধর্ষণের ফলে মৃত্যু হলে বা ধর্ষণ-পরবর্তীকালে কোনো কারণে ভিকটিমের মৃত্যু হলে অভিযুক্ত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা যাবে। আইনের ৯(৩) উপধারা মতে, গণধর্ষণ করা হলে এবং ধর্ষণের ফলে ভিকটিমের মৃত্যু হলে বা ভিকটিম আহত হলে গণধর্ষণে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেক আসামিকে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং এর অতিরিক্ত ১ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা যাবে। এছাড়া ধর্ষণের চেষ্টার জন্য ও ভিকটিমকে আহত করার জন্য ৯(৪) উপধারায় পৃথক শাস্তির বিষয় বর্ণিত আছে। আইনে প্রতারণা ও প্ররোচিত করে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনকে ধর্ষণ হিসেবে সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী ধর্ষণের মামলা বিশেষভাবে তদন্তের বিস্তারিত নির্দেশনা আছে। আইনের ১৮ ধারা অনুযায়ী, আসামি অপরাধ সংঘটনকালে পুলিশ কর্তৃক ধৃত বা অন্য কোনোভাবে ধৃত হলে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে অভিযোগপত্র দাখিলের নির্দেশনা আছে এবং যদি আসামি অপরাধ সংঘটনকালে ধৃত না হয়, সেক্ষেত্রে ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে অভিযোগপত্র দাখিল করতে হবে। এছাড়া ২২ ধারা মোতাবেক ভিকটিমের জবানবন্দি গ্রহণের উদ্দেশ্যে বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ভিকটিমকে উপস্থাপনের নিদের্শনা আছে।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ২০ ধারা মোতাবেক বিশেষভাবে দ্রুত বিচার করার লক্ষ্যে শুধু ট্রাইব্যুনালে এই মামলার বিচার কার্যক্রম চলবে। ২০(২) উপধারা মোতাবেক ট্রাইব্যুনাল প্রতি কর্মদিবসে একটানা বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করে মামলা নিষ্পত্তির নির্দেশনা আছে। ২০(৩) উপধারা মোতাবেক ১৮০ দিনের মধ্যে বিচারকার্য সম্পাদন করার নির্দেশনা আছে। দেশে বর্তমানে যে হারে যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে, সেক্ষেত্রে বিদ্যমান ১০১টি ট্রাইব্যুনাল দিয়ে আইনের নির্দেশনা মোতাবেক ১৮০ দিনের মধ্যে বিচারকার্য সম্পন্ন করা বাস্তবসম্মত নয়। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে মানব পাচার ট্রাইব্যুনাল ও শিশু আদালতের দায়িত্বে আছে। সারা দেশে শিশু আদালতে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ১৭ হাজার ৫০৬টি মামলা থাকলেও পৃথক কোনো আদালত নেই।

 এছাড়া মামলার বিচারের ক্ষেত্রে সাক্ষী ও প্রমাণ উপস্থাপন একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। বাংলাদেশে বিদ্যমান আইনে সাক্ষী সুরক্ষায় এবং সাক্ষী উপস্থাপনের ক্ষেত্রে কার্যকর কোনো আইন নেই। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনা করেন সরকার কর্তৃক নিয়োজিত কৌঁসুলিরা। ওই কৌঁসুলিরা দ্রুত বিচার নিশ্চিতের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য ভূমিকা না রাখায় ট্রাইব্যুনালের পক্ষে দ্রুত বিচার নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয় না। সম্প্রতি বেশকিছু আলোচিত মামলায় দেশের আদালতগুলো দ্রুত বিচার নিষ্পত্তি করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। প্রতিটি মামলার ক্ষেত্রে দেখা যাবে, তদন্তকারী সংস্থা ও রাষ্ট্রপক্ষে নিয়োজিত কৌঁসুলিরা বিশেষ সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। সময়মতো সাক্ষী উপস্থাপন করায় এবং রাষ্ট্রপক্ষের সক্রিয় তত্পরতা থাকায় ওই মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ আদালতকে যথাযথভাবে আইন মোতাবেক সহায়তা করলে বাংলাদেশ বিচার বিভাগ ন্যায়বিচার নিশ্চিতে অনন্য ভূমিকা রাখতে সক্ষম।

 বাংলাদেশের বিদ্যমান আইন আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের চেয়েও শক্তিশালী ও কার্যকর। ভারতে ধর্ষণের বিচার পেনাল কোডের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী স্বাভাবিক আদালতে বিচার হয়। সম্প্রতি ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট একটি মামলায় ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন ও শিশুদের বিরুদ্ধে নির্যাতনের ক্ষেত্রে প্রতি ১০০টি মামলার জন্য বিশেষ আদালত গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন। ওই নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ধর্ষণ ও যৌন অপরাধের ক্ষেত্রে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্দেশ্যে ২০১৯ সালে একটি বিশেষ স্কিম গাইডলাইন প্রণয়ন করে। ওই স্কিমের আওতায় ভারত সরকার সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শক্রমে ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট হিসেবে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার মামলার জন্য ১ হাজার ২৩টি বিশেষ কোর্টের অনুমোদন দেয় এবং গড় হিসাবে প্রতিটি কোর্টের জন্য প্রায় ১৬৭টি মামলা বরাদ্দ করা হয়। উল্লেখ্য, এর আগে স্থাপিত প্রায় ১ হাজার ৮০০টি বিশেষ আদালতের কার্যক্রম চলমান আছে। নতুন অনুমোদিত ১ হাজার ২৩টি কোর্ট শুধু ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন ও শিশুদের বিরুদ্ধে করা নির্যাতনের মামলা নিষ্পত্তি করবে।

গত বছরের ডিসেম্বরে ভারতের হায়দরাবাদে পশুচিকিৎসককে নির্মমভাবে ধর্ষণ ও হত্যা করায় সারা ভারতে আন্দোলন শুরু হয়। ওই প্রেক্ষাপটে অন্ধ্র প্রদেশ সরকার ‘দিশা আইন’ নামে দুটি বিশেষ আইন তৈরি করে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের বিষয়ে বিশেষ তদন্ত সংস্থা এবং আদালতের বিধান প্রবর্তন করে। ওই আইন অনুসারে, ২১ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার কার্যক্রম নিষ্পত্তি করে মামলার রায় ঘোষণা করার বিধান আছে। অন্ধ্র প্রদেশ সরকার এরই মধ্যে ৩৬টি বিশেষ আদালত প্রতিষ্ঠা করেছে।

বাংলাদেশে বর্তমানে যেভাবে যৌন সহিংসতা ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে, সেক্ষেত্রে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর বাস্তব প্রয়োগের লক্ষ্যে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা অনুপাতে পর্যাপ্ত ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করা যায়। এছাড়া ধর্ষণ মামলার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার জন্য মহানগর এলাকায় ও বিভাগীয় জেলায় শুধু ধর্ষণ মামলার বিচার করার জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা যায়। এই ট্রাইব্যুনালগুলো বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ধর্ষণ মামলার দ্রুত বিচার শেষ করবে। এছাড়া দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সুপ্রিম কোর্টের সমন্বয়ে বিশেষ মনিটরিং সেল গঠন করা প্রয়োজন। রাষ্ট্রপক্ষে সাক্ষী উপস্থাপন ও যথাযথ সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে প্রতি জেলায় বিশেষ মনিটরিং সেল গঠন করা আবশ্যক। ওই বিষয়ে এর আগে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক কয়েকটি রায়ে নির্দেশনা দেয়া আছে। সার্বিকভাবে বলতে গেলে আমাদের একটি উন্নত ও কার্যকর আইন থাকার পরও তার যথাযথ প্রয়োগের অভাবে বিচারের দাবিতে ছাত্র, শিক্ষক ও গণমানুষকে রাস্তায় আন্দোলন করতে দেখা যায়। কেবল আইনের যথাযথ প্রয়োগই ধর্ষণের মতো ঘটনায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে।

 

মো. জাকির হোসাইন: বাংলাদেশ বিচার বিভাগের সদস্য

সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, ফেনী