আইন ভেঙে ব্যাংকের প্রয়োজনীয় পণ্য বা সেবা কেনাকাটায় অংশ নিচ্ছেন পরিচালক বা তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান। প্রতিযোগিতামূলক দরের কথা বলা হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে উচ্চদরে তা কিনে নেয়া হচ্ছে। এভাবে একশ্রেণীর পরিচালক প্রতি বছর বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এখন থেকে পরিচালকের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যাংকের পণ্য বা সেবা ক্রয় করার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সম্প্রতি জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে পরিচালকের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো কোম্পানিও ব্যাংকের কেনাকাটায় সম্পৃক্ত হতে পারবে না বলে নির্দেশনা দিয়েছে সংস্থাটি। এটা একটা সময়োচিত পদক্ষেপ। কাজেই শুধু নির্দেশনা নয়, এটি যথাযথভাবে পরিপালিত হচ্ছে কিনা, তার তদারকিও নিশ্চিত করতে হবে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে।

সময়ান্তরে দেশের ব্যাংক খাতের প্রসার ঘটেছে। অনুমোদন পেয়েছে নতুন নতুন ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে দেশে তফসিলি ব্যাংকের সংখ্যা এখন ৬১। কিন্তু সংখ্যায় বাড়লেও ব্যাংক খাতে করপোরেট সুশাসন একটা বড় প্রশ্ন হিসেবে দেখা দিয়েছে। করপোরেট সুশাসন নিশ্চিতের মূল দায়টা পরিচালনা পর্ষদের। তাদের বড় কাজ হলো ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে সামগ্রিক দিকনির্দেশনা দেয়া। সেক্ষেত্রে আইনানুগ কৌশল থাকবে, থাকবে পর্যবেক্ষণও। নিয়মমাফিক যা হওয়ার কথা তা হচ্ছে কিনা দেখবে, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবে। এসব কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে শুধু প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ ও লক্ষ্যকে প্রাধান্য দিতে হবে, কোনোভাবে ব্যক্তিস্বার্থ নয়। অথচ বাংলাদেশে ঘটছে উল্টোটা। এখানে খোদ পরিচালকরাই নানাভাবে স্বার্থের সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছেন। অনেক ক্ষেত্রে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে নিজের আত্মীয়-স্বজনদের ব্যাংকে নিয়োগ দিচ্ছেন। হস্তক্ষেপ করে পছন্দের লোকদের পদোন্নতি দিচ্ছেন। ডিউ ডিলিজেন্সের বাইরে গিয়ে ঋণ অনুমোদন করছেন। এখন স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান কিংবা পৃথক কোম্পানি খুলে নিজেদের ব্যাংকের সঙ্গে ব্যবসা করছেন বলে অভিযোগ মিলছে, যা ব্যাংক কোম্পানি আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

ব্যাংকিং ব্যবসা আর ১০টি ব্যবসার মতো নয়। এটি চলে সর্বসাধারণের আস্থার ভিত্তিতে। ব্যাংক প্রতিষ্ঠায় উদ্যোক্তাদের অবদান থাকলেও এর মূল পুঁজি গ্রাহকের আমানত। আমানতকারীরাই এর চালিকাশক্তি। কাজেই প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা ব্যাংক ব্যবসার অপরিহার্য শর্ত। এজন্য উন্নত রাষ্ট্রে ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদের জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়েছে। স্বার্থের সংঘাত পরিহারে সুস্পষ্ট কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট পলিসি (সিআইপি) করা হয়েছে। এমনকি প্রতিবেশী ভারতও এক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। ব্যাংকের পর্ষদ সদস্যের জন্য দেশটি সিআইপি নীতি করেছে। সেখানে যেকোনো পরিচালকসহ তার পরিবারের সদস্য বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যাংকের আর্থিক লেনদেন নিষেধ করা হয়েছে। ব্যাংকের গোপনীয় তথ্য ফাঁস, প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে কোনো সুবিধা গ্রহণ, নিজের বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য ব্যাংক থেকে কোনো উপহার গ্রহণের দাবি না করার বিষয়ে বলা হয়েছে। সর্বোপরি এসব বিষয় পরিপালিত না হলে সুনির্দিষ্ট সদস্যের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিবিড় তদারকি এবং টেকসই অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ওইসব দেশের ব্যাংকগুলো সর্বক্ষেত্রে করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করছে, যা আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে ব্যাংকের বেশির ভাগ কেনাকাটা করা হয় প্রতিযোগিতামূলক উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে। বড় কেনাকাটার ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত হয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে। কেমন দামে কোন পণ্য কেনা হবে, পণ্যের ধরন কী হবে তা জানতে পারেন পরিচালক। ফলে গোপন তথ্য পেয়ে এমনিতেই তিনি এগিয়ে থাকেন। এর মাধ্যমে কাজ বাগিয়ে নিচ্ছেন অনেকে। কোনো পরিচালকের কাগজের কারখানা থাকলে সেই কাগজ ব্যাংকে ব্যবহার হচ্ছে। ভবন থাকলে ভাড়া দেয়া হচ্ছে ব্যাংকের কাছে। কোনো কোনো পরিচালক আবার ব্যাংকের কাছে সেবা ও পণ্য বিক্রি এবং জনবল নিয়োগ দিতে কোম্পানি খুলে বসেছেন। কেউ গাড়ি ভাড়া দিয়ে রেখেছেন। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক ব্যাংকের পরিচালক আরেক ব্যাংকের পরিচালককে কাজ পাইয়ে দিচ্ছেন। এতে ব্যাংকগুলো মানসম্পন্ন সেবা ও পণ্য যেমন পাচ্ছে না, তেমনি কেনাকাটায় খরচও হচ্ছে বেশি। মাঝখানে লাভবান হচ্ছেন পরিচালকরা। কাজেই এটা কঠোরভাবে দমন করা জরুরি।

দেশের কিছু ব্যাংকে পরিচালক ও শীর্ষ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে একটা অন্যায্য আঁতাত গড়ে উঠেছে। প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য ও স্বার্থের বাইরে গিয়ে পারস্পরিক যোগসাজশে একে অন্যের স্বার্থ রক্ষা করছেন। ফলে অনেক ক্ষেত্রে বিঘ্নিত হচ্ছে করপোরেট সুশাসন। গত বছর প্রত্যেক পর্ষদের শীর্ষ তিন ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তাকে নিজ নিজ ও পারিবারিক ব্যবসায়িক স্বার্থসংশ্লিষ্টতার বিবরণ বার্ষিক ভিত্তিতে পর্ষদে দাখিলের জন্য নির্দেশনা দিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একই সঙ্গে উল্লিখিত ব্যক্তিদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ব্যাংকের ক্রয় তালিকা থেকে বাদ দেয়ার কথা বলা হয়েছিল। এর পরও একই ধরনের অনিয়মের পুনরাবৃত্তি হয়ে আসছে। অস্বচ্ছ ক্রয় প্রক্রিয়ায় ব্যাংকের পণ্য বা সেবা ক্রয় করা হচ্ছে এবং এ কাজে চলছে বড় ধরনের দুর্নীতি। স্বার্থের সংঘাত পরিহারে চলতি বছরের মে মাসে ব্যাংকের চেয়ারম্যানসহ নীতিনির্ধারণী ভূমিকায় থাকা ব্যক্তিদের সাবসিডিয়ারি বা সহযোগী প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান, পরিচালক কিংবা সদস্যপদে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এবার আবার নতুন করে প্রজ্ঞাপন জারি করে ব্যাংকের কেনাকাটায় পরিচালক বা তার সংশ্লিষ্ট কোনো কোম্পানি অংশ না নেয়ার নির্দেশনা দিয়েছে সংস্থাটি। শুধু বিভিন্ন নির্দেশনা দিলে হবে না, সেগুলো যথাযথভাবে মানা হচ্ছে কিনা তাও দেখতে হবে। ব্যাংক কোম্পানি আইন বা সংশ্লিষ্ট বিধি লঙ্ঘন হলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে অপসারণ করতে হবে সংশ্লিষ্ট পরিচালককে। সর্বোপরি ব্যাংকগুলোকে নিবিড় নজরদারির আওতায় আনতে হবে।

আমরা দেখছি বহুমুখী স্বার্থের সংঘাতে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ছে। এ প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রজ্ঞাপনটি একটা সঠিক নির্দেশনার পদক্ষেপ। এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ  নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরো জোরদার করতে হবে। আইন করে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের মেয়াদ বাড়ানো এবং এক পরিবারের একাধিক সদস্য থাকার সুযোগ দেয়ার ফলে অনেক ব্যাংককে পরিবারতান্ত্রিক করে ফেলা হয়েছে। পর্ষদ অনেকটা পারিবারিক কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে পড়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এটা করপোরেট সুশাসন প্রতিষ্ঠার অন্তরায়। সুতরাং এ ধরনের বিধিও পুনর্বিবেচনার সময় এসেছে।