মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার নিয়েই চলাচল করছে দেশের বেশির ভাগ যানবাহন। বাণিজ্যিকভাবে যাত্রী পরিবহনকারী গাড়িতে ব্যবহার করা হচ্ছে মেয়াদোত্তীর্ণ গ্যাস সিলিন্ডার। প্রায়ই বিস্ফোরণ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে এসব গাড়িতে। তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বিধিমালা-২০০৪ (২০১৬ পর্যন্ত সংশোধিত) অনুযায়ী সিলিন্ডার নির্ধারিত মেয়াদের পরপর পরীক্ষা করার বিধান রয়েছে। তরলায়িত প্রাকৃতিক গ্যাস (সিএনজি) সিলিন্ডার পাঁচ বছর পরপর পরীক্ষার নিয়ম। বিধিমালার আওতায় গ্যাস সিলিন্ডারের আমদানি ও উৎপাদনের মান নির্ধারণ করা হয়েছে। কোনো ধরনের ত্রুটি না থাকা সত্ত্বেও সিলিন্ডার সংযোজনের পাঁচ বছর পর পুনরায় পরীক্ষা (রিটেস্ট) করা বাধ্যতামূলক। অথচ আইনগত এ বাধ্যবাধকতা উপেক্ষা করছেন সংশ্লিষ্টরা। মেয়াদোত্তীর্ণ গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের বিষয়ে ভ্রুক্ষেপ নেই গণপরিবহনের চালক ও মালিকদের। অনেক চালক-মালিকই জানেন না ঠিক কবে তার গাড়িতে ব্যবহূত গ্যাস সিলিন্ডার পরিবর্তন করা হয়েছে। এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত পরীক্ষা ও নজরদারি আবশ্যক। রাজধানীতে চলাচল করা ৯০ শতাংশ বাসই সিএনজিচালিত। জ্বালানি খরচ কমিয়ে আনতে দূরপাল্লার রুটসহ দেশের অন্যান্য এলাকায়ও বাড়ছে সিএনজিচালিত যানবাহনের সংখ্যা। এ অবস্থায় দুর্ঘটনা এড়াতে দ্রুত মান পরীক্ষার মাধ্যমে মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার বাছাই করা জরুরি।
গ্যাস সিলিন্ডারের মান রক্ষায় বিস্ফোরক অধিদপ্তরের সক্রিয়তা কাম্য। কেননা যানবাহনে ব্যবহূত সিলিন্ডারসহ সব ধরনের গ্যাস সিলিন্ডার রিটেস্টের অনুমোদন দেয় বিস্ফোরক অধিদপ্তর। তারপর সরকারের রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) সিএনজি কনভারশন ও রিটেস্টিং করে। বাজারে ছাড়া প্রতিটি সিলিন্ডার পরীক্ষার জন্য বিস্ফোরক অধিদপ্তরের মনোনীত সংস্থা রয়েছে। তাই দুর্ঘটনার দায় অনেকটা বিস্ফোরক অধিদপ্তরের ওপরও বর্তায়। যানবাহনের ফিটনেস সার্টিফিকেট দেয় বিআরটিএ। বিআরটিএও তদারকি বাড়িয়ে মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার প্রতিরোধ করতে পারে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় প্রতিষ্ঠা জরুরি। একই সঙ্গে সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা চাই।
মালিক ও চালক তাদের ইচ্ছেমতো পরীক্ষা করাচ্ছেন বা পরীক্ষা ছাড়াই চলছে একেকটি গাড়ি। আর ঘটছে দুর্ঘটনা। প্রাকৃতিক গ্যাসের রূপান্তরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে পরীক্ষা করা হয় গ্যাস সিলিন্ডার ঝুঁকিপূর্ণ কিনা। সারা দেশে এমন প্রায় ৬০০ প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে রিটেস্ট সেন্টার রয়েছে মাত্র ১৩ থেকে ১৪টি। রিটেস্ট সেন্টারের সংকটের কারণে গাড়ির মালিক চাইলেও নিয়মিত রিটেস্ট করতে পারেন না। বিষয়টিতে নজর দেয়া চাই। রিটেস্ট সেন্টারের সংখ্যা বাড়ানো হলে সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঝুঁকিও কমানো সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে বিআরটিএ থেকে ফিটনেস নেয়ার সময় যদি রিটেস্ট বা পুনঃপরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়, তাহলে কমবে ঝুঁকি আর বাঁচবে জীবন। গ্যাস সিলিন্ডারের গুণগত মান নিশ্চিত এবং নিয়মিত পুনঃপরীক্ষার ব্যবস্থা করা যেমন জরুরি, তেমনি নিরাপদে গ্যাস সিলিন্ডার কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, কীভাবে এগুলোর ব্যবস্থাপনা করতে হয়, তা ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে তুলে ধরতে হবে।
নিয়ম মেনে রক্ষণাবেক্ষণ করা হলে এবং যাচাই-বাছাই সাপেক্ষে প্রতিটি সিলিন্ডার ৪০ বছর পর্যন্ত ব্যবহার করা যেতে পারে। ফিটনেস সার্টিফিকেট দেয়ার সময় যদি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্ব্বয় করে মেয়াদোত্তীর্ণ গ্যাস সিলিন্ডারের ফিটনেস দেখা ও সার্টিফিকেট যাচাই করা হয়, তাহলে বাধ্য হয়ে মালিকপক্ষ তাদের যানবাহনে ব্যবহূত সিলিন্ডার রিটেস্ট করাবেন। আর সার্বিক বিষয়টি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগী হতে হবে।
মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডারের সঠিক কোনো পরিসংখ্যান কারো কাছেই নেই। মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিম্নমানের সিলিন্ডার ব্যবহার এখন জীবন্ত বোমায় পরিণত হয়েছে। দিন যত গড়াচ্ছে গ্যাস সিলিন্ডারের বয়স তত বাড়ছে, সেই সঙ্গে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। রিটেস্টের মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার নিয়ে রাস্তায় চলছে প্রতিনিয়ত। এখনই সচেতন না হলে ভয়াবহ বিপর্যয় সৃষ্টি হবে। কনভারশন কর্তৃপক্ষ কী পরিমাণ সিএনজিচালিত গাড়ি রয়েছে এবং কী পরিমাণ সিলিন্ডার পরীক্ষিত হয়েছে, বিস্ফোরক অধিদপ্তরে এই পরীক্ষার রিপোর্ট জমা দেয়ার কথা। সেটি সঠিকভাবে দেয়া হচ্ছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। শুধু রিপোর্ট জমা দিলেই হবে না, তালিকা ধরে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নিতে হবে।
একের পর এক সিলিন্ডার বিস্ফোরণে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও দুর্ঘটনার রাশ টানার কোনো উদ্যোগ না থাকা উদ্বেগজনক। নিম্নমানের সিলিন্ডার ও কিটস ব্যবহার, পাঁচ বছর পরপর রিটেস্ট না করাসহ বিভিন্ন কারণে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ও হতাহতের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বৈধ বা অবৈধভাবে গাড়িতে সংযোজিত আড়াই লক্ষাধিক সিএনজি সিলিন্ডার এখন জানমালের জন্য ভয়ংকর হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সড়ক-মহাসড়কে চলন্ত অবস্থায় প্রায়ই গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হচ্ছে, দুর্ঘটনায় যানবাহন ভস্মীভূতসহ প্রাণহানিও ঘটছে অহরহ। এটি বন্ধে পদক্ষেপ না নিলে আগামীতে দুর্ঘটনা আরো বাড়বে বৈকি।










