লকডাউন একটি আলোচিত শব্দ থেকে এখন আমাদের জীবনের বাস্তবতা। আর এই বাস্তবতা মেনে নেয়াটা খুব একটা সহজ কাজ নয়। স্বাভাবিকভাবেই লকডাউনের কারণে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সব কর্মকাণ্ড প্রায় বন্ধ। সবারই কষ্ট হচ্ছে, বিশেষ করে দরিদ্র মানুষদের। তাই অনেকেই এখন লকডাউন উঠিয়ে দেয়ার পক্ষে মত ব্যক্ত করছেন।
লকডাউন দেয়া হয়েছে মূলত মানুষের জীবন রক্ষা করতে। যেকোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে মানুষের জীবনই সবচেয়ে গুরুত্ব পাওয়া উচিত, তার পরেও লকডাউন ওঠানোর ক্ষেত্রে আমরা ব্যাপারটিকে পুরোপুরি অর্থনৈতিক দিক থেকে বিবেচনা করে দেখি, সেটি কেমন দাঁড়ায়।
এখন যদি আমরা আমাদের সব অথবা বেশির ভাগ শিল্প-কলকারখানা, অফিস, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও যোগাযোগ ব্যবস্থা খুলে দিই তাহলে নিঃসন্দেহে আমাদের অর্থনীতিতে বেশকিছু গতির সঞ্চার হবে। কিন্তু সেটি হবে স্বল্পমেয়াদের জন্য। এর কারণ মূলত দুটি।
প্রথমত, বেশির ভাগ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খোলা মানে বেশির ভাগ মানুষকে ঘরের বাইরে আনা। ঘরের বাইরে এলে তাদের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে এবং তারা বেশি করে আক্রান্ত হবেন। অর্থাৎ কর্মীরা অসুস্থ হবেন। তার ফলে সবকিছু খোলা থাকলেও আমরা ১৬ কোটি মানুষের দেশে কর্মী সংকটে পড়ব। আর শুধু যে কর্মীরা আক্রান্ত হবেন তা নয়। কর্মীদের সঙ্গে আক্রান্ত হবে তাদের পরিবারও। সুস্থ মানুষরাও কাজে যেতে ভয় পাবেন অথবা চাকরি চলে যাওয়ার ভয়ে কাজে গেলেও কাজের ধারা ব্যাহত হবে। কর্মী সংকট এবং কর্মীদের কর্মদক্ষতা হ্রাস আমাদের উৎপাদনসহ সব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ব্যাহত করবে। এতে আমাদের অর্থনৈতির গতি ধীর হতে বাধ্য।
ব্যাপারটা এখানেই শেষ নয়। অসুস্থ হওয়া এই বিশাল জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা আমাদের করতে হবে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সেই চিকিৎসা সেই সব পরিবারের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেবে এবং এর চেয়েও বড় কথা, এত বিশালসংখ্যক মানুষকে চিকিৎসা দেয়ার সক্ষমতা আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নেই। অর্থাৎ বাড়বে মানুষের মৃত্যুর হার, সঙ্গে সামাজিক অরাজকতা এবং অবশ্যই অর্থনৈতিক স্থবিরতা।
দ্বিতীয় কারণটি আরো ব্যাপক এবং সুদূরপ্রসারী। বাণিজ্য এখন যেহেতু একটি আন্তর্জাতিক ব্যাপার, সেহেতু করোনা আক্রান্ত অথবা করোনাপ্রবণ জাতি হিসেবে আমরা সেখানেও প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ব। প্রথমেই আসি আমাদের মূল রফতানি খাত তৈরি পোশাকের কথায়।
এখনই কারখানা খুলে দিলে অবশ্যই কিছু উৎপাদন বাড়বে। যেসব অর্ডার আছে, তার কিছু কাজ শেষ করা যাবে। হয়তো পিপিই, মাস্কের মতো অল্প কিছু নতুন অর্ডারও পাওয়া যাবে। কিন্তু এটি হবে স্বল্পমেয়াদের জন্য। মুনাফা হয়তো কিছু বেশি হবে এই সময়ে (যদিও ব্যাপারটা কতটা যৌক্তিক এবং মানবিক, সে ব্যাপারে প্রশ্ন থেকেই যায়), তার পরেও ব্যাপারটি ঘটবে খুবই স্বল্পমেয়াদে। এর পরেই প্রথমে ব্যাখ্যা করা কারণের প্রভাবে উৎপাদন ও মুনাফা দুটোই কমে যাবে। কিন্তু এটি গার্মেন্টের জন্য কেবল খারাপ খবরের শুরু। আমাদের গার্মেন্ট সেক্টরের সত্যিকারের বিপদ শুরু হবে আজ থেকে এক-দুই মাস পরে যখন ইউরোপ ও আমেরিকা তাদের করোনার প্রভাব অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। কিন্তু আমরা যৌক্তিক কারণেই পারব না। ঠিক তখনই তারা আমাদের থেকে আর কাপড় কিনতে চাইবে না। করোনাপ্রবণ এলাকার কারখানা এবং করোনা আক্রান্ত শ্রমিক অথবা করোনায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায় থাকা শ্রমিকের বানানো পোশাককে তারা নিজেদের জন্য বিপজ্জনক মনে করবে।
ক্রেতারা আমাদের করোনাপ্রবণ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করবে। এখানে তারা ভিজিট করবে না। এখানে নতুন কোনো ক্রয়াদেশ দেবে না। ক্রেতাদের আমাদের দেশ কিংবা দেশের কারখানাগুলোর জন্য খুব বেশি ভালোবাসা যে নেই, এটি আমরা করোনার প্রকোপ শুরুর দিকেই দেখেছি। তারা দ্বিধাহীনভাবেই তাদের দেয়া কর্মাদেশ বাতিল করে দিয়েছিল; যা ছিল রীতিমতো অন্যায়। আর তখন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তাদের কাছে নিজেদের দেশের স্বাস্থ্যঝুঁকির মতো শক্ত যুক্তি থাকবে। তারা বাংলাদেশে অর্ডার করতে আর আগ্রহী হবে না।
এর সঙ্গে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে আছে ভিয়েতনামের ভালো করোনা পরিস্থিতি। এমনিতেই তারা আমাদের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী। তাদের গার্মেন্টের অবকাঠামো, চীনের বিশেষ সহযোগিতা এবং করোনার কম প্রাদুর্ভাব আমাদের জন্য কম্পিটিটিভ ডিজঅ্যাডভান্টেজ তৈরি করবে। আমাদের ক্রেতারা সেখানে সহজেই তাদের ক্রয়াদেশ সরিয়ে নিতে পারবে, যা আমাদের গার্মেন্ট সেক্টরকে একেবারে মার্কেট আউটও করে দিতে পারে।
আমাদের রফতানি আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস গার্মেন্ট হলেও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সবচেয়ে বড় পথ হলো রেমিট্যান্স। আন্তর্জাতিকভাবে যদি আমরা করোনাপ্রবণ দেশ হিসেবে পরিচিত হই তাহলে তার প্রভাব গিয়ে পড়বে আমাদের রেমিট্যান্সপ্রবাহে। বিশ্ব পারলে দেশ হিসেবেই আমাদের কোয়ারেন্টিনে পাঠিয়ে দেবে। আমরা বাইরে কর্মী পাঠাতে পারব না। তার ফলে রেমিট্যান্সপ্রবাহ কমবে এবং অর্থনৈতিক মন্দা ত্বরান্বিত করবে।
শ্রমিকদের মতো একইভাবে উচ্চশিক্ষার্থে বাংলাদেশী ছাত্রছাত্রীদের বিদেশ যাওয়া প্রায় বন্ধ হয়ে যাবে। এটিও দেশের অর্থনীতির জন্য বেশ বড় ক্ষতি। বিদেশীরাও আমাদের দেশকে এড়িয়ে চলবে। ফলে আমাদের গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে চলা পর্যটন শিল্পেরও মুখ থুবড়ে পড়ার আশঙ্কা থেকে যায়।
আমাদের অর্থনীতি অনির্দিষ্টকাল বা অতিদীর্ঘকাল লকডাউনের ধকল সহ্য করার মতো শক্তিশালী নয়। আমাদের অবশ্যই শিল্প-কলকারখানা, অফিস খুলতে হবে। কিন্তু এখনই নয়। আমাদের স্বল্পমেয়াদের মুনাফা না দেখে দীর্ঘমেয়াদের সুবিধা দেখা দরকার। ২৫ মার্চের পরিবর্তে যদি আমরা ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ছুটি ঘোষণা করতাম তাহলে হয়তো মে মাসে অনেকটা লকডাউন উঠিয়ে নেয়া যেত। কিন্তু ৪ এপ্রিলের এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া ঘটনার পরে বাড়তে থাকা করোনা আক্রান্তের সংখ্যা আমাদের হাতে ৫ মে পরেও লকডাউনের মেয়াদ বাড়ানো ছাড়া তেমন কোনো বিকল্প রাখেনি। এখন ধান কাটার মৌসুম। হাওড় এলাকায় ধান কাটতে হবে। না হলে পানিতে তলিয়ে যাবে। তার জন্য দরকারে মাঠ প্রশাসন, স্বেচ্ছাসেবকদের কাজে লাগিয়ে যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করে কাজ করতে হবে। কিন্তু কোনোভাবেই এটি এখন লকডাউন ওঠানোর যুক্তি হতে পারে না।
আমাদের করোনা কমাতেই হবে। নিজেকে বাঁচাতে, অর্থনীতিকে বাঁচাতে। এর কোনো শর্টকাট নেই। এটি যত তাড়াতাড়ি আমরা বুঝব ততই মঙ্গল। করোনার প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতে কত বড় হতে পারে তার একটা উদাহরণ হলো বিশ্ববাজারে তেলের দাম। বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩৬ ডলারে নেমেছে। অর্থাৎ এক ব্যারেল তেল কিনে রাস্তায় ফেলে দিলেও বিক্রেতা আপনাকে ৩৬ ডলার দেবে। আমরাও করোনার প্রভাব এড়াতে পারব না। কিন্তু এর ধাক্কা কমাতে পারব। ক্ষতি আমাদের হবেই। আমরা ক্ষতিটাকে কমিয়ে রাখার চেষ্টা করব।
অফিস, শিল্প-কলকারখানা আমাদের বন্ধ রাখতেই হবে। সেটা আমরা আগামী এক মাস বা দেড় মাস বন্ধ রেখে ক্ষতি সহ্য করব নাকি এখন খুলে দিয়ে দুই মাস পরে দেড় বছরের জন্য অথবা চিরতরে বন্ধ করে দেয়ার মতো ক্ষতি ডেকে আনব, এটি আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অনেক বিপদে স্বল্পমেয়াদে কিছু ক্ষতি স্বীকার করে দীর্ঘমেয়াদের স্থায়ী ক্ষতিকে পাস কাটিয়ে যাওয়াকেই বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত বলে।
বাংলাদেশকে এখন বৈপ্লবিক সিদ্ধান্তই নিতে হবে। আশার কথা হলো, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত নেয়া মানুষটার উত্তরাধিকারীর কাঁধেই আবার বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত নেয়ার দায়িত্ব পড়েছে। তাই আমি প্রচণ্ড আশাবাদী।
রুবাইয়াত সাইমুম চৌধুরী: সহকারী অধ্যাপক, ফিন্যান্স, ডিপার্টমেন্ট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি










