১৮৫৯ সালে পেনসিলভানিয়ার ছোট্ট শহর টাইটাসভিল প্রথম ‘অয়েল রাশ’ সাইটে পরিণত হয়েছিল। শুরু থেকেই জ্বালানি তেল শিল্প ঘিরে নিরাশাবাদের বিস্তার ঘটেছে।   তখনকার অনেক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ‘কালো স্বর্ণ’ আসলে ছিল প্রকৃতির উপহার; যা অন্যরা একবার উত্তোলন শুরু করলে নিশ্চিতভাবে তা ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যাবে। পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের  ভূতত্ত্ববিদ সতর্ক করেছিলেন, ‘জ্বালানি তেলের এই অভূতপূর্ব আবিষ্কার’ আসলে একটি ‘ক্ষণস্থায়ী এবং ক্রম অপসৃয়মাণ প্রপঞ্চ’ হবে, পরবর্তী সময়ের তরুণরা হয়তো প্রাকৃতিক উপায়ে যার বিলুপ্ত হওয়ার সাক্ষী হবে।

তখন থেকেই প্রতি বছর তেলের বিপুল ঘাটতি নিয়ে এক ধরনের জল্পনা চলে এসেছে। ১৯৫০-এর দশকে আমেরিকার ভূতত্ত্ববিদ ম্যারিয়ন কিং হুবার্ট একটি গাণিতিক মডেলের মাধ্যমে তেল ও গ্যাসক্ষেত্রের ধারণক্ষমতা নির্ণয়ের চেষ্টা করেন। এখান থেকে তিনি ‘পিক অয়েল’ ধারণাটি জনপ্রিয় করে তোলেন। ওই ধারণা অনুসারে, একটি মুহূর্তে তেলের চাহিদা ও সরবরাহ শীর্ষে পৌঁছানোর পর তেল উত্তোলন কমতে শুরু করবে। তিনি একটি বেল কার্ভের মাধ্যমে এ ধারণা ব্যাখ্যা করেন। তার মতানুসারে ১৯৭০-এর দশক নাগাদ তেল উত্তোলনের পরিমাণ সর্বোচ্চ হবে এবং পরবর্তী সময়ে তা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করবে।

বলা বাহুল্য, এ ধরনের আশঙ্কা সত্য হয়নি। হুবার্ট এবং আরো অনেকেই ধরিত্রীর জ্বালানি তেলের মজুদের সঠিক মাত্রা ও অধিক তেল উত্তোলনে মানুষের ভৌত সীমা অতিক্রম করার সক্ষমতাকে অবমূল্যায়ন করেছেন। নিয়মিত বিরতিতে নতুন নতুন তেলক্ষেত্র আবিষ্কার হয়েছে এবং পুরনো উৎসগুলোও নিঃশেষ হয়ে যায়নি, যেমনটা ভেবেছিলেন নৈরাশ্যবাদীরা। কোনো তেলক্ষেত্রের উৎপাদনশীলতা একেবারে শীর্ষে না পৌঁছে তা মোটামুটি একই মাত্রায় (স্থবির) রয়েছে। হুবার্ট ভাবতেই পারেননি যে ফ্র্যাকিং ও হরাইজন্টাল ড্রিলিং ৬০ বছর পরে শেল-এনার্জি বিপ্লব ঘটাবে। একই সঙ্গে পুরো তেল ও জ্বালানি শিল্পের অবয়বই বদলে যাবে। 

আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সর্বোচ্চ পরিমাণের উৎস সম্পর্কেও হুবার্ট ভুল ধারণা করেছিলেন। একটা সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন জ্বালানিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার বদলে আমদানিকারক হয়, তখন তিনি ভেবেছিলেন যে ধাক্কাটি আসবে চাহিদার দিক থেকে, সরবরাহের দিক থেকে নয়। এক্ষেত্রে ১৯৬২-১৯৮৬ সময় পর্বের সৌদি আরবের তেলমন্ত্রী শেখ জাকী ইয়ামেনি চমত্কার পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘পাথরের অভাবে প্রস্তর যুগ শেষ হয়নি। তাই তেল যুগের অবসান ঘটবে বিশ্বে জ্বালানি তেল নিঃশেষ হওয়ার অনেক আগেই।’ 

এমনকি করোনা মহামারীর আগে থেকেই কাঠামোগত ফ্যাক্টর জ্বালানি তেলের চাহিদায় (পড়ুন ভোগের) দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছিল। উদীয়মান অর্থনীতিতে (বিশেষ করে চীনে) চলমান জ্বালানি দক্ষতার সুফল, বিদ্যুত্চালিত যানবাহনের ব্যাপক বাণিজ্যিকীকরণ, কার্বন নিঃসরণ কমাতে বেড়ে চলা সামাজিক-রাজনৈতিক চাপ এবং বিশ্বায়নের প্রভাব হ্রাস ইয়েমেনির অনুমানের সত্যতা প্রমাণ করেছে। এখন অতিমারী এ প্রবণতা ত্বরান্বিত করছে, যেটিকে আগে অন্তত এক দশক দূরের ব্যাপার মনে হয়েছিল।

নরওয়েজিয়ান জ্বালানি প্রতিষ্ঠান ডিএনভির মতে, ২০১৯ সালেই তেলের চাহিদা সর্বোচ্চে পৌঁছেছে এবং সেটি এখন কমতির দিকে। ব্রিটিশ জ্বালানি প্রতিষ্ঠান বিপির মতে, এ দশকে চাহিদা ১০ শতাংশ কমে যেতে পারে এবং আগামী ২০ বছরে তা ৫০ শতাংশেরও বেশি কমতে পারে। কিন্তু এ ধরনের অনুমান ভবিষ্যদ্বাণীর মতো অনির্ভরযোগ্য হতে পারে। কারণ আমরা জানি না, তেলের চাহিদা কোথায় গিয়ে ঠেকবে।

বিশ্ব এখন তেলের অনুমিত স্বল্পতা থেকে প্রাচুর্যের একটা প্যারাডাইম শিফটের মধ্যে রয়েছে। সামনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়বে। এর বৃদ্ধি মানে চূড়ান্তভাবে তেলের প্রশ্নহীন শ্রেষ্ঠত্বের অবসান ঘটতে যাচ্ছে। ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক এ অগ্রগতির একটা সুদূরপ্রসারী প্রভাব থাকবে। নিম্নে উল্লেখিত তিনটি বই বিষয়গুলো বুঝতে সাহায্য করতে পারে।          একটি পরিবর্তনশীল দৃশ্যপট

বৈশ্বিক ঘটনাবলি সংক্রান্ত অনেক বইয়ের প্রকাশনা অতিমারীর কারণে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। করোনাপূর্ব পরিপ্রেক্ষিত থেকে ভবিষ্যৎ দেখলে বার্লিন দেয়াল পতন পরবর্তী শীতল যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতার মতোই মনে হবে। এমনকি কেউ যদি মনে করে যে করোনা সংকট ইতিহাস ও তার পরিণাম, বিশেষত জ্বালানি শিল্পকে কেবল ত্বরান্বিত করেছে (মৌলিক পরিবর্তনের চেয়ে), তবে সেটি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

সৌভাগ্যবশত ড্যানিয়েল ইয়ারগিনের সর্বসাম্প্রতিক বই ‘দ্য নিউ ম্যাপ’ সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে। ইয়ারগিন নিঃসন্দেহে আমাদের সময়ের অন্যতম সেরা জ্বালানি বিশেষজ্ঞ। ১৯৯২ সালে ‘দ্য প্রাইজ’ বইয়ের জন্য তিনি পুলিত্জার পুরস্কার লাভ করেন। বইটিতে গত শতকের জ্বালানি তেল শিল্প এবং অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামরিক ক্ষেত্রে এর প্রভাবের একটি সুবিস্তৃত ইতিহাসের বর্ণনা রয়েছে। তার সাম্প্রতিক বইটি পরিধির দিক থেকে কম উচ্চাভিলাষী এবং পাণ্ডিত্যের দিক থেকে কম উল্লেখযোগ্য। কিন্তু যেসব পাঠক তেল ও গ্যাস শিল্প সম্পর্কে একটি সামগ্রিক চিত্র পেতে ইচ্ছুক, তাদের জন্য বইটি অবশ্যই পাঠ্য।

চলমান মহামারী নিম্ন কার্বন নিঃসরণের প্রবণতা বেগবান করবে—এ তত্ত্ব ইয়ারগিন নাকচ করেছেন। তার বক্তব্য হলো, আরো অনেক দিন তেল বৈশ্বিক পণ্য হিসেবে তার অগ্রগণ্য অবস্থান বজায় রাখবে। তার মতে, জাতীয় কার্বন নিঃসরণ বিরোধী কৌশল ও অঙ্গীকার সত্ত্বেও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত স্থানান্তর অর্থনৈতিকভাবে অনেক ব্যয়বহুল এবং প্রযুক্তিগতভাবে কঠিন।

৮০ শতাংশ জ্বালানি চাহিদা মেটাতে বিশ্ব এখনো কয়লা, তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। ইয়ারগিন আমাদের মনে করিয়ে দেন যে গত ৩০ বছরে এই পরিমাণ কিছুটা কমেছে মাত্র। এ কারণে ২০৫০ সাল নাগাদ কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনার বিষয়টি কল্পনা ছাড়া কিছু নয়। বার্ষিক মাথাপিছু ৩৮ হাজার ডলার আয়ের ইউরোপে মাথাপিছু কার্বন নিঃসরণ ভারতের একই মাত্রায় নামিয়ে আনা প্রয়োজন, যেখানে ভারতের বার্ষিক মাথাপিছু আয় মাত্র ২ হাজার ডলার।   জ্বালানি তেল ও গ্যাসের চাহিদার চিত্র কীভাবে বিবর্তিত হচ্ছে, ইয়ারগিন সেদিকে মনোযোগ দিতে আগ্রহী। প্রায় এক যুগ আগে আমেরিকায় যে শেল অয়েল বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল, পরিবর্তনের মূল উৎস সেখানেই। ২০০৮ থেকে ২০২০-এর মধ্যে আমেরিকার তেল উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় তিন গুণ বেড়েছে। ফলে দেশটি রাশিয়া ও সৌদি আরবকে টপকে বিশ্বের শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হয়েছে। ২০১৪ সালে কেবল টেক্সাসেই মেক্সিকোর চেয়ে বেশি তেল উৎপাদন হয়েছে। সে সময়ে সৌদি আরব এবং ইরাক বাদে ওপেকভুক্ত অন্য যেকোনো উৎপাদক দেশের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে ছিল।

ভূরাজনৈতিক প্রভাব বেশ বিস্তৃত হয়েছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র এখনো মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিপুল পরিমাণ তেল আমদানি করে। তবে কয়েক দশকে তারা আগের চেয়ে বেশি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ডোনাল্ড ট্রাম্প তো এক ধাপ এগিয়ে ‘জ্বালানি আধিপত্য’-কে আমেরিকার কৌশলগত লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণের চেষ্টা করেছিলেন। ‘জ্বালানি আধিপত্যবাদী আমেরিকা’— বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করতে তত্কালীন জ্বালানি সচিব রিক পেরি বলেছিলেন, ‘এর অর্থ জ্বালানি স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি দেশ হওয়া, যারা অন্য কোনো দেশের ভূরাজনৈতিক অরাজকতা থেকে মুক্ত, যারা জ্বালানিকে একটি অর্থনৈতিক উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।’ বাস্তবে শেল অয়েল উৎপাদনকারীরা জ্বালানি খাতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র আধিপত্য বা স্বয়ংসম্পূর্ণতা নয়, কেবল জ্বালানি নমনীয়তা অর্জনে সমর্থ হয়েছে। 

শেল অয়েল বিপ্লবের সবচেয়ে বড় ক্ষতির শিকার মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো। শিল্পটির রূপান্তর তেল রাজস্বের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল দেশগুলোর রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে সংকট সৃষ্টি করেছে, উদার সামাজিক কর্মসূচি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য তাদের যা প্রয়োজন। তেল চাহিদার সুবর্ণ সময়ে সৌদি আরব তেল রাজস্ব থেকে নাগরিকদের জন্য নানা ধরনের সহায়তা জুগিয়েছে, যা দেশটিকে একটি ‘অন্তর্ভুক্তিতার দেশ’ হিসেবে বিশ্বে পরিচিতি এনে দিয়েছে। তবে ২০১৪ সালে আমেরিকান শেল অয়েল উত্তোলনে উল্লম্ফনের সুবাদে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ থেকে ৩০ ডলারে পতন ঘটে। এতে সৌদি আরবের তেল রাজস্ব ২০১৩ সালে ৩২১ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০১৬ সালে ১৩৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। ফলে দেশটির কল্যাণ রাষ্ট্রের অভিধা দারুণভাবে হোঁচট খায়।

আমেরিকায় উৎপাদিত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসও রাশিয়াকে পিছিয়ে দিয়েছে। ফলে রাশিয়ার ওপর অতিনির্ভরশীলতা হ্রাসের সুযোগ পেয়েছে ইউরোপ। ইউরোপকে বাদ দিয়ে রাশিয়া এখন চীনের দিকে ঝুঁকেছে। নতুন তেল-গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়ন এবং প্রতিদিন তিন লাখ ব্যারেল জ্বালানি সরবরাহে সমর্থ একটি পাইপলাইন নির্মাণে চায়না ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ক্রেমলিনকে ২৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের আগ্রাসী কৌশল কেবল সম্ভাব্য তেল-গ্যাসের মজুদ নিরাপদ করার জন্য নয়; উপরন্তু অর্থনীতি সচল রাখতে প্রয়োজনীয় তেল ও গ্যাস আমদানির সরবরাহ পথ সুরক্ষিত রাখার প্রয়োজনেও।

যদিও কয়লা ব্যবহারে চীন এখনো এগিয়ে ( বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ কয়লা চীন ও ভারত ব্যবহার করে); তবে সবুজ জ্বালানি যুগে প্রবেশের ক্ষেত্রে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে। অধিকন্তু, লিথিয়াম ব্যাটারির বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে আধিপত্য বজায় রাখতে দেশটি বিশ্বের ৭০ শতাংশেরও বেশি সোলার মডিউল উৎপাদন করছে। চীন বৈশ্বিক চাহিদার প্রায় অর্ধেক বায়ুচালিত টারবাইন উৎপাদনে সক্ষম।

ওপেকের চূড়া

শেল অয়েল বিপ্লবের কারণে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণে ওপেকের ক্ষমতা খর্ব হয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ইয়ারগিন মনে করেন, জ্বালানি তেলের কার্টেল ধীরে ধীরে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব ও রাশিয়া এখন সত্যিকারের বাজার নিয়ন্ত্রক। তার মতে, এটি গত বসন্তেই স্পষ্ট হয়ে গেছে, যখন এ তিনটি দেশ কভিড-১৯-এর অভিঘাতের প্রতিক্রিয়ায় নজিরবিহীনভাবে বৈশ্বিক তেল উৎপাদন হ্রাস করেছে।

তবে ওপেককে অকার্যকর করাটা মনে হয় বেশ আগেই হয়ে যাচ্ছে। বিশ্বে যখনই তেলের দাম পড়তির দিকে গেছে, তখনই এ সংস্থার সমাপ্তির কথা অনেকে ভেবেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটি টিকে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি উৎপাদকরা সংখ্যায় এত বেশি যে তারা একক শক্তি হিসেবে ইচ্ছামতো দাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। তদুপরি গত বছর তারা সৌদি আরবকেও জোটে যুক্ত করেছিল। 

ঠিক একইভাবে রাশিয়া ও সৌদি আরব এখনো বাজারে প্রভাব ফেলতে পারলেও চাহিদা-সরবরাহে ভারসাম্য পরিবর্তনে দেশ দুটির খুব কমই সামর্থ্য রয়েছে। বিপরীতে ওপেক এবং বিশেষভাবে ওপেক প্লাসের (রাশিয়া ও আরো কিছু দেশের জোট) বাজার স্থানান্তর ও মূল্য পরিবর্তনে যথেষ্ট বেগ পেতে হচ্ছে। 

রোমা ত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ গ্যালিয়ানো গ্যারাভিনি ‘রাইজ অ্যান্ড ফল অব ওপেক’ গ্রন্থে এ সংস্থার চমত্কার বর্ণনা তুলে ধরেছেন, যেখানে সংস্থাটির ৬০ বছরের জীবনকালে পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সংগতি রেখে অভিযোজনের চিত্র উঠে এসেছে। অনেকেই হয়তো ভাবতে পারেন যে এ সংগঠনের ইতিহাস একদম একঘেয়ে, আসলে তেমনটি নয়।

গ্যারাভিনি—যিনি ওপেকের কাগজপত্র দেখার অবাধ সুযোগ পেয়েছিলেন। তিনি সংগঠনটির প্রথম দুই দশকের কর্মকাণ্ড ও ভূমিকা সবিস্তারে তুলে ধরেছেন। ওই দুই দশকে সংগঠনটি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর শুরু হওয়া বি-উপনিবেশায়ন প্রক্রিয়ার বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে ভূরাজনীতির চ্যালেঞ্জার হিসেবে কাজ করেছে। ওপেকের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ইরান, ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরব ও ভেনিজুয়েলা মূলত পশ্চিমা কিছু বহুজাতিক কোম্পানির হাত থেকে তেলের মজুদের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করতে চেয়েছিল। 

পরবর্তী সময়ে ১৯৭৩ ও ১৯৭৯ সালে তেল সংকট সৃষ্টি হয়। পশ্চিমা অর্থনীতিগুলো অধোগতির মুখোমুখি হয় এবং নীতিনির্ধারকরা বিকল্প জ্বালানি উৎসের সন্ধান শুরু করেন। ওই সময় একজন বিশ্লেষক যেমনটা বলেছিলেন, ‘তেলের মতো প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লে মানুষ হয় তার উৎপাদন বাড়ায়, নইলে ব্যবহার কমিয়ে দেয়।’

ফলে ওপেক কেবল নিম্ন চাহিদার মুখোমুখিই হয়নি, বিশেষ করে আলাস্কা থেকে অপরিশোধিত (ক্রুড) জ্বালানি আসার কারণে তেলের জোগান বাড়িয়ে দিয়েছিল। এ সময় থেকে মোটামুটি ২০০০ সাল পর্যন্ত ওপেক তাদের ভূরাজনৈতিক উচ্চাশা কমিয়ে আনে। উৎপাদন কোটা ও দাম নির্ধারণের মাধ্যমে  কার্টেলের চেষ্টা করেছিল।

২০০০ সালে জ্বালানি অপ্রতুল চীনের উত্থানের কারণে ওপেক ঐতিহাসিক সর্বোচ্চ সীমায় দাম বাড়াতে সমর্থ হয়েছিল, যখন ২০০৮ সালে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১৫০ ডলার নির্ধারণের দিকে এগোচ্ছিল এবং ২০১৪ সাল পর্যন্ত ওপেক তেলের বাজারে প্রধানত নিষ্ক্রিয় পর্যবেক্ষকের ভূমিকা পালন করেছে। তেলের চাহিদা যত বাড়ছিল, সংস্থাটি সরবরাহ কমিয়ে তেলের দাম ততই বাড়াচ্ছিল।

কোটার সঙ্গে কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা ছিল ওপেকের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ সংস্থাটির প্রাথমিক লক্ষ্য এমনভাবে তেলের দাম স্থিতিশীল রাখা, যাতে সদস্য রাষ্ট্রগুলো উচ্চ মুনাফা লাভ করতে পারে। শেল অয়েল বিপ্লব সৃষ্ট চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সংস্থাটি অস্বস্তিকর ওপেক প্লাস মৈত্রী জোট গড়তে বাধ্য হয়, নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর যার ভঙ্গুরতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সংস্থাটির সদস্য সংখ্যা হঠাৎ করেই ১৩ থেকে বেড়ে ২৩-এ উন্নীত হয়। ফলে সমন্বয় সাধন আরো কঠিন হয়ে পড়ে। আর এখন এর স্থায়িত্বের জন্য প্রয়োজন ঐতিহাসিক দুই শত্রু সৌদি আরব ও রাশিয়ার মধ্যকার সহযোগিতা।     

২০২০ সালের মার্চে সৌদি আরব ও রাশিয়া যখন একটি চুক্তিতে আসতে সমর্থ হয় না, তখন এর ফল হয় নজিরবিহীন মূল্যযুদ্ধ; যা প্রথমবারের মতো ডব্লিউটিআই বেঞ্চমার্ক ঋণাত্মক ধারার দিকে ঠেলে দিয়েছিল। পরের মাসে সংশ্লিষ্ট উচ্চাকাঙ্ক্ষী চুক্তি সম্পন্ন হয়। এর উদ্দেশ্য প্রতিদিন তেল উৎপাদন ৯ দশমিক ৭ মিলিয়ন ব্যারেলে নামিয়ে আনা। ওই সময় থেকেই বর্ধিত ওপেক সমন্বয়হীনতার সমস্যায় ভুগছিল, যেখানে রশিয়া উৎপাদন বাড়াতে চাপ দিচ্ছে এবং সৌদি আরব সেখানে রক্ষণশীল মনোভাব প্রদর্শন করে। এ সবকিছুর মধ্যে থেকেই কোনো না কোনোভাবে ওপেক একটি সাম্যাবস্থা তৈরি করতে সমর্থ হয়েছে, যার মাধ্যমে ধীরে ধীরে হলেও জ্বালানি তেলের চাহিদার সঙ্গে মিলিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বৃহত্তর আকারে সংস্থাটি বাজার ভারসাম্য রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এমন একটি অবস্থান ওপেক তৈরি করেছে, যা রক্ষা করা প্রয়োজন এবং ওপেক সেটাই চাইবে। অদ্ভুতভাবে সত্য হলো, ওপেক মূলত জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করবে। তেলের সর্বোচ্চ চাহিদা মানে বৈশ্বিক চাহিদা প্রথমবারের মতো কমতে শুরু করবে। বৈশ্বিক উৎপাদনের ৪৫ শতাংশের প্রতিনিধি হিসেবে ওপেক এবং এর সহযোগী দেশগুলো বিশেষ অবস্থান দখল করে আছে, যা সাম্যাবস্থা বজায় রাখতে পারে। এর মাধ্যমে মূল্যবৃদ্ধি বা মূল্যহ্রাসের প্রবণতা রোধ করা সম্ভব। চাহিদা কমে যাওয়া মানে জোগানও সেই অনুপাতে কমাতে হবে।

তদুপরি, সবুজ বিপ্লবের সঙ্গে জড়িত থাকা ওপেক তথ্য ও বিশ্লেষণ ভাগাভাগি করার মাধ্যমে এর সঙ্গে যুক্ত রাষ্ট্রগুলোকে তেল থেকে অর্জিত আয়ের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে সাহায্য করতে পারে।

ওপেক এবং এর সহযোগী দেশগুলো স্থায়ী মৈত্রী ধরে রাখতে পারবে কিনা, তা নির্ভর করবে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ওপর। সালমান বিন আব্দুল আজিজ আল সাউদের পুত্র সালমান বর্তমান বিশ্বে তেল শিল্পে অন্যতম অদ্ভুত এবং বিতর্কিত চরিত্র।

পুরস্কারজয়ী সাংবাদিক ব্র্যাডলি হোপ ও জাস্টিন ছেক তাদের ‘ব্লাড অ্যান্ড অয়েল’ বইয়ে দেখিয়েছেন কেমন করে ৩৫ বছর বয়সী যুবরাজ সালমান মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী মানুষে পরিণত হলেন। যুবরাজ সালমানই গত বছর কভিডের সময় তেলের মূল্যবৃদ্ধির পরিকল্পনা করেছিলেন। এটিই ছিল মূলত প্রথম ধাক্কা, যা সালমানের দ্বারা তার দেশ বা ওপেক থেকে এসেছিল।

গল্পটি বলতে গিয়ে হোপ ও ছেক জানান যে তারা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরিতে ‘অর্থের ওপরে জোর দিয়েছেন, যা কীভাবে খরচ করা হয়, কোন খাতে ব্যয় এবং কী কাজে ব্যবহূত হয়’। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে তাদের কাছে সৌদি আরবে ক্ষমতায় থাকা অনেকে অনেক কথা বলেছেন এবং সরকারি নথি থেকেও তারা অনেক তথ্য পেয়েছেন। এসবের মধ্যে নানা বিনিয়োগ এবং অতীতে যুবরাজের নিজস্ব ব্যবসার ব্যর্থতার নজির পাওয়া যায়।

সালমান কখনো আমেরিকা কিংবা ইউরোপে পড়াশোনা করেননি। তার বাবা ২০১৫ সালে রাজা হন এবং তিনি চাননি যে তার প্রিয় পুত্র সৌদি পরিচয় ভুলে গিয়ে পশ্চিমা রীতি আত্মস্থ করুক। যেমনটা সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা ইবনে সৌদি বলেছিলেন, ‘মানুষের নেতা হতে হলে সেই দেশের মানুষের মধ্যে থেকে শিক্ষালাভ করতে হয়। এভাবে নিজের দেশের মানুষের ঐতিহ্য এবং মানসিকতা বুঝে নিতে হয়।’

স্থানীয় রীতির শক্ত শিকড় ধারণ করে সালমান একটি জটিল অবস্থায় আঘাত করে নিজের স্থান ঠিক করে কিছু বিতর্ক তৈরি করেছেন। পাশাপাশি নিজের গোত্রের পাশাপাশি পশ্চিমের কাছেও সংস্কারকের একটি মূর্তি তৈরি করেছেন, যা অনেক তরুণ সৌদিকে উদ্বুদ্ধ করে। বাবার সিংহাসন লাভের কিছুদিন পরেই সালমান বুঝিয়ে দেন, তিনি মতবিরোধ মেনে নিতে রাজি নন। তিনি রাজদরবারের সঙ্গে যুক্ত অনেক অভিজাতকে দূরে সরানোর পাশাপাশি অনেককে বন্দি করেন, যার মধ্যে আরেক যুবরাজ মোহাম্মদ বিন নায়িফ অন্যতম। ৩০ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পদ এবং রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় তেল কোম্পানি আরামকোর সভাপতি হয়ে তিনি প্রভূত ক্ষমতা লাভ করেন। ২০১৭ সালে বাবার পছন্দে তিনি আবার নতুন করে যুবরাজ নির্বাচিত হন।

বইয়ে মোহাম্মদ বিন সালমানের একটি স্পষ্ট চিত্রের দেখা মেলে। যেখানে তাকে নিজের দেশে একজন স্বৈরাচারী এবং বহির্বিশ্বে একজন দাম্ভিক নেতা বলে মনে হয়। নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে ২০১৫ সালে ইয়েমের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান করে সালমান আমেরিকাকেও বিস্মিত করেন। অভিযানটি একটি বিদ্রোহী গ্রুপকে শায়েস্তা করে কয়েক সপ্তাহেই শেষ হয়ে যাওয়ার কথা কিন্তু তা আজও চলছে।

কাতার অবরোধের আয়োজক লেবানিজ প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরিকে অপহরণের আদেশও সালমানের কাছ থেকে এসেছিল। সালমান দেখেছিলেন উভয় পক্ষই ইরানের প্রতি সহানুভূতিশীল। সবচেয়ে বড় কথা, ধারণা করা হয় ওয়াশিংটন পোস্টের কলামিস্ট জামাল খাসোগিকে হত্যার নির্দেশও তারই দেয়া। ইস্তাম্বুলের সৌদি দূতাবাসে ২০১৮ সালের অক্টোবরে খাসোগিকে হত্যা করা হয়।

সালমানের কর্তৃত্ববাদী, আবেগপ্রসূত এবং অনিশ্চিত সিদ্ধান্তের নেতৃত্বের ধরনের কারণে বহির্বিশ্বে তিনি খুব বেশি বন্ধু খুঁজে পাননি, বরং মধ্যপ্রাচ্যের তেল শিল্পে অভূতপূর্ব ক্ষমতার অধিকারী হয়েছেন। তবে তিনি ‘ভিশন ২০৩০’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে সৌদি আরবের তেলভিত্তিক অর্থনীতিকে পরিবর্তন করে আধুনিক ও বৈচিত্র্যপূর্ণকরণ করতে চান। এর জন্য তিনি অবশ্য সাধুবাদ পাবেন। তিনি সৌদির ওয়াহাবি নীতিকে আরো হালকা করা এবং লিঙ্গবৈষম্য কমিয়ে সৌদির সমাজকে বিশ্বের সঙ্গে আরো উন্মুক্তভাবে পরিচিত করাতে চান। এখন দেখার বিষয়, এই সামাজিক লক্ষ্য অর্জনে তিনি কতদূর পর্যন্ত এগোতে পারেন।

যদিও অনেকে মনে করেন, ভিশন ২০৩০ আসলে একটি লোক দেখানো পরিকল্পনা। তারপরও সালমানই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি এমন কিছু পরিকল্পনা নিয়ে এসেছেন; যা তেল যুগের সমাপ্তির সঙ্গে তাল মেলাতে সৌদি আরবকে সাহায্য করতে পারে। মানুষকে প্রভাবিত করতে তিনি মাঝে মাঝে তার দাদা রাজা আব্দুল আজিজের উদাহরণ দিয়ে বলেন, তিনি এবং তার সময়ের মানুষেরা তেলের ওপর নির্ভর না করেই এ রাজ্য তৈরি করেছিলেন। কেবল তা-ই নয়, তারা রাজ্য চালিয়েছিলেন তেল ছাড়া এবং তেল ছাড়া তারা খারাপ ছিলেন না।

তেলের সর্বোচ্চ চাহিদার সময় যত এগিয়ে আসছে, মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ এ অবস্থানে নিজেদের আবিষ্কার করবে। খুব দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই সে দেশগুলো এবং তাদের নেতাদের উচিত প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করা।

[স্বত্ব:
প্রজেক্টসিন্ডিকেট
]

 

এডোয়ার্দো কাম্পানেল্লা: ইতালির ইউনিক্রেডিট ব্যাংকের অর্থনীতিবিদ; মাদ্রিদের আইই ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স অব চেঞ্জের ফেলো ও নস্টালজিয়া: দ্য পলিটিকস অব ইমোশন ইন অ্যা ফ্র্যাকচারড ওয়েস্ট গ্রন্থের লেখক

ভাষান্তর: মাহামুদুর রহমান