অ্যান্টিবায়োটিকের ক্রমেই রোগজীবাণু প্রতিরোধী হয়ে ওঠা দেশে অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যায় রূপ নিয়েছে। বিভিন্ন মাঠ গবেষণায় বিষয়টি উঠে আসছে। সম্প্রতি আইসিডিডিআর,বি এবং ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হসপিটাল পরিচালিত এক গবেষণা প্রতিবেদনেও এ ধরনের তথ্য মিলেছে। ওই গবেষণার ফলাফল বলছে, নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত কম বয়সী শিশুদের চিকিৎসায় ব্যবহূত অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করছে না। ফলে শ্বাসযন্ত্রের উন্নততর চিকিৎসা সত্ত্বেও অনেক শিশুর মৃত্যু ঘটছে। ২০১৪-১৭ সাল পর্যন্ত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কয়েক ডজন শিশু মারা যায় বলে সংশ্লিষ্ট গবেষকদের ভাষ্যে উঠে এসেছে। উদ্বেগজনক তথ্য বৈকি। তাই সমস্যাটিকে হেলায় নেয়ার সুযোগ নেই। এর প্রতিকারে অবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।

একসময় নিউমোনিয়া হলে অনেকটা মৃত্যু নিশ্চিত ধরে নেয়া হতো। কিন্তু কার্যকর টিকা উন্নয়ন, অ্যান্টিবায়োটিকের উদ্ভাবন এবং উন্নততর চিকিৎসায় এখন এটি একটি নিরাময়যোগ্য রোগে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে টিকা ও অ্যান্টিবায়োটিকের সাহায্যে এর চিকিৎসা বিশ্বব্যাপী অসংখ্য জীবন রক্ষা করেছে, করছে। তবে কম বয়সী শিশুদের জন্য নিউমোনিয়া এখনো প্রাণহানিকর। আমাদের দেশে এখনো শিশু মৃত্যুর অন্যতম বড় কারণ নিউমোনিয়া। এমন এক প্রেক্ষাপটে যেভাবে অ্যান্টিবায়োটিক রোগপ্রতিরোধী হয়ে উঠছে তা বেশ দুশ্চিন্তার। অ্যান্টিবায়োটিক কাজ না করলে ভবিষ্যতে কম বয়সী শিশুদের জীবন বাঁচানো মারাত্মক চ্যালেঞ্জিং হবে বৈকি। আজকে গবেষণা হয়েছে বলে নিউমোনিয়ার ক্ষেত্রে বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। ব্যাপকতর গবেষণা হলে ব্যাকটেরিয়াজনিত অন্য রোগের ক্ষেত্রেও এ ধরনের তথ্য মিলতে পারে। তাই এসব বিষয়ে আরো গবেষণা বাড়ানো প্রয়োজন।

বিভিন্ন অ্যান্টিবায়োটিকের ক্রমেই জীবাণু প্রতিরোধী হয়ে ওঠার জন্য একক কোনো কারণ নয়; অনেকগুলো ফ্যাক্টরই দায়ী। অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা নিশ্চিতে কত মাত্রা কতদিন সেবন করবে, তা খুব গুরুত্বপূর্ণ। নইলে তা মারণ ওষুধে পরিণত হতে পারে। দুঃখজনকভাবে দেশে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের ক্ষেত্রে নিয়ম-নীতির বালাই নেই। যথেচ্ছভাবে তা ব্যবহার হচ্ছে। নিয়ম হলো পরীক্ষা-নিরীক্ষায় জীবাণু সংক্রমণের প্রমাণ মিললে চিকিৎসকের সুনির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য সুনির্দিষ্ট মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক দেয়া। অথচ অনেক চিকিৎসকের মধ্যেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া উপসর্গ দেখে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের প্রবণতা বিদ্যমান। আবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেও অনেক সময় ব্যবস্থাপত্রে নির্দিষ্ট মাত্রার কথা উল্লেখ থাকে না। দেশের এক-তৃতীয়াংশ চিকিৎসা পেশাজীবী রোগীদের উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণের পরামর্শ দেন বলে এক গবেষণায় উঠে এসেছে, এটা দুঃখজনক। এক্ষেত্রে রোগীদেরও একটা ভূমিকা আছে। দ্রুত সেরে উঠতে অনেকেই অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণে স্বপ্রণোদিত আগ্রহ দেখায়। এমনকি অ্যান্টিবায়োটিক না লিখলে কিছু রোগী চিকিৎসক সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করে থাকেন। এটিও অ্যান্টিবায়োটিক লেখায় চিকিৎসককে প্ররোচিত করছে। রোগীদের আরেক খারাপ প্রবণতা হলো, অসুস্থ হলে চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে স্থানীয় ওষুধের দোকানদারের দ্বারস্থ হওয়া। ব্যবস্থাপত্র ছাড়া বিক্রির নিয়ম না থাকলেও অনিয়মতান্ত্রিকভাবে ওষুধের দোকানগুলো মুনাফার জন্য রোগীদের সাধারণ অসুখেও অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি করে। মাত্রা সম্পর্কে তাদের যেমন ধারণা থাকে না, তেমনি কতদিন সেবন করতে হবে তার জ্ঞানও নেই। এতে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবেই রোগী শারীরিক ক্ষতির শিকার হচ্ছে। আবার অনেক রোগীই একটু সেরে উঠলে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন বাদ দেন। পুরো কোর্স শেষ করেন না। বলা চলে, বহুমাত্রিক অপপ্রয়োগ বা অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে অ্যান্টিবায়োটিক ক্রমেই জীবাণু প্রতিরোধী হয়ে উঠছে।

সত্য যে, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়েল ওষুধ মানুষের অতি প্রয়োজনীয় বন্ধু। ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ফাঙ্গাসের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর এক কার্যকর হাতিয়ার হলো এসব ওষুধ। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে গত শতকের ষাট, সত্তর, আশির দশকে যেভাবে অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার হয়েছে, এখন আর হচ্ছে না। যেসব অ্যান্টিবায়োটিক বাজারে আছে, সেগুলো ৩০ বছর আগে এসেছে। বেড়ে চলা নতুন রোগ-বালাইয়ের বাস্তবতায় নতুন ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক দরকার হলেও এক্ষেত্রে তেমন অগ্রগতি নেই। অথচ অপপ্রয়োগে যেভাবে বিদ্যমান অ্যান্টিবায়োটিকগুলো রোগপ্রতিরোধী হয়ে উঠছে, তা চিকিৎসা ক্ষেত্রে বড় জটিলতা সৃষ্টি করবে বৈকি। চিকিৎসা পরিভাষায় এ সমস্যাকে বলা হয়, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়েল রেজিস্ট্যান্স। শুধু বাংলাদেশ নয়, এটি এখন বৈশ্বিক সমস্যায় রূপ নিয়েছে। অনেকেই একে পরবর্তী বৈশ্বিক মহামারী বলছেন। এ প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন দেশ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা প্রটোকল তৈরি করেছে। ব্যবস্থাপত্র ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার নিশ্চিত করেছে। এ-সংক্রান্ত যুগোপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। সর্বতোভাবে নিশ্চিত করছে অ্যান্টিবায়োটিকের সচেতন ও দায়িতশীল প্রয়োগ। বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা আমলে নিয়ে আমাদেরও সেটি করতে হবে।

অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার রোধে খোদ প্রধানমন্ত্রীও একাধিকবার নির্দেশনা দিয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বলেছেন। দুঃখজনকভাবে দেশে এখন পর্যন্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের কার্যকর ও যুগোপযোগী কোনো নীতিমালা করা হয়নি। দ্রুত এটি করা দরকার। লাগাম টানতে হবে চিকিৎসকদের হরে-দরে অ্যান্টিবায়োটিক প্রদানের প্রবণতা। ওষুধের দোকানে ব্যবস্থাপত্র ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া চাই। প্রয়োজনে জরিমানা ও কঠোর শাস্তি দিতে হবে। বাড়াতে হবে ওষুধ প্রশাসনের নজরদারি। পুরো কোর্স শেষ করার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে রোগীদের বোঝাতে চিকিৎসকদের আরো দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। অ্যান্টিবায়োটিক চেনাটা জনসাধারণের কাছে সহজ করতে ওষুধের লেবেলে লাল রঙ ব্যবহার, একইভাবে ব্যবস্থাপত্রেও লাল রঙ ব্যবহারের পরামর্শ কারো কারো। বোতলে বা প্যাকেটে এমনভাবে অ্যান্টিবায়োটিক বাজারজাত করতে হবে, কেউ যাতে সম্পূর্ণ কোর্সের অ্যান্টিবায়োটিক কিনতে বাধ্য হয়। খুচরা কেনার সুযোগ না থাকে। মোট কথা, বহুমাত্রিক সৃজনশীল উপায়ে অ্যান্টিবায়োটিকের দায়িত্বশীল প্রয়োগ নিশ্চিত করা চাই।

আমাদের দেশে অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার বহুমুখী অবয়বে হাজির। কেবল মানবদেহ নয়, গবাদি পশু, পোলট্রি, মত্স্য পালন ও কৃষিতেও অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) এক গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, পশুখাদ্য, মাছ ও কৃষিতে অতিমাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে। সবচেয়ে বেশি অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হচ্ছে কৃষিতে, যা দেশে ব্যবহূত মোট অ্যান্টিবায়োটিকের প্রায় অর্ধেক। ফলে খুব সহজেই কৃষিখাদ্যের মধ্য দিয়ে এ অ্যান্টিবায়োটিক মানুষের শরীরে ঢুকছে। এতে একদিকে যেমন অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা হারাচ্ছে, তেমনি শরীরও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হারাচ্ছে। এমনটি হলে ভবিষ্যতে ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণে অনেক মানুষই মারা যাবে বিনা চিকিৎসায়। সুতরাং এটি আমলে নিয়ে সব ক্ষেত্রে দ্রুত অ্যান্টোবায়োটিকের সর্বজনীন প্রটোকল প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।