চলমান করোনার প্রভাব পড়েছে চলতি বাজেটে (২০২০-২১)। ব্যাহত হচ্ছে অর্থ ব্যয়ের স্বাভাবিক গতি। ফলে অনিশ্চয়তার মুখোমুখি শতভাগ বাজেট বাস্তবায়ন। তথ্য বলছে, গত জুলাই-ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাজেট থেকে ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ৯০ হাজার ২৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে বাজেট বাস্তবায়ন হার মাত্র ৩৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ। এটা হতাশাজনক নৈপুণ্য। অর্থ ব্যয়ে এ মন্থরতা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বৈকি।

এবার বাজেট ঘোষণাকালীন করোনার প্রাদুর্ভাব ছিল। আগে থেকেই বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় ব্যক্ত করে আসছিলেন বিশেষজ্ঞরা। এজন্য বাস্তবমুখী বাজেট ঘোষণার ওপর জোর দিয়েছিলেন তারা। কিন্তু তাতে সরকারের দিক থেকে ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। অনেকটা আগের গতানুগতিকায় উচ্চাভিলাষী বাজেট ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী, যার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। প্রথম আট মাসে বাজেট বাস্তবায়নে যে ধীরগতির চিত্র উঠে এসেছে, তা বিশেষজ্ঞদের পূর্বোক্ত ধারণারই প্রতিফলন ঘটায় বৈকি। করোনাকালে কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে অর্থছাড়ের ক্ষেত্রে কৃচ্ছ্র নীতি নেয়া হলেও উন্নয়ন বাজেটে অবশ্য বরাদ্দের ৮৫ শতাংশ খরচ করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। অথচ সে অনুযায়ী খরচ করতে পারছে না বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। মূলত উন্নয়ন খাতে তুলনামূলক ব্যয়েরই প্রভাব পড়েছে বাজেটে।

করোনা সংকটের কারণে অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের জন্য চলতি বছর বেশ চ্যালেঞ্জিং। ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা বিরাজমান। বেসরকারি বিনিয়োগ শ্লথ। ব্যক্তি খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ব্যয়সংকোচনের নীতি নিয়েছে। বিপুলসংখ্যক লোক বেকার। গত বছর অঘোষিত লকডাউনে অনেক মানুষ কাজ ও আয় হারিয়েছে। তাদের অনেকেই পুনরায় কাজে যোগ দিতে পারেনি। এর মধ্যে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলায় চলছে লকডাউন। এখন আরেক দফায় কাজ হারিয়েছে মানুষ। আয়-উপার্জন নেই বিপুল শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর। ফলে ভোগেও এক ধরনের মন্থরতা বিরাজ করছে। বলা চলে, নানা দিক থেকে বর্তমানে অর্থনীতি সংকুচিত। সন্দেহ নেই, করোনাকালে সংকটে থাকা দরিদ্র জনগোষ্ঠী ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সরকার নগদ অর্থ সহায়তার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে খবর মিলছে, করোনার সময়ে সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে জিডিপি অনুপাতে সবচেয়ে পিছিয়ে বাংলাদেশ। এ অবস্থায় বাজেট বাস্তবায়নে গতি না আনলে সার্বিকভাবে অর্থনীতিতে কর্মচাঞ্চল্য ফিরিয়ে আনা কঠিন।

করোনাকালীন মন্দায় অর্থনীতিকে উদ্দীপ্ত রাখতে অনেক দেশেই কেইনসীয় মডেলে রাষ্ট্রীয়ভাবে অর্থপ্রবাহ জোগানো হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মতো বৈশ্বিক আর্থিক সংস্থাগুলোও এর ওপর জোর দিচ্ছে। এ সময়ে বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৫ শতাংশের বেশি হলেও সমস্যা দেখছে না আইএমএফ। মোদ্দাকথা, নানাভাবে সরকারি ব্যয় বাড়িয়ে ভোগ চাহিদা ও অর্থনীতির গতিময়তা বজায় রাখার পরামর্শ তাদের। কিন্তু বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত এর বিপরীত প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে নানা প্রণোদনা ও দরিদ্রদের সহায়তা কর্মসূচি বিন্যাস করা হয়েছে বটে, তবে এগুলো প্রয়োজনের তুলনায় বেশ অপ্রতুল। এমন এক প্রেক্ষাপটে বাজেট বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা আরো বড় মাত্রায় হাজির হয়েছে। নানা সমালোচনা সত্ত্বেও উচ্চাভিলাষী বাজেট ঘোষণার পেছনে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু বাজেট বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে আলোচ্য উদ্দেশ্য অনেকখানি ব্যাহত হচ্ছে। একে তো সরকারি সহায়তার পরিমাণ অপ্রতুল, তার মধ্যে বাজেট বাস্তবায়নে চলমান স্থবিরতা বজায় থাকলে অর্থনীতি কীভাবে ঘুরে দাঁড়াবে?

চলতি মহামারী আমাদের সামনে কিছু চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে। তার মধ্যে প্রধান দুটি চ্যালেঞ্জ হলো দারিদ্র্য এবং কর্মসংস্থান। আগের সাড়ে তিন কোটির সঙ্গে নতুন করে আড়াই কোটি দরিদ্র যোগ হয়েছে।  সেই হিসাবে দেশে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা এখন ছয় কোটি। অন্যদিকে আগে থেকেই দেশে কর্মসংস্থান পরিস্থিতি হতাশাজনক।  বিগত বছরগুলোয় জোরালো প্রবৃদ্ধি হলেও কর্মসংস্থান সীমিত। এর মধ্যে আনুষ্ঠানিক খাতের বিপুল কর্মী কাজ হারিয়েছেন। ফলে কর্মহীন মানুষের সংখ্যাও ঊর্ধ্বমুখী। এ দুটি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি বাজেট বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। বাজেট ব্যয় মানে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ। ফলে দেশের অভ্যন্তরে অর্থপ্রবাহ বাড়ে, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। বলা চলে, অর্থনীতিতে এর গুণক প্রভাব পড়ে। কাজেই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য বাজেট বাস্তবায়ন বেগবান করতে হবে।  

সত্য যে বাজেট বাস্তবায়নের সঙ্গে রাজস্বের একটা সংযোগ আছে। দুঃখজনকভাবে রাজস্ব আহরণে বাংলাদেশ বরাবরই দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পিছিয়ে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, নেপালের কর-জিডিপি অনুপাত প্রায় ১৯ শতাংশ, ভুটানের কর-জিডিপি অনুপাত ১৬ শতাংশ, ভারতের ১২ শতাংশ, শ্রীলংকার ১১ দশমিক ৬ শতাংশ, পাকিস্তানের ১১ শতাংশ, আফগানিস্তানের ৯ দশমিক ৯ শতাংশ এবং মালদ্বীপের অনুপাত ৯ দশমিক ১ শতাংশ। অথচ বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনো ৮ শতাংশের মতো। এর মধ্যে করোনার সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতির গতি ফিরে না আসায় রাজস্ব আদায় আরো কম হচ্ছে। ফলে সার্বিকভাবে অর্থ ব্যয়ের গতিও কম। এ সীমাবদ্ধতা অস্বীকারের জো নেই। এজন্য রাজস্ব আহরণ বাড়াতে করহার কমিয়ে করভিত্তি সম্প্রসারণের পরামর্শ অর্থনীতিবিদের। এটা আমলে নিয়ে কর কাঠামোয় ব্যাপকতর সংস্কার জরুরি।

লক্ষণীয় বিষয় হলো, অভ্যন্তরীণভাবে রাজস্ব আদায় কম হলেও বৈদেশিক উৎস থেকে বিপুল অর্থ পেয়েছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি বেড়ে চলা রিজার্ভের অর্থ ব্যবহার নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলছে। সব দিক বিবেচনা করে বহুমাত্রিক উৎস  থেকে প্রাপ্ত অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে বাজেট বাস্তবায়ন বাড়াতে হবে। সঙ্গে বাড়াতে হবে প্রশাসনিক সক্ষমতাও। নইলে অর্থনীতির প্রত্যাবর্তন সহজ হবে না। বিষয়গুলো আমলে নিয়ে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব বলিষ্ঠ উদ্যোগ নেবেন, এটিই প্রত্যাশা।