অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২২ শুরু হয়েছে। ভাষা আন্দোলনের চেতনা ও এর শহীদদের স্মৃতির প্রতি নিবেদিত এ গ্রন্থমেলা বাংলাদেশের অন্যতম সাংস্কৃতিক উৎসবও বটে। বিভিন্ন দেশে বইমেলা হয় বাণিজ্যের প্রয়োজনে, কিন্তু বাংলাদেশের অমর একুশে গ্রন্থমেলার মূল প্রেরণা ছিল ভাষা শহীদদের স্মৃতি ও বাংলা ভাষার প্রতি অফুরান আবেগের স্ফুরণ। বলা যায়, বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের চাঞ্চল্য অনেকটাই একুশে গ্রন্থমেলাকেন্দ্রিক। যদিও এবার ফেব্রুয়ারির মাঝপথে মেলা শুরু হয়েছে। মেলা চলাকালে বাংলা একাডেমি ও তত্সংলগ্ন মেলা প্রাঙ্গণ থাকবে পাঠক-লেখক, ক্রেতা-দর্শক নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের পদচারণায় মুখর। বইমেলার সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে। করোনার প্রাদুর্ভাবের মধ্যে শুরু হওয়া গ্রন্থমেলায় যথাযথভাবে স্বাস্থ্যবিধি পরিপালন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে ঘোষিত বিধিবিধান পরিপালনে বাংলা একাডেমিসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যথাযথ ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা।

অমর একুশে গ্রন্থমেলা উপলক্ষে বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্প একটি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে। এখন অনেক নতুন প্রকাশক এ শিল্পে এসেছেন। এ মেলায় মানুষের আগ্রহ এতই বেশি, শুধু প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল থেকে নয়, বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকেও গ্রন্থপ্রেমী বাঙালিরা এতে অংশ নেন। বইমেলা সৃজনশীল বইয়ের প্রদর্শন ও বিপণনের উদ্যোগ। এ উদ্যোগে প্রতি বছর সাফল্যের নতুন মাত্রা যোগ হচ্ছে। কিন্তু একটি বৈপরীত্যও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। একদিকে অজস্র বই প্রকাশিত হচ্ছে, বাড়ছে প্রকাশনা সংস্থা কিন্তু কমছে পাঠক। একসময় বাঙালির মননতৃষ্ণা নিবারণ, বিনোদন ও অবসরযাপনের অনুষঙ্গ ছিল বই। এমনকি স্বল্পশিক্ষিত নিম্নবিত্তের ঘরে বাঁশের আড়ায় থাকত দু-একটি বই। বিশেষ করে উপন্যাস। আগে মানুষের আর্থিক সংগতি ছিল কম, বইও ছিল না সহজলভ্য। ফলে পাঠাগারে গিয়ে বই পড়ার একটা সুন্দর চর্চা ছিল। আর ছিল ধার করে বই পড়ার রেওয়াজ। একটি বই শত হাত ঘুরে জীর্ণ হয়ে যেত। আজকের দিনে মানুষের আলো ঝলমলে ড্রইংরুমের সুদৃশ্য শোকেসে বই সাজানো থাকে। কিন্তু বই অধিকাংশ মানুষের মনের খোরাক নয়, বিনোদনের উপকরণ নয়; তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে এখন মানুষের মনের খোরাক আর বিনোদন মাধ্যমের হিসাব নেই, কিন্তু সেখানে নেই বইয়ের স্থান।

অমর একুশে গ্রন্থমেলা শুরু হওয়ার শুভক্ষণের অপেক্ষায় থাকেন বইপ্রেমিক পাঠক থেকে শুরু করে লেখক এমনকি প্রকাশনা শিল্পের সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারাও। শুধু তাই নয়, মনোমুগ্ধকর এ গ্রন্থমেলা নবোদ্যমে পাঠকসমাজকে যে মাত্রায় উদ্বেলিত করে, সেটাও আবহমান বাংলার এক নান্দনিক কর্মদ্যোতনা। মেলায় বই বিক্রির পরিমাণ যদি বাড়ে, তাহলে প্রকাশকরা অনেকটা স্বস্তিতে, স্বাচ্ছন্দ্যে বই প্রকাশ করতে পারেন। প্রতি বছর অমর একুশে গ্রন্থমেলা উপলক্ষে বেশ কয়েক হাজার নতুন বই প্রকাশিত হয়। এত বেশিসংখ্যক নতুন বই এলেও এর মধ্যে বেশির ভাগ থাকে মানহীন। কোনো রকম সম্পাদনা ছাড়াই বইগুলো মলাটবন্দি হয়ে আসে। মানহীন বইয়ের সংখ্যাধিক্য পীড়া দেয়, অস্বস্তি জাগায় মনে। এ বিষয়ে প্রকাশক ও সংশ্লিষ্ট সবার বিশেষভাবে মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। বই প্রকাশের আগে এর সুসম্পাদনা প্রয়োজন। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।

মাতৃভাষাকে তার যথার্থ অবস্থানে এখনো নিয়ে যেতে না পারাটাও দেশের জন্য কোনোভাবে কাঙ্ক্ষিত নয়। যে ভাষার জন্য মানুষ লড়াই করল, যেখান থেকে দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পটভূমি তৈরি হলো, তেমন যাত্রাপথকে আরো অর্থবহ করে তুলতে মাতৃভাষাকে নিজের জায়গায় সমুন্নত রাখাও সবার দায়বদ্ধতা। ভাষা আন্দোলন প্রায় ৭০ বছর পূর্তির মহা যুগসন্ধিক্ষণে। আর স্বাধীনতা অর্জন তার অর্ধশত বছর অতিক্রম করার পরও মাতৃভাষা আজও সর্বক্ষেত্রে কেন প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে না, তেমন প্রশ্ন থেকেই যায়। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারিজুড়ে অমর একুশে গ্রন্থমেলার সাড়ম্বর আয়োজন শুধু বই প্রকাশে সীমাবদ্ধ না রেখে সব ক্ষেত্রে মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে জোর দিতে হবে।

বাংলা সাহিত্যের অনন্য নক্ষত্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, আহমদ ছফা, হুমায়ূন আহমেদ প্রমুখ সাহিত্যিকের পর তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য লেখকের আবির্ভাব ঘটেনি; যা পড়ুয়াদের জন্য কিছুটা হতাশার বিষয়। দেশে অনেক মেধাবী ও অনেক উদীয়মান লেখক আছেন, যারা প্রতিনিয়ত আমাদের জন্য নতুন সৃজনে ব্যস্ত থাকেন। প্রতি বছর আমরা গ্রন্থমেলায় দেখতে পাই দেশে কিছু তরুণ উদীয়মান লেখকের আবির্ভাব ঘটে, যারা অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে তাদের লেখা বই মেলায় প্রকাশ করেন। কিন্তু তরুণ ও অপরিচিত লেখক হিসেবে পাঠকরা সেসব বইয়ের সঠিক মূল্যায়ন করেন না কিংবা কিনতে আগ্রহী হন না। ফলে সেই উদীয়মান তরুণ লেখক তার লেখালেখির স্পৃহা হারিয়ে ফেলেন। ভালো বইয়ের যেমন অভাব রয়েছে, তেমনি সমস্যা রয়েছে লেখকের রয়্যালটি নিয়ে। একই সঙ্গে কাগজসহ প্রিন্টিং ব্যয় বেড়ে ওঠায় বইয়ের দামও বাড়ছে। ফলে শিক্ষার্থীদের পক্ষে বই কেনা ক্রমে কঠিন হয়ে উঠছে। এক্ষেত্রে অবশ্য একটি সমালোচনাও রয়েছে। দেশে বইয়ের পেপারব্যাক এডিশন প্রকাশ হয় না, যা বিশ্বের অনেক দেশই করে। এতে বইয়ের দাম কমে আসে এবং সবাই তা কিনতে পারে। দেশের প্রকাশকদের এদিকে দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে বইয়ের ছাপার মান বাড়াতে হবে। ত্রুটিপূর্ণ গ্রন্থ প্রকাশ বন্ধ করা জরুরি। সঠিক সম্পাদনার পরই একটি বই প্রকাশ হওয়া উচিত। অভিযোগ রয়েছে অর্থের বিনিময়ে অনেক প্রকাশক অযোগ্য বইও প্রকাশ করছেন, যা কাম্য নয়।

হতাশাজনক বিষয় যে একুশে গ্রন্থমেলায় প্রতি বছরই নতুন বই আসার হার বাড়ছে, কিন্তু মানসম্মত বইয়ের সংখ্যা তেমন বাড়ছে না। যেনতেনভাবে নতুন বই মেলায় আনার প্রবণতায় মানহীন, তথ্য ও মুদ্রণ ত্রুটিযুক্ত বইয়ে বাজার ভরে যাচ্ছে। তাই মেলাকেন্দ্রিকতা থেকে বের হয়ে বছরজুড়ে নতুন বই প্রকাশ অব্যাহত রাখলে লেখক-প্রকাশকরা মেলার সময়ের বাড়তি চাপ থেকে মুক্ত থাকতে পারবেন এবং প্রকাশনার প্রতি যথাযথ মনোযোগী ও যত্নশীল হওয়ার সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি অমর একুশে গ্রন্থমেলা চলাকালীন সংলগ্ন এলাকায় কোনো রকম নিরাপত্তা ঘাটতি ও ব্যবস্থাপনাজনিত দুর্বলতা যাতে না থাকে, সেটা কঠোরভাবে নিশ্চিত করতে হবে। শুধু পর্যাপ্ত র্যাব-পুলিশ মোতায়েনই যথেষ্ট নয়, তাদের সার্বক্ষণিক ও ত্বরিত তত্পরতা নিশ্চিত করতে হবে। থাকতে হবে মেলায় আগতদের সচেতনতা। স্বাস্থ্যবিধি মেনে মেলায় অবস্থান করতে হবে। একাডেমির কর্মকর্তা-কর্মচারী, প্রকাশক ও স্টল-সংশ্লিষ্টদের টিকার সনদ রাখতে বলা হয়েছে। মেলায় সার্বক্ষণিক একটি ভ্রাম্যমাণ আদালত থাকবে। স্বাস্থ্যবিধি না মানলে জরিমানা করা হবে। করোনা সংক্রমণে প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজনের ওপর যে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, সেখানে অমর একুশে গ্রন্থমেলায় স্বাস্থ্য সুরক্ষার নিয়মকে সর্বাধিক প্রাধান্য দেয়া সংগত। আমরা এখনো সেভাবে করোনামুক্ত হতে পারিনি। তবে উৎসব আয়োজনকে নানামাত্রিক সীমাবদ্ধতায় পালনের যে নতুন কর্মযোগ, সেটাই এখন অনুসরণ করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। সুস্থ থাকা যেমন জরুরি, একইভাবে গ্রন্থের অনন্য সম্ভারও পাঠকের কাছে চলে আসা বাঞ্ছনীয়। উৎসবে সশরীরে উপস্থিত থাকা উদযাপনকে আরো গভীর করে তোলে। তবে স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিধিগুলোও অবশ্য পালনীয়।