স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে অর্থনৈতিক রূপান্তরের নতুন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টায় সৃষ্ট ব্যবসাসহায়ক পরিবেশে উন্মেষ ঘটছে নতুন নতুন অনেক উদ্যোগের। কিন্তু এক্ষেত্রে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে এখনো রয়ে গেছে উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তি। অর্থায়ন সংকট দূর করতে দীর্ঘদিন ধরে ‘স্টার্ট-আপ’ তহবিল গঠনের বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। এতদিন প্রতিশ্রুতি আর আশ্বাসের মধ্যে থাকলেও অবশেষে বাস্তব রূপ পেতে যাচ্ছে এটি। নিজস্ব অর্থে ৫০০ কোটি টাকার বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠনের মাধ্যমে মূলধন জোগানোর কার্যক্রম শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিশেষ এ তহবিল থেকে ২১-৪৫ বছর বয়সী নতুন ও সৃজনশীল উদ্যোক্তারা বন্ধকবিহীন সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ সুদে ঋণ পাবেন। পাঁচ বছরের নেয়া ঋণে এক বছর গ্রেস পিরিয়ড থাকারও খবর মিলছে। নিঃসন্দেহে এটি এক প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এর সুষ্ঠু বাস্তবায়নই কাম্য।
দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে উদ্যোক্তাদের মূলধন জোগানোর বিষয়টি অবশ্য একদম নতুন নয়। এ ধরনের উদ্যোগের যাত্রা ২০০১ সালে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে ইকুইটি অ্যান্ড অন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ ফান্ড (ইইএফ) গঠনপূর্বক কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নতুন উদ্যোক্তাদের বিনা সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সুদবিহীন এসব ঋণ গ্রহণের আট বছর পর সরকারকে ফেরত দেয়ার কথা থাকলেও অনেক উদ্যোক্তাই তা ফেরত দেননি। বিআইডিএসের মাঠ পর্যায়ে করা এক জরিপে উঠে এসেছে, ইইএফ সহায়তা নেয়া কৃষিভিত্তিক প্রকল্পের ২৫ শতাংশের কার্যালয় হয় খুঁজে পাওয়া যায়নি, না-হয় সেসব অফিস সম্পূর্ণভাবে অকার্যকর বা বন্ধ। আইসিটি প্রকল্পের ক্ষেত্রে ঠিকানা পাওয়া যায়নি ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশের। ফলে অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানকে দেয়া শতকোটি টাকার কোনো হদিস নেই। নামে-বেনামে অর্থ নিয়ে কেউ লাপাত্তা, আবার কেউ চলে গেছেন অন্য ব্যবসায়। বলা চলে, তহবিল ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা ও দুর্নীতির কারণে মুখ থুবড়ে পড়ে ইইএফ। এক পর্যায়ে তহবিলটি কিছুদিন বন্ধ রাখার পর আবার অন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ সাপোর্ট ফান্ড (ইএসএফ) নামে নতুন করে সাজানো হয় এটি। দুঃখজনকভাবে ইএসএফেও অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে এখান থেকে তহবিল পরিচালনায় গঠিত উইং বা অফিস থেকে সম্মানী ও আপ্যায়ন ভাতার নামে অবিশ্বাস্য ব্যয়ের তথ্য উঠে এসেছে। বিভিন্ন বিলের নামে শুধু সরকারি টাকার নয়ছয় নয়, প্রকল্প অনুমোদন করিয়ে দেয়ার নামে ঘুষ নেয়ার অভিযোগ রয়েছে ইএসএফের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে। যে কারণে সত্যিকারের প্রকল্পে-উদ্যোগে অর্থ যায় না বললেই চলে। ফলে সরকার যে ভালো উদ্দেশ্যে কম সুদের তহবিল চালু করেছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তা ব্যাহত হচ্ছে। হতাশাজনক বিষয় হলো, এসব অনিয়মের সুষ্ঠু তদন্তপূর্বক দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নজির খুব একটা নেই। এগুলো মন্দ দৃষ্টান্ত বৈকি।
নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য গঠিত স্টার্ট-আপ তহবিলের ক্ষেত্রে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেয়া চাই। অর্থ ছাড়ের ক্ষেত্রে প্রকল্প প্রস্তাব যাচাই থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ে গিয়ে উদ্যোগগুলোর সরেজমিন পরিদর্শন নিশ্চিত করতে হবে। একই ব্যক্তি নামে-বেনামে অর্থ নিচ্ছে কিনা, তা খতিয়ে দেখতেও বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। পুনঃঅর্থায়ন তহবিলটি বাস্তবায়ন হওয়ার কথা মূলত ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে। অযাচিত হস্তক্ষেপ না থাকলে তারা সাধারণত ডিউ ডিলিজেন্স বজায় রেখেই অর্থ ছাড় করে। কিন্তু রাজনৈতিক মহল ও প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ থাকলে ব্যাংকের জন্য কাজটি কঠিন হবে। নতুন তহবিল থেকে অর্থ পেতে নিশ্চয়ই অনেকে চেষ্টা-তদবির করবেন; রাজনৈতিক মহল থেকেও প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করা হবে। তবে শর্তগুলো পূরণ করে প্রকৃত উদ্যোক্তাদের কাছে অর্থ পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব ব্যাংকগুলোর। এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর সব পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বজায় রাখতে হবে। তহবিল ব্যবস্থাপনার মূল দায়িত্ব যেহেতু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের, সেহেতু ব্যাংকগুলো যথা প্রক্রিয়ায় অর্থ ছাড়ছে কিনা এবং প্রকৃত উদ্যোক্তারা অর্থ পাচ্ছেন কিনা, তার জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির তদারকি বাড়াতে হবে। স্টার্ট-আপ ফান্ডের অপব্যবহার যেন না হয়, তার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বাড়তি নজরদারি প্রয়োজন।
বাস্তবতা হলো, অন্য দেশের মতো চলমান করোনা মহামারীতে দেশের অর্থনীতি কিছুটা অভিঘাতের শিকার। গত বছরের এ সময়ে সংক্রমণ প্রতিরোধে নেয়া অঘোষিত লকডাউনে অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। অনেক মানুষ হয়ে পড়েছিল কর্মহীন। অনেকের আয়-রোজগারের পথ বন্ধ হয়েছিল। সরকার প্রণোদনা দিলেও অনেকেই এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেননি। বিশেষ করে প্রক্রিয়াগত জটিলতা ও প্রণোদনার অর্থ ছাড়ে বিলম্বের কারণে এসএমইগুলোর অবস্থা খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। এটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির চ্যালেঞ্জটি আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। এ অবস্থায় তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য স্টার্ট-আপ তহবিল গঠনের বিষয়টি সন্দেহাতীতভাবে ইতিবাচক। যথাযথভাবে কাজে লাগানো গেলে এর সুফল হবে বহুবিধ। এর মাধ্যমে সৃজনশীল অনেক উদ্যোগ ও প্রতিষ্ঠান যেমন গড়ে উঠবে, তেমনি বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে অর্থনৈতিক কর্মচাঞ্চল্য বেগবান করতে নতুন তহবিলটির ব্যবস্থাপনায় উত্তম চর্চা অনুসরণের বিকল্প নেই।










