গত অর্থবছরে দেশের জিডিপির আকার দাঁড়িয়েছে ৪১৬ বিলিয়ন ডলার আর মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৫৯১ ডলার। মঙ্গলবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য উল্লেখপূর্বক পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী এ ঘোষণা দেন। সংশ্লিষ্টদের উচিত এ অর্জন ধরে রাখতে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ এবং এর সুফল সবার কাছে পৌঁছে দেয়ার পদক্ষেপ নেয়া। মনে রাখা দরকার, জিডিপি বৃদ্ধি স্বাভাবিকভাবেই আশাপ্রদ হলেও প্রকট বৈষম্যের এ সমাজে এর সুফল সবাই পাচ্ছে না। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধির মতো সূচকে অগ্রগতি আশাব্যঞ্জক নয়। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবার মান, পরিবেশের ক্ষয় প্রভৃতি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। করোনায় বিপুলসংখ্যক মানুষের আয় কমেছে, কর্মসংস্থান হারানোর খবরও মিলছে। বিভিন্ন গবেষণায় নতুন করে বহু মানুষের দরিদ্র হওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধির সঙ্গে জীবনমানেরও উন্নয়ন প্রয়োজন, এখানে বাংলাদেশের ঘাটতি লক্ষণীয়। এক্ষেত্রে জিডিপি প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি এর বণ্টন ও জীবনমান উন্নয়নেও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। 

একসময় উন্নয়ন অর্থনীতিবিদরা মনে করতেন জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি মানেই উন্নয়ন। অনেকেই বলতেন, প্রবৃদ্ধি যত বাড়বে তত এর সুফল গড়িয়ে ওপর থেকে নিচের দিকের মানুষের কাছে যাবে। এতে নিম্ন আয়ের মানুষেরও আয় বাড়বে। অর্থনীতির ভাষায় ধারণাটিকে বলা হয় ‘ট্রিকল ডাউন থিওরি’। তবে উন্নয়নের এ ধারণা বেশ আগেই পরিত্যাগ করেছেন অর্থনীতিবিদরা। কারণ বাস্তবে দেখা যায়, প্রবৃদ্ধি যত বাড়ে, আয়বৈষম্য বাড়ে তার চেয়ে বেশি। আর তাই জিডিপি প্রবৃদ্ধি মানেই অর্থনীতির উন্নতি নয়। এমনকি প্রবৃদ্ধি বাড়লে এর সুবিধা চুইয়ে নিচে নামার যে ট্রিকল ডাউন নীতি, সেটাও ভুল প্রমাণিত হয়েছে। তবে উন্নয়ন অর্থনীতিবিদরা জিডিপিকে পরিত্যাগ করলেও অধিকাংশ রাষ্ট্র ও সরকার এখনো জিডিপি প্রবৃদ্ধিতেই থেমে রয়েছে। এর পেছনে অবশ্য কিছু কারণ আছে। যেমন প্রবৃদ্ধির সঙ্গে একটি দেশের ভাবমূর্তির সম্পর্ক রয়েছে। প্রবৃদ্ধি বাড়লে একটি দেশের ভাবমূর্তি বাড়ে বলে মনে করা হয়। দেশটির প্রতি বিনিয়োগকারীদেরও আকর্ষণ বাড়ে। এককথায় এর এক ধরনের রাজনৈতিক মূল্য আছে। আর তাই সরকারও জিডিপি প্রবৃদ্ধির কথা ব্যাপকভাবে প্রচার করে। কোনো কোনো রাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষা এতটাই প্রবল যে তারা পরিসংখ্যানের মারপ্যাঁচে জিডিপি বাড়াতে চেষ্টা করে। জিডিপি আবিষ্কারক সাইমন কুজনেতস নিজেই পরে এর দুর্বলতা নিয়ে বলেছিলেন, জিডিপি দিয়ে দেশের মধ্যে কলকারখানা, চাষের জমি কিংবা ব্যবসায় মোট কতখানি উৎপাদন হচ্ছে তা আঁচ করা যেতে পারে বটে, কিন্তু মানুষের জীবনে কী উন্নতি হলো, তার জীবনযাত্রায় কতখানি স্বাচ্ছন্দ্য এল, সে তার ছেলে-মেয়েকে ভালো স্কুলে পাঠাতে পারল কিনা বা অসুখ-বিসুখে ভালো ডাক্তার পেল কিনা, তা এ দিয়ে মাপা যায় না। এ কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ জিডিপির বিকল্প অনুসন্ধান করছে এবং অনেক ক্ষেত্রে তারা সফল হয়েছে। মানবসম্পদ উন্নয়ন সূচক, গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস, সুশাসনসহ বিভিন্ন সূচকের আবির্ভাব ঘটেছে।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো মুনাফাকেন্দ্রিক জিডিপির ধারণা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। কারণ ধনীদের হাতে আছে বিশাল পুঞ্জীভূত সম্পদ। এ বৈষম্য মাথাপিছু জিডিপির ধারণায় গোলমাল করে দিতে পারে। আবার উন্নয়নের আড়ালে যদি তা ভবিষ্যেক অন্ধকার করে দেয়, তাকেও টেকসই উন্নয়ন বলতে রাজি নন বর্তমান অর্থনীতিবিদরা। জিডিপি বেড়ে যাওয়া বা প্রবৃদ্ধি উন্নয়নের কোনো নিশ্চিত মানদণ্ড হয়ে উঠতে পারেনি, তাই অর্থনীতিবিদরা এর সংশোধন চাইছেন। ভুটান দীর্ঘদিন ধরেই জিডিপির বদলে মানদণ্ড ধরেছে ‘গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস (জিএনএইচ)’-কে। যেখানে জিএনএইচের চারটি মূল বিবেচ্য বিষয় টেকসই ও সমতাভিত্তিক উন্নয়ন, পরিবেশের সুরক্ষা, সংস্কৃতির রক্ষা ও প্রচার এবং সুশাসন। অর্থনীতিবিদরা জিএনএইচের ধারণাকে শুরুতে খুব একটা গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন বলে প্রমাণ নেই। হিমালয়ের পাদদেশে থাকা ভুটানের এ মডেলকে এখন গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে শুরু করেছেন বিশ্বের অর্থনীতিবিদরা। অনেকেই জোর দিচ্ছেন জিডিপি সংশোধন করে মানুষের স্বাচ্ছন্দ্য, প্রয়োজনীয় দ্রব্যের ক্রয় সক্ষমতা, টেকসই উন্নয়নকে অন্তর্ভুক্ত করে গ্রিন জিডিপি পরিমাপের ওপর।

উন্নয়নের বিষয়ে মূল আলোচনায় চলে আসে জীবনমান ও জীবনযাপন। জীবনমানের প্রধান নিয়ামক ভোগের স্তর। আয়-উপার্জন বাড়ার সঙ্গে ধরে নেওয়া হয় যে ভোগের স্তর এবং মান দুটিই বাড়বে। রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক পণ্য সন্তোষজনক মানের না থাকলে আয় বাড়া সত্ত্বেও নাগরিক জীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়তে পারে। তখন আয় বৃদ্ধি তার কাছে অর্থহীন হয়ে যেতে পারে। বাড়তি দুশ্চিন্তা ও অশান্তির কারণও হতে পারে। যেসব দেশে এ বিষয়গুলো উন্নত মানের, সেসব দেশে জীবনযাপন করতে মানুষ আগ্রহী হয়। যেসব দেশে তা নিম্নমানের, অসন্তোষজনক, সেসব দেশ থেকে মানুষ দেশান্তরিত হতে চায়। একটি দেশে জিডিপি বেশি হলেও যে টেকসই উন্নয়ন দুর্বল হতে পারে, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেলেও যে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবনযাত্রার মান নিম্ন হতে পারে—এ বিষয়ে অনেক গবেষণামূলক কাজ হয়েছে নানা দেশে। অমর্ত্য সেন এ বিষয় নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন, মাহবুবুল হকের সঙ্গে ‘মানব উন্নয়ন সূচক’ ধারণা প্রবর্তন করেছেন। জোসেফ স্টিগিলজসহ মূলধারার বহু অর্থনীতিবিদও অর্থনীতি পরিমাপের পদ্ধতি হিসেবে জিডিপি ব্যবহারের সার্থকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। প্রকৃতপক্ষে জিডিপি দিয়ে একটি দেশের আর্থিক লেনদেন বা বাণিজ্যিক উৎপাদন, বিতরণ, পরিষেবার বিস্তার সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। কারণ যেকোনো লেনদেন ও বাণিজ্যিক তত্পরতা বৃদ্ধিতেই জিডিপি বাড়ে। কিন্তু এজন্য সামাজিক, মানবিক ও পরিবেশগত কোনো ক্ষতি হলে তা হিসাবে বিবেচনা করা হয় না। সে কারণে এর মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বোঝা যায় না; সামাজিক ও পরিবেশগত ক্ষতি তাতে ধরা পড়ে না; অর্থনীতির গুণগত অগ্রগতিও বোঝা যায় না।

শুধু জিডিপি বাড়ানোর চেষ্টায় থাকার বিপদও রয়েছে অনেক। এতে কারখানা করতে গিয়ে উর্বর জমি দখল হতে পারে। বনজঙ্গল ধ্বংস হতে পারে। বসতবাড়ি থেকে উত্খাত করা হতে পারে অনেককে। বড় বড় প্রকল্প চালু করতে গিয়ে পরিবেশ রক্ষার চিন্তাভাবনায় ছেদ পড়তে পারে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই সব নয়; প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আরো অনেক বিষয়ে নজর দিতে হয়। জিডিপির মোহ কাটিয়ে কীভাবে ভালো থাকা যায়, সেদিকে মনোযোগ দেয়া উচিত। ভালো থাকার মানে হচ্ছে সমাজবদ্ধ হয়ে থাকা, অপরাধের হার কমানো, সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা, আয়ুষ্কাল বাড়ানো, নির্মল বাতাস, বিশুদ্ধ পানি, দূষণমুক্ত পরিবেশ আর জীবন নিয়ে ইতিবাচক মনোভাব। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে জিডিপি অনুপাতে বিশ্বের অধিকাংশ দেশের এমনকি প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ ও আফগানিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশের আনুপাতিক হারে ব্যয় কম। শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতে একদিকে জৌলুস বাড়ছে, অন্যদিকে মানুষের ওপর বোঝাও বাড়ছে। মানের দিক দিয়েও শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা অনেক পিছিয়ে। অবকাঠামো উন্নয়ন হলেও অর্থনীতিতে তার উপযোগ প্রাপ্তি ও সুযোগব্যয় নিয়ে সংশয় রয়েছে। ভুল নকশা, ভুল পরিকল্পনা আর সময় ও ব্যয় বৃদ্ধিতে উন্নয়ন আজ প্রশ্নবিদ্ধ। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জিডিপি বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, স্বনিয়োজিত মানুষের সংখ্যাই ২ কোটি ৩৬ লাখ। এসব ক্ষেত্রে কাজের কোনো স্থিরতা নেই, আয় তুলনামূলক অনেক কম, নিরাপত্তাও কম। বস্তুত বাংলাদেশের জিডিপি ও মাথাপিছু আয়ের স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধির পেছনে বড় অবদান হচ্ছে প্রবাসী আয়ের। এছাড়া আছে শিল্প ও কৃষি। অথচ এ তিন ক্ষেত্রে যুক্ত শ্রমজীবী মানুষের আয় এবং জীবনের নিরাপত্তা দুটিই ঝুঁকিপূর্ণ, অনিশ্চিত। জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে তাদের অবদান মুখ্য হলেও এতে তাদের অংশ ক্রমেই কমছে।

জিডিপি বা মাথাপিছু আয় দেশের প্রতিটি মানুষের প্রকৃত আর্থিক অবস্থার প্রতিফলক নয়। আসলে মাথাপিছু জাতীয় গড় আয় বা গড় ব্যয় দ্বারা কখনই একজন মানুষের প্রকৃত আর্থিক অবস্থার মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। গড় আয় বা এ ধরনের মূল্যায়নের ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় দরিদ্র শ্রেণীর মানুষ। জিডিপির আরেকটি দুর্বলতা আছে। এটি ক্রমবর্ধমান আয় ও সম্পদের বৈষম্য বুঝতে পারে না। প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের আয়বৈষম্য বেড়ে চলছে। উন্নয়নের ক্ষেত্রে বৈষম্যের বিষয়টি অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে।

নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ ব্যানার্জি বলেছেন, একটি দেশের টেকসই অর্থনৈতিক অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি হলো প্রান্তিক জনগণের উন্নয়ন। তিনি এ কৌশলকে ‘গোয়িং স্মল’ নাম দিয়েছেন। অর্থনীতির স্বাস্থ্য ভালো রাখতে হলে আগে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য ভালো রাখতে হবে। এক্ষেত্রে যারা উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত, তারা যদি সন্তোষজনক মজুরি পান তাহলে উৎপাদনে গতিশীলতা আসবে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি নিশ্চিত হবে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে কীভাবে সমতার অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে এখন অনেক বেশি। শুধু জিডিপি ও তার প্রবৃদ্ধির দিকে দৃষ্টি দিলে হবে না। এর সঙ্গে সঙ্গে মানুষের উপকার কতখানি হচ্ছে, তা মাপার জন্য নতুন মাপকাঠি দরকার। সঠিক মাপকাঠি না থাকলে সঠিক নীতিও তৈরি হবে না। নীতিনির্ধারকদের বরং নজর দেয়া উচিত মানুষের জীবনের সুখ, স্বাচ্ছন্দ্য, শান্তি কতটুকু বাড়ল তার প্রতি। জিডিপি দিয়ে এগুলো নির্ণয় করা যায় না। আয়বৈষম্য, দারিদ্র্য, পুষ্টি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নতি আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এসব খাতের ব্যাপারে মনোযোগী হতে হবে।