[গতকালের পর]

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ

গত বছর আগস্ট মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৪৮ বিলিয়ন ডলার, যা বর্তমানে ৪০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে এসেছে। রফতানি আয় বৃদ্ধি ও ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রবাসী আয়ে রেকর্ড প্রবৃদ্ধিতে আমাদের রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলারে উঠেছিল। ডলারের সঙ্গে টাকার অবমূল্যায়ন ও বাণিজ্যিক ব্যাংকের ডলারের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ থেকে ৭ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করে। তাছাড়া গত ১২ জুলাই এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) প্রাপ্য ১ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করা হয়েছে। উপরন্তু বর্ধিত আমদানির চাপে রিজার্ভ ৪০ বিলিয়নের নিচে নামে। তবে এতে চিন্তিত হওয়ার কারণ নেই। বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কমানোর জন্য সরকার আমদানি নিয়ন্ত্রণ করেছে। ৫০ লাখ ডলারের ঊর্ধ্বে আমদানি ঋণপত্র খোলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদনের বিধান করা হয়েছে।

রিজার্ভ নিয়ে প্রতিনিয়ত নানা আলোচনা হচ্ছে। আইএমএফের মতে, রফতানি উন্নয়ন তহবিলে (ইডিএফ) বিনিয়োগ করা ৭ বিলিয়ন ডলার, জিটিএফ ২০ কোটি ডলার, এলটিএফ ৩ কোটি ৮৫ লাখ ডলার, পায়রা বন্দরে প্রদত্ত ঋণ ৬৪ কোটি ডলার, বাংলাদেশ বিমানকে প্রদত্ত ঋণ ৪ কোটি ডলার এবং শ্রীলংকাকে প্রদত্ত ২০ কোটি ডলার বাদ দিলে প্রকৃত রিজার্ভ ৩১ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি হতে পারে। বিগত দুই মাসে ডলারের সরবরাহ স্থিতিশীল রাখার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক বিক্রীত প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার বাদ দিলে রিজার্ভের পরিমাণ আরো কমে যাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবে এ রিজার্ভে চার মাসের আমদানি ও উন্নয়ন ব্যয় নির্বাহ করা যাবে। তবে রিজার্ভে প্রতিনিয়ত বৈদেশিক মুদ্রাও আসছে। গত বছর প্রায় ৮ লাখ বাংলাদেশী নতুন করে চাকরি নিয়ে বিদেশে গেছেন। ইউরোপের দেশগুলোয় রফতানি কিছুটা সংকুচিত হলেও চীনের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ফলে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি কমবে না, বরং বাড়বে বলে আশা করা যায়।

বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি ও মন্দার হাতছানিতে পৃথিবীর বহু দেশেই রিজার্ভ কমেছে। চীনে গত সাত মাসে ২০০ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ কমে ৩ হাজার ২৫০ বিলিয়ন থেকে ৩ হাজার ৫০ বিলিয়নে দাঁড়িয়েছে। জাপানে ১০০ বিলিয়ন কমে ১ হাজার ৪০০ বিলিয়ন ডলার থেকে ১ হাজার ৩০০ বিলিয়নে নেমেছে। সুইজারল্যান্ডে কমেছে ১১০ বিলিয়ন ডলার। আগের রিজার্ভ ৯৫০ বিলিয়ন থেকে বর্তমানে ৮৪০ বিলিয়নে নেমেছে। ছয় মাস আগে ভারতের রিজার্ভ ৬০০ বিলিয়ন ডলারের ওপর ছিল, বর্তমানে তা দাঁড়িয়েছে ৫৭২ বিলিয়ন ডলারে। পাকিস্তানের বর্তমান রিজার্ভ ১৫ বিলিয়ন এবং শ্রীলংকার রিজার্ভ ২ বিলিয়ন ডলারেরও কম। কাজেই বাংলাদেশের রিজার্ভ এখনো সন্তোষজনক বিবেচনা করা যায়। সরকার যেসব ব্যয় সংকোচন, বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয়, জ্বালানি ব্যবহারে মিতব্যয়িতা শুরু করেছে তা ইতিবাচক। তবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের আমদানি অব্যাহত রেখে সম্ভাব্য জ্বালানি সংকট মোকাবেলা করতে হবে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ স্থিতিশীল না হলে দেশীয় শিল্পের উৎপাদন বিঘ্নিত হবে। যেকোনো বিশ্বমন্দায় বাংলাদেশে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও ভোগ চাহিদা বর্তমান থাকায় আমরা বিরূপ প্রভাব বোধ করিনি। এবারো সম্ভাব্য বৈশ্বিক মন্দায় আমাদের অর্থনীতি সচল রাখতে হবে।

বৈদেশিক ঋণ

বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ জিডিপির প্রায় ১৩ শতাংশ। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের ২০২২ সালের রিপোর্টে বাংলাদেশকে ঋণ পরিশোধের দিক থেকে কম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ এ পর্যন্ত বাংলাদেশ কখনো বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে বিলম্ব করেনি। অর্থ বিভাগ ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের মধ্যে যে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা বলবৎ রয়েছে এর মাধ্যমে বাজেট বরাদ্দের বিপরীতে যথাসময়ে বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর প্রাপ্য ঋণ পরিশোধিত হয়। আমাদের ঋণের ৮০ শতাংশই দীর্ঘমেয়াদি এবং স্বল্পসুদে গৃহীত। গ্রেস পিরিয়ডও বেশি। এ ঋণের ৭৫ শতাংশই সরকারের, বাকি ২৫ শতাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নেয়া। তবে ইদানীং বেসরকারি খাতে গৃহীত ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। এর জন্য সরকারকে সভরেন বন্ড দিতে হয়।

সম্প্রতি সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, বর্তমানে প্রতি বছর জিডিপির ১ দশমিক ১ শতাংশ হারে বিদেশী দায়দেনা পরিশোধ করা হয়। আগামী ২০২৬ সাল নাগাদ তা প্রায় দ্বিগুণ পরিশোধ করতে হবে। গত ১৯ জুলাই ২০২২ দৈনিক বণিক বার্তায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বিদেশী উৎস থেকে ঋণের পরিমাণ ছিল ৪৫ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২১-২২ অর্থবছরে ৯৩ দশমিক ২৩ বিলিয়নে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের বেশ ক’টি প্রকল্প যেমন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল আগামী ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ চালু হয়ে বাণিজ্যিক উৎপাদন/রাজস্ব উপার্জন করবে। সেক্ষেত্রে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। তবে এখন থেকে বড় আকারের বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে (সরকারি বা বেসরকারি) প্রকল্পের লাভ-লোকসানের হিসাব (বা আইআরআর) পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই করে নেয়া সমীচীন হবে। ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে উন্নয়ন-সহযোগীদের শর্তাদিও ভালোভাবে যাচাই করে দেখতে হবে, যাতে কঠিন শর্তের বেড়াজালে ভবিষ্যতে অসুবিধায় পড়তে না হয়।

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট

বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই জ্বালানি সংকট এখন কঠিন বাস্তবতা। একদিকে মূল্যবৃদ্ধি, অন্যদিকে সরবরাহ চেইনে বিশৃঙ্খলা—এ উভয় সমস্যায় বাংলাদেশেও জ্বালানি তেল ও গ্যাস ব্যবহারে কৃচ্ছ্রসাধন করা হচ্ছে। ডিজেলচালিত বিদ্যুৎ প্লান্ট বন্ধ রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন তেল আমদানির এলসি খুলতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় সরকার দেশব্যাপী দৈনিক ২-৩ ঘণ্টা বাধ্যতামূলক লোডশেডিং করছে। এ পরিস্থিতিতে শুধু গৃহস্থালি বিদ্যুৎ ব্যবহার নয়, বরং শিল্পোৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর প্রভাব দেশের রফতানিতে পড়তে পারে। যারা জেনারেটর বা ক্যাপটিভ পাওয়ার ব্যবহার করছে তাদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। তবে জ্বালানি তেলের দাম জুনে প্রতি ব্যারেল ১১৬ ডলার থেকে বর্তমানে প্রায় কম-বেশি ১০০ ডলারে নেমে এসেছে। সরবরাহ স্বাভাবিক হলে দাম আরো কমতে পারে।

বাজেট সহায়তা হিসেবে ঋণ গ্রহণ

২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটের খরচ নির্বাহের জন্য এবং বাণিজ্য ঘাটতি মেটানোর জন্য আইএমএফ ও জাইকার কাছ থেকে বাজেট সহায়তা হিসেবে ঋণ গ্রহণের জন্য আলোচনা চলছে। লক্ষ রাখতে হবে, এ ঋণ যেন এসএমই সহায়তা, উৎপাদনমূলক প্রকল্প এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ব্যবহূত হয়। কোনো ধরনের অনুৎপাদনশীল প্রকল্প, প্রশাসনিক ব্যয় বা ঋণ পরিশোধে যেন ব্যবহার না করা হয়। এ ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রেও শর্তাদি নির্ধারণে যৌক্তিক দরকষাকষি করা সমীচীন হবে।

রাজস্ব সংগ্রহ পরিস্থিতি

আমাদের দেশের প্রায় ৪ কোটি লোকের কর প্রদানের সামর্থ্য থাকলেও মূলত ২৫ লাখ লোক রিটার্ন জমার মাধ্যমে কর প্রদান করে থাকে এবং প্রায় ১ কোটি লোক পরোক্ষভাবে কর দেয়। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এশিয়ায় সর্বনিম্ন। এখনো কর-জিডিপি ৯ শতাংশের কাছাকাছি। আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর গড় অনুপাত ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর কর-জিডিপির গড় অনুপাত ২৬ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর কর-জিডিপি ৯-১৯ শতাংশের মধ্যে। ২০২১ সালের মধ্যে আমাদের কর-জিডিপির অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ২০৪১ সালের মধ্যে এ অনুপাত ২৪ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে। প্রতি বছর এনবিআরের রাজস্ব সংগ্রহে প্রবৃদ্ধি থাকলেও লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয় না। ২০২১-২২ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ২০০ কোটি টাকা রাজস্ব সংগৃহীত হলেও তা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২৯ হাজার ৮০০ কোটি টাকা কম।

এ অবস্থায় কর-জিডিপি অনুপাত তথা রাজস্ব সংগ্রহ বাড়াতে কর ফাঁকি রোধ করতে হবে, করদাতার সংখ্যা বাড়াতে হবে। এনবিআরের অটোমেশন দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে।

প্রত্যক্ষ কর ও ভ্যাট সংগ্রহ অটোমেশন প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করলে রাজস্ব বাড়বে। প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে এনবিআরের জনবল বৃদ্ধি করে থানা পর্যায় পর্যন্ত কর অফিস সম্প্রসারণ করতে হবে। অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহ বৃদ্ধির জন্য অতি দ্রুত সর্বাত্মক ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় দেশীয় ব্যাংক ও বিদেশী উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করতে হবে। সেক্ষেত্রে দেশের ঋণের বোঝা আরো বাড়বে।

উপরের আলোচনায় দেশের অর্থনীতির যে সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরা হলো তাতে সাবধান হওয়ার প্রয়োজন আছে, কিন্তু আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। ‘দেশের অর্থনীতি খাদের কিনারে’ কিংবা ‘শ্রীলংকার অবস্থার দিকে যাচ্ছে’ বলে যারা প্রচার করছে, তারা দেশবাসীকে অহেতুক আতঙ্কগ্রস্ত করে পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এরূপ অপপ্রচারের কারণে দ্রব্যমূল্য, বৈদেশিক মুদ্রার সঙ্গে টাকার মান এবং ব্যাংক ব্যবস্থা অস্থিতিশীল হয়ে পড়তে পারে। এ ব্যাপারে দেশবাসীকে সতর্ক থাকতে হবে। (শেষ)

 

মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া: সাবেক সিনিয়র সচিব; জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান; বর্তমানে জার্মানিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত