অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় এটি বজায় রাখলেও সাম্প্রতিক সময়ে বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যে বড় ঘাটতি দেখা দিয়েছে। রেকর্ড আমদানি প্রবৃদ্ধির সঙ্গে রেমিট্যান্সপ্রবাহ কমে যাওয়ায় এমনটি ঘটেছে। এতে ডলারের দাম ঊর্ধ্বমুখী। খুচরা বাজারে ডলারের দাম ৯২ টাকায় ঠেকেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার বিক্রি করেও বৈদেশিক মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল করতে পারছে না। পক্ষে ও বিপক্ষে মতামত থাকলেও সবাই সতর্ক পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দিয়েছেন। প্রয়োজনে হস্তক্ষেপ ও আমদানি নিয়ন্ত্রণের কথাও বলছেন অনেকে। অনেকে ডলারের মূল্য বাজারের হাতে ছেড়ে দেয়ার পরামর্শও দিয়েছেন।

আমদানি ঋণপত্র খোলা হচ্ছে বেশি, ঋণপত্র ‘সেটেল’ করা হচ্ছে বেশি। এর অর্থ ডলারের চাহিদা বাড়ছে। বিপরীতে ডলার আমদানি সেভাবে বাড়ছে না। ডলার আমদানি বাড়ে মোটামুটি তিনটি সূত্র থেকে। এক হচ্ছে রফতানি আয়। দ্বিতীয় হচ্ছে রেমিট্যান্স। তৃতীয় উৎস হচ্ছে ঋণ ও সাহায্যের টাকা এবং সেবা খাতের বৈদেশিক আয় অথবা বৈদেশিক বিনিয়োগ। চাহিদার তুলনায় ডলার সরবরাহ কম। রফতানি আশানুরূপ নয়, অর্থাৎ যেভাবে আমদানি বাড়ছে, সেভাবে রফতানি বাড়ছে না। রেমিট্যান্সপ্রবাহও আগের মতো বাড়ছে না। আবার সেবা খাতের মাধ্যমে ডলার আয়ও সেভাবে বাড়ছে না। বস্তুত বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে। কয়েক বছরের মধ্যে ‘ব্যালান্স অব পেমেন্ট’ ঘাটতি সর্বোচ্চ। এ কথাও সত্য, চলতি হিসাবে ঘাটতি মানেই তা অর্থনীতির জন্য খারাপ নয়। বিনিয়োগের জন্য মূলধনি যন্ত্রপাতি এবং উৎপাদনের জন্য কাঁচামাল আমদানি বৃদ্ধির কারণে চলতি হিসাবে ঘাটতি হলে তা নিয়ে উদ্বেগের কিছু নেই। যদি বিলাসবহুল পণ্য আনার কারণে আমদানি অনেক বেড়ে ঘাটতি তৈরি হয়, তা নিশ্চয়ই ঝুঁকি তৈরি করবে। আবার বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচার হলেও তা দুশ্চিন্তার বিষয়। এক্ষেত্রে আমদানি পণ্য যাচাই-বাছাইয়ে আরো বেশি মনোযোগ দিতে হবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বিষয়টি খতিয়ে দেখতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা ডলারের মূল্যবৃদ্ধির একটা বড় শিকার সাধারণ মানুষ। ডলারের মূল্যবৃদ্ধি মানেই হচ্ছে জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি। এরই মধ্যে আমদানি করা পণ্য ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, আদা ইত্যাদির দাম বাড়ছে। প্রকৃত মজুরি নিম্নগামী। পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। এমন বাজারে ডলারের মূল্যবৃদ্ধি মানে মূল্যস্ফীতি। সরকারের উচিত এ অবস্থায় ত্বরিত ব্যবস্থা নেয়া। আমদানির উৎসে জন্ম নেয়া মূল্যস্ফীতি হয়তো বন্ধ করা যাবে না; কিন্তু ডলারের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করে পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দেয়া যায় নিশ্চয়ই। অপ্রয়োজনীয় আমদানিও পরিহার করা যায়। প্রয়োজনীয় নয় এবং বিলাসবহুল পণ্যের আমদানি নিয়ন্ত্রণে উচ্চ শুল্কারোপসহ কিছু ব্যবস্থা নেয়া যায়।

চলতি হিসাবের ঘাটতির ভালো-মন্দ উভয় দিকই রয়েছে। উভয় দিক বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হবে। বস্তুনিষ্ঠতার সঙ্গে এর বিশ্লেষণ প্রয়োজন। লেনদেনে ভারসাম্যের চলতি হিসাবের ঘাটতি ভালোর দিকে যাচ্ছে নাকি মন্দের দিকে, অথবা এর চাপ আমাদের অর্থনীতিতে কতটা পড়ছে ইত্যাদি বিষয় বের হয়ে আসবে যৌক্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমেই। বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত এখনো শক্ত। যদিও অনেক আঘাত আসছে। ব্যাংক খাতের অস্থিরতা আমাদের অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের আঘাত নিঃসন্দেহে। এ পরিস্থিতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। আমাদের অর্থনীতির ভারসাম্যের দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এক্সটারনাল ব্যালান্স ও ইন্টারনাল ব্যালান্স। উভয় ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ মোটামুটি টেকসই অবস্থায় রয়েছে। ২০০০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ১৮ বছরের লেনদেনের ভারসাম্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পাঁচ বছর খুবই সামান্য পরিমাণ চলতি হিসাবে ঘাটতি হয়েছে। বাকি সব বছরে চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত ছিল। চলতি হিসাবের ঘাটতির পরিমাণ গুরুত্বপূর্ণ নয়, গুরুত্বপূর্ণ হলো জিডিপির অনুপাতে চলতি হিসাবের ঘাটতি কত বা দেশের রিজার্ভ দিয়ে এটি সামাল দেয়া যাবে কিনা। এখন পর্যন্ত সবকিছু নিয়ন্ত্রণে আছে। তবে ভবিষ্যতে বড় ধরনের সংকট যেন তৈরি না হয়, তা মোকাবেলার প্রস্তুতি এখন থেকেই নিতে হবে।

করোনাকাল থেকে এখন পর্যন্ত বিশ্বের প্রায় সব দেশের মুদ্রারই দরপতন হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দরপতন হয়েছিল ইউরোর। এখন এগুলো ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ওই সময়ে বাংলাদেশের মুদ্রার মান স্থিতিশীল ছিল। গত জুলাই থেকে বৈদেশিক দেনা শোধের চাপ বেড়ে গেলে টাকার দরপতন হতে থাকে। তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ থেকে ডলার ছেড়ে টাকার দরপতন ঠেকিয়েছে। ব্যাংকগুলো বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা মেটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা দিয়ে ডলার কিনছে। দাম বাড়ায় তাদের বেশি টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে। এতে ব্যাংকের টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে চলে যাচ্ছে। এ অর্থ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে অলস পড়ে থাকছে। অন্যদিকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তারল্য সংকটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা মুদ্রা ব্যবস্থাপনার ভারসাম্যহীনতার ইঙ্গিত দেয়। এ বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। রিজার্ভ ভেঙে ডলারের দাম ধরে রাখার প্রবণতা নিয়েও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। কারণ তুরস্কসহ কয়েকটি দেশ এরই মধ্যে রিজার্ভ থেকে অতিরিক্ত ডলার ব্যয় করে মুদ্রার মান ধরে রাখতে গিয়ে বিপদে পড়েছে। এখন ডলার সরবরাহ করতে না পারায় নিজস্ব মুদ্রার ব্যাপক পতন ঘটছে। বাংলাদেশের পরিস্থিতি এখনো তেমন পর্যায়ে না গেলেও সতর্কতামূলক প্রস্তুতি নেয়া চাই। করোনার প্রকোপ কিছুটা কমে আসায় জাপানসহ বিশ্বের প্রতিটি দেশেই আমদানি বেড়েছে। এতে পণ্যের দামও বেড়েছে। এছাড়া তেলের দাম, ফ্রেইট চার্জ, কনটেইনার ভাড়া ইত্যাদি বেড়ে ওঠায় আমদানি ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। এক্ষেত্রে ডলারের দাম অতিরিক্ত বাড়তে না দেয়া আবার জোর করে প্রকৃত অবস্থা থেকে অনেক নিচে রাখারও কোনো যৌক্তিকতা নেই। বাজার পর্যবেক্ষণপূর্বক ব্যবস্থা নেয়াই শ্রেয়। বাংলাদেশ ব্যাংক তেমনটিই করছে বলে প্রতীয়মান হয়। তবে বিশেষজ্ঞদের অনেকেই ডলারের দাম বাজারের হাতে ছেড়ে দেয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। এতে চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ডলারের দাম নির্ধারিত হবে। তবে এর শঙ্কাও রয়েছে। ডলারের দাম ব্যাপক আকারে বেড়ে গেলে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি বা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি ব্যাহত হবে, সেদিকেও দৃষ্টি রাখতে হবে। এক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষা করা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য কঠিন একটি কাজ। তবে এতদিন তারা যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গে এটি করে এসেছে। আগামীতেও তাই করবে বলে প্রত্যাশা।

মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক বরাবরের মতো ডলার বিক্রি করছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত ২৫০ কোটি ডলার বিক্রি করেছে বলে জানা যাচ্ছে। তবে দিন যত যাচ্ছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ডলার বিক্রির চাহিদাও বাড়ছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকদের একটি সাফল্য হলো, বৈদেশিক বিনিময় হারকে তারা স্থির রাখতে পেরেছেন। একসময় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকরা আইএমএফ টাকার প্রকৃত বিনিময় হার বের করে যে মান নির্দেশ করত, সেভাবে ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার নির্ধারণ করতেন। বর্তমানে সেই ধারা বন্ধ করে বাজারের চাহিদা ও সরবরাহের টুলস ব্যবহার করেই বৈদেশিক মুদ্রার মান নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। যখনই রফতানি কমেছে, তখনই আমদানি নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি ডলারের চাহিদা নিয়ন্ত্রণে রাখার সুবিধা দিয়েছে অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকদের। আশা করি এবারো তার ব্যতিক্রম হবে না।

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলসহ প্রায় সব পণ্যের দামই বেড়েছে। জ্বালানি তেলের কারণে জাহাজ ভাড়া বেড়েছে। আমদানি খরচের সঙ্গে এটাও যোগ হচ্ছে। বেশি দামে পণ্য আমদানি করায় বাজারে এর দাম বাড়ছে। আবার শিল্পের কাঁচামালও বেশি দামে আমদানি করতে হচ্ছে। ফলে উৎপাদিত পণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে। এদিকে প্রবাসীরা যে রেমিট্যান্স পাঠান, ডলারের দাম বাড়ায় তারা একই ডলার পাঠিয়ে এখন বেশি টাকা পাবেন। এতে তারা লাভবান হবেন। তবে এ টাকা দেখে খরচ করতে গেলে আবার ডলারের দাম বাড়ার নেতিবাচক প্রভাবের মধ্যে তাদেরও পড়তে হচ্ছে। আবার অনানুষ্ঠানিক বাজারে ডলারের বিপরীতে বেশি টাকা মিললে আনুষ্ঠানিক খাতে রেমিট্যান্সপ্রবাহ কমে যেতে পারে। আনুষ্ঠানিক বাজারে ডলারের দাম বাড়লে রেমিট্যান্সপ্রবাহও বাড়তে পারে। এ কথা সত্য, ডলারের দাম বাড়ার কারণে রফতানিকারকরা বিদেশের বাজারে মুদ্রার অবমূল্যায়নজনিত সুবিধা পাবেন। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দেশে এখন মূল্যস্ফীতির চাপ বিদ্যমান। ডলারের দাম বেড়ে গেলে মূল্যস্ফীতি আরো বেড়ে ওঠার শঙ্কা রয়েছে। বিষয়টি বিবেচনায় রেখে বৈদেশিক মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখার উদ্যোগ নিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক সেটি করছেও বটে। কিন্তু খুচরা বাজারের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিনিময় হারের ব্যবধান ৪-৫ টাকা হলে তা অবশ্যই দুশ্চিন্তার। রিজার্ভ ভেঙে বাজার স্থিতিশীল রাখা নাকি ডলারের দাম বাড়তে দেয়া হবে, এ দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় রাখতে হবে।