সমুদ্রপথে অবৈধ অভিবাসন দেশের অন্যতম বড় দুশ্চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো বৈধ প্রক্রিয়া ছাড়াই নিয়মিতভাবে এ পথে বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করছেন অভিবাসনেচ্ছুরা। এমনকি মহামারী পরিস্থিতিকে উপেক্ষা করেও ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে প্রবেশের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন অনেক বাংলাদেশী। সর্বশেষ ২৫ জানুয়ারি ইতালিতে অভিবাসন প্রত্যাশায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে সাতজন ঠাণ্ডায় নৌকাতেই মারা গেছেন বলে খবর মিলছে। অবৈধ অভিবাসনের প্রচেষ্টাকালে মারা যাওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম নয়। এর আগেও বেশ কয়েকবার এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। মাঝে মাঝেই এ ধরনের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হচ্ছে। এটা উদ্বেগজনক। এতে একদিকে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের প্রাণ বিপন্ন হচ্ছে, অন্যদিকে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। অবৈধ অভিবাসন রোধে সরকারকেই জোরালো প্রচেষ্টা নিতে হবে।

বিভিন্ন সময়ে  উদ্যোগ সত্ত্বেও অবৈধ অভিবাসন রোধ করা যাচ্ছে না। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অবৈধ পন্থায় বিদেশে পাড়ি দিচ্ছেন অভিবাসনপ্রত্যাশী বাংলাদেশী তরুণরা। মূলত দালাল ও পাচারকারীদের প্ররোচনা-প্রতারণায় ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসনের পথে পা বাড়াচ্ছেন তারা। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক কমিশনের (ইউএনএইচসিআর) তথ্যমতে, অবৈধভাবে ইউরোপে প্রবেশের শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ রয়েছে। অবৈধ অভিবাসনের ক্ষেত্রে ‘পুশ’ ও ‘পুল’ উভয় ফ্যাক্টরই কাজ করছে। দেশে চাকরিপ্রত্যাশীদের তুলনায় বাজার অনেক ছোট। তার ওপর চাকরিপ্রত্যাশীদের অনেকেই অদক্ষ কিংবা কম দক্ষ। এসব কারণে প্রতিযোগিতার বাজারে তারা জায়গা করে নিতে পারেন না। আবার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে শ্রমবাজারে বৈষম্য তো রয়েছেই। সামাজিক অস্থিরতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণেও জীবন অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। এগুলো হলো পুশ ফ্যাক্টর। আর পুল ফ্যাক্টর হলো বিদেশে উচ্চমজুরি, নিরাপদ জীবন, নাগরিক সুবিধা, সামাজিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার হাতছানি। সব মিলিয়ে বাড়ছে ঝুঁকিপূর্ণ অবৈধ অভিবাসন।

অবৈধ অভিবাসনের সঙ্গে মানব পাচারের একটা সংযোগ আছে। একে তো অর্থনৈতিক সচ্ছলতা আনার স্বপ্নে নিজেরাই মরিয়া হয়ে বাইরে যেতে চায়, আবার পাচার চক্রের প্রলোভনেও ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিতে প্রলুব্ধ হয়। কাজেই বিষয়টি শুধু দেশীয় চৌহদ্দির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর একটা আন্তর্জাতিক ব্যাপ্তি আছে। সেজন্য বৈশ্বিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে। বাস্তবতা হলো এখন পর্যন্ত অনেক মানুষের মৃত্যুর কারণ হলেও মানব পাচারকারী চক্রগুলো ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে। মূল চক্রগুলো লিবিয়া, দুবাই, তুরস্ক প্রভৃতি দেশে কার্যক্রম চালানোর কারণে তাদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না বলে খবর মিলছে। এ অবস্থায় ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহূত হওয়া দেশগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করা যায় কিনা, সেটি ভাবতে হবে। আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানো গেলে মূল দুর্বৃত্তদের ধরা অসম্ভব নয়। তার জন্য কূটনৈতিক তত্পরতা এবং সরকার টু সরকার পর্যায়ে মানব পাচারবিরোধী আলোচনা জোরদার করা প্রয়োজন।

দেশে অবৈধ অভিবাসন তথা মানব পাচার প্রতিরোধে শক্ত আইন রয়েছে। এর যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা দরকার। ২০১২ সালে আইনটি প্রণীত হলেও দুঃখজনকভাবে মানব পাচারবিষয়ক অপরাধের তদন্ত, মামলা পরিচালনা ও অপরাধীর দণ্ড দেয়ার ক্ষেত্রে অগ্রগতি সামান্য। অনেক মামলা দীর্ঘ সময় ধরে ঝুলে আছে। এসব মামলার বিচার প্রক্রিয়ায় গতি আনতে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল দাবি করছে সংশ্লিষ্টরা। এর বাস্তবায়ন জরুরি। পাচারকারীদের অপতত্পরতা বন্ধে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকেও আরো চৌকস হতে হবে। আজকাল ডিজিটাল প্রযুক্তি, ট্র্যাকিং ডিভাইস ব্যবহার করে পাচারকারী ও তাদের অবস্থান চিহ্নিত করা সহজ। এগুলোর ব্যবহার বাড়াতে হবে। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, সাগরপথ, সীমান্ত এলাকা ও দেশের সুনির্দিষ্ট কিছু জায়গাকে পাচারকারীরা ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। এসব জায়গায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর টহল বাড়াতে হবে। উপকূলে, সাগরপথে কোস্টগার্ডের নজরদারি বাড়াতে হবে। নতুন কোনো স্থানকে অপরাধীরা ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করছে কিনা, সেটি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া চাই।

অবৈধ অভিবাসনকে নিছকই আইন-শৃঙ্খলাসম্পর্কিত ইস্যু হিসেবে ভাবলে অবশ্য ভুল হবে। এর সঙ্গে মানুষের সত্যিকারের অর্থনৈতিক প্রয়োজনটিও ভীষণভাবে যুক্ত। অবৈধ অভিবাসনের দিক থেকে আন্তর্জাতিক সংস্থার তালিকায় কেন বাংলাদেশ থাকছে তার কারণ খুঁজলে প্রথমেই আসবে দেশে কর্মসংস্থানের ঘাটতি ও বেকারত্বের বিষয়টি। দেশের বিপুলসংখ্যক বেকার ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ধারণা, বিদেশে গেলে তাদের ভাগ্যের চাকা ঘুরবে। পারিবারিক সচ্ছলতা আসবে—এ বিশ্বাস নিয়ে অবৈধ পথে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদেশে পাড়ি দেয় তারা। তাদের এ বিশ্বাসকে পুঁজি করে স্বার্থ হাসিল করে পাচারকারীরা। কাজেই অবৈধ অভিবাসন বন্ধে দেশে মানুষের কর্মনিয়োজন বাড়াতেও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া চাই। আরেকটি বিষয়, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত হলেও বর্তমানে জনশক্তি রফতানি অনেকটা স্থবির অবস্থায় রয়েছে। তেমন কোনো নতুন শ্রমবাজার আমাদের অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত হয়নি। এদিকে করোনার অভিঘাতে উৎস দেশগুলোয় অর্থনীতি সংকুচিত হওয়ায় নিজস্ব শ্রমবাজারে তারা স্থানীয়দের প্রাধান্য দিচ্ছে। নতুন করে বাইরে থেকে খুব একটা কর্মী নিয়োগ করছে না তারা। অবৈধ অভিবাসন বাড়ার এটিও একটা কারণ। এটা বিবেচনায় নিয়ে নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান, বিদ্যমান শ্রমবাজারে বাংলাদেশীদের সুরক্ষা নিশ্চিতে সরকারের কূটনৈতিক তত্পরতা বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে কাজের ক্ষেত্র প্রসার করতে হবে, যাতে অবৈধ অভিবাসনে মানুষ প্ররোচিত না হয়। একই সঙ্গে অভিবাসন প্রক্রিয়ায়ও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন দরকার। আমাদের অভিবাসন প্রক্রিয়া এখনো দালালনির্ভর। বিদেশে যাওয়া কর্মীদের বেশির ভাগই রিক্রুটিং এজেন্সির নাম-পরিচয় সম্পর্কে অবগত থাকেন না। ফলে দালাল কর্তৃক সহজেই প্রতারিত হন। অনেক দিন ধরেই দালালদের নিবন্ধনের কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। বৈধভাবে নিবন্ধিত হলে দালালদের চিহ্নিত করা এবং আইনের আওতায় আনা সহজ হবে। সুতরাং বিষয়টি আমলে নেয়া জরুরি।

সমুদ্রপথে অবৈধভাবে বিদেশ গমন ঠেকাতে গত বছর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি ছাড়াও ইতালি, লিবিয়া, স্পেন প্রভৃতি দেশে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতরাও অংশগ্রহণ করেছিলেন। ওই বৈঠকে সমুদ্রপথে অবৈধ উপায়ে বিদেশযাত্রা রোধে বেশকিছু সুপারিশ প্রণয়ন করা হয়। সেসবের মধ্যে রয়েছে দুবাই থেকে বেনগাজি পর্যন্ত বাংলাদেশী নাগরিকরা যাতে সহজে যেতে না পারেন সে ব্যাপারে সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনা চালিয়ে যাওয়া, ট্রাভেল এজেন্টদের বিষয়ে মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা এবং সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর আরো জোরালো ভূমিকা রাখা, বিদ্যমান আইন কানুন ও বিধিতে সময়োপযোগী পর্যাপ্ত বিধান সংযোজন করা, মানব পাচারে জড়িত অপরাধীদের বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দ্রুত বিচারের আওতায় আনা। সরকারকেই আইন প্রয়োগ, দায়ীদের শাস্তি প্রদান ও অবৈধ অভিবাসন রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।