মেধাসম্পদ আসলে কী? সহজ করে বললে মানুষ জন্মের সময় যে মেধা নিয়ে জন্মায় তা সচেতনভাবে চর্চা ও প্রয়োগের মাধ্যমে যে সম্পদে পরিণত করা হয় তাকেই মেধাসম্পদ বলে। কাজী নজরুল ইসলাম জন্মসূত্রে লেখনীর যে মেধা নিয়ে জন্মেছিলেন তার সচেতন চর্চা ও প্রয়োগের ফলাফল হচ্ছে অগ্নিবীণা কাব্যগ্রন্থ যা কিনা মেধা থেকে মেধাসম্পদে রূপান্তরের অন্যতম উদাহরণ। মেধাসম্পদ গতানুগতিক মেধার মতো নয়, এটি স্থানান্তর বা হস্তান্তর যোগ্য নয়। মেধাসম্পদ যেহেতু ব্যক্তিসত্তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত তাই ব্যক্তির সৃষ্টিশীলতাই এ সম্পদের উৎস। পৃথিবীর সব উদ্ভাবন, আবিষ্কার, সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে মেধাসম্পদের ছোঁয়া আছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশের এ সময়ে মানুষের মৌলিক মেধাসম্পদ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। এটি শতাব্দীর উন্নয়ন ও অগ্রগতির সবচেয়ে মূল্যবান হাতিয়ার হতে পারে মানবসভ্যতার জন্য। বাংলাদেশেও আজ বুদ্ধিকেন্দ্রিক বৌদ্ধিক সম্পদের অপরিহার্যতা উপলব্ধি করার সময়ে এসেছে। তাই মেধাসম্পদকে সুরক্ষা দেয়া এখন এ যুগের দাবি। সৃষ্টিশীল ও সৃজনশীল মেধাসম্পদ অধিকার সুরক্ষায় প্রতি বছরের মতো এবারো ২৬ এপ্রিল বিশ্ব মেধাসম্পদ দিবস পালন করা হলো। এ বছরের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ‘উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতা ত্বরান্বিতকরণে নারী এবং মেধাসম্পদ’। ২০০০ সাল থেকে জাতিসংঘের বিশেষায়িত সংস্থা ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অর্গানাইজেশন (ডব্লিউআইপিও) এ দিবস উদযাপন শুরু করেছিল। দিবসটি সবার মধ্যে উদ্ভাবনী এবং সৃজনশীলতাকে উৎসাহিত করতে এবং মেধাসম্পদের স্বত্ব অধিকার সুরক্ষায় (আইপির) প্রচার ও সচেতনতা তৈরিতে কাজ করে। এছাড়া মেধাসম্পদের স্বত্বের গুরুত্ব এবং উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতার প্রচার, প্রসার সম্পর্কে বিশ্ববাসীর কাছে সচেতনতা বাড়াতেই মূলত প্রতি বছর বিশ্ব মেধাসম্পদ দিবস পালিত হয়। বাংলাদেশেও দিবসটি কেন্দ্র করে শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর (ডিপিডিটি) নানা কর্মসূচি আয়োজন করে।
সভ্যতার অন্যতম চালিকাশক্তি মেধাসম্পদ। তবে এ মেধাসম্পদের অধিকার অর্থাৎ মেধাস্বত্ব সম্পর্কে আমাদের স্পষ্ট ধারণা ও সচেতনতার অভাব রয়েছে। মেধাসম্পদের অধিকারই হচ্ছে মেধাস্বত্ব, ইংরেজিতে একে বলা হয় (আইপিআর) ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস। মেধাস্বত্বের ইংরেজি পরিভাষা ‘কপিরাইট’ বলতে আক্ষরিক অর্থে কোনো মৌলিক সৃষ্টির ‘অনুলিপি তৈরির অধিকার’ বোঝায়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এ অধিকারগুলো সীমিত সময়ের জন্য সংরক্ষিত থাকে। সৃষ্টিশীল, বুদ্ধিবৃত্তিক কিংবা শিল্পের বিভিন্ন কাজের এক বড় পরিব্যাপ্তিতে মেধাস্বত্ব থাকতে পারে বা হওয়া সম্ভব। যেমন কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক এবং অন্যান্য সাহিত্যকর্ম, চলচ্চিত্র, নৃত্যবিন্যাস, সুর, সংগীত, ধারণকৃত শব্দ, চিত্রকর্ম, অঙ্কন, মূর্তি বা প্রতিকৃতি, আলোকচিত্র, সফটওয়্যার, পত্র-পত্রিকা, ম্যাগাজিন, বই, বেতার ও টেলিভিশনের সরাসরি ও অন্যান্য সম্প্রচার এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে শিল্প-নকশা অর্থাৎ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিজাইনের মধ্যে অন্তর্গত। মেধাস্বত্ব কপিরাইট দিয়ে মেধাসম্পদের ওপর নির্মাতার নৈতিক ও আর্থিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এর ফলে সেই মেধাসম্পদের পুনরুৎপাদন, বিক্রি, বাজারজাত, লাইসেন্স প্রদান এবং জনসমক্ষে প্রদর্শনীর ক্ষেত্রে নির্মাণকারী ব্যক্তি একচ্ছত্র অধিকার লাভ করেন। মূলত বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন খাতে, বিশেষ করে প্রযুক্তি খাতে মেধাসম্পদ অধিকার ও তা সংরক্ষণের ব্যবস্থা সঠিকভাবে করতে পারলে নতুন উদ্ভাবন ও নির্মাণশৈলী আগামী বিশ্ববাজারের দেশের অর্থনৈতিক অবস্থান ও বিশ্বদরবারে নতুন পরিচয় তৈরি হবে। এ জাতির মেধাসম্পদভিত্তিক অর্থনীতির গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে মার্কিন ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, লেখক ও নিউইয়র্ক সিটির সাবেক মেয়র মাইকেল ব্লুমবার্গ বলেন, ‘দ্য ক্রিয়েটিভ ইকোনমি ইজ ওয়ান অব দ্য মোস্ট পাওয়ারফুল ইঞ্জিনস অব গ্রোথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, অ্যান্ড ইট ক্যান সার্ভ অ্যাজ এ পাথ আউট অব পভার্টি ফর কান্ট্রিজ ইন দ্য ডেভেলপিং ওয়ার্ল্ড। বাট ইন অর্ডার ফর দিস টু হ্যাপেন, দেয়ার মাস্ট বি স্ট্রং অ্যান্ড এফেকটিভ প্রটেকশনস ফর ইন্টেলেকচুয়াল প্রপারর্টি’। এই জন্যই মেধাসম্পদকে আইন ও নিয়ন্ত্রণ সংস্থার মাধ্যমে যথাযথভাবে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। তার সঙ্গে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বাড়াতে হবে যাতে করে মেধাসম্পদ তৈরি ও বিকাশের প্রকৃত পরিবেশ থাকে।
সৃষ্টিশীল ও সৃজনশীল ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম, সেজন্যই এ বছর ডব্লিউআইপিও ঠিক করেছে, তারা বিশ্বজুড়ে নারী উদ্ভাবক, নির্মাতা এবং উদ্যোক্তাদের ‘আমরা পারব’ মনোভাবকে উৎসাহিত করতে এবারের দিবস উদযাপন করছে। এ বছর মূলত মেধাসম্পদে নারীর গুরুত্ব ও ভূমিকার প্রতি আলোকপাত করা হয়েছে। আসলে মেধাসম্পদ বলতে পেটেন্ট, ট্রেডমার্ক ও কপিরাইটের মতো আইন দিয়ে সুরক্ষিত অদৃশ্য সম্পদকে বোঝায়। এতে আইনি সুরক্ষা নির্মাতা ও উদ্ভাবকদের তাদের আইডিয়া ও সৃষ্টিকর্ম থেকে উপকৃত হওয়ার সুযোগ করে দেয়, তাদের উদ্ভাবন সংরক্ষণ ও সামনে এগিয়ে নিতে সাহায্য করে, সেই সঙ্গে তাদের আগামীতে আরো উদ্ভাবনী ও সৃষ্টিশীল কাজ করার জন্য অনুপ্রেরণা দিয়ে থাকে। আমাদের দেশে মেধাসম্পদের অধিকার ও তা সুরক্ষার ব্যবস্থা সঠিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হলে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আসা ত্বরান্বিত হবে। কারণ এক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা নিশ্চিত থাকবেন যে তাদের বিনিয়োগ ফলাফল মেধাস্বত্বের আইন দিয়ে সুরক্ষিত থাকবে।
এ বছর বিশ্ব মেধাসম্পদ দিবসের প্রতিপাদ্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। কারণ ঐতিহাসিকভাবে মেধাসম্পদের ক্ষেত্রে নারীদের প্রতিনিধিত্ব কম। ডব্লিউআইপিওর দেয়া তথ্য মতে, বিশ্বব্যাপী সব উদ্ভাবকের মধ্যে নারী উদ্ভাবক ৩০ শতাংশেরও কম এবং বিশ্বব্যাপী দায়ের করা পেটেন্ট আবেদনের মধ্যে মাত্র ১৩ শতাংশ নারীদের। নারীদের জন্য মেধাসম্পদ প্রয়োগের সুযোগ ও মেধাস্বত্বের অধিকার সুরক্ষিত এবং সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারলে আমরা উদ্ভাবন এবং সৃজনশীলতার একটি নতুন তরঙ্গ উন্মোচন করতে পারি যার উপকার সমাজের প্রত্যেকে পাবে।
মেধাসম্পদ অধিকারের ক্ষেত্রে নারীদের সমর্থনের অন্যতম একটি উপায় হলো নেতৃত্বের পদে নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো। নারীদের অংশগ্রহণ কম হওয়ায় ও নেতৃত্বে তাদের অনুপস্থিতি তাদের উদ্ভাবনী ও নির্মাতা সত্তাকে পিছিয়ে রেখেছে। নারীদের মেধাসম্পদ অধিকারের ক্ষেত্রে সমর্থনের আরেকটি উপায় হলো, মেধাসম্পদের আইনি জটিল পথে নারীদের এগিয়ে যেতে সহায়তার জন্য মেন্টরশিপ ও রিসোর্স সরবরাহ করা। এর মধ্যে প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম, নেটওয়ার্কিং ইভেন্ট এবং মেন্টরশিপের ব্যবস্থার সুযোগও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
বহু দেশ মেধাসম্পদের মাধ্যমে উদ্ভাবন এবং সৃজনশীলতার সুরক্ষা ও প্রচারের জন্য সফলভাবে কাজ করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য দেশগুলো হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, জার্মানি ও যুক্তরাজ্য। এসব দেশে বৌদ্ধিক বা মেধাসম্পদ সুরক্ষিত রাখার জন্য শক্তিশালী আইনি কাঠামো রয়েছে, যার মধ্যে পেটেন্ট, ট্রেডমার্ক, কপিরাইট এবং বাণিজ্য গোপনীয়তা নকশা-নথি আইন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল প্রপার্টি রাইটস ইনডেক্সের তথ্য মতে, মেধাসম্পদের মেধাস্বত্ব অধিকার রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্ব দিচ্ছে। তাদের স্কোর ৭ দশমিক ৫৬৬। যুক্তরাষ্ট্রের আইপিআর সঠিক প্রয়োগের জন্য তাদের সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা রয়েছে, যা তাদের মেধাস্বত্ব আইন লঙ্ঘন প্রতিরোধ এবং মোকাবেলায় সহায়তা করে আসছে।
অন্যদিকে এটি মনে রাখা জরুরি যে মেধাসম্পদ অধিকার কেবল সৃষ্টিকারী নির্মাতা ও উদ্ভাবকদের অধিকার রক্ষার জন্য নয়। এটি মেধাসম্পদ থেকে প্রাপ্ত সুবিধাগুলোকে ন্যায্যতা এবং সমতার মাধ্যমে ভাগ করে নেয়ার বিষয়টিকেও নিশ্চিত করে থাকে। এর সঙ্গে নতুন পণ্য, পরিষেবা ও প্রযুক্তির বিকাশের পথে অবদান রেখে থাকে। বর্তমান এ আধুনিক যুগে মেধাসম্পদ নিয়ে করা কপিরাইট, ট্রেডমার্ক, পাইরেসি, ডিজিটাল প্লাটফর্মে কপিরাইট সংরক্ষণ, রয়্যালটি আদায় এবং ব্রডকাস্টিং অর্গানাইজেশন থেকে ট্রান্সমিশন এবং রিট্রান্সমিশন সঠিকভাবে নিশ্চিতকরণে অতিগুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশে মেধাসম্পদ অধিকারের বর্তমান অবস্থা জনসচেতনতার অভাবে খুব বেশি আশাব্যঞ্জক নয়। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে মেধাসম্পদের প্রচার ও সুরক্ষার জন্য উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। যেমন বাংলাদেশ পেটেন্ট আইন, ২০২২ এরই মধ্যে সংসদে পাস হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ শিল্প নকশা আইন-২০২২ প্রণয়নের কাজ চলছে। ট্রেডমার্ক আইন, ২০০৯ সংশোধন করে ট্রেডমার্ক আইন, ২০১৫ করা হয়েছে। ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (নিবন্ধন ও সুরক্ষা) আইন, ২০১৩ ও বিধিমালা ২০১৫ প্রণয়ন করা হয়েছে যা আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এছাড়া জামদানি, ইলিশ, ঢাকাই মসলিনসহ মোট ১১টি পণ্য ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে নিবন্ধিত করা হয়েছে। বগুড়ার দই, বাংলাদেশের শীতলপাটি, শেরপুরের তুলসীমালা ধান, চাঁপাইনবাবগঞ্জের আশ্বিনা ও ল্যাংড়া আম ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে নিবন্ধনের জন্য জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া আরো ১৯টি পণ্য নিবন্ধনের জন্য প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তবে এখনো বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা প্রয়োজন। প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে একটি হলো, মেধাসম্পদ অধিকার সম্পর্কে সাধারণ জনগণ ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে সচেতনতার অভাব রয়েছে। আর মেধাসম্পদ বিকাশের জন্য পরিবেশের ঘাটতি রয়েছে আমাদের দেশে।
বাংলাদেশের জন্য উদ্ভাবন, সৃজনশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন সুযোগ তৈরি করতে পারে যদি মেধাসম্পদ অধিকার অর্থাৎ মেধাস্বত্বের সুরক্ষাকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করে আমরা যথাযথ পদক্ষেপ নিতে পারি। জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় মেধাসম্পদের সুরক্ষায় দেশীয় উদ্ভাবক ও উদ্ভাবনের প্রসার ঘটাবে। যেহেতু একবিংশ শতাব্দীর সমৃদ্ধির চাবি মেধাবান মানুষের হাতে, তাই আমাদের জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে পরিকল্পিত জ্ঞান অনুশীলন, প্রশিক্ষণ, গবেষণার মাধ্যমে বাংলাদেশকে মেধাস্বত্ববান জাতিতে পরিণত করতে হবে।
মো. আবিদ মঈন খান: সাংবাদিক










