আগামী অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার প্রস্তুতি পর্বে অর্থ মন্ত্রণালয় অংশীজনদের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক আয়োজন করছে নিয়মিত। এমন একটি বৈঠকে অর্থনীতিবিদরা প্রণোদনা প্যাকেজ সম্প্রসারণ ও মেয়াদ বৃদ্ধির পাশাপাশি বেশকিছু পরামর্শ দিয়েছেন করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি চাঙ্গা রাখতে। ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের হাতে নগদ অর্থ প্রদানের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। গেল বছরের বাজেটে করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে শিল্প খাতে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণাসহ দরিদ্র ও কর্মহীন মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। সরকারের সেসব সিদ্ধান্ত ছিল সময়োপযোগী ও যথাযথ। এসব নীতি সহায়তার কারণে ব্যবসায়ীরা ক্ষতি কাটিয়ে কিছুটা ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু নতুন করে সংক্রমণ আবারো বেড়ে ওঠায় তারা বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। দ্রুত কমছে উৎপাদনশীলতা। অন্যদিকে মানুষের আয় ক্রমেই কমতে থাকায় অভ্যন্তরীণ বাজারও সংকুচিত হচ্ছে। ফলে অনেক শিল্পই নতুন করে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। এ অবস্থায় করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত প্রণোদনার পাশাপাশি নীতি সহায়তা অব্যাহত রাখা জরুরি। এসএমই শিল্পকে চাঙ্গা করতে সরকার প্রণোদনা ঘোষণা করেছিল, কিন্তু নানা জটিলতায় সেটি পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। দারিদ্র্যদের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থও ত্রুটিপূর্ণ তালিকার কারণে প্রদান করা যায়নি বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে, যা কাম্য নয়।

করোনার প্রাদুর্ভাবে দেশের ছোট-বড় সব উদ্যোক্তা কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অনেক মানুষ কাজ হারিয়ে শহর ছেড়ে গ্রামে যেতে বাধ্য হয়েছেন। অর্থনীতিবিদদের মতে, পুঁজি বেশি বলে বড় উদ্যোক্তারা সহজে প্রাকৃতিক কিংবা মানবসৃষ্ট ধকল কাটিয়ে উঠতে পারেন। পুঁজি কম বিধায় ছোট উদ্যোক্তাদের প্রাথমিক ধকল কাটিয়ে ওঠাই কঠিন হয়ে পড়ে। সেক্ষেত্রে ঋণ বা প্রণোদনা প্রয়োজনটা তাদেরই বেশি। অথচ সরকারের প্রণোদনা ঋণের বেশির ভাগই পেয়েছেন বড় উদ্যোক্তা বা প্রতিষ্ঠান। এক্ষেত্রে অবকাঠামোগত সমস্যা যেমন আছে, তেমনি আছে ব্যাংকের বড়দের প্রতি পক্ষপাতও। সর্বব্যাপ্ত করোনা দুর্যোগে দেশের অর্থনীতির সব খাত যখন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, তখন তাতে গতি ফেরাতে ব্যবস্থাও হতে হবে সর্বব্যাপ্ত। কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প যদি ঘুরে দাঁড়াতে না পারে, তাহলে শুধু বৃহৎ শিল্প দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দেয়া কঠিন হবে বৈকি। কেবল বড়দের নয়, ছোটদের মনোবল বাড়ানোও এক্ষেত্রে সমান জরুরি। এও ভুলে যাওয়া চলবে না, প্রণোদনা প্যাকেজের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও অর্থায়ন যতটা গুরুত্বপূর্ণ, এর সুচারু বাস্তবায়ন তার চেয়ে বেশি জরুরি। বিশেষত প্রণোদনার অর্থ প্রকৃত প্রাপকের হাতে পৌঁছানোর বিকল্প নেই। আমাদের দেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতা কেবল নয়, রাজনৈতিক সংস্কৃতিও এক্ষেত্রে বিবেচনায় রাখতে হবে। কৃষিঋণ পেতেও কৃষকরা একই রকম ভোগান্তিতে আছেন। ছোট উদ্যোক্তাদের ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে আরেকটি সমস্যা হলো তথ্যের ঘাটতি। বড় উদ্যোক্তাদের ঋণের প্রয়োজনীয়তা কেউ অস্বীকার করছে না। রফতানির বাজার ফিরে পেতে এসব শিল্প নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু অধিক শ্রমশক্তিনির্ভর ছোট উদ্যোক্তাদেরও রক্ষা করতে হবে।

বাংলাদেশ মানে শুধু শহরাঞ্চল নয়। এখনো সিংহভাগ মানুষ গ্রামে বাস করে। গ্রামের অর্থনীতি চাঙ্গা করা এবং কর্মসংস্থান বাড়ানোর প্রতিই সরকারকে অধিক মনোযোগী হতে হবে। একথা ঠিক যে করোনাকালে শহর ও গ্রামাঞ্চল উভয়ের অর্থনীতি ও জনজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের ছোট ছোট শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উদ্যোক্তারা বিপাকে পড়েছেন। এ অবস্থায় গ্রামাঞ্চলের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সরকার যে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল, তা ছিল বাস্তবমুখী পদক্ষেপ। প্রণোদনা পেলে বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানার মালিক বা অন্য উদ্যোক্তারা ফের উৎপাদনে যেতে পারবেন। গ্রামে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বরাদ্দের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ বিতরণ করা হয়নি। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানোর লক্ষ্যে শতভাগ বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধীদের সহায়তার জন্য ৮১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও বিতরণ করা হয়েছে মাত্র ২৩ কোটি টাকা। লক্ষ করা যাচ্ছে, যেসব প্যাকেজের আওতায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বেশি উপকৃত হতে পারে, সেসব প্যাকেজের বিপুল পরিমাণ অর্থ বিতরণ করা সম্ভব হয়নি। 

করোনায় কর্মহীন দরিদ্র মানুষকে খাদ্যসহায়তা দিতে আড়াই হাজার কোটি টাকার প্যাকেজের মধ্যে বিতরণ বাকি আছে ১ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকা। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বাইরে করোনায় ক্ষতিগ্রস্তদের নগদ আড়াই হাজার টাকা করে দেয়ার জন্য বরাদ্দকৃত ১ হাজার ২৫০ কোটি টাকার প্যাকেজের ৩৭৮ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়নি। এ চিত্র হতাশাজনক। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি দেশে মোট দারিদ্র্যের ৩৩ শতাংশ যুক্ত করতে পারছে। কভিড-১৯-এ অনেকে কর্মহীন হয়েছে। তাদের প্যাকেজ সহায়তার আওতায় আনতে হবে। গরিবদের খাদ্যসহায়তা আরো বাড়াতে হবে। স্বাস্থ্য খাতের সুবিধা বাড়াতে হবে। শুধু প্রণোদনা প্যাকেজ দিলেই নিশ্চিত হয়ে বলা যাচ্ছে না, সরকারের সহায়তা আসলে জায়গামতো পৌঁছাচ্ছে কিনা, বরং সুষ্ঠু বিতরণ প্রক্রিয়া এখানে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান সংকট মোকাবেলায় জনগণের দুর্ভোগ কমানোয় প্রণোদনার কার্যকারিতাকে মাপকাঠি হিসেবে ধরলে নিশ্চয়ই এখানে সামাজিক সুরক্ষার জন্য সুনির্দিষ্ট প্যাকেজটি সময়মতো বাস্তবায়ন হতো। মালয়েশিয়াসহ অনেক দেশের সরকার একটি নম্বর দিয়েছিল। করোনার কারণে নতুন করে যারা চাকরি হারিয়েছেন, তারা নিজেরাই প্রদত্ত নম্বরে যোগাযোগ করে চাকরি হারানোর কথা সরকারকে জানিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়ে সরকার চাকরি হারানোদের আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। বাংলাদেশও এ ধরনের উদ্যোগ নিতে পারে। বাংলাদেশের কর্মসংস্থানের একটি বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। এদের সুরক্ষা প্রদানে নগদ অর্থসহায়তার উদ্যোগ নিতে পারে। করোনার প্রভাব প্রায় প্রতিটি খাতেই কমবেশি পড়েছে। এক্ষেত্রে তাই প্রণোদনার বণ্টনও হওয়া উচিত ক্ষতিগ্রস্তের পরিমাণ ও সক্ষমতা অনুযায়ী। যারা অপেক্ষাকৃত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের সহায়তা দিতে হবে দ্রুত। গবেষণায় দেখা গেছে, নগদ অর্থসহায়তা প্রদান ব্যয়সাশ্রয়ী ও অধিক কার্যকর। সরকারও উদ্যোগ নিয়েছে দরিদ্র ও ক্ষতিগ্রস্তদের নগদ সহায়তা প্রদানের। করোনার এবারের ধাক্কা সামলাতে তাই অতীত অভিজ্ঞতা বিবেচনায় রেখে পদক্ষেপ নেয়া হোক।