অপুষ্টিতে ভুগছে দেশের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক জনগোষ্ঠী। সুষম খাবারের ঘাটতি রয়েছে ৫০ শতাংশেরও বেশি জনসংখ্যার। ভিটামিন ‘এ’, ক্যালসিয়াম, জিঙ্ক ও আয়রনের অভাব অন্যতম। পাঁচ বছরের কম বয়সী ৪১ শতাংশ শিশু জিঙ্কের অভাবে ভুগছে, প্রায় ৩৬ শতাংশ শিশু খর্বকায়। ১৫-১৯ বছর বয়সী মেয়েদের প্রায় ৪৪ শতাংশ অপুষ্টির কারণে বেঁটে বা লম্বায় কম। বিদ্যমান পুষ্টি পরিস্থিতি উন্নয়নে বায়োফর্টিফায়েড জিঙ্কসমৃদ্ধ বেশ কয়েকটি ধানের জাত উন্মুক্ত করেছে সরকার। কিন্তু সচেতনতার অভাবসহ নানা কারণে কৃষক ও ভোক্তার কাছে এ চাল কাঙ্ক্ষিত জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেনি। সরকার জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট ও লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে মিল রেখে ২০৩০ সালের মধ্যে দারিদ্র্য ও ক্ষুধার অবসান এবং উন্নত পুষ্টি অর্জনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। জিঙ্কসমৃদ্ধ চালের উৎপাদন ও বাজার সম্প্রসারণের লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হতে পারে। তবে তার জন্য বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সর্বোপরি জাত সম্প্রসারণে সরকারের সহায়তা আরো বাড়াতে হবে।

ভাত বাংলাদেশের মানুষের প্রধান খাদ্য। এ দেশের মানুষের ৭৭ শতাংশ ক্যালরি ও ৫০ শতাংশ প্রোটিন আসে ভাত থেকে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পুষ্টির অধিকাংশ ক্যালরি, প্রোটিন ও খনিজ উপাদান আসে ভাত থেকে। ফলে চালের মাধ্যমে প্রতিটি মানুষের পুষ্টির জোগান নিশ্চিত করার উদ্যোগটি গুরুত্বপূর্ণ। জিঙ্কসমৃদ্ধ ধানের জাত আবিষ্কার করা হয়েছে বটে, তবে তা মাঠ পর্যায়ে বিস্তৃত পরিসরে সম্প্রসারণ করা সম্ভব হয়নি। দেশব্যাপী এ ধানের বীজ নিশ্চিত করা যায়নি। বীজের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা মসৃণ করা প্রয়োজন। আবার অনেকে এ চাল সম্পর্কে যথাযথ ওয়াকিবহাল নন। জনগণের মধ্যে সচেতনতাও তৈরি করতে হবে। সবচেয়ে ভালো হয় জিঙ্ক চাল হিসেবে একে ব্র্যান্ডিং করলে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, মিনিকেট বলে কোনো ধানের জাত না থাকলেও বাজারে এ চাল সয়লাব। ব্রি ধানের বিভিন্ন জাতকে পলিশ, সাদা, সর্টিং ইত্যাদি করে মিনিকেট বা নাজির নামে বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। ভোক্তারাও এসব জাতের চাল বেশি দামে কিনে দুভাবে প্রতারিত হচ্ছেন। প্রথমত, বেশি দাম এবং দ্বিতীয়ত, ভিটামিন ও খনিজহীন শর্করাবিশিষ্ট চাল। চাল ছাঁটাই ও পলিশ করলে এর ভিটামিন ও খনিজ উপাদান প্রায় সবটাই নষ্ট হয়ে যায়। গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব জাতের চাল বাজারে ভিন্ন নামে বিক্রি হওয়ায় তারা পরিশ্রমের স্বীকৃতি পাচ্ছে না। সচেতন ভোক্তারা বাজারে তাদের চাহিদামতো পুষ্টি উপাদানসমৃদ্ধ চাল খেতে পারছেন না। এসব সমস্যার আশু সমাধান দরকার। বিশেষজ্ঞরা চাল নিয়ে প্রতারণা বন্ধে নতুন আইন তৈরির কথা বলেছেন। মিলার ও ভোক্তা উভয়ের এ ব্যাপারে দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশিত।

দক্ষিণ আফ্রিকার দেশ ঘানায় স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত অর্গানিক ধানের পরিমাণ অপ্রতুল ছিল। ফলে সরকারিভাবে প্রচুর চাল আমদানি করতে হতো। উৎপাদনের মাত্র ২০ শতাংশ চাল শহর এলাকার জনগণ খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করত। কারণ শহর এলাকার লোকজনের আমদানীকৃত চালের প্রতি আকর্ষণ ছিল। ফলে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত অর্গানিক ধানের কৃষকরা চাল বিক্রি করতে সমস্যায় পড়তেন। এ সমস্যা দূরীকরণের জন্য সরকার একটি আপস্কেলিং প্রোগ্রাম হাতে নেয়; যার মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত অর্গানিক ধানের উৎপাদন এবং পরিভোগ বাড়ানো যাবে। ফলে দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে। এজন্য তারা চাল বাণিজ্যের মূল চাবিকাঠি এবং ভোক্তার পছন্দের বিষয়টি বিশদভাবে বিশ্লেষণ করে ধাপে ধাপে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়। পাশাপাশি এ চালের উৎপাদন, জোগান, ব্যবহার ও পরিভোগ নিশ্চিত করে। ফলে কৃষকদের আয় বাড়ানো এবং খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। 

প্রধানমন্ত্রীর ‘খাদ্যের মাধ্যমে পুষ্টির জোগান’ স্লোগান সামনে রেখে কৃষি বিজ্ঞানীরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। ফলে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ছয়টি জিঙ্কসমৃদ্ধ ধানের জাত, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট একটি ধানের জাত এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট একটি জিঙ্কসমৃদ্ধ গমের জাত উদ্ভাবন করেছে। পুষ্টিসমৃদ্ধ ধানের চাষ করে যেমন কৃষকরা নিজেরা উপকৃত হতে পারেন, তেমনি অর্থনৈতিকভাবেও লাভবান হতে পারেন। এজন্য প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা। অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য এসব ধানের বাজারজাত প্রক্রিয়া নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে এবং বিজ্ঞানসম্মতভাবে করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ চীনে ধানের ব্র্যান্ডিং কৌশল অনুসরণ করে চাইনিজ চালকে উচ্চমূল্যের পণ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তার পরও কিছু কৌশল অবলম্বন করা কঠিন হয়ে পড়ে। যেমন দেশজুড়ে চাল উৎপাদনকারীর সঙ্গে বাজারের সম্পর্ক গড়ে তোলা, স্থানীয়ভাবে চাল সংগ্রহ কেন্দ্র স্থাপন করা, খাদ্য প্রদর্শনের জন্য উপযুক্ত পরিবার বাছাই করা, স্কুল, হাসপাতাল, জেলখানার খাবারের তালিকায় পছন্দের চাল সরবরাহ নিশ্চিত করা, প্রয়োজন অনুযায়ী চাল পুরো বছর সরবরাহ নিশ্চিত করা ইত্যাদি। পুষ্টিসমৃদ্ধ চালের বাজার এবং প্রচার পরিকল্পনা তৈরির উদ্দেশ্য হলো পুষ্টিসমৃদ্ধ চালের উৎপাদন বাড়ানো, মার্কেটে সহজলভ্যতা বাড়ানো, দেশের সব অঞ্চলে চাহিদা বাড়ানো, ক্যাটারিং এবং পাবলিক ইনস্টিটিউশন যেমন স্কুল, হাসপাতালের মেনুতে পুষ্টিসমৃদ্ধ চাল রাখার পাশাপাশি অপুষ্টি থেকে জনগণকে রক্ষার জন্য পুষ্টিসমৃদ্ধ চালের বাজার তৈরি করা যেতে পারে। সচরাচর ব্যবহূত চালের পরিবর্তে পুষ্টিসমৃদ্ধ চাল গ্রহণে উৎসাহিত করা এবং এ চালের খাদ্যগুণ, স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুবিধাগুলো সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো উদ্যোক্তা কৌশলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অন্যান্য পণ্যের মতো চালের ব্র্যান্ডিংয়ের ওপর খুব একটা গবেষণা হয়নি। বেশির ভাগ গবেষণা হয়েছে ভোক্তার সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার ওপর। অতীত গবেষণা থেকে দেখা যায়, ভোক্তার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—ভোক্তা পণ্য কেনার ব্যাপারে বিবেচনা করে প্রথমত, কতটা নিরাপদ, স্বাদ কী রকম, চালের আকৃতি কেমন, ধানের আকার কী রকম, দাম কত এবং কী ব্র্যান্ডের। চাহিদা অনুযায়ী গুণগত মানসম্পন্ন হলে উচ্চমূল্য দিতে তারা কার্পণ্য করেন না। চালের ব্র্যান্ডিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভোক্তারা বাজারে প্রচলিত পণ্যগুলোর সঙ্গে তুলনা করেন। ফলে তারা পণ্যের মধ্যে পার্থক্যগুলো যাচাই করেন। বর্তমানে চাল উৎপাদনকারী ও ভোক্তা উভয়ের জন্যই চালের ব্র্যান্ডিং করাটা জরুরি। চাল উৎপাদনকারীর ক্ষেত্রে চালের উদারনীতি ও এর বণ্টন চালের মূল্য কমিয়ে দেয়, পক্ষান্তরে চালের ব্র্যান্ডিংয়ের মূল্য বাড়িয়ে দেয়। যাহোক, ভোক্তার জন্যও চালের ব্র্যান্ডিংয়ের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। প্রথমত, ক্ষুধা নিবারণের জন্য ভোক্তার চালের প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে ভোক্তার আরো কিছু প্রয়োজন, যেমন চালের কার্যকারিতা, নিরাপত্তা এবং গুণাগুণের ভিন্নতা। চাল উৎপাদনকারী ও ভোক্তা উভয়ের জন্য চালের গুণাগুণ বিশ্লেষণের জন্য ব্র্যান্ডিংয়ের প্রয়োজন। কৃষকের আয় এবং খাদ্য ও পুষ্টির নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের নীতিমালা নির্ধারণের ক্ষেত্রে, বাণিজ্য ও ভোক্তার পছন্দের বিষয় তথা চালের উৎপাদন, ব্যবহার ও গ্রহণ বিশদভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে।

পুষ্টিসমৃদ্ধ চাল উৎপাদনে কৃষকদের প্রণোদনা দেয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি এর চাহিদা বৃদ্ধিতে প্রচারণাও বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে মিলার ও কোম্পানিগুলো বড় ভূমিকা রাখতে পারে। পুষ্টিসমৃদ্ধ ধান থেকে পুষ্টিসমৃদ্ধ চালের রূপান্তর প্রক্রিয়া নির্দিষ্ট করতে হবে। মিলিংয়ের মাধ্যমে চালের পুষ্টিগুণ সর্বোচ্চ সংরক্ষণের জন্য কোন প্রক্রিয়া অবলম্বন করতে হবে তা স্থির করতে হবে। সব তথ্য দৃষ্টিনন্দন প্যাকেজিংয়ের মাধ্যমে ব্র্যান্ডিং প্রক্রিয়ায় জনগণের জন্য উন্মুক্ত করা হলে একদিকে ভোক্তার অধিকার সংরক্ষিত হবে, অন্যদিকে কৃষকরা কাঙ্ক্ষিত মূল্যের বিনিময়ে আর্থিকভাবে লাভবান হবেন। বাংলাদেশে এখনো ব্রি উদ্ভাবিত পুষ্টিসমৃদ্ধ কোনো ধান তথা চালের ব্র্যান্ডিং হয়নি। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রটোটাইপ ব্র্যান্ডিং উন্নয়নের ওপর গবেষণালব্ধ ফলাফল লক্ষ করতে পারে। থাইল্যান্ডে প্রান্তিক চাষীদের উৎপাদিত চালের টেকসইয়ের জন্য প্রটোটাইপ ব্র্যান্ডিং উন্নয়নের ওপর গবেষণা হয়েছে। গবেষণা থেকে কিছু নির্দেশনা চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রথমত, স্ব-উৎপাদিত পণ্যের গুণাগুণ বিশ্লেষণ করতে হবে, মার্কেটের অন্যান্য পণ্য থেকে নিজ পণ্যের কোন গুণটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ তা চিহ্নিত করতে হবে, ভোক্তার চাহিদা বুঝতে হবে হোক সেটা কার্যকরী অথবা আবেগীয়, সরকারি কোনো স্লোগান, ধারণা অথবা পলিসির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা তা খতিয়ে দেখা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, পণ্যের গুণাগুণের সঙ্গে ভোক্তার আবেগীয় চাহিদার সমন্বয় করে ব্র্যান্ডের উপাদান সৃষ্টি করতে হবে, যাতে ভোক্তার মাঝে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়। বাংলাদেশও এ মডেল অনুসরণ করতে পারে।