যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডাস্ট্রিয়াল পাওয়ার হাউজ জেনারেল ইলেকট্রিক (জিই) গত নভেম্বরে ঘোষণা দিয়েছে তারা তিনটি আলাদা কোম্পানিতে বিভক্ত হয়ে যাবে। জাপানি প্রতিষ্ঠান তোশিবা এবং স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে পরিচিত নাম জনসন অ্যান্ড জনসনও একই রকম পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। এটি মূলত একটি দীর্ঘ তালিকার কয়েকটি নাম, যার মধ্যে ডোডুপন্ট ও সিমেন্সও রয়েছে। তাহলে কি কনগ্লোমারেটদের দিন শেষ হতে চলছে?

অ্যালফাবেট (গুগলের প্যারেন্ট কোম্পানি), অ্যামাজন ও মেটার মতো (ভূতপূর্ব ফেসবুক) প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো অধিগ্রহণ নীতির ওপর চলছে, কনগ্লোমারেটগুলো ভেঙে গিয়ে ভিন্ন প্রবাহে চলতে চাইছে। তাদের উদ্দেশ্য মূলত নৈপুণ্য বৃদ্ধি। উদাহরণস্বরূপ, সাম্প্রতিক সময়ে জিইর শেয়ারের দাম কমে গিয়েছিল। অংশীদাররা দাবি করছে প্রতিষ্ঠানের স্বাস্থ্যসেবা, বিমান চলাচল ও শক্তি খাত নিজের মতো করে পরিচালিত হলে আগামী শতকে অধিক মুনাফা অর্জন সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ব্যবসা কাঠামো, উপযোগী নেতৃত্ব ও কৌশলগত নমনীয়তার মাধ্যমে তা সম্ভব হবে।

পন্থাটি সিমেন্সের জন্য কার্যকর হয়েছে। এক্ষেত্রে কনগ্লোমারেট ব্যবস্থা ভেঙে যাওয়ায় জিই অধিগ্রহণ করা সম্ভব হয়েছে। সিমেন্স তার ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে অধিগ্রহণ করে ২০২১ সালে মুনাফাও করেছে। কিন্তু প্রশ্ন থাকে— কনগ্লোমারেটগুলো কেন কার্যকর নৈপুণ্য দেখাতে পারছে না? উত্তরে তথাকথিত কনগ্লোমারেট-ছাড়ের কথা বলা হয়। বিচিত্র ব্যবসার সমন্বয়ে থাকা কোম্পানিগুলোর শেয়ারের ক্ষেত্রে বাজার তুলনামূলক কম দাম দেয়। বাজারের এককেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মতো এ প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিটি বিভাগকে সমান মূল্য দেয়া হলে মোটের ওপর ভালো মুনাফা আসত।

কনগ্লোমারেট ভাঙার ক্ষেত্রে দেখা যায় কনগ্লোমারেট প্রতিষ্ঠানে টোবিন কিউয়ের মান—বস্তুগত সম্পদের বাজারমূল্য এবং এর প্রতিস্থাপন মূল্যের অনুপাত—একক দ্রব্য প্রতিষ্ঠানের তুলনায় কম। ক্ষেত্রবিশেষে মূলধন নানা বিভাগে বণ্টিত হয়। প্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তর থেকে কোনো বিভাগে অধিক বরাদ্দ দেয়া হলে প্রতিষ্ঠানের সম্পদের রিটার্ন (মুনাফা) হ্রাস পায়।

প্রচলিত জ্ঞান বলে, সদর দপ্তর তুলনামূলক অধিক মুনাফার বিভাগ থেকে স্বল্প মুনাফার বিভাগে বরাদ্দ দিলে এ ধরনের ঘটনা ঘটে। মূলধনের ত্রুটিপূর্ণ এ বরাদ্দকে ‘করপোরেট সোস্যালিজম’ বলা হয়। কিন্তু আমি এবং আমার সহ-লেখকরা সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখতে পেরেছি এটাই একমাত্র বিষয় নয়।

বস্তুত, কনগ্লোমারেট প্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তর বরাবরই ওই সমন্বয়ের দক্ষতম বিভাগে অধিক বরাদ্দ দিয়ে থাকে। কেননা কোথায় বরাদ্দ বাড়াতে হবে সে সিদ্ধান্ত নিতে তারা বিভাগীয় ম্যানেজারের সুপারিশ পর্যালোচনা করে। যেসব বিভাগ বেশি মুনাফা অর্জন করতে পারবে মনে করা হয়, তারাই অধিক বরাদ্দ পায়।

কিন্তু ম্যানেজাররা মূলত সাম্রাজ্য তৈরি করে। তাদের মধ্যে বৃহত্তর বিভাগ চালানোর ক্ষুধা থাকে। এ কারণে তারা কখনো কখনো চলমান প্রজেক্টের খরচের পরিমাণ বাড়িয়ে দেখায়। তারা যদি এরই মধ্যে কনগ্লোমারেট প্রতিষ্ঠানের লাভজনক বিভাগের দায়িত্বে থেকে থাকেন, সেখানকার অতিরিক্ত খরচ সদর দপ্তরকে নতুন বরাদ্দ দেয়া থেকে বিরত রাখে না। এ ব্যবস্থাপনা কোনোভাবেই মূলধনের উপযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত করে না। একেই সমন্বয়-ছাড় বলা হচ্ছে।

শেষ পর্যন্ত, কনগ্লোমারেট মডেল থেকে বেরিয়ে আসাই এ ফাঁদ থেকে মুক্তির একমাত্র উপায়। বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়লে বিভাগীয় ম্যানেজারদের সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। কেননা এ ধরনের কার্যক্রম মূল প্রতিষ্ঠানকে লাভজনক বিভাগে অধিক বিনিয়োগ করায় চাপ বৃদ্ধি করে।

এটি নিছক কোনো কল্পনা নয়। আমাদের গবেষণায় আমি এবং আমার সহ-লেখকরা দেখি ২০ বছর আগে চীন যখন বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় যোগদান করে, তখন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কনগ্লোমারেট প্রতিষ্ঠানগুলো চীনের প্রতিষ্ঠানের কারণে প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়েছে। ফলে অতিরিক্ত খরচ সম্পর্কে ম্যানেজারদের রিপোর্ট পাঠানোর প্রবণতা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পেয়েছে। চীনা পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে প্রতি বিচ্যুতিতে অতিরিক্ত খরচ ১৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ১৯৯৯ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত চীন থেকে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধির পরিমাণ ছিল ৭ শতাংশ।

কোম্পানিগুলোর সর্বাধিক উৎপাদনশীল অংশের খরচ কমে যায়, যেখানে আগে সর্বোচ্চ সীমার অতিরিক্ত খরচ দেখানো হতো। এতে এ বিভাগগুলো অধিক মুনাফা করতে পারত, যেখানে স্বল্প উৎপাদনশীল অংশগুলো আরো দুর্বল হয়ে পড়ত। অর্থাৎ সর্বোচ্চ দক্ষ অংশ সর্বাধিক মূলধন লাভ করত।

এর মাধ্যমে ফার্মগুলোর কনগ্লোমারেট ডিসকাউন্ট কমে আসতে দেখা যায়। চীনা পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে এর পরিমাণ ৩২ শতাংশ কমে যায়। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার সময়ে রফতানিকারক কনগ্লোমারেট প্রতিষ্ঠানগুলো—যেখানে চীন দৃঢ় প্রতিযোগী হিসেবে আবির্ভূত হয়, এমনকি ‘কনগ্লোমারেট প্রিমিয়াম’ নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়। যেসব কনগ্লোমারেট চীনের প্রতিযোগিতার মুখে পড়েনি, এ সময়ে তাদের কনগ্লোমারেট ডিসকাউন্ট বাড়তে দেখা যায়।

জনপ্রিয় এবং সুপ্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি করেও ভোক্তা ধরে রাখতে পারে। এর মাধ্যমে অনেক সময় অধিক খরচে স্বল্প উৎপাদন করতে দেখা যায়। একচেটিয়া ক্ষমতা প্রয়োগ করে চীন এই বিক্ষিপ্ত অবস্থা দূর করে কনগ্লোমারেটগুলোকে স্বল্প খরচে অধিক উৎপাদন করতে বাধ্য করে।

জিই ও সিমেন্সের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বিভক্ত হয়ে একাধিক প্রতিষ্ঠান হওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে লাভবান হতে পারে। এর মাধ্যমে মুনাফা বৃদ্ধির পাশাপাশি স্টকের মূল্যবৃদ্ধি পাবে। কিন্তু এর মাধ্যমে অন্যান্য কনগ্লোমারেট হয়তো বুঝবে যে তাদের আসলে একটি দৃঢ় কিন্তু সুস্থ প্রতিযোগিতার মাধ্যমেই উন্নতি সম্ভব, অন্যভাবে নয়।

[স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]

 

দালিয়া মারিন: টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি অব মিউনিখের স্কুল অব ম্যানেজমেন্টের ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকসের অধ্যাপক; সেন্টার ফর ইকোনমিক পলিসি রিসার্চের ফেলো এবং ব্রুগেলের নন-রেসিডেন্ট ফেলো

ভাষান্তর: মাহমুদুর রহমান