আজ থেকে শুরু হচ্ছে সরকারি ধান-চাল সংগ্রহ কার্যক্রম। চলতি বোরো মৌসুমে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে সরকার মোট ১৮ লাখ টন ধান-চাল সংগ্রহ করবে। এর মধ্যে ২৭ টাকা কেজি দরে সাড়ে ছয় লাখ টন ধান এবং সাড়ে ১১ লাখ টন চাল (কেজিপ্রতি ৪০ টাকায় সিদ্ধ চাল আর কেজিপ্রতি ৩৯ টাকায় আতপ চাল) কেনার খবর মিলছে। সংগ্রহ শেষ হবে ৩১ আগস্ট। চলমান বোরো সংগ্রহ কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়ন করাটাই কাম্য।
বোরো আমাদের চালের সর্ববৃহৎ মৌসুম। চালের মোট অভ্যন্তরীণ চাহিদার শতকরা প্রায় ৬০ ভাগ এখান থেকেই মেটে। কাজেই খাদ্যনিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় খাদ্যশস্যের মজুদ পরিস্থিতি উভয় দৃষ্টিকোণ থেকে এ মৌসুম গুরুত্বপূর্ণ। দুঃখজনকভাবে গত দুই বছরে বোরো থেকে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ধান-চাল সংগ্রহে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। এর পেছনে কিছুটা সংগ্রহ অভিযানের প্রক্রিয়াগত ত্রুটি আর কিছুটা বাজারের দামজনিত অভিঘাত দায়ী। প্রচলিত অভ্যন্তরীণ ধান-চাল সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় সরকার চাল সংগ্রহের জন্য চালকল মালিকদের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ২০০৬ সালের জাতীয় খাদ্যনীতিতে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে খাদ্যশস্য কেনার বিধান থাকলেও তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করছেন চালকল মালিকরা। অভ্যন্তরীণ ধান-চাল সংগ্রহ অভিযানে সরকারকে নানাভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন তারা। এটা একটা কাঠামোগত সমস্যা বৈকি। গত দুই বছর বোরো মৌসুমে ধান ২৬ টাকা কেজি দরে, সিদ্ধ চাল ৩৬ টাকা দরে এবং আতপ চাল ৩৫ টাকা দরে কিনেছিল সরকার। কিন্তু সরকারি গুদামের চেয়ে খোলাবাজারে ধানের দাম বেশি হওয়ায় কৃষক সরকারের কাছে ধান বিক্রি করেননি। সমরূপভাবে, সরকারি মূল্যের চেয়ে বাজারমূল্য বেশি হওয়ার অজুহাতে মিলাররা চুক্তি অনুযায়ী চাল দেননি সরকারকে। তাদের দাবি এতে লোকসান হবে। এ প্রেক্ষাপটে তারা চালের দাম কেজিপ্রতি ৪ টাকা বাড়ানোর আহ্বান জানালে সরকার নির্ধারিত দামেই অটল ছিল। ফলে দফায় দফায় মেয়াদ বাড়িয়েও সরকার লক্ষ্য অনুযায়ী ধান সংগ্রহে ব্যর্থ হয়, যার পরিণতিতে আজকের মজুদ সংকটের সৃষ্টি। তাই অতীতের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে কর্মসূচিটি সফল করতে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া চাই।
সব দেশেই রাষ্ট্রীয়ভাবে খাদ্যশস্য সংগ্রহ কর্মসূচি চালানো হয়। তবে কিছু দেশে কার্যকর সরকারি খাদ্যশস্য সংগ্রহ প্রক্রিয়া বিদ্যমান। ভারত তার মধ্যে অন্যতম। বর্তমানে ভারতীয় কৃষকরা একটি গ্যারান্টিড মিনিয়াম সাপোর্ট প্রাইসে (এমএসপি) সরকারের কাছে নিজেদের পণ্য, প্রধানত ধান ও গম বিক্রি করতে পারেন, পর্যায়ক্রমিকভাবে যা প্রতি বছরই নির্ধারিত হয়। এমএসপি ব্যবস্থা মূলত পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। চলমান বাজার পরিস্থিতির ভিত্তিতে নির্ধারিত এমএসপির আওতায় কৃষক রাজ্য নির্ধারিত কেন্দ্রগুলোয় ধান, চাল, গম সরবরাহ করে থাকেন। ন্যায্য দাম পাওয়ায় কৃষক আগ্রহের সঙ্গে সরকারের কাছে খাদ্যশস্য বিক্রি করেন। ফলে বরাবরই দেশটিতে মৌসুমভিত্তিক সংগ্রহ অভিযান সফল হয়। বিষয়টি মাথায় রেখে স্থানীয় প্রেক্ষাপট উপযোগী করে দেশে এমএসপি ব্যবস্থা প্রবর্তন করা যেতে পারে।
বিদ্যমান খাদ্যশস্য সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় মিলারদের প্রভাব অত্যধিক। নানা অজুহাতে তারা যখন চাল সরবরাহ করেন না, তখন শেষ মুহূর্তে সরকারের কিছুই করার থাকে না। ফলে লক্ষ্য অনুযায়ী মজুদ বাড়ানো ব্যাহত হয়। এজন্য মিলারদের প্রতি অতিনির্ভরতার এই কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করারও সময় এসেছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি ভেবে দেখা প্রয়োজন। চুক্তি অনুযায়ী তারা সরকারকে চাল সরবরাহ করতে বাধ্য। অথচ চাল সরবরাহ না করলেও তাদের বিরুদ্ধে নেয়া হয় না ব্যবস্থা। এবার এর ব্যত্যয় আশা করব। এবার ধান ও চাল সংগ্রহের দাম বাড়ানো হয়েছে। ধানে এবার ১ টাকা বেশি এবং চালে ৩ টাকা বাড়িয়ে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। আগের তুলনায় দাম নিশ্চয়ই আকর্ষণীয়। কাজেই মিলারদেরও দায়িত্ববোধ প্রদর্শন জরুরি। চুক্তিবদ্ধ সব মিলারকে কথামতো চাল সরবরাহ করতে হবে। চুক্তি অনুযায়ী চাল না দিলে কালো তালিকাভুক্ত করাসহ আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে তাদের বিরুদ্ধে। প্রয়োজনে ট্রেড লাইসেন্স বাতিলের মতোও কঠোর পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। গতবার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ এবং সরকারি প্রণোদনা ঘোষণা দেয়ার পর মিলাররা সাড়া দেননি। শেষ পর্যন্ত সরকারকে চাল সরবরাহ করেননি তারা। অতীতের অভিজ্ঞতা আমলে নিয়ে এবার সম্ভাব্য বিকল্প ব্যবস্থা রাখা জরুরি।
খাদ্যশস্য পরিধারণের জন্য সরকারি তরফ থেকে খাদ্যগুদামের সংকটেরও কথা বলা হয়। এটা স্বল্পমেয়াদি নয়, দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা। সুপরিকল্পিতভাবে এরও সমাধান দরকার। ৫ হাজার টন ধারণক্ষমতার আরো ২০০টি পেডি সাইলো নির্মাণের সিদ্ধান্ত রয়েছে সরকারের। জনসংখ্যানুপাতে মজুদ বাড়িয়ে তুলতে এগুলো দ্রুত নির্মাণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে বৈকি।
দেশের সরকারি গুদামে মাত্র সাড়ে চার লাখ টনের মতো খাদ্যশস্য মজুদ আছে। মজুদের এই পরিমাণ গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এটা হতাশাজনক। দেশে করোনার দ্বিতীয় প্রবাহ চলছে। সামনে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়সহ অনেক প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা আছে। সুতরাং মজুদ না বাড়ালে আপত্কালীন পরিস্থিতি সামাল দেয়া কঠিন। এমনটি হলে খাদ্য সংকটের শঙ্কাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। এ অবস্থায় মজুদ পরিস্থিতি উন্নয়নে চলমান সংগ্রহ অভিযান সফল করার বিকল্প নেই। খাদ্য মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে সঠিকভাবে ধান-চাল কিনতে মাঠ প্রশাসনকে নির্দেশনা দেয়ার খবর মিলছে। মাঠ প্রশাসনের সক্রিয় প্রচেষ্টায় রাষ্ট্রীয় ধান-চাল সংগ্রহ কর্মসূচি সফল হবে বলে প্রত্যাশা।










