দেশে গত ফেব্রুয়ারিতে শুরু হয় টিকাদান। টিকার মজুদ শেষ হওয়ায় মাঝে কিছুদিনের জন্য কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়। বিভিন্ন উৎস থেকে টিকা আসায় এখন ফের পূর্ণোদ্যমে শুরু হতে যাচ্ছে টিকাদান কার্যক্রম। পরিকল্পনা অনুযায়ী বর্তমানে চল্লিশোর্ধ্ব ও ২০টি শ্রেণী-পেশার নাগরিকদের টিকা কর্মসূচির আওতায় আনা হচ্ছে। কিন্তু উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অধিক মানুষের সংস্পর্শে আসা (সুপার স্প্রেডার) ৪০ বছরের নিচের ব্যক্তিরা টিকার বাইরে রয়ে যাচ্ছে। ফলে গণটিকাদান কার্যক্রম হাতে নেয়া সত্ত্বেও সংক্রমণ ঠেকাতে তা খুব একটা সফল হচ্ছে না। এ অবস্থায় সুপার স্প্রেডারদের টিকার আওতায় আনার পরামর্শ দিচ্ছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। বিষয়টি আমলে নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কার্যকর পদক্ষেপ একান্তভাবে কাম্য।

মাঝে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও দেশে আবার করোনা সংক্রমণ বেড়ে চলছে। বিশেষ করে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট শনাক্তের পর থেকে সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী। সংক্রমণ বাড়ায় সারা দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। হাসপাতালে রোগীদের জায়গা হচ্ছে না, অক্সিজেন থেকে শুরু করে চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতিও দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় সংক্রমণের বিস্তার প্রতিরোধে কঠোর লকডাউন আরোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি চলছে টিকাদান। কিন্তু টিকাদান এখন পর্যন্ত সমাজের সুবিধাভোগী অংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সুবিধাবঞ্চিতরা টিকার বাইরে রয়ে যাচ্ছে। বলা হচ্ছে, দোকান কর্মচারী, অটোরিকশাচালক, রিকশাচালক, বাসের চালক-হেলপার প্রভৃতি পেশার লোকজন প্রতিদিনই বিপুলসংখ্যক মানুষের সংস্পর্শে আসেন। তাদের মাধ্যমে সংক্রমণ দ্রুত ছড়ায়। এসব সুপার স্প্রেডার করোনা সংক্রমণ বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখছেন। তাদের টিকার আওতায় আনা না গেলে সংক্রমণ স্থিতাবস্থায় আনা কঠিন হবে। সুতরাং সুপার স্প্রেডার কমিউনিটিকে টিকা প্রদানই এখন আমাদের অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ।

করোনা মহামারী মোকাবেলায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন টিকাদান চলছে। সব দেশ, বিশেষ করে উন্নত ও ধনী রাষ্ট্রগুলো চেষ্টা করছে দ্রুততম সময়ে বেশিসংখ্যক মানুষকে টিকার আওতায় আনতে। এজন্য অনেক দেশ অনলাইনে নিবন্ধনের মাধ্যমে হাসপাতাল বা ক্লিনিকভিত্তিক টিকাদানের পাশাপাশি ওয়াক ইন সিস্টেমে গণটিকাদানের ব্যবস্থা করেছে। ইংল্যান্ডে টিকাদানের কাভারেজ বাড়াতে ফুটবল স্টেডিয়াম, থিয়েটার, সুপারমার্কেট, কার পার্কিং সাইট, শপিং সেন্টার, কমিউনিটি সেন্টার, স্কুল প্রাঙ্গণ প্রভৃতি স্থানে ওয়াক ইন সিস্টেমে মানুষকে টিকা দেয়া হচ্ছে। ১৮ বছর বা তদূর্ধ্ব যেকোনো নাগরিকই এসব স্থানে টিকা নিতে পারে। তার জন্য আগাম কোনো নিবন্ধনের প্রয়োজন পড়ে না। স্থানীয়ভাবে প্রচারণা চালানো হয়, উল্লিখিত স্থানগুলোয় টিকা দেয়া হচ্ছে। এতে মানুষ অবগত থাকছে এবং যাওয়ার পথে সহজেই টিকা নিতে পারছে। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অঙ্গরাজ্যেও ওয়াক ইন সিস্টেমে টিকাদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ইসরায়েলেও এ পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। ফলে ওইসব দেশে দ্রুত টিকার কাভারেজ বাড়ছে এবং করোনা সংক্রমণ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। এমনকি ভারতেও এ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। মুম্বাই, দিল্লি, মহারাষ্ট্র, কলকাতাসহ দেশটির কিছু এলাকায় ওয়াক ইন সিস্টেমে মানুষকে টিকা দেয়া হচ্ছে। এর সুফল মিলছেও তাড়াতাড়ি। এখন ভারতে সংক্রমণ পরিস্থিতি কিছুটা নিম্নমুখী। কাজেই উল্লিখিত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে।

সরকারের লক্ষ্য আগামী বছরের প্রথম প্রান্তিকের মধ্যে দেশের ৮০ শতাংশ জনগোষ্ঠীকে টিকার আওতায় আনা। টিকাদান যেভাবে চলছে, তাতে ওই লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন। এখনো টিকাদান মোট জনসংখ্যার একটা ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সমাজের সুবিধাভোগীরা টিকা পাচ্ছে, সুবিধাবঞ্চিতরা রয়ে যাচ্ছে টিকার বাইরে। এতে সংক্রমণ পরিস্থিতিতে উন্নতিতেও আশানুরূপ সুফল মিলছে না। জনগোষ্ঠীর বিরাট অংশ বিশেষ করে সুপার স্প্রেডার কমিউনিটি টিকার বাইরে রয়ে গেলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনা সহজ হবে না। এ অবস্থায় সুপার স্প্রেডারদের টিকার প্রাধিকার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা এবং টিকাদান নিশ্চিত করা জরুরি। এটি ঠিক যে টিকা নেয়ার ক্ষেত্রে তাদের এখনো অনাগ্রহ লক্ষ করা যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে টিকাদানের প্রয়োজনীয়তা বিষয়ে তাদের বোঝাতে হবে। প্রচার-প্রচারণা বাড়িয়ে তাদের সচেতন করতে হবে, টিকাদানে আগ্রহী করে তুলতে হবে। টিকা নেয়াকে বাধ্যতামূলকও করা উচিত। এক্ষেত্রে দোকান কর্মচারী, রিকশচালক, দোকানদার, সবজি বিক্রেতা প্রভৃতিদের জন্য আলাদা কার্যক্রম হাতে নেয়া যায়। সিটি করপোরেশন এলাকায় ওয়ার্ড কাউন্সিলের অফিস বা বাজারের কাছে টিকাদান কার্যক্রম চালানো প্রয়োজন। বাধ্যতামূলকভাবে সুপার স্প্রেডারকে টিকা নেয়ার বিধান জারি করতে পারে সরকার। চীন ও ভারতের মতো বিভিন্ন স্থানে অস্থায়ী ভিত্তিতে টিকাদান কেন্দ্রও খোলা প্রয়োজন। সিটি করপোরেশনসহ সরকারি অফিসগুলো এক্ষেত্রে সহায়তার হাত প্রসারিত করতে পারে। দেশের টিকাদান কার্যক্রমের জন্য সরকারের গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত শক্তিশালী নেটওয়ার্ক ও কর্মী রয়েছে। টিকাদান কার্যক্রম সফলভাবে পরিচালনার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতিও পেয়েছে বাংলাদেশ। করোনার টিকা প্রদানের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ অন্যদের মডেল হবে বলে প্রত্যাশা।

বাস্তবতা হলো, টিকা নেয়ার নিবন্ধন প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল। সুরক্ষা ওয়েবসাইটে গিয়ে বা মোবাইলে সুরক্ষা অ্যাপ ডাউনলোড করে নিবন্ধন করতে হয়। অনলাইন উন্নত ডিভাইস সুবিধা না থাকলে বা প্রয়োজনীয় কৃেকৗশল না জানলে নিবন্ধন করা সহজ নয়। প্রক্রিয়াগত এ জটিলতাও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর টিকা গ্রহণে অনাগ্রহের কারণ। কাজেই তাদের জন্য সহজ প্রক্রিয়ার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বিদ্যমান অনলাইন প্রক্রিয়ায় নিবন্ধনের পাশাপাশি ওয়াক ইন সিস্টেমে টিকা কার্যক্রম পরিচালনার পরামর্শ দিচ্ছেন। অন্য দেশগুলোর অভিজ্ঞতা নিয়ে এ ব্যাপারে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া এখন সময়ের দাবি। এক্ষেত্রে এনজিওগুলোকে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে।

গণহারে টিকাদানের ক্ষেত্রে একটা বড় বাধা টিকার প্রাপ্যতা। টিকার মজুদ বাড়াতে সরকারকে বিভিন্ন উৎস থেকে টিকা সংগ্রহে মনোযোগ দিতে হবে। মাঝে কিছুটা সমস্যা হলেও এখন কয়েকটি উৎস থেকে টিকা আসছে। টিকা কেনার জন্য বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ ঘোষণা করা হয়েছে। টিকার প্রবাহ যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, সেজন্য সরকারকে বিভিন্ন টিকা কোম্পানি ও দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। একই সঙ্গে টিকা উৎপাদনে দেশীয় সক্ষমতাও কাজে লাগাতে হবে। বেগবান করতে হবে টিকাদান কার্যক্রম। টিকাদানের ক্ষেত্রে আমাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। টিকাদানে বাংলাদেশের সাফল্য বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে। তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত আমাদের টিকাদানের জনবল ও প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো আছে। পাশাপাশি এনজিওগুলোরও রয়েছে বিশাল কর্মী বাহিনী। এদের কাজে লাগিয়ে স্কুল প্রাঙ্গণ, বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন, শপিংমল, কমিউনিটি সেন্টার, স্টেডিয়ামসহ প্রভৃতি স্থানে ওয়াক ইন সিস্টেমে টিকা দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। সুপার স্প্রেডারদের টিকার আওতায় না আনা পর্যন্ত সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে না। সরকারি-বেসরকারি যৌথ প্রচেষ্টায় করোনার টিকা কার্যক্রম ত্বরান্বিত হোক—এটিই প্রত্যাশা।