সাম্প্রতিক সময়ে বন্যপ্রাণী
হত্যা বেড়ে উঠেছে। একের পর এক হাতি হত্যার
সংবাদ গণমাধ্যমে
প্রকাশ হওয়ার
পরিপ্রেক্ষিতে সরকার
কিছু পদক্ষেপ
নিতে যাচ্ছে।
বন্যপ্রাণী হত্যা
বন্ধে বন্যপ্রাণী
(সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন আরো কঠোর করার সুপারিশ
করেছে পরিবেশ,
বন ও জলবায়ু পরিবর্তন
মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত
সংসদীয় কমিটি।
বিপন্ন প্রাণী
হত্যাকে জামিন
অযোগ্য অপরাধ
হিসেবে গণ্য করার পাশাপাশি
শাস্তি আরো বাড়ানোর চিন্তাভাবনা চলছে। করোনা প্রাদুর্ভাব বিশ্বকে পরিবেশ নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য
করেছে। আর পরিবেশ রক্ষায়
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ
গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কিন্তু
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দুঃখজনক
বিষয় হলো, বন্যপ্রাণী হত্যা
অপরাধ হিসেবে
গণ্য হলেও কাউকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়ার খবর মেলে না। আবার আইনেরও
কিছু সীমাবদ্ধতা
রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিপন্ন
প্রাণী সংরক্ষণে
আইন সংস্কারের
পাশাপাশি যথাযথ
প্রয়োগও নিশ্চিত
করতে হবে।
বাংলাদেশ
থেকে হারিয়ে
গেছে এক ডজনের বেশি বন্যপ্রাণী। অধিকাংশ
বন্যপ্রাণী প্রধানত
বনাঞ্চলের ধরন, অবস্থা ও বিস্তৃতির ওপর নির্ভরশীল। এসব প্রাকৃতিক পরিবেশের
অবনতি তাই স্থানীয় ও আবাসিক পশুপাখিকে
নানাভাবে প্রভাবিত
করে। গত তিন দশকে বাংলাদেশে বনাঞ্চলের
অবনতি ঘটেছে
প্রচণ্ডভাবে। অথচ বাংলাদেশ সংবিধানের
অনুচ্ছেদ ১৮ ক-এ রাষ্ট্র কর্তৃক
জীববৈচিত্র্য, বন ও বন্যপ্রাণী
সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধানের
বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র
বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের
জন্য পরিবেশ
সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করিবেন
এবং প্রাকৃতিক
সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ
ও নিরাপত্তা
বিধান করিবেন।’
শুধু তা-ই নয়, দেশে প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষায়
আইন আছে ঠিকই। বন্যপ্রাণী
(সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ (২০১২ সালের ৩০ নং আইন) অনুযায়ী অবৈধভাবে
বন্যপ্রাণী হত্যার
বিচার ও শাস্তি লিপিবদ্ধ
রয়েছে। তবুও প্রাণী হত্যার
দৃশ্য দেখতে
হচ্ছে। মূল বিষয় হলো, আইনের যথাযথ
প্রয়োগ হয় না। আর আইনের প্রয়োগ
নেই বলেই তদন্ত প্রতিবেদন
আলোর মুখ দেখে না। আসামি ধরা পড়ে না। অপরাধীদের জেলে যেতে হয় না। জরিমানা
গুনতে হয় না।
সার্কভুক্ত
শ্রীলংকা ও নেপালে বন্যপ্রাণী
সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা পাশের দেশ ভারতের
চেয়েও উন্নত।
এমনকি মালয়েশিয়ার
চেয়েও ভালো।
শ্রীলংকার সরকার
সরকারি বনভূমিকে
তিন খণ্ডে
ভাগ করে। এর বড় খণ্ডের মালিক
বন বিভাগ।
তার পরের অংশ পড়েছে
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ
বিভাগের ওপর। এ বিভাগের
জন্ম ১৯৪৯ সালে। মন্ত্রণালয়ের নাম ‘বন্যপ্রাণী ও বন সংরক্ষণ’
এবং বাকি অংশ চা-কফি-মসলা প্রভৃতি বাণিজ্যিক
কাজে ব্যবহার
হয়। বন বিভাগের অধীনে
আছে দেশের
৫৫ শতাংশ
বনভূমি। এ বিভাগ ব্রিটিশরা
তৈরি করে ১৮৮৭ সালে।
বাকি প্রায়
সবটুকুই আছে বন্যপ্রাণী বিভাগের
অধীনে। এখানে
বলে রাখা ভালো, বন বিভাগের জমিতে
তারা যেকোনো
বন কেটে সেখানে দেশী বা বিদেশী
গাছ লাগিয়ে
আয়কৃত টাকা সরকারি খাজনায়
জমা করবে।
এটাই তাদের
কাজ। তবে এখানে বন্যপ্রাণী
যা আছে তা সংরক্ষণ
করবে বন্যপ্রাণী
বিভাগ। তবে বন বিভাগ
মূলত তাদের
অধীনে দেয়া ৯০০ বর্গকিলোমিটার ভূমিতে বাণিজ্যিক বনায়ন
করে। শ্রীলংকার
বন্যপ্রাণী বিভাগের
হাতে যে বনভূমি ন্যস্ত
করা হয়েছে,
সেখান থেকে তারা কোনো গাছ বাণিজ্যিক
কাজে বা নিতান্ত প্রয়োজন
ছাড়া কাটতে
পারবে না। কোনো ভিনদেশী
প্রজাতি আনতে পারবে না। কেবল বন্যপ্রাণী
ও তার ব্যবস্থাপনা প্রদর্শনের
মাধ্যমে টাকা রোজগার করতে পারবে, যেটা তাদের মূল লক্ষ্য নয়। তার পরও এ খাতে শ্রীলংকার আয় প্রচুর। অসংখ্য
পর্যটক একটি সমন্বিত পদ্ধতিতে
বন্যপ্রাণী ও বন প্রদর্শন
করতে পারে।
নেপালে বন্যপ্রাণী
সংরক্ষণের ব্যবস্থাও
বেশ জোরদার।
এখানে বন্যপ্রাণী
বিভাগ কোনো বন ধ্বংস
করতে পারবে
না। কিন্তু
পরিবেশবান্ধব পর্যটকদের
আনা-নেয়া করতে পারবে
বা শ্রীলংকার
মতো গবেষণা
করতে পারবে।
বাংলাদেশ যদি পাশের দুটি বন্ধুপ্রতিম দেশের
মতো নতুন করে একটি বন্যপ্রাণী বিভাগ
সৃজন করে তাদের হাতে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ
ও টেকসই
ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব
দেয়, তাহলে
হয়তোবা দেশে এখনো যে বন্যপ্রাণী বেঁচে
আছে, সেগুলো
সংরক্ষণ এবং এসব বনভূমির
সঙ্গে সম্পৃক্ত
জনগোষ্ঠীর ভাগ্যের
কিছুটা হলেও উন্নতি করা সম্ভব হবে।
বন্যপ্রাণী
সংরক্ষণে বাংলাদেশ
বন বিভাগ
বেশকিছু পদক্ষেপ
নিয়েছে, যার মধ্যে বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় বন অধিদপ্তর ‘স্ট্রেংদেনিং রিজিওনাল কো-অপারেশন
ফর ওয়াইল্ডলাইফ প্রটেকশন’ নামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন
করছে। এ প্রকল্পের আওতায়
বন্যপ্রাণী উইং সৃষ্টি করা হয়েছে। রাজশাহী,
রংপুর ও হবিগঞ্জে তিনটি
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ
বিভাগ প্রতিষ্ঠা
করা হয়েছে।
অবৈধভাবে বন্যপ্রাণী
পাচার ও নিধন বন্ধের
লক্ষ্যে জাতীয়ভাবে
ঢাকায় এবং সব বিভাগীয়
শহরে ‘বন্যপ্রাণী
অপরাধ দমন ইউনিট’ গঠন করা হয়েছে।
বন্যপ্রাণী শিকার
ও পাচার
বন্ধের লক্ষ্যে
বন বিভাগ,
পুলিশ, র্যাব,
কোস্টগার্ড, কাস্টমস
ও বিজিবির
সমন্ব্বয়ে বন্যপ্রাণী
অপরাধ দমন ইউনিট গঠনের
সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আহত ও উদ্ধার
করা বন্যপ্রাণীকে চিকিৎসাসেবা দিতে চারটি
ওয়াইল্ডলাইফ ক্রাইম
কন্ট্রোল ইউনিট
ও হটলাইন
চালু করা হয়েছে। বন বিভাগ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণসংক্রান্ত শিক্ষা, গবেষণা
ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধির
লক্ষ্যে গাজীপুর
শাল বনাঞ্চলে
প্রাকৃতিক নৈসর্গিক
পরিবেশে আন্তর্জাতিক মানের ‘ওয়াইল্ডলাইফ সেন্টার’
প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বাংলাদেশের
বিভিন্ন বনাঞ্চলে
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনাকে অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে ৪১টি এলাকাকে
সংরক্ষিত এলাকা
বা প্রটেকটেড
এরিয়া ঘোষণা
করা হয়েছে।
বন্যপ্রাণীর বংশবিস্তার
ও সংরক্ষণের
লক্ষ্যে কক্সবাজার
ও গাজীপুরে
দুটি সাফারি
পার্ক স্থাপন
করা হয়েছে।
২২টি সংরক্ষিত
এলাকায় স্থানীয়
জনসাধারণকে সম্পৃক্ত
করে সহযোগী
ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি
চালু করা হয়েছে। কিন্তু
বাস্তবায়ন ও তদারকির ঘাটতির
কারণে কোনো কিছু থেকে কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলছে না।
দেরিতে
হলেও বন্যপ্রাণী
সংরক্ষণে সরকারের
উপলব্ধি ইতিবাচক।
তবে এ সংরক্ষণের কাজটা
যেমন অত্যন্ত
জরুরি, তেমনি
দুরূহ। সরকার
অগ্রণী ভূমিকা
নিলেও যত দিন না জনসাধারণ সংরক্ষণের
প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি
করে এগিয়ে
আসবে, এ সমস্যার সমাধান
হবে না। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ
ও বন সংকোচন রোধ করার জন্য সরকার যেসব বিধি-নিষেধ
জারি করেছে,
সেগুলো যাতে যথারীতি রূপায়ণ
করা হয়, তা সরকার
ও জনসাধারণের
যৌথ দায়িত্ব।
প্রতিটি সংরক্ষিত
এলাকায় বন রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় সশস্ত্র
পাহারাদারদের নিযুক্তি
দিতে হবে, রাখতে হবে জবাবদিহিতার ব্যবস্থা।
শিকারিদের জন্য থাকতে হবে কঠোর আইনি ব্যবস্থা। রিজার্ভ
ফরেস্ট ছাড়াও
খণ্ড বনগুলো
যাতে জনবসতিমুক্ত থাকে, সেজন্য সরকারি
খবরদারি বাড়াতে
হবে। বিরল প্রজাতির প্রাণীগুলোকে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেশের
চিড়িয়াখানাগুলোর ওপর ছেড়ে দেয়া যেতে পারে।
বন্যপ্রাণী
সংরক্ষণের জন্য বেশি বেশি করে বন সৃষ্টি করতে হবে, বন পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণে যথাযথ
ব্যবস্থা গ্রহণ
করতে হবে, বন্যপ্রাণী নিধনের
ক্ষেত্রে আইনের
কঠোরতা আরোপ করে তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন
করতে হবে, বন্যপ্রাণী নিধনের
ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে ব্যাপক গণসচেতনতা
সৃষ্টি করতে হবে। বন না থাকলে
বন্যপ্রাণীর আশ্রয়ই
থাকবে না। তাই সাধারণ
মানুষ সচেতন
হলে সহজেই
বন্যপ্রাণীদের রক্ষা
করা সম্ভব।
সরকারি-বেসরকারি
ও ব্যক্তি
উদ্যোগে বন সৃষ্টি এবং রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে
বন্যপ্রাণীর নিরাপদ
আবাসস্থল নির্মাণ
করা সম্ভব।
বন্যপ্রাণী যাতে নিশ্চিহ্ন হতে না পারে, সেদিকে সবার নজর দেয়া জরুরি। বাংলাদেশে
এরই মধ্যে
জাতীয় পশুর জন্য বাঘ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন
করা হয়েছে।
শকুন সংরক্ষণে
‘বিশেষ শকুন সংরক্ষণ অঞ্চল’
ঘোষণা করা হয়েছে। ডলফিন
সংরক্ষণে পাবনা
জেলার তিনটি
অঞ্চল ও সুন্দরবনে ডলফিন
অভয়ারণ্য ঘোষণা
করা হয়েছে।
প্রতিবেশী দেশ ভারতও বন্যপ্রাণী
ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে
অভূতপূর্ব উন্নয়ন
করেছে। বাংলাদেশও
একই প্রক্রিয়া
অনুসরণ করে আইনের যথাযথ
প্রয়োগ নিশ্চিতের
মাধ্যমে বন্যপ্রাণী
সংরক্ষণ করতে পারে।
বন ও বন্যপ্রাণী আমাদের জাতীয় সম্পদ। আমাদের বন্যপ্রাণী আজ হুমকির সম্মুখীন। অহরহ বৃক্ষ ও বন্যপ্রাণী নিধন সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ রকম পরিস্থিতিতে বর্তমান সরকার বন্যপ্রাণী রক্ষায় একটি আইন প্রণয়ন করেছে এবং এটি সংশোধন করে শাস্তি আরো কঠোর করার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে আইন প্রণয়নই শেষ কথা নয়, প্রয়োজন এর যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত এবং জনসচেতনতা তৈরি করা। দেশ ও জাতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের জন্য সমাজ ও রাষ্ট্রের যুগপৎ ভূমিকা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি। বন ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি এখন বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ। আগে ধারণা ছিল বন থাকলে বন্যপ্রাণী থাকবে কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে তার উল্টো, বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা করলে বন টিকবে। কারণ একটি বনের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় উপাদান বা রক্ষাকবচ হচ্ছে তার প্রাণিকুল। প্রতিটি বনই গড়ে ওঠে তার প্রাণিকুলের চাহিদা অনুযায়ী। একেক অঞ্চলের বন যেমন একেক রকম, ঠিক তেমনি ভিন্ন অঞ্চলের বনের প্রাণিকুলের প্রজাতিগত বৈচিত্র্যও অনন্য। বাংলাদেশ এরই মধ্যে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। সামগ্রিকভাবে বন, জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা যতটা উন্নত ও টেকসই করা যাবে, দেশের প্রাণীবৈচিত্র্য তথা সামগ্রিক জীববৈচিত্র্য ততটাই সমৃদ্ধ হবে। বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজন দক্ষ জনবল। আহত, আঘাতগ্রস্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত বন্যপ্রাণীর পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজন বন্যপ্রাণীর ওপর প্রশিক্ষিত ডাক্তার। দিনে দিনে বন্যপ্রাণীর প্রতি মানুষের ভালোবাসা, সচেতনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাশাপাশি সরকারের সঠিক তত্ত্বাবধান বা ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠলে বাংলাদেশও বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্যে একটি সমৃদ্ধিশালী দেশে পরিণত হবে।










