শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড—প্রবাদটি শিক্ষার গুরুত্ব বোঝাতে স্লোগান হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে, কিন্তু তাতে নির্দিষ্ট করা হয়নি প্রাথমিক, মাধ্যমিক, নাকি উচ্চশিক্ষা—কোন স্তরের শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড? ধরে নেয়া যেতে পারে, সব স্তরের শিক্ষাই জাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সেটি হয়ে থাকলে সব স্তরের শিক্ষাকে গুরুত্ব দেয়া প্রথমত সংবিধানসম্মত দায়িত্ব রাষ্ট্রের। একটি জাতির ২০ শতাংশেরও কম মানুষের ভাগ্যে উচ্চশিক্ষা নেয়ার সুযোগ থাকে। বাকি ৮০ শতাংশ মানুষ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা নিয়ে সুশিক্ষিত হতে পারলে একটি জাতি বিশ্বের বুকে দাঁড়িয়ে যেতে পারে। এজন্য বলা যায়, মাধ্যমিক শিক্ষাই হচ্ছে জাতির মেরুদণ্ড মজবুত করার শিক্ষা। বাংলাদেশে সেই মাধ্যমিক শিক্ষাই সবচেয়ে অবহেলিত। পাঁচ দশকেও মাধ্যমিক শিক্ষার ভিত শক্তিশালী হয়নি। বিশেষজ্ঞরা এর জন্য সরকারি উদ্যোগে ভালো মাধ্যমিক বিদ্যালয় গড়ে না ওঠাকে দায়ী করছেন। এর প্রভাব পড়ছে আমাদের শিক্ষার মানে এবং মানবসম্পদের ওপর। আধুনিক কৃষি থেকে শুরু করে শিল্প বা সেবা খাতে দক্ষ মানবসম্পদ মিলছে না। এখন যুক্ত হয়েছে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের উপযোগী মানবসম্পদ তৈরির চ্যালেঞ্জ। বিশ্বের অভিজ্ঞতার আলোকে তাই মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে।

শিক্ষাসংশ্লিষ্ট জনগুরুত্বপূর্ণ মৌলিক অধিকারের মতো বিষয় থেকেও মানুষ বঞ্চিত হয়েছে, বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছে নিরবধি। বলা হয়, জনগণের প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে না পারলে একটি রাষ্ট্র সমৃদ্ধ হতে পারে না। কথাটি বিলম্বে হলেও বাংলাদেশ আংশিক বুঝতে পেরে প্রাথমিক শিক্ষাকে ঢেলে সাজাতে গিয়ে ২০১০ সালের শিক্ষানীতিতে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষার স্তর নির্ধারণ করছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত স্কুলগুলোকে জাতীয়করণ করা হলেও ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণী বাদ পড়ে থাকল। কেন জাতীয়করণ থেকে ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম শ্রেণী বাদ পড়ল এবং অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষার স্তরই-বা কেন নির্ধারণ করা হলো? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া যায় না। মাধ্যমিক শিক্ষা বৈষম্যের জাঁতাকলে পিষ্ট। খালি চোখেই দেখা যায়, গ্রামগঞ্জের ৯৭ শতাংশ শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষক বিরাট বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। শিক্ষার মাত্র ৩ শতাংশের সঙ্গে যারা জড়িত, তারা সরকারের যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে আসছেন। অথচ একই কারিকুলাম, একই সিলেবাস, একই পরীক্ষা পদ্ধতি, একই কর্মঘণ্টাসহ শিক্ষাদান পদ্ধতির সবকিছু একই নিয়মে পরিচালিত হলেও সরকারের আর্থিক সুবিধা থেকে বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষার সঙ্গে জড়িতরা বঞ্চিত হয়ে আসছেন দীর্ঘদিন। অন্যদিকে বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চালাতে হয় বেশি বেতনে, আর শিক্ষকদের দেয়া হয় যৎসামান্য অর্থ।

১৬ কোটি মানুষের দেশে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা বহু বছর ধরে ছিল ৩১৭, এখন এমপিওভুক্তের কারণে এ সংখ্যা বেড়েছে। এ নিয়ে কারো যেন কোনো চিন্তা ছিল না। অর্থাৎ মাধ্যমিক শিক্ষা বেসরকারি খাতেই চলতে থাকবে। তবে বেসরকারি শিক্ষক সংগঠনগুলো পুরো মাধ্যমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণের জন্য আন্দোলন করে যাচ্ছে বহুদিন। এখনো পুরো মাধ্যমিক শিক্ষার ৩ শতাংশের কাছাকাছি সরকারি বিদ্যালয়, বাকি ৯৭ শতাংশ বেসরকারিভাবেই চলছে। ফলে অনেক মেধাবী শিক্ষকতা পেশায় আসতে চান না, এলেও থাকতে চান না এবং থাকেন না। শিক্ষার এ দুটো স্তরেই বিশেষ দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর অধিকাংশের অবস্থাই শোচনীয়। পর্যাপ্ত মানসম্পন্ন শিক্ষকের ঘাটতির পাশাপাশি অবকাঠামোগত স্বল্পতা শিখন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে। অনেক সুযোগ-সুবিধাই নেই সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। দেশজুড়ে মানসম্পন্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা সরকারের ছিল বলে মনে হয় না। ফলে পুরো মাধ্যমিক শিক্ষা বেসরকারিনির্ভর হয়ে পড়েছে। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক তিন স্তরের মধ্যে মাধ্যমিকের অবস্থা সবচেয়ে দুর্বল। এ স্তরের জন্য একাধিক প্রকল্পসহ নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে মাধ্যমিকে।

জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত শিক্ষার মাধ্যমে মালয়েশিয়ার বর্তমানে উন্নত বিশ্বের সারিতে প্রবেশ করেছে। মালয়েশিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থা চার ধাপে বিভক্ত। প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীকে সরকারি বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সব অঙ্গরাজ্য ৬ থেকে ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত শিক্ষা সবার জন্য বাধ্যতামূলক, ফলে আমেরিকার মাধ্যমিক শিক্ষার বিস্তার অনেক বেশি। মাধ্যমিক স্তরের জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশ মাধ্যমিক স্কুলে অধ্যয়নরত। যুক্তরাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থায় মূলত তিনটি ধাপ রয়েছে। যেমন প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা। বাস্তবায়নে রয়েছে দুই ধরনের স্কুল—স্থানীয় ফ্রি পাবলিক স্কুল ও প্রাইভেট স্কুল। মাধ্যমিক শিক্ষার বয়স ১২ থেকে ১৮ বছর। সপ্তম শ্রেণী থেকে শুরু করা হয় (১২ বছর), শিক্ষা মূলত অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক। নিউজিল্যান্ডে তিন ধরনের মাধ্যমিক বিদ্যালয় আছে। এর মধ্যে সরকারি স্কুলগুলোয় পড়ে প্রায় ৮৫ শতাংশ শিক্ষার্থী। আর সরকারি নিবন্ধনভুক্ত (বেসরকারিভাবে পরিচালিত) স্কুলে পড়ে ১২ শতাংশ। বাকি মাত্র ৩ শতাংশ যায় বেসরকারি স্কুলে। বিশ্বে যেসব দেশ উন্নতি করেছে, যাদের দেখে আমরা অবাক হই এবং কিছুটা ঈর্ষাও অনুভব করি, তারা সবাই শিক্ষায় সর্বোচ্চ বিনিয়োগ করেছে, অনেক সময় সাধ্যের বাইরে গিয়ে, যেমন কিউবা ও দক্ষিণ কোরিয়া। দীর্ঘদিন ধরে কিউবার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা দেশগুলো অবরোধ আরোপ করে রেখেছে, তাতে তার অর্থনীতি খুবই নাজুক অবস্থায় পড়েছে। কিন্তু দেশটি শিক্ষা ক্ষেত্রে বিনিয়োগ থেকে পিছপা হয়নি। এর সুফল তারা পাচ্ছে। একটি গোটা প্রজন্ম বিশ্বমানের শিক্ষা পেলে বিজ্ঞান থেকে শুরু করে সাংবাদিকতা, বাস্তুকলা থেকে কৃষিকাজ সর্বত্র যে বিশাল মাপের অর্জন সম্ভব, কিউবা তা করে দেখাচ্ছে। কয়েক বছর ধরে দেশটি তার জিডিপির ৯ শতাংশ বরাদ্দ দিচ্ছে শিক্ষায়।

মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে কয়েকটি উপাদানের যথাযথ সমন্বয় করতে হয়, যা বাস্তবায়ন করতে শিক্ষায় পর্যাপ্ত অর্থায়ন প্রয়োজন। আধুনিক ও যুগোপযোগী শিক্ষাক্রম প্রণয়ন, পর্যাপ্তসংখ্যক যোগ্য ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, উপযুক্ত শিক্ষাদান সামগ্রী ও ভৌত অবকাঠামো প্রস্তুত, যথার্থ শিক্ষণ-শিখন পদ্ধতি আবিষ্কার, উপযুক্ত মূল্যায়ন পদ্ধতি বিশ্লেষণ, ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ ও মনিটরিং ইত্যাদি উপাদানের যথোপযুক্ত সমন্বয় সাধন করতে বেশি অর্থ বরাদ্দ দেয়া উচিত ছিল। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সব স্তরে দক্ষতার মান কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নেই। এর বিপরীতে অপচয়ের হার কমিয়ে দক্ষতার মান বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এ দক্ষতা ও অপচয় রোধ করতে হবে, যাতে মানসম্মত শিক্ষার মাধ্যমে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সত্যিকারের মানবসম্পদে রূপান্তর করা যায়। গুণগত শিক্ষার জন্য যে উপাদানটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তা হচ্ছে মানসম্পন্ন শিক্ষক। শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য ভালো শিক্ষাগত যোগ্যতার অধিকারী মানসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে। সব শিক্ষকের জন্য বুনিয়াদি ও বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, কর্মরত শিক্ষকদের জন্য কর্মকালীন প্রশিক্ষণ এবং একই সঙ্গে শিক্ষকদের যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করতে অবশ্যই যথোপযুক্ত বেতন-ভাতা দিয়ে তাদের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা ও পেশাগত স্বাধীনতা দিতে হবে।

শিক্ষা ক্ষেত্রে সংকটের নানা প্রকাশ আছে, প্রতিবিধানও আছে এবং সফল প্রতিবিধানের জন্য কয়েকটি বিষয় ও প্রস্তুতি অপরিহার্য। এর একটি হচ্ছে রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক সংকল্প ও সদিচ্ছা, দ্বিতীয়টি পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং তৃতীয়টি জাতির চিন্তায় শিক্ষাকে সর্বাগ্রে রাখা। মানবসম্পদ উন্নয়ন নিঃসন্দেহে সকল প্রকার উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি। আর এক্ষেত্রে শিক্ষার গুরুত্ব সর্বাধিক। কারণ শিক্ষাই হলো, মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রধান উপায়। সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা, উচ্চ হারে মাধ্যমিক শিক্ষা এবং সুনির্বাচিত উচ্চশিক্ষা যে দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে সে শিক্ষা আমরা পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো থেকে পাই। মানবসম্পদ উন্নয়নে শিক্ষা সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। পাশাপাশি রাষ্ট্র বস্তুগত অবকাঠামো উন্নয়ন, উপযুক্ত নীতি সমর্থন দিয়ে মানবসম্পদ উন্নয়নের গতিকে আরো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য মোটেই উপযোগী নয়, তা বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। এক্ষেত্রে প্রাথমিক শিক্ষা পেশা পরিবর্তনে সামান্য সহায়তা করলেও মানবসম্পদ উন্নয়নে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার তেমন কোনো ভূমিকা নেই। এ অবস্থায় যুগোপযোগী মানবসম্পদ তৈরির লক্ষ্যে শিক্ষা ব্যবস্থার উত্কর্ষ অর্জনে দৃষ্টি দেয়া দরকার। মাধ্যমিক শিক্ষার মান উন্নত করার জন্য বাড়তি গুরুত্ব দিতে হবে। এক্ষেত্রে মাধ্যমিক শিক্ষাক্রম থেকে শুরু করে পাঠদান ও প্রতিষ্ঠানে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে, যা জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও মৌলিক উত্কর্ষকে উৎসারিত করবে। এ পর্যায়ে প্রযুক্তির ব্যবহার কীভাবে বাড়ানো যায়, তাও বিবেচনায় রাখতে হবে।