গত বছর গৃহীত লকডাউনে শিল্প-কারখানা থেকে শুরু করে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো বড় মাত্রায় আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল। করোনাসৃষ্ট ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সংগত কারণে বিভিন্ন খাত ও প্রতিষ্ঠানের জন্য ২৩টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল সরকার, যার আর্থিক মূল্য আনুমানিক ১ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। দেশী প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেজা, বেপজা ও বাংলাদেশ হাইটেক পার্কে অবস্থিত বিদেশী প্রতিষ্ঠানকেও প্রণোদনা সুবিধা দেয়া হয়েছে। কিন্তু অর্থনৈতিক অঞ্চল-বহির্ভূত বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রণোদনার বাইরে ছিল। এখন আবার দেশজুড়ে কঠোর লকডাউন জারি করা হয়েছে। রফতানিমুখী শিল্প-কারখানা বাদে সব প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে চলতি মাস থেকে আবার প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নের খবর মিলছে। এবার দেশী-বিদেশী নির্বিশেষে প্রযোজ্য সব প্রতিষ্ঠানকে প্রণোদনা প্রদানের অনুরোধ জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিদেশী উদ্যোক্তাদের ধরে রাখতে ও নতুন প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে সবার জন্য সমান সুযোগ-সুবিধা প্রদান জরুরি। কাজেই স্বচ্ছতার সঙ্গে ভালো প্রস্তাবটির সুষ্ঠু বাস্তবায়নই কাম্য।

কভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের পর থেকে গত প্রায় দেড় বছর ধরে দেশের উৎপাদন খাত ও ব্যবসা-বাণিজ্যে বিরাজ করছে মন্দা। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকার লড়াই করছে। কিছু ক্ষেত্রে পরিচালন ব্যয় হ্রাস করে, আবার কিছু ক্ষেত্রে ব্যবসার আকার ছোট করে কিংবা কর্মী সংখ্যা কমিয়ে। এটা দেশী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে যেমন সত্য, তেমনি দেশে কার্যরত বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। করোনার অভিঘাতের ক্ষেত্রে দেশী-বিদেশী কোনো তফাত নেই। সব প্রতিষ্ঠানই সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। সংকটময় পরিস্থিতিতে দেশী প্রতিষ্ঠানের মতো বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারাচ্ছে। দুঃখজনকভাবে রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা দেশী প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি কিছু বিদেশী প্রতিষ্ঠান পেলেও সবাই পায়নি। বিশেষ করে অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর বাইরে থাকা বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলো এক্ষেত্রে বঞ্চিত রয়ে গেছে। অথচ তারাও সরকারকে শুল্ক, মূসক ও আয়কর দিচ্ছে। কর্মসংস্থানে রাখছে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। অনেক বাংলাদেশী কর্মী এসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি বিনিময়, শ্রম দক্ষতা বাড়াতে, সর্বোপরি বৈদেশিক মুদ্রা জোগাতে প্রভূত সাহায্য করছে। দেশের অর্থনীতিতে এত অবদান রাখা সত্ত্বেও বিদেশী অনেক প্রতিষ্ঠান এখনো প্রণোদনার বাইরে থাকাটা বৈষম্যমূলক। প্রণোদনা প্যাকেজগুলো তিন বছরের জন্য ঘোষিত হয়েছে। তার মানে তিন বছর পর্যন্ত দেশী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রযোজ্য সুযোগ-সুবিধা পাবে। একই ব্যবসায়িক ইকোসিস্টেমে বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোও কাজ করছে। কিন্তু তারা সুযোগ-সুবিধা পাবে না, তা হতে পারে না। এটা রাষ্ট্রীয় সমতা নীতির পরিপন্থী। কাজেই বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও প্রণোদনার আওতাভুক্ত সময়ের দাবি।

চলমান মহামারী একটি বৈশ্বিক প্রপঞ্চ। বিশ্বের সব দেশের অর্থনীতিতে এর প্রভাব পরিব্যাপ্ত। হয়তো মাত্রাগত তারতম্য থাকতে পারে। তাই যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, জাপান, চীন, ভারত, শ্রীলংকা, সিঙ্গাপুর, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়াসহ প্রায় প্রতিটি দেশই দ্রুত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার নিশ্চিতে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে রাষ্ট্রীয় সমর্থন জুগিয়েছে। এক্ষেত্রে দেশী না বিদেশী এই বাছবিচার না করে রাষ্ট্রীয় সীমানার মধ্যে নিবন্ধিত প্রযোজ্য সব প্রতিষ্ঠানকে প্রণোদনা সুবিধা দিয়েছে তারা। বিশেষ করে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার নীতি আমাদের জন্য দৃষ্টান্তযোগ্য। দেশ দুটি করোনা সংকটে কর ছাড়, কর পরিশোধের সময়সীমা বাড়ানো, ঋণ পরিশোধে আপাত স্থগিতাদেশ, ভূমি ব্যবহার ফি বিলম্বে পরিশোধের সুযোগ, সুদহার কমানোসহ প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় হ্রাসকৃত হারে সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিয়েছে। সুনির্দিষ্টভাবে ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে পোশাক, ইলেকট্রনিকস, অটোমোবাইল ও টেলিকম খাতের প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বেশি সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়েছে। আর কম্বোডিয়ার ক্ষেত্রে পোশাক ও হালকা প্রকৌশল শিল্পের প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এ ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে দেশী-বিদেশী মালিকানার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কোনো পার্থক্য করা হয়নি। বরং সবাই যাতে সমান সুযোগ পায়, অর্থনীতি দ্রুত ঘুরে দাঁড়ায়—রাষ্ট্রীয়ভাবে এটিই নিশ্চিত করা হয়েছে। দেশ দুটির নীতি ও অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য বিশেষভাবে শিক্ষণীয় বৈকি।

সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান এক দেশ থেকে অন্য দেশে স্থানান্তরিত হচ্ছে। এটি এখনকার প্রবণতা। উদ্দেশ্য, সার্বিকভাবে পরিচালন ব্যয় কমিয়ে ব্যবসাকে লাভজনক রাখা। এ প্রেক্ষাপটে প্রতিষ্ঠানগুলো যেখানে সুযোগ-সুবিধা বেশি ও সস্তা শ্রম রয়েছে, সেখানে স্থানান্তরের বিষয়টিকে প্রাধান্য দিচ্ছে। চীন ও জাপানের অনেক প্রতিষ্ঠান এখন অন্যত্র কারখানা স্থানান্তরের খবর মিলছে। এটা বাংলাদেশের জন্য বড় সুখবর হতে পারে বৈকি। কিন্তু তার জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা চাই। আমাদের দেশ একই সঙ্গে বিনিয়োগ প্রত্যাশী ও উদ্বৃত্ত শ্রমের দেশ। এটা একটা ইতিবাচক বিষয়। তবে প্রণোদনা সুবিধা প্রদানে বিদেশী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে যে বৈষম্য রয়ে গেছে, তা ভুল বার্তা দিতে পারে। এতে বিদ্যমান বিদেশী বিনিয়োগকারীরা হতাশ হওয়ার পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। তাই বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে। 

আশার কথা, অর্থনৈতিক অঞ্চল-বহির্ভূত বিদেশী কোম্পানিগুলোকে প্রণোদনা সুবিধার আওতায় আনতে এরই মধ্যে অর্থ বিভাগে চিঠি পাঠিয়েছে। বলা হচ্ছে, এটি বাস্তবায়ন হলে ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে সমতা বিধান হবে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এখন অর্থ বিভাগের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিই জরুরি।

বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়াসহ আমাদের প্রতিযোগী অর্থনীতিগুলো বেশ সচেষ্ট। এজন্য তারা ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে চলছে। ফলে সেখানে বিপুল বিনিয়োগ আসা শুরু করেছে। বাংলাদেশ বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে নানা উদ্যোগ নিলেও বিনিয়োগ প্রবাহ এখনো আশানুরূপ নয়। বিদেশী উদ্যোক্তাদের জন্য সুযোগ-সুবিধাও অপর্যাপ্ত। এর মধ্যে ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি বিদ্যমান বিদেশী উদ্যোক্তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি করছে। তারা নতুন বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হচ্ছে। এটা অর্থনীতির জন্য শুভলক্ষণ নয়। সুতরাং বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সবার জন্য সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতে সরকার কার্যকর ব্যবস্থা নেবে—এটিই প্রত্যাশা।