পরিকল্পনা ও অনুমোদনহীন অবকাঠামো নির্মাণ, অবৈধ গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগের নিয়ন্ত্রণহীন দুর্নীতিতে পড়ে পিষ্ট ঢাকার নাগরিকরা। ঢাকা এখন বিশ্বের অনিরাপদ শহরগুলোর তালিকার প্রথম সারিতে, বসবাস অযোগ্য শহরের মধ্যে চতুর্থ। ৪০০ বছরের পুরনো নগরীটি অপরিকল্পিত উন্নয়নের ফলে দিনে দিনে যে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে, তার প্রমাণ আমরা পাই সম্প্রতি মগবাজারে ঘটে যাওয়া গ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনা দিয়ে। রয়েছে এ ধরনের আরো ঘটনাও। এ বিস্ফোরণের মাত্রা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে তিনতলা ভবনের একাংশ ধসে পড়াসহ পাশের ডজনখানেক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা বেশ কয়েকটি বাসের কাচ ভেঙে অনেকে আহত-নিহত হয়েছেন, যা ঝুঁকিপূর্ণ ও ক্রমেই বসবাসের অযোগ্য এক নগরীর চিত্র তুলে ধরে।

গত কয়েক বছরে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে গ্যাস বিস্ফোরণে জীবন ও সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। তার পরও কর্তৃপক্ষের সচেতনতা বেড়েছে বলে মনে হয় না। নারায়ণগঞ্জে মসজিদে বিস্ফোরণ, শনির আখড়ায় দুর্ঘটনা থেকে আমরা শিক্ষা গ্রহণ করিনি। নারায়ণগঞ্জে একটি মসজিদে গ্যাস বিস্ফোরণে ৪০ জন মারা যান। গত বছর ঢাকার ইন্দিরা রোড এলাকার একটি সড়কে পরপর কয়েকটি বিস্ফোরণে পাঁচটি ম্যানহোলের ঢাকনা ও রাস্তার স্ল্যাব উড়ে যায়। পরবর্তী সময়ে জানা যায়, ভূগর্ভস্থ নর্দমায় জমে ওঠা আবর্জনার পচন থেকে উত্পন্ন গ্যাস এবং তিতাসের গ্যাসলাইনের ছিদ্র দিয়ে নির্গত গ্যাস মিলে সড়কের নিচে বিস্ফোরণগুলো ঘটে। এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার পর সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সুষ্ঠু তদন্তের কথা বলে কমিটি গঠন করলেও তাদের অনুসন্ধান আর জনগণের দৃষ্টিগোচর হয় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তদন্ত এগোলেও কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার খবর মেলে না। সংশ্লিষ্ট সংস্থার জবাবদিহিতা, সঠিক তদন্ত এবং এ পরিপ্রেক্ষিতে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হলে এমন দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব বলেই অনুমেয়।

গ্যাসের মতো অতি দাহ্য পদার্থের সঞ্চালন, সরবরাহ লাইন ও সংযোগ হতে হয় শতভাগ টেকসই, নিখুঁত ও ত্রুটিমুক্ত। এর কোনো পর্যায়ে সামান্য ত্রুটি থাকলে পরিণাম যে ভয়াবহ হয়, তার বহু প্রমাণ আমাদের সামনেই রয়েছে। সুয়ারেজের আবর্জনা ও স্তূপ করে রাখা ময়লা থেকে সাধারণত মিথেন গ্যাস উত্পন্ন হয়। মগবাজারের এ ঘটনার নেপথ্যে মিথেন গ্যাসের উপস্থিতির কথা বলা হচ্ছে। গ্যাস বদ্ধ জায়গায় জমা থাকে এবং তা বাতাসের সংস্পর্শে এসে এক্সপ্লোসিভ মিকশ্চার তৈরি করে। নর্দমার ভেতরে উত্পন্ন গ্যাস বেরিয়ে যাওয়ার পথ না থাকলে তা জমতে জমতে এমন ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। এ পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য রাস্তা ঢালাইয়ের সময় পিটে ফাঁক রাখতে হয়, যাতে ফাঁক দিয়ে গ্যাস বেরিয়ে যেতে পারে। ভূগর্ভস্থ নর্দমা পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব ঢাকা ওয়াসার; গ্যাসের লাইনগুলো ছিদ্রমুক্ত রাখাসহ সার্বিক রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব তিতাসের। সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সহযোগিতা ও সমন্বয়ের ভিত্তিতে তাদের এ দায়িত্ব নিয়মিতভাবে পালন করতে হবে।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোয় অব্যবস্থাপনা, তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণগত ত্রুটি থেকে গ্যাস বিস্ফোরণের দুর্ঘটনা কম। সেখানে মাটির নিচে থেকে পাইপলাইন দিয়ে বাসাবাড়িতে গ্যাস সংযোগ দেয়া হয় না। বরং বাড়িতে বাড়িতে সিলিন্ডার রয়েছে এবং তা ফুরিয়ে গেলে রি-ফিল করা হয়। তবে দুর্ঘটনা ঝুঁকি এড়াতে সিলিন্ডারগুলো ঘরের বাইরে রাখা হয় এবং পাইপের মাধ্যমে সংযুক্ত করা হয়। পাশাপাশি  দুর্ঘটনা এড়াতে নির্দিষ্ট সময় পরপর ফায়ার অডিটসহ নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। আমাদের দেশে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকির অভাবে বারবার এ-জাতীয় দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব এড়ানোর প্রবণতা যেমন স্পষ্ট, তেমনি বাড়ির মালিক ও বাসিন্দাদের মধ্যেও রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে উদাসীনতা বিদ্যমান; যা দুর্ঘটনার পরিমাণ বৃদ্ধি করছে।

ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরের গ্যাস সরবরাহ লাইনের ৭০ শতাংশই ঝুঁকিপূর্ণ। অর্ধশত বছরের পুরনো লাইন আর অবৈধ সংযোগ এখানে গ্যাস দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। ২০১০ সাল থেকে আবাসিক ভবনে নতুন করে গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকার কথা থাকলেও একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের যোগসাজশে অবৈধ সংযোগ নেয়া হয়। এসব ত্রুটিপূর্ণ লাইন থেকে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। অথচ গ্যাসের সঞ্চালন লাইন থেকে শুরু করে সংযোগস্থল পুরোপুরি নিশ্ছিদ্র ও সুরক্ষিত হওয়া জরুরি। গ্যাসের পুরনো পাইপলাইনে ক্ষয়, পুরনো কিংবা নতুন পাইপলাইনে ময়লা-আবর্জনা জমে লিকেজ-ছিদ্র ইত্যাদি তৈরি হওয়া অমূলক নয়। গ্যাস বিতরণ লাইন রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, অযত্ন-অবহেলা এবং সময়মতো কেন্দ্রীয় অফিস থেকে আঞ্চলিক অফিসগুলোয় প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ না করার কারণেও নাগরিকদের জন্য তা বিপদ ডেকে আনছে। রাজধানীর মাটির নিচ দিয়ে নেয়া হয়েছে অসংখ্য গ্যাসলাইন। এসব লাইনের কোথাও লিক হচ্ছে কিনা, কোনো ভবনের কোনো কক্ষে গ্যাস জমা হচ্ছে কিনা—এসবের নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিকল্প নেই।

মগবাজারের আকস্মিক এ বিস্ফোরণ আমাদের ব্যবস্থাপনা ও কাঠামোগত দুর্বলতা নতুন করে উন্মোচন করেছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, রাজধানীসহ সারা দেশে এ রকম বহু ভবনই রয়েছে ঝুঁকির মধ্যে। বিভিন্ন ভবনে অগ্নিকাণ্ড, পুরান ঢাকায় রাসায়নিক বিস্ফোরণ, বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিস্ফোরণ ইত্যাদি ঘটনা এর প্রমাণ। আমরা আশা করি, মগবাজারের বিস্ফোরণের ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটিগুলো প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করবে। এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধ করতে হলে ভবনের মালিক, বসবাসকারী, গ্যাস বিতরণকারী কর্তৃপক্ষসহ সব পক্ষেরই দায়িত্বশীল ও সতর্ক ভূমিকা দরকার। ভবনের মালিকদের অবশ্যই উচিত তার ভবনের গ্যাস সংযোগ নিরাপদ আছে কিনা, তা নিয়মিত পরীক্ষা করানো। তাকেই মূল দায়িত্ব পালন করতে হবে। আমরা আশা করি, গ্যাস বিস্ফোরণজনিত দুর্ঘটনা এড়াতে সংশ্লিষ্ট সবাই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবেন।