সম্প্রতি জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার (এফএও) এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। তাতে উঠে এসেছে কৃষি খাতে বিভিন্ন দেশের জনপ্রতি বিনিয়োগ ও মূল্য সংযোজনের পরিমাণ। গবেষণাটির তথ্য বলছে, বাংলাদেশে কৃষিতে জনপ্রতি বিনিয়োগ ও মূল্য সংযোজনের পরিমাণ যথাক্রমে ১৬ দশমিক ৪ ডলার এবং ১ হাজার ৩৭ ডলার। এটি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো, এমনকি রাজনৈতিক অস্থিরতায় জর্জরিত মিয়ানমারের চেয়েও কম। সময়ান্তরে জিডিপিতে অবদান কমে এলেও এখনো মোট শ্রমশক্তির একটা বড় অংশ কৃষিতে নিয়োজিত। তদুপরি পুরো জনগোষ্ঠীর খাদ্য জোগানেও খাতটি ভূমিকা রাখছে। অতিমারী ও নানা দুর্যোগের পরিপ্রেক্ষিতে কৃষির গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। কাজেই দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৃষির টেকসই রূপান্তর ও আগামীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় জনপ্রতি বিনিয়োগ ও মূল্য সংযোজন উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বাড়াতে হবে। এটি আমলে নিয়ে নীতিনির্ধারকদের কার্যকর পদক্ষেপ কাম্য।
গত ৫০ বছরের
যাত্রায় দেশের
কৃষি খাতে
সাফল্য কম নয়। মোট কৃষি উৎপাদন
বেড়েছে অনেক।
স্বাধীনতার অব্যবহিত
পর দেশে
খাদ্য উৎপাদনের
(প্রধানত ধান-গম) পরিমাণ
ছিল ১ কোটি ১০ লাখ টনের
মতো। বর্তমানে
সেটি ৪০ কোটি টন ছাড়িয়ে গেছে।
একইভাবে শস্যনিবিড়তাও আগের চেয়ে বেড়েছে।
ফসলেও এসেছে
কিছুটা বহুমুখিতা। কিন্তু কৃষির সার্বিক
দৃশ্যপটে কিছু
চ্যালেঞ্জ দৃশ্যমান।
অপরিকল্পিত শিল্পায়ন
ও নগরায়ণে
জাতীয়ভাবে কৃষিজমির
ক্রমেই সংকোচন
ঘটছে। আঞ্চলিকভাবেও বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাত
দেখা যাচ্ছে।
বরেন্দ্র অঞ্চলে
খরার প্রবণতা
বাড়ছে। ভূগর্ভস্থ
পানির স্তর
নিচে নেমে
যাচ্ছে। জলবায়ু
পরিবর্তনজনিত কারণে
দক্ষিণাঞ্চলে বাড়ছে
লবণাক্ততা ও স্বাদু পানির
দুষ্প্রাপ্যতার প্রকোপ।
আবার হাওরে
আকস্মিক বন্যার
পৌনঃপুনিকতা ও ভয়াবহতা আগের
চেয়ে বেড়েছে।
ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ফসল ও কৃষি। উপরন্তু
মজুদ, সংরক্ষণ
ও বাজার-বিপণন ব্যবস্থায়
রয়ে গেছে
বড় দুর্বলতা।
সব মিলিয়ে
নানা সংকটের
মুখোমুখি এখন আমাদের কৃষি
খাত। এসব সংকট উত্তরণে
বিনিয়োগ বৃদ্ধির
বিকল্প নেই।
আমরা
দেখছি জাপান,
নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাষ্ট্র, সুইডেন, চীন, দক্ষিণ
কোরিয়া প্রভৃতি
দেশ স্বল্পসংখ্যক লোক নিয়োজন করেও
কৃষির টেকসই
রূপান্তর ঘটাতে
সক্ষম হয়েছে।
কৃষি খাত দেশগুলোর অর্থনীতিতে রাখছে বড় অবদান।
নিজেদের খাদ্য
চাহিদা মিটিয়ে
একটা উল্লেখযোগ্য অংশ রফতানিও করছে।
এটা সম্ভব
হয়েছে কৃষির
যান্ত্রিকীকরণ, বাণিজ্যিকীকরণ, উৎপাদন প্রক্রিয়ার সব ধাপে প্রযুক্তির সম্প্রসারণ, সুদক্ষ ব্যবস্থাপনা, মজুদ সক্ষমতা বৃদ্ধি,
মূল্য সংযোজন,
উন্নত বাজার,
বিপণন ব্যবস্থাসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে লক্ষ্যাভিমুখী বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে।
এসব ক্ষেত্রে
প্রতিবেশী ভারতও
অব্যাহতভাবে বিনিয়োগ
বাড়িয়ে চলছে,
গবেষণা প্রতিবেদনে প্রাপ্ত তথ্য থেকে
যা স্পষ্ট।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কৃষিজমির ক্রমসংকোচনের প্রেক্ষাপটে স্বল্প জমিতে
অধিক ও বহুমুখী ফসল
উৎপাদন, একই
সঙ্গে পুষ্টি
নিশ্চিত করাই
আমাদের সবচেয়ে
বড় চ্যালেঞ্জ। এজন্য পুষ্টিসমৃদ্ধ উচ্চফলনশীল নতুন নতুন জাত
উদ্ভাবন, সেগুলো
দ্রুত কৃষকের
মাঝে পৌঁছে
দেয়া, উৎপাদন
ব্যবস্থাপনা, বিশেষ
করে সার,
সেচ ও কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন করতে
হবে। কৃষিতে
দ্রুত প্রযুক্তির সম্প্রসারণ করতে হবে।
কৃষিবিষয়ক সমন্বিত
তথ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় খাদ্যনীতি প্রণয়ন ও খাদ্য
চাহিদা যথাযথভাবে নিরূপণ করা সম্ভব
হচ্ছে না।
ফলে প্রায়
প্রতি বছরই
উৎপাদন ও চাহিদার সঙ্গে
গরমিল লক্ষ
করা যাচ্ছে।
এ সমস্যা
দূর করতে ডিজিটালাইজড তথ্য ভাণ্ডার গড়ে
তুলতে হবে।
পর্যাপ্ত বিনিয়োগ
বাড়ানো ছাড়া
এসব ক্ষেত্রে
অগ্রগতি সম্ভব
নয়।
দেশে শস্য উৎপাদন বাড়লেও মজুদ সক্ষমতা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়েনি। আবার যা আছে, তাও চলছে সনাতনী পদ্ধতিতে। ফলে একদিকে অনেক খাদ্য সংরক্ষণ যেমন করা সম্ভব হচ্ছে না, তেমনি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অপচয়ও হচ্ছে। কাজেই জাতীয়ভাবে আধুনিক ও মানসম্মত আরো বেশিসংখ্যক গুদাম তৈরি করতে হবে। এটা একটা দিক। অন্যদিকে আঞ্চলিক পর্যায়ে জলবায়ু পরিবর্তন ও অন্য প্রাকৃতিক কারণে কৃষি যেসব সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে, সেগুলো মোকাবেলায় বাঁধসহ বিভিন্ন টেকসই অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। অপরিকল্পিত কৃষি উৎপাদনের ফলে মাটি, পানি ও কৃষকের স্বাস্থ্যে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। নদী ব্যবস্থা নাব্যতা হারাচ্ছে। বিভিন্ন জায়গায় চর পড়ে যাচ্ছে। নদীগুলোর নাব্য ফিরিয়ে আনতে খননকাজ বাড়াতে হবে। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। শুধু খাদ্যশস্য নয়, গবাদি পশু, পোলট্রি, মাছ কৃষির প্রভৃতি উপখাতেও বাংলাদেশ ভালো করছে। কিন্তু এটা কতটা টেকসই হবে তা নিয়ে শঙ্কা রয়ে যাচ্ছে। সন্দেহ নেই, এসব অর্জন টেকসই করতে হলে গবেষণানির্ভর জুতসই হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। তার জন্য চাই পর্যাপ্ত বিনিয়োগ।
সরকার যথার্থভাবেই কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ওপর জোর দিয়েছে। এটা ইতিবাচক। এর মানে কেবল যন্ত্র ব্যবহার নয়। এর সঙ্গে অনেক কিছু যুক্ত। যন্ত্র বিকল হলে তা মেরামতে সার্ভিসিং সেন্টার গড়ে তোলা, খুচরা যন্ত্রাংশের শিল্প,
রক্ষণাবেক্ষণ, দক্ষ জনবল তৈরির মতো দীর্ঘমেয়াদি বিষয় নিয়েও ভাবতে হবে। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ কেন্দ্রও গড়ে তুলতে হবে। কৃষির নানা সাফল্য সত্ত্বেও কৃষি প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে দেশ অনেক পিছিয়ে। এ ধরনের শিল্পের বিকাশ ঘটানো দুদিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। এতে একদিকে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ বাজারের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশেও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রফতানি করা সম্ভব হবে। এ শিল্পের জন্য একটি কার্যকর সরবরাহ চেইনেরও উন্নয়ন করতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
খরা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়সহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রকোপ বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে আগামীতে আমাদের নিয়ন্ত্রিত আবহাওয়ার চৌকস কৃষিতে উত্তরণের কথা বলছেন কৃষিবিজ্ঞানীরা। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জনপ্রতি বিনিয়োগে বাংলাদেশ এখনো বেশ পেছনে রয়ে গেছে। এই কম বিনিয়োগ দিয়ে কৃষির পরবর্তী উল্লম্ফন সম্ভব নয়। শুধু গবেষণা নয়, এজন্য উপযোগী প্রযুক্তির সন্নিবেশসহ অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। তার জন্য বাড়াতে হবে বিনিয়োগ। রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টায় দেশের কৃষি খাতে বিনিয়োগ আরো বাড়বে, এমনটাই প্রত্যাশা।










