দেশে সড়ক ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হলেও সড়ক নিরাপত্তা রয়ে গেছে আশঙ্কাজনক পরিস্থিতিতে। সড়ক নিরাপত্তার ঘাটতিতে প্রতিদিনই দেশের কোথাও কোথাও ঘটছে দুর্ঘটনা; দীর্ঘতর হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় বার্ষিক মৃত্যুহার উচ্চ আয়ের দেশগুলোর দ্বিগুণ এবং বিশ্বের সর্বোচ্চ নৈপুণ্য দেখানো অর্থনীতিগুলোর চেয়ে পাঁচ গুণের অধিক। এমনকি আঞ্চলিক গড় বিবেচনায়ও দেশে সড়কে মৃত্যুহার বেশি। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বিভিন্ন সময় কিছু পদক্ষেপ নেয়া হলেও তাতে মেলেনি তেমন সুফল। এ অবস্থায় দেশে প্রথমবারের মতো নিরাপদ সড়ক করিডোর গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনের তথ্যমতে, প্রাথমিকভাবে ‘নিরাপদ করিডোর’ হিসেবে গড়ে তোলা হবে জাতীয় মহাসড়ক এন-৪-এর গাজীপুর-টাঙ্গাইল ও এন-৬-এর নাটোর-নবাবগঞ্জ অংশকে। ইতিবাচক উদ্যোগটি সব মহাসড়কে বিস্তৃত করে দেশে টেকসই সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাটাই কাম্য।
গত দুই দশকে সড়কভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিপুল বিনিয়োগ হয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টায় বিস্তৃত হয়েছে সড়ক-মহাসড়ক। তবে অন্তর্নিহিত কিছু দুর্বলতার কারণে সড়ক নিরাপত্তায় আশানুরূপ অগ্রগতি হচ্ছে না। প্রতিদিনই প্রাণ ঝরছে সড়কে। ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য একটি নির্দিষ্ট বয়সসীমা ও শিক্ষাগত যোগ্যতা বেঁধে দিলেও সেটি অনেক ক্ষেত্রে মানা হচ্ছে না। অদক্ষ ও ভুয়া লাইসেন্সপ্রাপ্ত চালক গাড়ি নিয়ে নামছেন সড়কে। বেপরোয়া গতিতে চালাচ্ছেন গাড়ি। ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনও অনেক সময় উঠে আসছে সড়কে। উচ্চগতির যানবাহনের সঙ্গে চলছে ধীরগতির যানবাহন। সড়ক নির্মাণেও রয়ে গেছে নকশা ও প্রকৌশলগত ত্রুটি। অনেক জায়গায় অপরিকল্পিত গতিরোধক বিদ্যমান। সেগুলোও অনেক সময় দুর্ঘটনার কারণ হচ্ছে। আবার নিরাপদ সড়ক আইন করা হলেও এর যথাযথ প্রয়োগ নেই। সর্বোপরি, সড়ক ব্যবস্থায় আছে নজরদারির ঘাটতি। বিধৃত কারণগুলোর সঙ্গে এটিও সড়ক নিরাপত্তায় উন্নতি না হওয়ার পেছনে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। সার্বক্ষণিক নজরদারির অভাবে চালক যেমন বেপরোয়া আচরণ করেন, তেমনি নানা জায়গায় চলে অন্যায্য মাশুল আদায়। চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্যে চালক থেকে যাত্রী সবাই ভীতসন্ত্রস্ত। সব মিলিয়ে দেশে সড়ক নিরাপত্তা তলানিতে।
সড়ক নিরাপত্তা একটা বৈশ্বিক প্রপঞ্চ। অনেক দেশে আন্তর্জাতিক মানের সড়ক থাকলেও সড়ক নিরাপত্তা তেমন আশাব্যঞ্জক নয়। বিশ্বে সড়ক নিরাপত্তায় সবচেয়ে এগিয়ে থাকা কয়েকটি উন্নত দেশের মধ্যে রয়েছে নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড, সুইডেন, যুক্তরাজ্য ও জাপান। দেশগুলোয় সড়ক দুর্ঘটনা ও মৃত্যুহার লক্ষণীয়ভাবে কম। প্রতি লাখে গড়ে ৩-৫ শতাংশ মাত্র। উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে থাইল্যান্ড, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তাইওয়ানের কিছু দেশে সাম্প্রতিক সময়ে সড়ক নিরাপত্তায় উন্নতি ঘটেছে। এটা সম্ভব হয়েছে উন্নত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার উন্নয়ন, ট্রাফিক আইনের কঠোর প্রয়োগ, চালক-যাত্রী নির্বিশেষে ট্রাফিক শৃঙ্খলা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সার্বক্ষণিক নজরদারি জোরদারের মাধ্যমে। ওইসব দেশের উত্তম চর্চাগুলো আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।
দেশে সড়ক নিরাপত্তা উন্নয়নে সরকারের সদিচ্ছার ঘাটতি নেই। খোদ প্রধানমন্ত্রীও সড়ক দুর্ঘটনা রোধে নানা নির্দেশনা দিয়েছেন। এছাড়া বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন সময়ে সুপারিশ দিয়েছেন। কিন্তু সেগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হয়নি। দেশে নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে এসব সুপারিশ ও নির্দেশনা বাস্তবায়নের সময় এসেছে। শুধু ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নয়, সড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রেও বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভেবে দেখা উচিত। নিরাপদ সড়ক তৈরির জন্য সুপরিকল্পিত নকশা এবং এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মান বজায় রেখে কাজ করাটা জরুরি। মহাসড়কগুলোয় ফিডার রোড দিয়ে কম গতির গাড়ি, মোটরবিহীন যানবাহন চলাচল বন্ধ করা দরকার, যাতে দুর্ঘটনা হ্রাস পায়। আর মহাসড়কের পাশে থাকা বাজার, মানুষজন রাস্তা পারাপার হয়—এমন স্থানগুলোয় বিশেষ ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়টি এখন সময়ের দাবি।
মানবিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষতি বিবেচনায় দেশে নিরাপদ করিডোর গড়ে তোলার বিষয়টি অনেক দিন ধরে আলোচনা হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে সেটি এখন দুটি মহাসড়কে পরীক্ষামূলকভাবে বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে। বলা হচ্ছে, প্রস্তাবিত নিরাপদ সড়কে থাকবে সিসিটিভি ক্যামেরা। কোনো যানবাহন ট্রাফিক আইন ভাঙলেই ধরে ফেলবে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ। সেখান থেকে বার্তা পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেবে টহল কিংবা ট্রাফিক পুলিশ। দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত পৌঁছে যাবে অ্যাম্বুলেন্স। বিনামূল্যে পৌঁছে দেবে নিকটবর্তী হাসপাতালে। প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য থাকবে দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী ও ট্রমা সেন্টার। সড়ক দুটি নিরাপদ রাখতে সার্বক্ষণিক কাজ করবে একাধিক সরকারি-বেসরকারি সংস্থা। নিঃসন্দেহে এতে সড়কে শৃঙ্খলা আসার পাশাপাশি দুর্ঘটনা যেমন কমে আসবে, তেমনি সার্বিকভাবে বাড়বে যাত্রীদের নিরাপত্তাও। সুতরাং গৃহীত উদ্যোগের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন জরুরি।
নিরাপদ সড়কের প্রয়োজনীয়তা অনুধাবনপূর্বক আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জাতিসংঘ গত দশককে ‘সড়ক নিরাপত্তা দশক’ হিসেবে ঘোষণা করেছিল। এ সময়ে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা ও প্রাণহানি অর্ধেকে নামিয়ে আনার বিষয়ে সদস্য দেশগুলো একমতও হয়েছিল। কিছু দেশে এরই মধ্যে উন্নতি ঘটলেও বাংলাদেশে সড়ক নিরাপত্তায় এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। এমন এক প্রেক্ষাপটে উল্লিখিত দুই মহাসড়কে যে নিরাপদ করিডোর গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী। এ ধরনের উদ্যোগ অন্য মহাসড়কগুলোয়ও বিস্তৃত করা প্রয়োজন। নজরদারি বৃদ্ধি ও প্রযুক্তিভিত্তিক নানা উদ্ভাবনী উপায়ের সন্নিবেশে দেশের সড়ক নিরাপত্তায় আমূল পরিবর্তন আসবে, এটিই প্রত্যাশা।










