দেশে চলছে করোনা মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউ। বাড়ছে সংক্রমণ ও মৃত্যুহার। করোনার এই দ্বিতীয় প্রবাহে সংকটাপন্ন রোগীদের জন্য আইসিইউ শয্যার তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক হাসপাতাল ঘুরেও আইসিইউ না পেয়ে মারা যাচ্ছে রোগী। তার মধ্যে শিশুদের জন্য এই বিশেষায়িত সেবার সুবিধা আরো অপ্রতুল। জনমিতিক বিন্যাসে একটা উল্লেখযোগ্য অংশ শিশু হলেও তাদের জন্য পর্যাপ্ত আইসিইউ সুবিধা নেই। তথ্য বলছে, ঢাকা শিশু হাসপাতালসহ দেশের সরকারি কোনো হাসপাতালে করোনা সংক্রমিত শিশুদের জন্য পেডিয়াট্রিক আইসিইউ (পিআইসিইউ) সুবিধা নেই। করোনা মোকাবেলার ক্ষেত্রে এটি আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বড় অসংগতি ও দুর্বলতা বৈকি।
করোনার প্রথম ঢেউয়ে শিশুদের মধ্যে আক্রান্তের হার ছিল কম। গবেষণার তথ্যমতে, বিশ্বব্যাপী শিশুদের আক্রান্তের হার ছিল ২ থেকে ৩ শতাংশের মধ্যে। তবে এবার দ্বিতীয় ঢেউয়ে শিশুদের সংক্রমণের হার বাড়ছে। বিশেষত ভারতে ভাইরাসটির নতুন ধরনে বিপুলসংখ্যক শিশু সংক্রমিত হচ্ছে। অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে অনেক শিশুর মারা যাওয়ার খবরও মিলছে। করোনার নতুন ধরনটি বাংলাদেশে পৌঁছলে তা শিশুদের জন্য মারাত্মক বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে বলে শঙ্কা ব্যক্ত করছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। তেমনটি হলে পরিস্থিতি সামাল দেয়া কঠিন হবে। এ অবস্থায় শিশুদের সুচিকিৎসার বিষয়টি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপকদের বিবেচনার দাবি রাখে। বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দেশে কেবল চট্টগ্রাম ও ঢাকা মেডিকেল কলেজে পিআইসিইউ আছে। তাও গড়ে উঠেছে স্থানীয় উদ্যোগে, সরকারি উদ্যোগে নয়। আর আছে স্বল্পসংখ্যক বেসরকারি হাসপাতালে। অথচ শিশুদের জন্য করোনা নিবেদিত ঢাকা শিশু হাসপাতালেও নেই কোনো পিআইসিইউ। এটা হতাশাজনক। আইসিইউ না থাকায় গুরুতর শিশুদের ঢামেক হাসপাতালে পাঠাতে হচ্ছে। সেখানেও সঠিক সময়ে শয্যা ফাঁকা পাওয়া যাচ্ছে না। চিকিৎসকদের ভাষ্যে উঠে এসেছে, যথাযথভাবে আইসিইউ সুবিধা দেয়া গেলে কভিডে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া শিশুদের অনেককেই বাঁচানো যেত। কাজেই এ প্রেক্ষাপটে শিশুদের জন্য পিআইসিইউ সুবিধা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ও শ্রীলংকায় শিশুদের আইসিইউ সুবিধা তুলনামূলক ভালো। ভারতে গত শতকের নব্বইয়ের দশকের প্রথম দিকে শিশুদের জন্য বিশেষায়িত সেবা চালু হয়েছে। ব্যক্তি উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগেও দেশটিতে পিআইসিইউ সুবিধা বাড়ানো হয়েছে; যদিও মহামারীর মতো পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য তা যথেষ্ট নয়। তবে এক্ষেত্রে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো বেশি এগিয়ে। বিশেষত শূন্য দশকের প্রথম দিকে সার্স ভাইরাসের প্রকোপের পরিপ্রেক্ষিতে তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়াসহ কিছু দেশ তাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজিয়েছিল। বয়স্ক থেকে শুরু করে শিশু সব বয়সগোষ্ঠীর জন্য উপযোগী করে পর্যাপ্ত আইসিইউ সুবিধাসহ সার্বিক স্বাস্থ্য সক্ষমতা বাড়িয়েছিল। চলমান মহামারী মোকাবেলায় দেশগুলো অনেকটা সফল হওয়ার পেছনেও এ বিষয়টি কাজ করেছে বৈকি। বর্তমান সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদেরও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজন।
সত্য যে আইসিইউ সুবিধা বাড়ানো সময়সাপেক্ষ বিষয়। এক্ষেত্রে রাতারাতি উন্নতি সম্ভব নয়। কিন্তু কাজটি এখন থেকে শুরু করতে হবে। এখানে শুধু অবকাঠামো নয়, জনবলেরও একটা বিষয় আছে। বরাদ্দ বাড়িয়ে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি-চিকিৎসাসামগ্রীর পাশাপাশি ধাপে ধাপে দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে হবে। বাড়াতে হবে প্রশিক্ষণ। বিদ্যমান অবকাঠামোর মধ্যে অনেক হাসপাতালে শিশুদের জন্য আইসিইউ স্থাপন সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে অবকাঠামো সম্প্রসারণ করে কীভাবে আইসিইউ গড়ে তোলা যায়, সেই চেষ্টা করতে হবে।
চলতি ঢেউয়ে যে হারে শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে, তা শঙ্কাজাগানিয়া। ভারতের নতুন ধরনের অনুপ্রবেশ ঘটলে পরিস্থিতি আরো ভয়ানক হবে। দুঃখজনকভাবে, এখন পর্যন্ত শিশুদের সংক্রমণ বাড়লে কীভাবে চিকিৎসা দেয়া হবে, তার পরিকল্পনা দৃশ্যমান নয়। শিশুদের জন্য কভিড নিবেদিত হাসপাতালের সংখ্যাও সীমিত। সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবেলায় তাই সরকারি দুটি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি যেসব হাসপাতালে পিআইসিইউ আছে, তার মধ্যে একটা সমন্বয় দরকার। আর জরুরি ভিত্তিতে শিশুদের কিছু আইসিইউ শয্যা বাড়ানো যায় কিনা, তার উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষায়িত সেবা বাড়ানোর ক্ষেত্রে বরাবরই অপ্রতুল বরাদ্দের কথা বলা হয়। এটা অস্বীকারের জো নেই। কিন্তু যা বরাদ্দ দেয়া হয়, অনেক ক্ষেত্রে তাও যথাযথভাবে ব্যয় হয় না। বরাদ্দকৃত অর্থের সদ্ব্যবহার করলে শিশুদের জন্য পিআইসিইউ সুবিধা বাড়ানো মোটেই কঠিন নয়। এখানে সদিচ্ছাটাই মুখ্য।
মনে রাখা চাই, চলমান মহামারীই শেষ স্বাস্থ্য দুর্যোগ নয়। আরো বিপর্যয় সামনে আসতে পারে। এছাড়া ডেঙ্গু, নিউমোনিয়ার মতো নৈমিত্তিক রোগের প্রকোপ তো আছেই। সেগুলো মোকাবেলায় এখন থেকে প্রস্তুতি নিতে হবে। সেক্ষেত্রে শিশুদের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দিয়ে বিশেষায়িত সেবাগুলো বাড়াতে হবে। সেটা শুধু রাজধানী বা বড় শহরকেন্দ্রিক নয়, উপজেলা পর্যায়েও বিস্তৃত করতে হবে। তার সমান্তরালে গড়ে তুলতে হবে প্রশিক্ষিত জনবল। কভিড-১৯ মহামারী আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো পরস্ফুিট করেছে। এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে এখন স্বাস্থ্য ব্যবস্থার টেকসই রূপান্তরই কাম্য।










