কখনো ভাবিনি এমন একটি বিষয় নিয়ে লিখব, যার কারণে নিজেকেই ঘরের মধ্যে বন্দি জীবনযাপন করতে হচ্ছে। অথচ আমি নিজে একজন অণুজীববিজ্ঞানী এবং অনেকদিন ধরে ভাইরোলজি পড়াই। বর্তমানে নভেল করোনাভাইরাস পরীক্ষার জন্য যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপিত ল্যাবটি দেখভাল করছি। কখনো এমন একটি মহামারীর বিষয়ে বলা হয়নি। তবে এ ধরনের ভাইরাস এমন কাজ করতে পারে সেই অনুমান বিজ্ঞানীদের ছিল। কী সুন্দর চেহারা দেখতে। অথচ কী ভয়ংকর! বিজ্ঞানী ছাড়া সাধারণ মানুষ নিজ চোখে যাকে দেখেনি, তার জন্য কত যন্ত্রণা! সব সভ্যতা থমকে গেল। আমাদের সব ক্ষমতা ‘নাই’ হয়ে গেল। কত ক্ষমতাহীন সারা বিশ্ব। অবাক হয়ে চেয়ে রই। এ মুহূর্তে যখন লিখছি তখন ওয়ার্ল্ডোমিটারে দেড় লাখের বেশি মানুষ মারা গেছে। বাঙালিরা কতই হুজুগে মাতাল যে নভেল করোনাভাইরাস নিয়ে তর্কে একজন নিহত ও ১২ জন আহত হয়েছে। খুবই অবাক হলাম। এছাড়া এটি নিয়ে ফেসবুকে ট্রল, গুজব ও মিথ্যার ছড়াছড়ি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত দুই মাসে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে প্রায় সাড়ে ছয় লাখ মানুষ। এ বিরাটসংখ্যক মানুষ যারা দেশে এসেছে, তারা কেউ হোম কোয়ারেন্টিন মানতে রাজি নয়। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানী শিক্ষকও নন। ফলে কী হবে কিছুটা হলেও ভাবনার বিষয়। অনেক ভুল তথ্যের মধ্যে প্রথম হলো এটির উৎস নিয়ে। অনেকেই বলেন, এটি এসেছে ল্যাব থেকে। কেউ বলেন, এটি ছেড়েছে চীন। কেউ বলেন, আমেরিকা। এটি একটি ল্যাবে পরিবর্তন করে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। এ রকম আজগুবি অনেক কিছু। পৃথিবীর বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার মেডিসিনে আমেরিকার একদল বিজ্ঞানী এ ভাইরাসের আরএনএ ডাটা বিশ্লেষণ করে দেখেছেন যে বাদুড় বা বনরুই-জাতীয় প্রাণী থেকে এটি আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
দ্বিতীয় তথ্যবিভ্রাট, কোথা থেকে ছড়ায়। অনেক লিফলেটে দেখলাম, ডিম ভালোভাবে সেদ্ধ করে খেতে বলা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো চীন থেকে এটি ছড়ানোর পর এখন পর্যন্ত অন্য কোথাও প্রাণী থেকে ছড়ানোর তথ্য পাওয়া যায়নি। এখন আসি চিকিৎসা সম্পর্কে ভুল তথ্য ও গুজব সম্পর্কে। বিভিন্ন ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্যমতে, গরুর গোবর ও মূত্র খেলে করোনা থেকে মুক্ত থাকা যায়, যার কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ কেউ দেখাতে পারেননি। পেঁয়াজ, রসুন, নিম খেলে করোনা থেকে মুক্ত থাকা যায়, এমন তথ্যও দিচ্ছেন অনেকে। অনেক গাছের মধ্যে ঔষধি গুণাগুণ আছে এটি ঠিক, তাই বলে করোনায় কাজ করবে এমনটা বলা মনে হয় ঠিক হবে না। এমন যে জিনিসগুলো অন্য ভাইরাসের বিরুদ্ধে ভালো কাজ করে, তারা করতে পারে। তবে সেটা এত সহজে বলা ঠিক নয়। কারণ ভাইরাসটি তার স্বজাতি থেকে অনেক ভিন্নতা দেখাচ্ছে, তাই তো এত কথা বলা।
তৃতীয় ভুল তথ্য হলো হাত ধোয়া নিয়ে। কোথাও হ্যান্ড স্যানিটাইজার বা হেক্সিসল পাওয়া যাচ্ছে না। তার মানে হলো, মানুষ ভাবছে শুধু এগুলো দিয়েই ভাইরাস মারা যায়। অন্য কিছু কাজ করবে না। কিন্তু প্রকৃত তথ্য হলো, যত বেশি ক্ষার তত ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকরী। তার মানে হলো, কাপড় কাচা সাবান বা সোডা বেশি কার্যকরী। তাই বলে তো আর রাস্তায় সাবান নিয়ে ঘোরা যাবে না। স্যানিটাইজার বা হেক্সিসল না পেলে বাসায় এসে কাপড় কাচার সাবান দিয়ে হাত ধুলেও হবে। পরবর্তী ভুল ধারণা হলো, চীন বা অন্য কোনো দেশ, যেখানে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে, সেখানকার জিনিস ব্যবহার করা যাবে না। আমেরিকার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বিজ্ঞানী গবেষণায় পেয়েছেন যে করোনা বাতাসে ৩ ঘণ্টা, কপারে ৪ ঘণ্টা, শক্ত কাগজে ২৪ ঘণ্টা, প্লাস্টিক ও স্টিলে তিনদিন বেঁচে থাকে। এখন সহজে যে কারো পক্ষে সিদ্ধান্ত নেয়া সহজ কখন কোন জিনিসটি বাইরে থেকে আনলেও ব্যবহার করা যাবে। এছাড়া লিফট, সিঁড়ি, টাকা বা অন্য কিছু কী দিয়ে তৈরি, তার ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে কখন ব্যবহার করা যাবে।
সেদিন রাস্তায় বের হয়েছিলাম করোনার লিফলেট বিতরণের জন্য। আমার ধুলাবালিতে সমস্যা হয় বলে মাস্ক পরেছিলাম। মাস্কটি একটু বাঁকা ছিল। একজন আমাকেই বলল, ঠিক করে পরেন। বুঝলাম মানুষের মধ্যে নিয়ম মানার ইচ্ছা আছে। কিন্তু প্রকৃত তথ্য জানা নেই। রাস্তায় বের হলেই দেখবেন হরেক রকম মাস্কের ছড়াছড়ি। কোনটি এবং কখন প্রকৃতভাবে ভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করবে? বিজ্ঞানীরাই এ বিষয়ে ভিন্ন তথ্য দিয়েছেন। পৃথিবীর অন্য একটি বিখ্যাত সাময়িকী দ্য ল্যানসেটের ভিত্তিতে তথ্যগুলোর সারাংশ দিলাম মাত্র। সিদ্ধান্ত পাঠকের। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত মানুষ অবশ্যই মাস্ক পরবে। সুস্থ মানুষ, যারা করোনা আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে আসবে, তাদের অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। চীনে যখন ছড়ায় তখন যে তথ্য দেয়া হয়েছিল তা হলো হাসপাতাল, ট্রেন বা জনবহুল জায়গা, আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনা আছে এমন মানুষ, আইন-শৃঙ্খলার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। তবে সেটা অবশ্যই সার্জিক্যাল অথবা এন৯৫ মাস্ক হতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, হংকং একই ধরনের কথা বলেছে। তবে যেখানে মাস্কই পাওয়া যায় না, সেখানে এসব কথা বলে লাভ কী? এছাড়া বলা হয়েছে, বাড়িতে অবস্থানরত বা ভালো পরিবেশে কাজ করেন এমন ব্যক্তিদের মাস্ক পরার প্রয়োজন নেই বা প্রয়োজন মনে করলে কাপড়ের মাস্ক ব্যবহার করা যাবে। এগুলো পুরোপুরি ভাইরাস প্রতিরোধ না করলেও কিছুটা তো করবেই। কারণ ভাইরাস তো একা থাকে খুবই কম। এটি ধুলাবালির সঙ্গে লেগে থাকে বেশি। আরো গরিব মানুষ যারা, তারা ইচ্ছা করলে গামছাও কয়েক ভাঁজ করে পরতে পারেন, তাতে উপকার হবে। তাই আমাদের এভাবে সক্ষমতা অনুসারে ব্যবস্থা নিতে হবে।
সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা যেটি তা হলো, রোগের লক্ষণ নেই মানে বিদেশ থেকে এলে আর ঘরের মধ্যে থাকতে চাই না। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, দুই থেকে ১৪ দিনের মধ্যে রোগ না হলেও অন্যের শরীরে সেটা যেতে পারে। কিন্তু আমরা বিদেশ থেকে এসে বিয়ে খাচ্ছি, বিয়ে করছি। এ কারণেই এখন বেশি ছড়াবে। তাই আপনার বাড়ির পাশে কেউ বিদেশ থেকে এলে তার কাছে যাবেন না বা তাকে বাইরে বের হতে দেবেন না। আমি যখন লিফলেট বিতরণ করি তখন অনেকে বলেছেন যে গরিব মানুষের এটি হবে না। দুঃখিত, এ ভাইরাস কাউকে গরিব বা ধনী হিসেবে চেনার জন্য কোনো ব্যবস্থা রাখেনি। এ ভাইরাসের প্রধান গুণ আমরা এরই মধ্যে জেনে গেছি। তা হলো, এর সংক্রমণ হার। এখন বাংলাদেশে সেই হারে ছড়াইনি মানে এটা নয় যে ছড়াবে না। অনেকে দাবি করছেন গরমে ছড়াবে না। কিন্তু এরই মধ্যে কিছু গরম দেশেও ছড়িয়ে গেছে। সুতরাং গরমে ছড়াতে পারে, তবে প্রকোপ কিছুটা কম হতে পারে। এখন পর্যন্ত এ ভাইরাসের সমস্যা হলো, এটি তার জাত ভাই থেকে ১৯ ভাগ আলাদা। ফলে অনেক তথ্য বলা হচ্ছে তার জাত ভাইদের সঙ্গে তুলনা করে। সেটি সত্য না-ও হতে পারে। একটি বছর না গেলে পুরোপুরি বলা যাবে না এর চরিত্র সম্পর্কে। তাছাড়া ইতালির ভাইরাসটি চীন থেকে উত্পত্তি হওয়া থেকে দুই-তিনবার পরিবর্তন হয়েছে, এটি স্পেনের ভ্যালেন্সিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা জেনোম সিকোয়েন্স করে প্রমাণ করেছেন। ফলে এ ভাইরাস নিয়ে যা খুশি তা বলাটা এত সহজ নয়।
রাজবাড়ীর মতো তর্ক করে নিহত হওয়ার চেয়ে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিন। যে তথ্য বলা হলো, সেভাবে সতর্ক থাকুন এবং অন্যকে থাকতে বলুন। ভুল তথ্যে বিশ্বাস করবেন না। শুধু সরকারের একার পক্ষে এটির মোকাবেলা সম্ভব নয়। সবার প্রচেষ্টাই পারবে বড় আকারে ছড়িয়ে পড়া থেকে দেশকে রক্ষা করতে।
ড. মো. ইকবাল কবীর জাহিদ: অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান
অণুজীববিজ্ঞান বিভাগ, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়










