আমার খুব পছন্দের ব্যক্তিদের মধ্যে একজন হলেন স্বনামধন্য লেখক, শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। তিনি এত পরিশীলিত ও বস্তুনিষ্ঠনির্ভর ভাষা প্রয়োগ করেন, যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুধু শুনে যেতে মন চায়। তিনি একটি কথা প্রায়ই বলে থাকেন, ‘মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়।’ এ কথাটি আজ খুব মনে পড়ছে। তার কারণ হলো, মানুষ পৃথিবীতে যা কিছু অর্জন করেছে, প্রাথমিকভাবে তার মূলে রয়েছে স্বপ্ন এবং পরবর্তী সময়ে নিষ্ঠা, শ্রম এবং সংগ্রাম। সেই সূত্র ধরে পাঁচ দশক আগে একটি জাতি স্বপ্ন দেখেছিল একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের, যার নাম হয়েছিল বাংলাদেশ। সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করছি এ স্বপ্নের রূপকার-জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান, মুজিবনগর সরকার এবং এ দেশের সোনার সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের, যারা একটি রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জন করেছিল একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র।

মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী প্রজন্মের একজন হয়ে দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে চাই কী অপরিসীম দেশপ্রেম ও ত্যাগ সেদিন আচ্ছন্ন করে রেখেছিল সাত কোটি মুক্তিকামী বাঙালিকে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসের এই গৌরবময় সুবর্ণজয়ন্তীতে আজ অনেক কিছুই ব্যক্ত করার অভিপ্রায় মনে উঁকি দিচ্ছে। একটি কথা ভেবে সেদিন মনে হলো যে আমরা খুব সম্ভবত একটি রাষ্ট্র পেয়েছি, যেখানে ৭ মার্চ, ২৬ মার্চ ও ১৬ ডিসেম্বর—এ তিনটি দিবসই একই বছরে সুবর্ণজয়ন্তী পালন করছে। নিঃসন্দেহে এটি একটি অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ ঘটনা।

স্বাধীনতার মূল অভিপ্রায় ছিল একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র এবং সার্বিকভাবে একটি মুক্তির সংগ্রাম। মুক্তি সবসময় একটি সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জন করতে হয়। সেই সংগ্রাম ছিল স্বাধীনতার সংগ্রাম। বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের দুর্নিবার ভাষণে বলেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ তিনি কেন ‘মুক্তি’ শব্দটি আগে বললেন? স্বাধীনতার জন্য একজন তৃষ্ণার্ত মানুষকে প্রাথমিকভাবে মুক্তিকামী হতে হয়, তার পরে সেই মানুষটিই একসময় উপলব্ধি করে যে মুক্তির জন্য স্বাধীনতা অপরিহার্য। মুক্তি অনেক ব্যাপক ও গভীর ব্যাপার। স্বাধীনতা বলতে রাজনৈতিক স্বাধীনতা বোঝানো সম্ভব কিন্তু মুক্তি বলতে বোঝাবে সার্বিক মুক্তি। আমাদের যে প্রাক-সংগ্রাম শুরু হয়েছিল ১৯৪৮ সাল থেকেই, সেটি বোঝা যায় যখন রাষ্ট্রভাষার আন্দোলনের দাবিতে ১৯৪৮-এর ১১ মার্চ ঢাকায় ধর্মঘট হয়েছিল।

মুক্তিযুদ্ধপূর্ব ও পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতা ও মুক্তি—এ দুয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য লক্ষ করা যায়নি। অথচ এ দুটি শব্দের মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান। তা না হলে পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে সংবিধানে যে পরিবর্তন আনা হয়েছে, তাতে ‘মুক্তি’ সরিয়ে সে জায়গায় ‘স্বাধীনতা’ বসানো হলো কেন, কেন প্রয়োজন পড়ল এ সংশোধনের? আমরা যদি আমাদের আদি সংবিধানের প্রস্তাবনার শুরুতে লক্ষ করি, তবে দেখা যাবে যে এক নম্বর অনুচ্ছেদেই বলা হয়েছিল, ‘আমরা বাংলাদেশের জনগণ ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের মার্চের ২৬ তারিখে স্বাধীনতা ঘোষণা করিয়া জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করিয়াছি।’

১৯৭৮-এ জারি করা এক ফরমানের বলে সংবিধানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। প্রস্তাবনার ওপরে লেখা হয়েছে, ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ এবং প্রথম অনুচ্ছেদের যেখানে ছিল ‘জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রাম’-এর কথা, সেটি বদলে প্রতিস্থাপিত হয়েছে ‘জাতীয় স্বাধীনতার জন্য ঐতিহাসিক যুদ্ধ।’ শুধু তাই নয়, এর পরে দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে যেখানে অঙ্গীকারের কথা আছে, সেখানেও ‘জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম’ কেটে বসানো হয়েছে ‘জাতীয় স্বাধীনতার যুদ্ধ’। সেই সঙ্গে যোগ করা হয়েছে সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থার কথা এবং বাদ দেয়া হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতা। আদি সংবিধানে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ছিল এবং তার স্থান ছিল জাতীয়তাবাদের পরেই। অর্থাৎ প্রথম অঙ্গীকার জাতীয়তাবাদের, দ্বিতীয় অঙ্গীকার সমাজতন্ত্রের। সংশোধনীতে সমাজতন্ত্র বাদ দেয়া হয়নি সত্য কিন্তু তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে সর্বশেষে এবং সমাজতন্ত্র বলতে বোঝানো হয়েছে, ‘অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুবিচার।’ আদিতে নাগরিকদের জাতীয়তাবাদ ছিল বাঙালি, সংশোধনের ফলে তা দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশী।

সংবিধানের সংশোধনগুলো মোটেই পরস্পরবিচ্ছিন্ন নয়; তারা একটি অভিন্ন চিন্তাধারার প্রতিফলনও বটে। প্রস্তাবনার সংশোধনীতেই ‘জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রাম’ রূপান্তরিত হয়েছে ‘জাতীয় স্বাধীনতার জন্য ঐতিহাসিক যুদ্ধ’। ব্যাপারটা যত সহজ মনে হয় তত সহজ নয়। যুদ্ধ একাত্তরের ব্যাপার বটে, কিন্তু সংগ্রামের ইতিহাস সুদীর্ঘ, যুদ্ধ সংগ্রামের একটি অংশবিশেষ। সংগ্রাম একাত্তরে শুরু হয়নি, শেষও হয়নি। ১৯৭৮-এ যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত, তারা যুদ্ধটাকেই ঘটা করে দেখতে চেয়েছেন সংগ্রামকে উপেক্ষা করে। কেননা তারা যুদ্ধে ছিলেন, সংগ্রামে ছিলেন না।

বলা বাহুল্য, স্বাধীনতার জন্য লড়াই হয়েছে একাত্তরে। অনস্বীকার্য। পাকিস্তান রাষ্ট্রের পরাধীনতা থেকে বের হয়ে এসে আমরা একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছি। কিন্তু সেটা একমাত্র লক্ষ্য ছিল না; মূল লক্ষ্য ছিল অনেক ব্যাপক ও বিস্তৃত। সেটি ছিল জনগণের মুক্তি। যে চারটি রাষ্ট্রীয় মূলনীতির উল্লেখ করা হয়েছে, তার একমাত্র চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল মুক্তির। সুতরাং হাতিয়ার ছিল স্বাধীনতা যুদ্ধ, মূল লক্ষ্য ছিল মুক্তি।

মুক্তির জন্য সংগ্রামটা দীর্ঘকালের। এ লড়াইয়ে অজস্র মানুষ এসেছে, অনেক সংগঠন যোগ দিয়েছে। অভ্যুত্থান হঠাৎ করে ঘটেনি। একাত্তরে শুরুও নয়, শেষও নয়। মুক্তির সংগ্রাম এখনো চলছে এবং চলবে। শেষ যে হয়নি, তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ ওই সংশোধনগুলো। ওগুলোর উদ্দেশ্য হচ্ছে সংগ্রামের লক্ষ্যকে অস্পষ্ট করে দেয়া। মানুষকে বিভ্রান্ত করা। মুক্তির সংগ্রামকে একটি সামরিক যুদ্ধ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। নিশ্চিতভাবে একাত্তরের সমর নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী ঘটনা কিন্তু সেটা একমাত্র ঘটনা নয়, প্রথমও নয়। বাঙালি মুক্তির জন্য সংগ্রাম ১৯৪৮ সাল থেকেই একটু একটু করে বিছিন্নভাবে হয়ে এসেছে। প্রচার করা হয়েছিল যে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা মুক্তি দেবে। কিন্তু সে আশায় গুড়ে বালি!

১৯৭০ সালের নির্বাচন-পরবর্তী ছয় দফা পাল্টে গিয়ে রূপ নিল এক দফায়। বঙ্গবন্ধু তার চিরাচরিত ভাষায় পাকিস্তানিদের উদ্দেশে বললেন, ‘কত নেছো, কত দেবা, কবে যাবা!’ সেই এক দফা হলো রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা এবং জাতীয় মুক্তি। তারপর এ দেশের মুক্তিকামী বাঙালি বসে থাকেনি। আক্রমণকে তারা কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর ওপর আঘাত হিসেবে দেখেনি, দেখেছে তাদের অস্তিত্বের ওপর আক্রমণ হিসেবে। সেভাবেই তারা প্রতিঘাত ব্যক্ত করেছে। অংশ নিয়েছে মুক্তিযুদ্ধে।

যুদ্ধের পেছনে যে চেতনা নিহিত সেটা মুক্তির, যে মুক্তির সংজ্ঞা পাওয়া গেছে রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতিতে। মূলনীতিগুলো যুদ্ধে জনগণের অংশগ্রহণ থেকেই বের হয়ে এসেছে। সেটি না হলে কারো সাধ্য ছিল না ওগুলোকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার; যেমন যুদ্ধের সময়ে ও তার অব্যবহিত পরে কারো সাধ্য ছিল না তাদের অস্বীকৃতি জানায়। কিন্তু শাসনক্ষমতা যখন জনগণের কাছ থেকে দূরে সরে গেল, তখনই সম্ভব হয়েছে মূলনীতি সংশোধনের। মুক্তির জায়গায় চলে এল স্বাধীনতা।

১৯৭৮ সালের সাংবিধানিক সংশোধনগুলো দক্ষিণপন্থী। সেটির রেশ ধরে পরে জেনারেল এরশাদের সময়ে পুঁজিবাদের পথকে আরো সুপ্রশস্ত করা হলো। রাষ্ট্রধর্ম প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে পশ্চাত্গমনেচ্ছুদের অলংকৃত করা হলো। বঙ্গবন্ধু এই দক্ষিণপন্থীদের প্রধান শত্রু মনে করেননি। বামপন্থীরা তার মিত্র ছিল না ঠিকই, কিন্তু তারা তার জন্য তত বড় হুমকিস্বরূপ ছিল না; যতটা না ছিল তার আশপাশে লুকিয়ে থাকা কুচক্রী ও দুর্বৃত্তরা।

১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী উত্থাপন করে ২৪ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু যে  ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’-এর (বাকশাল) ঘোষণা দিয়েছিলেন, সেটি মুক্তিকামী জনগণের কণ্ঠস্বর নয় বলে একজন পথ হারানো জননায়ক স্বগতোক্তি করেছিলেন। বাকশালের পক্ষে-বিপক্ষে অনেক বিতর্ক আছে ঠিকই, কিন্তু সেই সময়ের পরিস্থিতি একটু নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে বঙ্গবন্ধু মানুষের ঐক্যকে সর্বসম্মতিক্রমে একটি সর্বজনীন প্লাটফর্মে আনতে চেয়েছিলেন। অত্যন্ত উঁচু একটি জায়গায় ছিলেন তিনি, অতটা জনপ্রিয়তা ও ক্ষমতা কখনো কোনো বাঙালি রাষ্ট্রনায়ক আজ অব্দি লাভ করেননি। কিন্তু সদ্য স্বাধীন দেশে নৈরাজ্য, অস্থিরতা তাকে অস্থির করে তুলেছিল। পার্লামেন্টে যখন জেনারেল ওসমানী ও ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন বাকশালের বিরোধিতা করেছিলেন, বঙ্গবন্ধু উত্তরে বলেছিলেন, ‘I understand the sentiment of members of the parliament. But I go for a great mandate’. বাকশালকে মানুষের কাছে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরা হয়। সে সময় দেশের অনেক ভয়াবহ সমস্যা ছিল, যেগুলো তত্কালীন সরকার সামাল দিতে পারছিল না। ঘাতকরা ওই বিচ্ছিন্নতার সুযোগ নিয়েছে। নইলে অতি নিষ্ঠুর পাকিস্তানি শাসকরা যে কাজ করতে সাহস পায়নি, সে কাজ করার মতো দুঃসাহস স্থানীয় দুর্বৃত্তরা সংগ্রহ করতে পারত না। বঙ্গবন্ধু নিজেও বলেছিলেন, বাকশাল একটি সাময়িক ব্যবস্থা, কিন্তু সেটা পরীক্ষিত হওয়ার আগেই তাকে নরপশুর দল হত্যা করে।

জাতিসংঘ বাংলাদেশকে ২০২৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বিবেচনা করবে। বলা হয়ে থাকে বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। অনেক অবকাঠামোগত কাজ হয়েছে ও হচ্ছে। বলা বাহুল্য, আমরা কি একটু চিন্তা করে দেখেছি উন্নতি মানে বড়জোর ২০ জনের উন্নতি এবং ৮০ জনের অবনতি? কিসের মূল্যে উন্নতি হয়েছে? আমাদের দেশে ও প্রবাসী বাঙালিদের মধ্যে কিছু ভুঁইফোড় বুদ্ধিজীবীর (pseudo-intellectual) আবির্ভাব হয়েছে, যারা নাকি এ দেশের অনেক কিছু নিয়ে তাদের একপেশে, নিরর্থক, গালভরা বক্তব্য দেন, কিন্তু সমস্যাটা হলো, তারা সমালোচনা করতে করতে এক পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধকেও বিতর্কিত করার প্রয়াস করে থাকেন। একটি দলকে সমালোচনা করতে করতে তারা মুক্তিযুদ্ধকেও বিতর্কিত করে তোলেন! আমাদের উপলব্ধি করতে হবে মুক্তিযুদ্ধ কোনো দলের বা গোষ্ঠীর সম্পত্তি নয়, এটি এককভাবে বাঙালির গৌরব ও অহংকার। জাতি আজ কীভাবে বিভক্ত বুঝতে আর বাকি নেই! আমাদের মধ্যে যে জাগতিক অস্থিরতা বিরাজমান, তাতে করে মূল্যবোধ থাকার কথা নয়। সব কিছুই আছে, কিন্তু তাতে প্রাণ নেই, শুধুই লৌকিকতা। স্বাধীনতা দিবসের এই সুবর্ণজয়ন্তীতে আরো একবার একটি শান্ত, সামাজিক মূল্যবোধসম্পন্ন, বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখে যেতে চাই, যে স্বপ্নের নির্যাস হবে একটি মুক্ত বাংলাদেশ তথা বাঙালির মুক্তি।

রেজওয়ান উর রহমান: প্রবাসী কলাম লেখক