বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ছয়-নয় সুদহার বেঁধে দিয়েছিল। বর্তমানে সেটিই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে উচ্চমূল্যস্ফীতির কবলে পড়ে। গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতির কঠিন চাপে দেশের অর্থনীতি। সরকারি হিসাবেই চলতি বছরের এপ্রিলে দেশে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৬ দশমিক ২৯ শতাংশ। দ্রব্যমূল্য অস্বাভাবিক বাড়ায় মূল্যস্ফীতির এ চাপ দিন দিন আরো ভারী হচ্ছে। মূল্যস্ফীতির হার যে পর্যায়ে উঠেছে, তাতে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দেয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে ঋণ ও আমানতের সুদহার নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে বেঁধে দেয়া সুদহার মেনে চলা সম্ভব হচ্ছে না। এরই মধ্যে ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের কাছ থেকে ৯ শতাংশের বেশি হারে সুদ আদায় করতে শুরু করেছে। ব্যাংকের সুদহারের সীমা বেঁধে দেয়া বাজার অর্থনীতির নীতিবিরুদ্ধ হলেও সেটি করা হয়েছিল বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্য সামনে রেখে। কিন্তু করোনার কারণে তা আর হয়ে ওঠেনি। এখন মূল্যস্ফীতি বেড়ে ওঠার পরিপ্রেক্ষিতে ছয়-নয় সুদহার নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। উচ্চমূল্যস্ফীতি ও টাকার মানের অবমূল্যায়ন এবং ডলারের সংকটের মধ্যে এটি ধরে রাখাই কঠিন হয়ে পড়ছে। এমন অবস্থায় বাজেটে কী ধরনের নির্দেশনা থাকে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

প্রতিটি দেশের চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মূল্যস্ফীতি। পরিস্থিতি সামাল দিতে উন্নত বিশ্বের দেশগুলো বাড়াচ্ছে সুদহার। বাংলাদেশেও মূল্যস্ফীতি ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে, যা আরো উসকে দিচ্ছে সাম্প্রতিক সময়ের ডলার সংকট। টাকার বিপরীতে ডলারের মূল্যবৃদ্ধির উল্লম্ফন শুধু মূল্যস্ফীতি নয়, সুদহারের ওপরও চাপ সৃষ্টি করছে। গত প্রায় চার দশকে মূল্যস্ফীতি সর্বোচ্চ অবস্থানে থাকায় এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, ব্রাজিল, রাশিয়াসহ সব বড় দেশ সুদহার বাড়িয়েছে। যুদ্ধ, মূল্যস্ফীতি ও সুদ বৃদ্ধির জেরে বাজার আরো অস্থির। সাধারণত মুদ্রার মান পড়ে গেলে বা মূল্যস্ফীতি বেড়ে গেলে ব্যাংকে সুদহার বাড়ানো হয়। অর্থাৎ নতুন নোট না ছাপিয়ে বরং বিদ্যমান নোট যাতে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বিশেষ কারণ ছাড়া বাইরে চলে না যায়, তার জন্য সুদহার বাড়ানো হয়। আর মূল্যস্ফীতি খুব বেশি বাড়লে ব্যাংক সুদহার সমন্বয় করে বাজারে অর্থ সরবরাহ কিছুটা কমিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু বাংলাদেশে সুদহার বৃদ্ধির এমন উদ্যোগ এখনো দেখা যায়নি।

সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকরা সার্বিক পরিস্থিতি যথাযথভাবে বিবেচনা করে সঠিক পথটিই বেছে নেবেন বলে সবার প্রত্যাশা। তবে মনে রাখতে হবে এত কিছুর পরও মূল্যস্ফীতি কিছুটা হবেই। আর এতে সাধারণ মানুষ বিশেষত যাদের আয় কম তারা চাপের মুখে পড়বে। পুরো সংকট কেবল মুদ্রানীতি বা মনিটারি পলিসি দিয়ে সমাধান করা সম্ভব হবে না। সরকারের বাজেট প্রস্তাবেও সংকট সমাধানের সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ থাকা চাই। তাই আসন্ন ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতির কারণে বিপাকে পড়া মানুষকে সুরক্ষা দিতে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত করা চাই। বিশেষ করে কৃষি খাতে দেয়া ভর্তুকি আরো বাড়াতে হবে। জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ও বিচক্ষণতার সঙ্গে করতে হবে। চাহিদা নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহ বাড়ানো—উভয় দিকেই নীতি মনোযোগ সক্রিয় রাখতে হবে। তবে যা-ই হোক না কেন মূল্যস্ফীতি ও বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই সুদের হার নির্ধারণ করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে অর্থ ধার নিতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে যে সুদ দিতে হয়, যাকে নীতি সুদহার বা রেপো সুদহার বলা হয়, সেটিও বাড়ানো হয়েছে। মহামারীর সময় এ হার কমানো হয়েছিল বাজারে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর জন্য। এ সুদহার সে সময় কমিয়ে দেয়ায় ঋণপ্রবাহ বেড়েছে, যারা ব্যবসা-বাণিজ্য করেন তারা এর সুবিধা পেয়েছেন। এর সুফল ভোগ করেছেন সাধারণ ভোক্তাও। এ নীতি সুদহার বাড়ানোর পেছনে যে ভাবনাটি কাজ করছে তা হলো, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে টাকা নিতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে এখন বেশি খরচ করতে হবে। ফলে এ ব্যাংকগুলো যখন কাউকে ঋণ দেবে তখন সেই ঋণের সুদহারও বেশি রাখবে। এতে ঋণপ্রবাহ কমবে। আর ঋণপ্রবাহ কমলে বাজারে টাকার সরবরাহ কমবে। ফলে মূল্যস্ফীতিও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। অর্থাৎ সংকটকালে সাধারণ নাগরিকদের কিছুটা হলেও সুরক্ষা নিশ্চিত হবে। তবে মনে রাখতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান নির্দেশনা অনুসারে ৯ শতাংশের বেশি সুদ কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংক চাইতে পারবে না। এ সীমা যদি এমনটিই রাখা হয় তাহলে রেপো সুদহার বাড়ানোর মাধ্যমে ঋণপ্রবাহের লাগাম টেনে ধরার যে কৌশল, তা থেকে পুরো সুফল পাওয়া যাবে না। রেপো সুদহার বাড়ানো কেবল সমাধানের পথে প্রথম ধাপ। ৯ শতাংশের ওই সীমাটি তুলে নেয়া অথবা এ কার্যক্রমকে আরো নমনীয় ও বাস্তবানুগ করাটা হবে দ্বিতীয় ধাপ। ব্যাংক ঋণপ্রার্থীকে কত শতাংশ সুদে ঋণ দেবে তা এখন বাজারের চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হওয়া উচিত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী মেয়াদি আমানতের সুদ মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে কম দেয়া যাবে না। কিন্তু ডলার সংকট, বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে প্রতিনিয়ত মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। এখন মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করে আমানতে সুদ দিতে গিয়ে ব্যাংকগুলোর তহবিল ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু ঋণের সুদহার বাড়ানো যাচ্ছে না। ফলে ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। সারা বিশ্বই মূল্যস্ফীতির চাপ সামাল দিতে সুদহার বাড়াচ্ছে। মানুষ ঘরে টাকা ফেলে রাখবে না। বিকল্প সঞ্চয়ের মাধ্যমও তেমন নেই। একটি অংশ বেশি লাভের আশায় এমএলএম কোম্পানি, কো-অপারেটিভসহ এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করে পুরো টাকা খোয়ানোর ঝুঁকিতে পড়েছে। ফলে ঘুরেফিরে ব্যাংকই সাধারণ মানুষের ভরসা। ব্যাংকে টাকা রেখে তাত্ক্ষণিক তোলার সুযোগ, জমানো টাকা অনলাইন ও কার্ডে ব্যবহার, ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তাসহ বিভিন্ন কারণে ব্যাংকেই টাকা রাখতে বেশি আগ্রহী মানুষ।

বর্তমান অবস্থায় নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ কঠিন সময় পার করছে। ধারণা করা হচ্ছে মূল্যস্ফীতির হার আরো বাড়বে। সেক্ষেত্রে তাদের কীভাবে স্বস্তি দেয়া যায় তার দিকনির্দেশনা বাজেটে থাকা আবশ্যক। বাংলাদেশ ব্যাংক রেপো রেট বাড়িয়েছে, ডলারের মূল্যমানও বাড়াচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সুদহার ছয়-নয়ের মধ্যে ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে নিঃসন্দেহে। আর জোরপূর্বক এটি চাপিয়ে রাখা হলে তা যেকোনো সময়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, যার প্রমাণ ডলারের মূল্য ধরে রাখা। এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণপূর্বক সুদহার নির্ধারণে ম্যানেজড ফ্লোটিং প্রক্রিয়া গ্রহণ করার দিকেই আমাদের অগ্রসর হতে হবে। বাজারের চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতেই আমানত ও ঋণের সুদের হার নির্ধারণ করতে হবে। এক্ষেত্রে জোর করে বা চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্ত সুফল বয়ে আনবে না।