বর্তমানে দেশের ব্যাংক ব্যবস্থার একটা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে খেলাপি ঋণ। খেলাপি ঋণের চক্র থেকে বেরোতে পারছে না এ খাত। এমনকি অতিমারীতে নিয়ন্ত্রণ বিধিমালায় কিছুটা ছাড় দেয়া সত্ত্বেও খেলাপি ঋণ ঊর্ধ্বমুখী। হালনাগাদ তথ্য বলছে, দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ব্যাংকের অর্থ পরিশোধ না করে কোনো কোনো খেলাপি পালিয়েছে মালয়েশিয়ায়, কেউ পালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে, কেউ পালিয়েছে ব্রিটিশ দ্বীপরাষ্ট্রগুলোয় এবং কেউবা পালিয়েছে কানাডায়। সম্প্রতি বিভিন্ন ব্যাংকের প্রায় ৮০০ কোটি টাকা অনাদায়ী রেখে কানাডায় পালানো চট্টগ্রামের এক ব্যবসায়ীকে কারাদণ্ড দিয়েছেন অর্থঋণ আদালত। দেশে এনে তার বিরুদ্ধে দ্রুত সাজা কার্যকর করাটাই এখন জরুরি, যাতে সেটি অন্য খেলাপিদের জন্য দৃষ্টান্ত হয়।

দেশে অব্যাহতভাবে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির মূলে রয়েছে সুশাসন ঘাটতি। যাচাই-বাছাই করে ঋণ বিতরণ করার নিয়ম থাকলেও তা অনেক সময় পরিপালন হচ্ছে না। প্রকৃত চাহিদা নয়, রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাব, তদবির কিংবা জ্ঞাতি সম্পর্ক বিবেচনায় অনেক ক্ষেত্রে ঋণ দেয়া হচ্ছে। ঋণ দেয়ার পর এর সঠিক ব্যবহার হচ্ছে কিনা, উৎপাদনশীল খাতে লগ্নি হচ্ছে কিনা তা যথাযথভাবে তদারক করছে না ব্যাংকগুলো। আবার ঋণের বিপরীতে রাখা হচ্ছে না পর্যাপ্ত বন্ধক বা জামানত।  বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে, ঋণ অনিয়মের  ক্ষেত্রে ব্যাংকের একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তারও যোগসাজশ রয়েছে। তারা কমিশনের বিনিময়ে কারো কারো জন্য অন্যায্যভাবে ঋণ অনুমোদন করিয়ে দিচ্ছে। সংগত কারণে সেই ঋণ আর আদায় হচ্ছে না। ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ ডিউ ডিলিজেন্সেও ব্যাপকভাবে দুর্বলতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। তারা ঋণ অনুমোদনে যেমন যথাপ্রক্রিয়া অনুসরণ করছে না, আবার আদায়ের  ক্ষেত্রেও তাদের আছে নানা সীমাবদ্ধতা ও শৈথিল্য। সব মিলিয়ে আর্থিক খাতে বাড়ছে খেলাপি ঋণ।

মোটামুটিভাবে খেলাপি ঋণ একটি বৈশ্বিক সমস্যা। এ সমস্যা নিরসনে অনেক দেশ আর্থিক নিয়ন্ত্রণ বিধিমালার পাশাপাশি কিছু উদ্ভাবনী পদক্ষেপ নিয়েছে। কিছু দেশ যেমন জার্মানি, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, আর্মেনিয়া, চেক প্রজাতন্ত্র, ডেনমার্ক, ভারত প্রভৃতি দেশ ব্যাংকে ন্যায়পাল নিয়োগ করেছে। আবার যুক্তরাজ্য বা যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোয় ‘ডেট রিকভারি বা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি’ গঠন করা হয়েছে। কিছু দেশ আর্থিক খাত নিয়ন্ত্রণের সুবিধার জন্য স্বতন্ত্র ব্যাংকিং কমিশন গঠন করেছে। ফলে সেসব দেশে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে। তাদের অভিজ্ঞতা ও গৃহীত পদক্ষেপ আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।

বলা হচ্ছে, বড় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ভুইফোঁড় কিছু প্রতিষ্ঠানও ঋণখেলাপির তালিকায় প্রথম সারিতে উঠেছে। ব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে অন্য খাতে বিনিয়োগ করা, নামে-বেনামে প্রতিষ্ঠান খুলে ঋণের পরিধি বাড়ানোর মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচারই এসব প্রতিষ্ঠানের অন্যতম বাণিজ্য। এভাবে অর্থ পাচারের তথ্য নিয়মিত বিরতিতে সংবাদমাধ্যমে উঠে আসছে। বণিক বার্তার সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনের তথ্যমতে, কানাডায় পালিয়ে যাওয়া সাজাপ্রাপ্ত ব্যবসায়ীও ফেরত না দিয়ে উল্টো ঋণের অর্থ অন্য খাতে ব্যবহার ছাড়াও কানাডায় গড়েছেন বিলাসবহুল বাড়ি। এ প্রবণতায় দেশ বরং নানাভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। কাজেই ইচ্ছাকৃত খেলাপি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে ন্যূনতম শৈথিল্যও কাম্য নয়।

বর্তমানে দেশে খেলাপি ঋণের যে দুষ্টচক্র সৃষ্টি হয়েছে, তার ফলে দেশের অর্থনীতির ওপর একদিকে যেমন এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, তেমনি অন্যদিকে দেশের মানুষ নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। যে বিপুল পরিমাণ ঋণের অর্থ খেলাপি হচ্ছে, তা যদি সঠিক সময়ে ঋণগ্রহীতারা ফেরত দিতেন, তবে ব্যাংকগুলো সে অর্থ অন্য বিনিয়োগকারী বা উদ্যোক্তাদের দিতে পারত। এতে নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হতো এবং দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি আরো বেগবান হতো। অর্থনীতিতে পড়ত গুণক প্রভাব। তাই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে খেলাপি ঋণে দ্রুত রাশ টানতে হবে। খেলাপি ঋণের সমস্যা নিরসনে বিশেষজ্ঞরা অনেক দিন ধরে ব্যাংক খাতের জন্য ন্যায়পাল নিয়োগ, মন্দ ঋণ আদায়ের জন্য ‘ডেট রিকভারি বা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি’ গঠন, অর্থঋণ আদালতে কোনো রায় হলে সরাসরি সম্পত্তি জব্দ করার সুযোগ, অর্থ ব্যাংক নিয়ন্ত্রণের পুরো ক্ষমতা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে প্রদান, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের সংখ্যা কমিয়ে আনা, একীভূতকরণের সুযোগ সৃষ্টি এবং সর্বোপরি একটি ব্যাংকিং কমিশন গঠনের পরামর্শ দিয়ে আসছেন। অর্থনীতির স্বার্থে এগুলো এখন বিবেচনায় নেয়া জরুরি।  

অর্থঋণ আদালত কানাডায় পলাতক  খেলাপি ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সম্প্রতি যে সাজার আদেশ দিয়েছেন, সেটি সময়োচিত। এ রায় যথাসম্ভব দ্রুত কার্যকর করা জরুরি। আমরা দেখছি, অর্থঋণ আদালতে বিপুল মামলা ঝুলে আছে। নিষ্পত্তি হচ্ছে না।  সেক্ষেত্রে জনবল  যেমন বাড়ানো দরকার, তেমনি এ ধরনের আদালতের সংখ্যা আরো বাড়ানো যায় কিনা,  সে  চেষ্টা করতে হবে। সার্বিক বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে অনেক সময়  লেগে যাচ্ছে।  সেক্ষেত্রে আর্থিক মামলাগুলো নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা যায় কিনা,  সেটিও ভাবা  যেতে পারে। বলতে  গেলে  দীর্ঘদিনের বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে খেলাপি ঋণ আজকে বিপর্যয়কর পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রধানত ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের কারণেই ব্যাংক খাতের বর্তমান সংকট সৃষ্টি হয়েছে। কাজেই খেলাপি ঋণের বিস্তার কমাতে হলে দেশে দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালনের পরিবেশ বিনির্মাণ করতে হবে। এ দায়িত্ব রাষ্ট্রেরই।