গত জনশুমারিগুলোতে পার্বত্য অঞ্চল ও সমতলের আদিবাসীসহ বঞ্চিত ও পিছিয়ে পড়া মানুষের সবাইকে গণনায় সঠিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছিল। ২০২১ সালে শুরু হতে যাওয়া জনশুমারিতে আগের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠে একটি পরিপূর্ণ তথ্যভাণ্ডার তৈরির জন্য কিছু সুপারিশ এসেছে ২৬ জুন অনুষ্ঠিত অনলাইন বৈঠকে। আলোচকরা জনশুমারিতে আদিবাসীদের পূর্ণাঙ্গ ও সঠিক তথ্য সংগ্রহের পরামর্শ দিয়েছেন। বিগত কয়েক দশকের জনশুমারি ও গৃহগণনায় কিছুমাত্রায় সম্প্রদায়গত বিভাজিত তথ্য উঠে এলেও তা ছিল অপর্যাপ্ত ও ত্রুটিপূর্ণ। সুষ্ঠু পরিকল্পনা প্রণয়নে এটি সহায়ক নয়। প্রতি ১০ বছর পরপর জনশুমারি হয়ে থাকে বিধায় এর পরিপূর্ণ ও নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ বাঞ্ছনীয়। এ প্রেক্ষাপটে জনশুমারিতে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বিভাজিত পরিসংখ্যান নিশ্চিত করা একান্তভাবে কাম্য।

জনশুমারি কেবল জন বা গৃহগণনা নয়। রাষ্ট্র তার নাগরিকদের উন্নয়নে কী কর্মসূচি নেবে, কীভাবে জনগণের আর্থসামাজিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে, তারও প্রাথমিক প্রস্তুতি এ লোকগণনা। রাষ্ট্রের চোখে যে সব নাগরিক সমান, এবারের জনশুমারিতে তার প্রতিফলন থাকতে হবে। এক্ষেত্রে সংখ্যাগুরু বা সংখ্যালঘু কিংবা আদিবাসী পরিচয়ে কারো প্রতি বৈষম্য করা যাবে না। অনেক সময় ধর্মীয় সম্প্রদায়গত তথ্য পাওয়া গেলেও জাতিগতভাবে মানুষের তথ্য খুঁজলে তা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রকাশনায় পাওয়া যায় না। এক্ষেত্রে আদিবাসীর মোট সংখ্যা, জাতিগুলোর জনসংখ্যা, জনগোষ্ঠীর সদস্যদের লিঙ্গ, বয়স, বৈবাহিক অবস্থা ইত্যাদি নিয়ামকের প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসহ জাতিগতভাবে বিভাজিত এবং পর্যাপ্ত ও সঠিক তথ্য সংগ্রহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিগত জরিপগুলোয় সব জাতি, বিশেষ করে পার্বত্য দুর্গম অঞ্চলে বসবাসকারীদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য আসেনি। আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকাগুলোয় জরিপ পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত আদিবাসী কর্মকর্তা ও মাঠপর্যায়ের কর্মীর অভাব থাকার প্রসঙ্গ এসেছে বারবার। গত জরিপগুলোতে আদিবাসীদের তথ্য সংগ্রহে সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্তদের অনীহা লক্ষ করা গেছে। সমতলের আদিবাসীদের বেলায় সমস্যাটি আরেকটু জটিল। বিগত দুটি জরিপে অনেকেরই তথ্য নেয়া হয়েছে ধর্মীয় বর্গ অনুসারে। আবার কোনো কোনো জাতিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে ‘নিম্নবর্ণ’-এর সঙ্গে। এ কারণে বাংলাদেশে মোট আদিবাসী জনসংখ্যার সঠিক তথ্য সরকারি জরিপে কখনো পাওয়া যায়নি। দেশের জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের ক্ষেত্রে দেশীয় সমগ্র জনসংখ্যার ব্যাপারে পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ ধারণা থাকা জরুরি। সংখ্যাতাত্ত্বিক বিচারেও ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলো আমাদের মোট জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হলেও তাদের প্রকৃত সংখ্যা ও জাতিগত বিভাজন আমাদের অজানা। এবার এ ঘাটতি দূর করতে হবে। একদিকে  বেশকিছু জাতিগোষ্ঠী এখনো স্বীকৃত  নেই, সরকারি তালিকার বাইরে রয়ে  গেছে: অন্যদিকে যারা স্বীকৃত তাদেরও নির্ভুল ও পরিপূর্ণ পরিসংখ্যান  নেই। সব মানুষ যেন নিজের জাতির পরিচয়ে চিহ্নিত হয়, এবারের জনশুমারিতে বিবিএসকে তা নিশ্চিত করতে হবে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পিছিয়ে পড়া বা বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য স্বতন্ত্র জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। কানাডা, অস্ট্রেলিয়ার জনশুমারিতে অনেক বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হয়। বছর বছর এ তথ্য হালনাগাদ হয়ে থাকে। প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে এ ডাটাবেজ নিয়মিত আপডেট করা হয়। অনুরূপভাবে বাংলাদেশে আদিবাসীদের জন্য স্বতন্ত্র শুমারি করা যেতে পারে। আলোচনা অনুষ্ঠানে পরিকল্পনামন্ত্রী জানিয়েছেন, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ‘রিয়েল টাইম ডাটা’ সংগ্রহের লক্ষ্যে একটি পাইলট প্রকল্প হাতে নিতে যাচ্ছে। এটি সফল হলে দেশব্যাপী এ কার্যক্রম হাতে নেয়া হবে। আমরা আশা করি, এ প্রকল্প সফল হবে এবং প্রচেষ্টাটি পুরোপুরি সফল হলে যেকোনো ব্যক্তি যেকোনো স্থানে বসেই হালনাগাদ তথ্য দেখতে পাবেন।

বিবিএস ২০১১ সালে আমাদের ২৭টি ক্ষুদ্র জাতিসত্তার  কথা বলেছে। কিন্তু ২০১৯ সালে এসে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে ৫০টি জনগোষ্ঠীর কথা। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো এবং গবেষকরা রাষ্ট্রীয় তালিকার  চেয়ে বেশি জাতিসত্তার কথা বলছেন। কেউ  কেউ বলছেন, এর সংখ্যা ৭৮টি হবে। কেউ বলছেন, এর সংখ্যা হবে ৭৫। এ সংখ্যা সঠিকভাবে নির্ণয় করা জরুরি। এবারের জনশুমারিতে তাই সব জনগোষ্ঠীর বিভাজিত, সঠিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিসংখ্যান নিশ্চিত করতে হবে, যাতে  কেউ বাদ না পড়ে। এজন্য জনশুমারি করতে সঠিক ও যোগ্য লোকজন নির্বাচন করা দরকার।  আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় তথ্য ও উপাত্ত সংগ্রহে নিয়োজিতরা যাতে তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব সঠিক ও দক্ষতার সঙ্গে সম্পাদন করতে পারে তার জন্য তাদের যথাযথ ও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দিতে হবে। সংশ্লিষ্ট সমাজ ব্যবস্থা সম্পর্কে তাদের পর্যাপ্ত ধারণা দেয়ার বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে সেখানে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী ও সংগঠনগুলোকে কাজে লাগাতে হবে। মনে রাখা চাই, এসব জনগোষ্ঠীকে স্বপরিচয়ে অন্তর্ভুক্ত করতে না পারলে তাদের সংকটের সমাধান করা যাবে না। প্রণয়ন করা যাবে না সঠিক উন্নয়ন পরিকল্পনা।

আধুনিক বিশ্বে এমন কোনো রাষ্ট্র নেই, যেখানে শুধু একটি সম্প্রদায় বা জনগোষ্ঠীই বসবাস করে। সে অর্থে বাংলাদেশ একটি বহুজাতিক, বহুমাত্রিক, বহুভাষিক জনগোষ্ঠীর বাসস্থল; বৈচিত্র্যময় সভ্যতা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অধিকারী একটি দেশ। কিন্তু সব তথ্যসূত্র প্রমাণ করে যে বাংলাদেশে বসবাসরত আদিবাসী সম্পর্কে সরকারি রিপোর্ট, বেসরকারি সংস্থা ও স্বতন্ত্র গবেষকের আহরিত তথ্যের মধ্যে ব্যাপক তারতম্য রয়েছে। রিপোর্টগুলো অসম্পূর্ণ ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ। ১৯৩১ সালের ব্রিটিশ ভারতের সেন্সাস রিপোর্ট থেকে অদ্যাবধি স্বাধীন বাংলাদেশের আদমশুমারি রিপোর্ট সে সাক্ষ্য বহন করছে। এ দেশে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার প্রকৃত সংখ্যা কত এবং মোট কতটি আদিবাসী গোষ্ঠী আছে, তা অস্পষ্ট ও অজানা। প্রাসঙ্গিক বিভিন্ন রিপোর্ট পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের আদিবাসী সম্পর্কে এখন পর্যন্ত সমন্বিত তথ্যসূত্রের অভাব রয়েছে। আসন্ন জনশুমারিতে বিদ্যমান ঘাটতি, বিভ্রান্তি নিরসনে কর্তৃপক্ষের সতর্ক দৃষ্টি ও কার্যকর পদক্ষেপ আশা করব।