বাংলাদেশ ব্যাংকের ৫০ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পেমেন্ট ব্যবস্থায় বিপর্যয় দেখা দেয় সম্প্রতি। লেনদেনের বাড়তি চাপ সামলাতে না পেরে ১৩ এপ্রিল অকার্যকর হয়ে পড়ে ইলেকট্রনিক ফান্ডস ট্রান্সফার (ইএফটি), যা আবার চালু করতে সময় লেগেছে প্রায় এক সপ্তাহ। ইএফটির মতোই অকার্যকর হয়ে যায় আন্তঃব্যাংক চেক নিষ্পত্তির মাধ্যম বাংলাদেশ অটোমেটেড ক্লিয়ারিং হাউজ (বিএসিএইচ)। একই দিন আন্তঃব্যাংক রেপো ও কলমানি লেনদেনের এমআই মডিউলও অকার্যকর হয়ে যায়। করোনার মধ্যে অর্থনীতির গতি ধরে রাখতে যেখানে হিমশিম খেতে হচ্ছে, সেখানে প্রযুক্তিগত দুর্বলতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পেমেন্ট ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়া হতাশাজনক।

বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুত বড় হচ্ছে, বাড়ছে বাণিজ্য ও লেনদেন। বৈশ্বিক সংযুক্তিও বেড়েছে কয়েক গুণ। প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে লেনদেন ও বাণিজ্য এখন রিয়েল টাইমে সম্পন্ন করতে হচ্ছে। বিশ্বের বহু দেশের সঙ্গে সময়ের ব্যবধানের কারণে ২৪ ঘণ্টাই এখন আর্থিক সেবা চালু রাখতে হচ্ছে। আর সেটি করতে গিয়ে প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীলতাও বাড়ছে। এক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত দুর্বলতার কারণে লেনদেন ব্যবস্থা ব্যাহত হলে অর্থনীতিতে তার প্রতিঘাত পড়ে বহু গুণ। করোনার এ সময়ে আর্থিক খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার নতুন গতি লাভ করেছে। এর চাপ সামলাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিমশিম খাচ্ছে বলে খবর মিলছে, যা টেকসই আর্থিক খাত ও অর্থনৈতিক গতিশীলতার জন্য সহায়ক নয়।

প্রযুক্তির ব্যবহার যত বাড়বে, এর ঝুঁকিও তত বাড়বে। প্রযুক্তির উত্কর্ষের সঙ্গে ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়। ব্যাংক বা আর্থিক খাতে প্রযুক্তির সমস্যা সারা বিশ্বেই এখন আলোচনার বিষয়। তবে যেভাবে ব্যাংকিং কার্যক্রমে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে, ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সেভাবে নজরদারি বাড়েনি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটা আরো বেশি প্রযোজ্য। প্রতিষ্ঠানগুলো হার্ডওয়্যার কেনায় বিনিয়োগ করতে চায়। কিন্তু সে তুলনায় সফটওয়্যারে বিনিয়োগে কম আগ্রহী। সিকিউরিটি নিশ্চিত করার বিষয়টি থাকছে দৃষ্টির আড়ালে। ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে মারাত্মক ত্রুটি রয়ে যাচ্ছে। এ ত্রুটি সবার জন্য ভয়াবহ সমস্যা তৈরি করতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে স্বাভাবিক লেনদেনে বিঘ্ন ঘটাকে তাই গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। পশ্চিমা বিশ্বের তুলনায় বাংলাদেশ সাইবার প্রযুক্তি ও নিরাপত্তায় অনেকটাই পিছিয়ে। সম্প্রতি ব্যাংক খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়তে শুরু করেছে। ফলে এর সঙ্গে ঝুঁকিও বাড়ছে। এ ঝুঁকি এড়াতে প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি এ খাতে আরো বেশি বিনিয়োগ করতে হবে। বিশেষ করে যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়ে এ খাতে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে হবে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রচুর বিনিয়োগ করছে। বিশ্বের অধিকাংশ উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাইবার নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত বিষয় দেখভালের জন্য শক্তিশালী বিশেষ উইং রয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যা অনুপস্থিত, প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অধিকাংশ সময় ভেন্ডরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা শঙ্কাজাগানিয়া। এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হাতছাড়া হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এটি মোকাবেলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব দক্ষ প্রযুক্তিগত দল থাকা আবশ্যক।

পেমেন্ট ব্যবস্থায় সৃষ্ট সমস্যার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক অবশ্য বিটিসিএলের ইন্টারনেট লাইনের ত্রুটির কথা বলছে। পেমেন্ট প্রেসার বেড়ে যাওয়ায় আকস্মিক এ সমস্যা তৈরি হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে। কিন্তু এ সমস্যাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকে সংঘটিত রিজার্ভ কেলেঙ্কারি কিন্তু এরই ফল। প্রযুক্তিগত দুর্বলতার কারণে আবার কোনো কেলেঙ্কারি ঘটুক, তা কারো কাম্য নয়। আশার কথা হলো, বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনাপূর্বক সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতা চিহ্নিত করার পদক্ষেপ নিয়েছে। এক্ষেত্রে দ্রুতই অভিজ্ঞ ও দক্ষদের সমন্বয়ে গঠিত উচ্চ পর্যায়ের কমিটি প্রয়োজন হলে বিদেশ থেকে দক্ষ ও সক্ষম প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে আইটি অডিট করানো জরুরি। বিভিন্ন দেশের সফল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আদলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রযুক্তিগত বিকাশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের স্বপ্ন দ্রুত উন্নত দেশ হওয়ার। আর্থিক খাতে প্রযুক্তিগত দুর্বলতা রেখে এটি অর্জন করা কঠিন হবে। এতে যেকোনো সময়ে বড় ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারি সংঘটিত হওয়ার শঙ্কা থেকে যাবে।

মহামারী করোনার কারণে দেশের অর্থনীতি নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখে। এর প্রভাবে বাণিজ্য আজ হুমকির মুখে। এমন অবস্থা মোকাবেলায় সরকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করছে, যার বাস্তবায়নের দায়িত্ব পড়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর। অর্থনৈতিক কার্যক্রম সংকুচিত হয়ে পড়ায় সরকারের রাজস্ব আহরণও কমেছে। ফলে অর্থনীতিকে চাঙা রাখতে চাহিদা ধরে রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে মুদ্রা সরবরাহ শৃঙ্খল মসৃণ রাখা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব। এতে কোনো ব্যাঘাত ঘটলে অর্থনীতিতে তার প্রভাব হবে মারাত্মক। সাতদিন লেনদেনে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় বাণিজ্য, উৎপাদন ও ভোগের ওপর কী প্রভাব পড়েছে, তা বিশ্লেষণ করলেই এটি স্পষ্ট হয়ে উঠবে। ভবিষ্যতে প্রযুক্তিগত দুর্বলতার কারণে লেনদেন ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হলে অর্থনীতি ক্ষতির মুখে পড়বে, যার দায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এড়াতে পারবে না।

বর্তমানের আলোচিত কিছু প্রযুক্তি যেমন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, মেশিন লার্নিং, ক্লাউড কম্পিউটিং, বিটকয়েন, ব্লকচেইন, ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যাপক প্রসার লাভ করছে। এক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ ব্যাংক ব্যবস্থার বেশির ভাগ সেবা হবে অনলাইনভিত্তিক ২৪/৭ এবং তাত্ক্ষণিক। এছাড়া ব্যাংকগুলো প্রতিটি গ্রাহককে চাহিদা অনুযায়ী কাস্টমাইজড বা বিশেষায়িত সেবা দিতে সক্ষম হবে। এসব কিছু বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য ভবিষ্যতে অত্যন্ত শক্ত প্রতিকূলতা অপেক্ষা করছে। ব্যাংকিং সিস্টেমের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষায় এবং ঝুঁকি হ্রাসে ব্যাংককে সর্বদা সতর্ক থাকতে হবে। সামগ্রিকভাবে ব্যাংকের আইটি খাতে বর্তমানে চারটি প্রধান প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। প্রথমত, সঠিক জায়গায় সঠিক লোকের অভাব; দ্বিতীয়ত, প্রয়োজনীয় বাজেটের অভাব; তৃতীয়ত, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের নিরীক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা এবং শেষটি হলো ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আইটি কর্মকর্তাদের দেনদরবার ও তদারকির ঘাটতি। ঝুঁকি প্রশমনে বাংলাদেশ ব্যাংককে এসব বিষয় আমলে নিয়ে তার প্রযুক্তিগত রূপান্তরের রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। আর্থিক খাতে আইটির ব্যবহার হয়ে উঠেছে অতিমাত্রায় ব্যাপকভিত্তিক। সব ধরনের লেনদেনই এখন চলে ডিজিটাল সিস্টেমে। এর ফলে সময়ের সঙ্গে ক্রমেই এ লেনদেন আরো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। এসব ঝুঁকি মোকাবেলায় প্রস্তুতি নিতে হবে। এজন্য প্রয়োজন আইটি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো।

বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে চলছে। লক্ষ্য ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত বাংলাদেশের। এটি অর্জনে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। দেশের পেমেন্ট ব্যবস্থাও আন্তর্জাতিক মানের হতে হবে। প্রযুক্তিগত দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে আর্থিক লেনদেনসংশ্লিষ্ট নতুন সফটওয়্যার ভার্সনের চেক ক্লিয়ারিং ও ইএফটি সিস্টেমসহ নতুন নেটওয়ার্ক স্থাপনা ব্যবহারে নিরাপত্তা ঝুঁকি নিরূপণ ও তা নিরাময় করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামোতে বাইরে থেকে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন কর্তৃক সাইবার আক্রমণ, ম্যালওয়্যার অনুপ্রবেশসহ অন্যান্য আক্রমণ নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও প্রতিরোধে সহযোগিতা প্রদান এবং তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের কর্মকর্তাদের সাইবার নিরাপত্তাবিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদান করাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এর জন্য পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করতে হবে। শুধু প্রযুক্তিগত উন্নতি ঘটালেই চলবে না, একই সঙ্গে তার ব্যবস্থাপনার জন্য দক্ষ জনবলও তৈরি করতে হবে। শক্তিশালী ব্যাকআপ সিস্টেম থাকাও আবশ্যক যাতে একটিতে ত্রুটি দেখা দিলে বিকল্প পথে সেবা চালু রাখা যায়।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বলছে, তথ্যপ্রযুক্তির দুর্বল নিরাপত্তা অবকাঠামোগত কারণে বড় ধরনের সাইবার আক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশের আর্থিক খাত। সবক্ষেত্রে ডিজিটালাইজেশন কার্যক্রম জোরদার করা হলেও এর জন্য যে নিরাপত্তা অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রযুক্তির আধুনিকায়ন দরকার, সে বিষয়টি দৃষ্টির আড়ালে থেকে যাচ্ছে। এজন্য সর্বত্রই পুরনো প্রযুক্তি রয়ে যাচ্ছে, আইটি গভর্ন্যান্স প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না। এ সুযোগে প্রযুক্তির হালনাগাদের সার্বক্ষণিক যুক্ত থাকা হ্যাকারসহ অন্যান্য অসাধু চক্র সহজেই বাংলাদেশে সাইবার আক্রমণ চালাতে পারছে। আধুনিকায়ন ও বিশ্বায়নের এ যুগে সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। সাইবার হামলা মোকাবেলায় যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে তথ্যপ্রযুক্তিগত মজবুত নিরাপত্তা অবকাঠামো গড়ে তুলতে ব্যাপকভিত্তিক কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। এজন্য দৃঢ় নৈতিকতাসম্পন্ন সৎ ও আস্থাভাজন দক্ষ জনবল গড়ে তোলার ওপর জোর দেয়া প্রয়োজন। তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর যেসব যন্ত্রপাতি ও ডিভাইস ব্যবহার করা হয়, সেগুলোর অপারেটিং সিস্টেমের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও দরকার।