দেশ থেকে বিভিন্ন উপায়ে পাচার হয়ে যাওয়া অর্থ বাজেটে বৈধ করার প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। বিদেশে অর্জিত স্থাবর সম্পত্তি দেশে আনা না হলে এর ওপর ১৫ শতাংশ, বিদেশের অস্থাবর সম্পত্তি দেশে আনা না হলে এর ওপর ১০ শতাংশ এবং দেশে পাঠানো নগদ অর্থের ওপর ৭ শতাংশ হারে কর ধার্যের প্রস্তাব করা হয়েছে। কর দিয়ে এসব অর্থ বৈধ হয়ে গেলে এর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারবে না আয়কর কর্তৃপক্ষসহ যেকোনো কর্তৃপক্ষ। রোববার জাতীয় সংসদে ২০২১-২২ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা অর্থমন্ত্রীর এ প্রস্তাবের সমালোচনা করেছেন। শুধু তাই নয়, অর্থনীতিবিদ, বিশেষজ্ঞ, ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারাও এর সমালোচনা করছেন। দেশের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী অর্থ পাচার অপরাধ এবং কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। তাছাড়া আইনটি পাশ কাটিয়ে বাজেটের মাধ্যমে পাচারকৃত অর্থকে বৈধতা দানের এ প্রস্তাব অনৈতিক এবং আইনসম্মতও নয়। দেশে বা বিদেশে যারা বৈধভাবে আয় করেন, তাদের ক্ষেত্রবিশেষে ২০-৩০ শতাংশ পর্যন্ত কর দিতে হয়। আর এ ধরনের অপরাধকে ছাড় দিয়ে মাত্র ৭ থেকে ১৫ শতাংশ কর দেয়ার মাধ্যমে পাচার হওয়া টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া গ্রহণযোগ্য নয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থমন্ত্রীর এ প্রস্তাব করদাতাদের জন্য বৈষম্যমূলক। এতে সৎ করদাতারা নিরুৎসাহিত হবেন। প্রস্তাবটি পুনরায় বিবেচনা করা হবে বলে প্রত্যাশা।
ওয়াশিংটনভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির (জিএফআই) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বৈদেশিক বাণিজ্যের আড়ালেই বাংলাদেশ থেকে ৪ হাজার ৯৬৫ কোটি ডলার পাচার হয়। বাংলাদেশী মুদ্রায় এর পরিমাণ সোয়া ৪ লাখ কোটি টাকা। আর দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠান টিআইবির হিসাবে প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে ১ থেকে দেড় হাজার কোটি ডলার বিদেশে পাচার হয়। অর্থ পাচার করা বাংলাদেশে একটি অপরাধ এবং এর শাস্তির বিধান রয়েছে। ফলে কর দেয়ার মাধ্যমে পাচার হওয়া টাকা ফিরিয়ে আনার সরকারের এ পদক্ষেপ আইনবিরোধী। বাংলাদেশের বিদ্যমান আইন ও আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অর্থ পাচার একটি গুরুতর অপরাধ। বিদ্যমান মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি অর্থ পাচার করলে অথবা অর্থ পাচারের চেষ্টা, সহায়তা বা ষড়যন্ত্র করলে সর্বনিম্ন চার বছর ও সর্বোচ্চ ১২ বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এছাড়া অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির দ্বিগুণ মূল্যের সমপরিমাণ বা ১০ লাখ টাকার মধ্যে যেটি বেশি, সেই অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। অর্থদণ্ড পরিশোধে ব্যর্থ হলে অপরিশোধিত অর্থদণ্ডের পরিমাণ বিবেচনায় অতিরিক্ত কারাদণ্ড দেয়ার বিধান আছে এ আইনে।
অর্থমন্ত্রী যে প্রক্রিয়ায় পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার কথা বলছেন, সেটিকে বৈধতা দিতে তিনি ইন্দোনেশিয়ার উদাহরণ দিয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশের সঙ্গে ইন্দোনেশিয়ার প্রক্রিয়াগত অনেক পার্থক্য রয়েছে। ইন্দোনেশিয়া একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এ সুবিধা দিয়েছিল। ইন্দোনেশিয়া অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে পাচার করা অর্থ বিনা প্রশ্নে ফেরত আনার ঘোষণা দেয় মাত্র একটি অর্থবছরে। পাশাপাশি দেশটির সব সমুদ্র, নৌ, বিমান ও স্থলবন্দরে স্ক্যানার বসায়। এতে ইন্দোনেশিয়ার রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ে এবং বিদেশ থেকে অনেক অর্থ ফেরত আসে। ওই বছরের পর আর এ ধরনের সুযোগ দেয়নি ইন্দোনেশিয়া। দেশটির সুবিধা প্রদানের প্রক্রিয়াটি বাংলাদেশ থেকে ছিল ভিন্ন। অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে অর্থ ফেরত আনলে জরিমানা কম, তার পরের তিন মাসে আনলে জরিমানার পরিমাণ বাড়বে, তার পরের তিন মাসে আনলে জরিমানার পরিমাণ আরো বাড়বে। তারা চেয়েছিল অর্থ দ্রুত আসুক। সর্বোপরি দেশটির সরকার ঘোষণা দিয়েছিল অর্থ ফেরত আনার সর্বশেষ সুযোগ। এরপর আর এ সুযোগ দেয়া হয়নি। বাংলাদেশের প্রস্তাবের সঙ্গে ইন্দোনেশিয়ার প্রস্তাবের সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো, ইন্দোনেশিয়ার সরকার সুযোগ দেয়ার পাশাপাশি অর্থ পাচার রোধ ও পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনতে নানা পদক্ষেপও নিয়েছিল। ওইসিডির দেশগুলোর মধ্যে একটি চুক্তি আছে, যেখানে ওই দেশগুলো অর্থ পাচার বন্ধে তথ্য আদান-প্রদানের পাশাপাশি অবৈধ অর্থ ফেরত দেয়ার ব্যবস্থা নেবে। ইন্দোনেশিয়া যে সময়ে অর্থ ফেরানোর সুযোগ দিয়েছে, ঠিক সে সময়ে এ গ্রুপে যোগ দেয়। ফলে একদিকে শাস্তির ঝুঁকি, অন্যদিকে সুযোগ প্রদান—এমন ব্যবস্থা গ্রহণের ফল ইন্দোনেশিয়া পেয়েছে। বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী অর্থ ফেরত আনতে শুধু সুযোগই দিয়েছেন, কিন্তু সতর্কবার্তা বা ব্যবস্থা গ্রহণের ঘোষণা দিতে পারেননি। কারণ বাংলাদেশ ওইসিডির অর্থ পাচার রোধসংক্রান্ত চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি। ফলে অর্থ পাচারকারীদের কোনো ঝুঁকিই নেই। প্রশ্ন হলো, ঝুঁকি না থাকলে অর্থ পাচারকারীরা কেন শুধু কর দিতে যাবেন? পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে দেশে-বিদেশে জমানো কালো টাকা সাদা করার ছোট-বড় ‘ক্ষমা প্রকল্প’ (অ্যামনেস্টি স্কিম) বেশ কয়েকটি নেয়া হয়েছিল। কোনোটিই তেমন সফল হয়নি। প্রথম মোটামুটি সফল প্রকল্পটি ছিল ১৯৯৭ সালের। তত্কালীন অর্থমন্ত্রী পি চিদম্বরমের উদ্যোগে ‘ভলান্টারি ডিসক্লোজার অব ইনকাম স্কিম’ (ভিডিআইএস) নামে এ প্রকল্প চালু হয় ১৯৯৭ সালের ১ জুলাই। প্রকল্পের মেয়াদ ছিল মাত্র ছয় মাস। ব্যক্তিগত ঘোষিত আয়ের ক্ষেত্রে ধার্য হয়েছিল ৩০ শতাংশ কর, কোম্পানির ক্ষেত্রে ৩৫ শতাংশ। দেশজুড়ে বিভিন্ন ভাষায় অর্থ মন্ত্রণালয় এ প্রকল্প সার্থক করতে প্রচার চালিয়েছিল। ১৯৯৭ সালের সেই সরকারি ক্ষমা প্রকল্পে সাড়া দিয়েছিল পৌনে পাঁচ লাখ মানুষ। তাদের অঘোষিত আয়ের পরিমাণ দেখানো হয়েছিল ৩৩ হাজার কোটি রুপি। সরকারি কোষাগারে কর জমা হয়েছিল প্রায় ৯ হাজার ৭৬০ কোটি রুপি। ভারতীয় অর্থনীতির বহরের তুলনায় যা নগণ্য। প্রকল্প শেষ হলে তার কার্যকারিতা কতটুকু, শুধু সেটাই যে বোঝা গিয়েছিল তা নয়, পরবর্তী সময়ে ‘কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল’-এর (সিএজি) রিপোর্টে ওই প্রকল্পকে ‘দেশের সৎ করদাতাদের প্রতি অবিচার’ বলেও মন্তব্য করা হয়েছিল।
অর্থ পাচার রোধে কার্যকর পদক্ষেপ ব্যতিরেকে শুধু অর্থ ফেরত আনার প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ হবে না বলেই প্রতীয়মান হয়। দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ নামমাত্র কর দিয়ে বৈধ করার এ প্রক্রিয়া নৈতিকতাবিরোধী। এতে দুর্নীতিই আরো উৎসাহিত হবে, যা সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কোনো প্রশ্ন ছাড়া যদি পাচার হওয়া টাকা দেশে আনা হয় বা আনার জন্য উৎসাহিত করা হয় তাহলে রেমিট্যান্সপ্রবাহ বাড়বে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু যেসব প্রবাসী আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে দেশে অর্থ পাঠান, তারা কতটুকু উৎসাহিত হবেন, সেটা দেখার বিষয়। আর প্রশ্ন ছাড়া যদি পাচার করা টাকা দেশে আসে, সেটা অর্থনীতির জন্য প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। প্রতি বছর বাজেটে কালো টাকা একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ কর দিয়ে সাদা করার সুযোগ রাখা হয়। আর এ টাকা মূলত আবাসন খাত ও শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করার সুযোগ থাকে। তথ্য-উপাত্ত বলছে, কালো টাকা সাদা করার নীতিতে সুফল মেলেনি। ফলে অর্থ পাচার রোধে কার্যকর ব্যবস্থা ব্যতিরেকে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার এ সুযোগ কতটা কাজে আসবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। তাছাড়া যেসব দেশে পাচারকৃত অর্থ ও সম্পদ রয়েছে, সেখানে কোনো ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন না হলে কেউই অর্থ ফেরত আনা বা ঘোষণা দিয়ে বৈধ করবেনও না।
টাকা পাচার হওয়ার মূল কারণের মধ্যে আছে দুর্নীতি, ওভার ও আন্ডার ইনভয়েসিং, ট্যাক্স ফাঁকি দেয়া। এগুলো বন্ধ করতে হবে সর্বাগ্রে। কর ব্যবস্থার সংস্কার করতে হবে। তাহলে দেশের টাকা দেশেই থেকে যাবে। অর্থমন্ত্রী বলছেন, বৈধ অর্থও নানা কারণে অপ্রদর্শিত হতে পারে। তিনি সে অর্থ ফেরত আনার কথা বলছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কোন অর্থ বৈধ পথে আর কোনটি অবৈধ পথে উপার্জিত, তা কীভাবে বুঝবেন তিনি। মূল বিষয় হলো, বাংলাদেশ থেকে কেন অর্থ পাচার হয়, তার কারণ খুঁজে বের করা। অর্থনীতিবিদরা কিছু কারণ এরই মধ্যে চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে দেশে বিনিয়োগের পরিবেশের অভাব, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার শঙ্কা, রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর দুর্বল নজরদারি, আইনের শাসনের ঘাটতি ও দুর্নীতি। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার গবেষণায় টাকা পাচারের ক্ষেত্রে মোটাদাগে এসব কারণ উঠে এসেছে। আগে এর সমাধান করতে হবে, তাহলে অর্থ পাচার বন্ধ হবে, অর্থ ফেরতও আসবে।










