হজের অনিশ্চয়তার মধ্যে হজযাত্রী পরিবহনের লক্ষ্যে বৈমানিক-ক্রুসহ দুটি বড় উড়োজাহাজ লিজের প্রক্রিয়া শুরু করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। করোনার প্রকোপের কারণে গত দুই বছর হজ মৌসুমে যাত্রী পরিবহনের চাপ ছিল না। ফলে বিমানের আয় হয়েছে কম। এ সময়ে হজ পালিত হয়েছে স্বল্প পরিসরে। এবারো হজের সময়ে করোনার প্রকোপ কেমন হবে তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। ফলে আগে থেকে বিমান ও বৈমানিক লিজ নিয়ে বাড়তি অর্থ যেন গচ্ছা দিতে না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা আবশ্যক। একই সঙ্গে লিজ প্রক্রিয়া স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন। বিমান লিজ নেয়া নিয়ে প্রায়ই দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এবার যেন তা না হয়, সে বিষয়ে সজাগ থাকা চাই। করোনা সংক্রমণ শুরুর আগে হজের দুই মাস ছাড়া বছরের বাকি ১০ মাসই লোকসান দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। জাতীয় পতাকাবাহী রাষ্ট্রায়ত্ত একটি সংস্থার এ হাল উদ্বেগজনক। সব ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশ বিমান একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হোক—এটা সবার প্রত্যাশা।
২১টি আধুনিক উড়োজাহাজের শক্তিশালী বহর থাকার পরও বিমান শুধু লোকসানই দিয়ে যাচ্ছে। এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা জানান, এর পেছনে যথাযথ পরিকল্পনার অভাব এবং নিম্নমানের যাত্রীসেবা দায়ী। পূর্বপরিকল্পনার অভাবে বহরের অনেক নতুন উড়োজাহাজ সক্ষমতা অনুযায়ী ব্যবহার হচ্ছে না, মানসম্পন্ন পূর্ণ সেবাও দিতে পারছে না। ফলে আকাশে শান্তির নীড় স্লোগান ধারণকারী বিমানের পৃথিবী বছরের পর বছর ছোট হয়েছে। ১৯৭২ সালে বিমান তার ডানা মেলার পর থেকে জাতীয় উড়োজাহাজ সংস্থাটি প্রায় প্রতি অর্থবছরেই লোকসান দিয়েছে। বিমানের একটি বড় বাজার আছে এবং অনেক যাত্রী এ সংস্থার ওপর ভরসা করে, তবুও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অনুন্নত সেবা, অব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনার দুর্বলতা ও বিপণন নীতিমালা এবং পেশাদার কর্মীর অভাবে তাদের বাজার কমে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের মতো জনশক্তির বড় বাজারের সম্ভাবনাও বিমান কাজে লাগাতে পারছে না। এটি খুবই দুর্ভাগ্যজনক যে বিমান তাদের আধুনিক উড়োজাহাজের সুষ্ঠু ব্যবহারের জন্য এখনো কোনো উপযুক্ত উড্ডয়ন পরিকল্পনা তৈরি করতে পারেনি।
করোনার প্রকোপ হঠাৎ বেড়ে ওঠায় হজ প্রাক নিবন্ধন প্রক্রিয়া স্থগিত করেছে ধর্ম মন্ত্রণালয়। এছাড়া এবার বাংলাদেশের কতজন হজে যেতে পারবেন, হজ পালনের ক্রাইটেরিয়া কী হবে, তাও স্পষ্টভাবে জানা যায়নি। ফলে স্বভাবতই করোনা পূর্ববর্তী সময়ের মতো হাজী নাও যেতে পারেন। সেক্ষেত্রে দুটি উড়োজাহাজ লিজ নেয়ার মতো সিদ্ধান্ত বিমানের মতো লোকসানি সংস্থা এড়াতে পারে। আবার এ কথাও সত্য, এখন উড়োজাহাজ লিজ না নিলে পরে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হবে। এমন অবস্থায় একটি উড়োজাহাজ নিজ নেয়া যেত। পাশাপাশি লিজ নেয়ার সময় পর্যাপ্ত হাজি না পাওয়া গেলে অন্য রুটে বিমান চালানোর ক্লজ চুক্তিতে যোগ করা প্রয়োজন। সর্বাগ্রে বিমানের ব্যয়ের বিষয়টিতে দৃষ্টি রাখতে হবে।
উড়োজাহাজ লিজ নিয়ে বিমান বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। মিসরের ইজিপ্ট এয়ার থেকে ২০১৪ সালে পাঁচ বছরের জন্য দুটি বোয়িং লিজ নেয় বিমান। লিজ নেয়ার মাত্র চার মাসের মধ্যেই উড়োজাহাজ দুটি নষ্ট হয়ে যায়। চুক্তি অনুযায়ী, দুটি উড়োজাহাজের জন্য প্রতি মাসে ১০ কোটি করে বছরে ১২০ কোটি টাকা লোকসান দিতে হয়েছে বিমানকে। যদিও হজের মৌসুমে স্বল্প সময়ের জন্য উড়োজাহাজ লিজ নিয়ে থাকে বিমান এবং এ সময়ে তারা মুনাফাও করে থাকে। উড়োজাহাজ লিজের ক্ষেত্রে যুক্তি দেখানো হচ্ছে, নিয়মিত ফ্লাইট কাটছাঁট করলে শিডিউল বিপর্যয় হবে। যাত্রী সংকট সৃষ্টি হবে। তাই দুটি বোয়িং উড়োজাহাজ লিজ না নিলে নিয়মিত ফ্লাইট নির্বিঘ্ন হবে। এছাড়া বহরের কোনো উড়োজাহাজ হঠাৎ বিকল হলে হজযাত্রায় বিপর্যয় ঘটবে। এতে ধর্মীয় বিষয়ে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে। সেক্ষেত্রে আরো ব্যয় সাশ্রয়ী কোনো অপশন রয়েছে কিনা, তাও যাচাই-বাছাই করে দেখা হোক।
বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে কোনো প্রতিষ্ঠানকে টিকে থাকতে হলে এর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দক্ষ, যোগ্য ও দুর্নীতিমুক্ত হওয়ার বিকল্প নেই। এদিক থেকেও বিমানের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। বিভিন্ন দেশের সরকারি-বেসরকারি এয়ারলাইনসের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় বিমানের পিছিয়ে পড়ার এটাই অন্যতম কারণ। অতীতে জনবল কমিয়ে আনা এবং বিদেশীদের সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেয়াসহ বিমানকে দুর্নীতিমুক্ত করার নানা উদ্যোগ নেয়া হলেও তা ফলপ্রসূ হয়নি। জানা যায়, নতুন উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণে উদাসীনতা ও অবহেলার কারণে সম্প্রতি বিমানের শীর্ষ ম্যানেজমেন্টের প্রতি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। এর আগে বিমানের সেবার মান নিয়েও মন্ত্রিসভার বৈঠকে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন তিনি। তাই আমরা আশা করব, সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকেই এদিকে দৃষ্টি দেয়া হবে।
৫০ বছরে বিমানের অর্জন আশানুরূপ নয়। এর চেয়ে কম সময়ে বিশ্বের অনেক দেশের অ্যাভিয়েশন খাত অনেক এগিয়েছে। সম্ভাবনা ও সুযোগ সেভাবে কাজে লাগাতে পারেনি বিমান। অন্য দেশের এয়ারলাইনসগুলো এখানে এসে ব্যবসা করে যাচ্ছে, বিমানের মার্কেট শেয়ার ২০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। অথচ ন্যাশনাল ক্যারিয়ার হিসেবে মেজরিটি শেয়ার বিমানের থাকা উচিত ছিল। এটি বিমানের জন্য শুভ নয়। লোকসানের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি তারা। যাত্রী রয়েছে কিন্তু বিমান সব যাত্রীকে পরিবহন সেবা দিতে পারছে না। ফলে অন্য দেশের এয়ারলাইনস যাত্রী পরিবহন করে ব্যবসা করছে। আধুনিক যুগের চাহিদা মেটাতে অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে বিমানকে। গত এক দশকে বিমান যে গতিতে এগিয়েছে, তা আরো বাড়াতে হবে। বিমানে বর্তমানে যে উড়োজাহাজের বহর রয়েছে তা দিয়ে অনেক দূর এগিয়ে যাওয়ার কথা, কিন্তু বিমান তা পারেনি। এখন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করে যদি তা বাস্তবায়ন করা যায় তাহলে অনেক দূর এগিয়ে যাবে বিমান। করোনা-পরবর্তী সময় অ্যাভিয়েশনের জন্য খুব সহজ হবে না। বিমানকে টিকে থাকতে হলে নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বাংলাদেশ অ্যাভিয়েশনের জন্য খুবই সমৃদ্ধ। বাংলাদেশে এখন যথেষ্ট ক্যাপটিভ ট্রাফিক (আসা ও যাওয়ার ফ্লাইট) রয়েছে। বর্তমান সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কিন্তু বাংলাদেশে ফুল ফ্লাইট পরিচালিত হচ্ছে। এমনকি মধ্যপ্রাচ্যে টিকিট সংকট দেখা দিয়েছে। এক্ষেত্রে বিমান পরিকল্পিত উপায়ে এগোলে লোকসান হওয়ার কথা নয়।
বাংলাদেশের ভেতরে ও বহির্বিশ্বে বিমানের যাত্রী পেতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের ৮০ লাখের বেশি নাগরিক কর্মরত। তদুপরি প্রতি বছর লাখ লাখ নতুন কর্মী বাইরে যাচ্ছেন চাকরি নিয়ে। অনেকে নিয়মিত দেশে আসছেন পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষাসহ নানা প্রয়োজনেও প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশী আকাশপথে যাতায়াত করেন। তাদের বেশির ভাগেরই পছন্দ লাল-সবুজ পতাকাবাহী বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইট। কিন্তু আমাদের গর্বের এ প্রতিষ্ঠানের নানা দুর্বলতার কারণে নাগরিকরা অন্য দেশের বা বেসরকারি উড়োজাহাজে ভ্রমণ করতে বাধ্য হন। পর্যাপ্ত এয়ারক্রাফট না থাকা এর প্রধান কারণ। নিয়মিত যে প্রতিষ্ঠানটি লোকসান দেয়, তার বহর বড় থাকার কথা নয়। একই সঙ্গে সময়সূচি রক্ষা করতে না পারা, যাত্রীসেবার আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখায় ঘাটতি—এসব সমস্যাও প্রকট। শুধু আন্তর্জাতিক রুটে নয়, দেশের ভেতরেও বিমান নিজেকে অতি সীমিত পরিসরে গুটিয়ে রেখেছে। বাংলাদেশে সচ্ছল জনগোষ্ঠী বাড়ছে। প্রতিদিন আকাশপথে দেশের নানা প্রান্তে বিপুলসংখ্যক নারী-পুরুষ ভ্রমণে আগ্রহী। বেসরকারি একাধিক প্রতিষ্ঠান এ সুযোগ কাজে লাগাতে উদ্যোগী হয়েছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস কেন তা পারবে না? প্রধানমন্ত্রী ঢাকার কাছাকাছি একটি নতুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের সংকল্প ফের ব্যক্ত করেছেন। দেশ-বিদেশের যেকোনো স্থানে দ্রুত যাতায়াতে ক্রমবর্ধমান চাহিদার প্রেক্ষাপটে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় উদ্যাগী হবে, এটাই প্রত্যাশা। এক্ষেত্রে তাদের অবশ্যই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার কথাটি মনে রাখতে হবে। এ প্রতিযোগিতা দেশের অভ্যন্তরে ও দেশের বাইরে এবং তাতে সক্ষমতার একটিই পথ—উত্কর্ষ অব্যাহতভাবে বাড়িয়ে চলা।










