ইউক্রেনে আগ্রাসনের জবাবে রাশিয়ার ওপর ব্যাপক আর্থিক ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে পশ্চিমা বিশ্ব। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে কি যুদ্ধ বন্ধ হবে? কিংবা এটা কি যুদ্ধ বন্ধের কোনো উপায় বলে মনে হচ্ছে? এর মানে কি পশ্চিমারা রাশিয়াকে তার বাজে কাজের জন্য শাস্তি দিচ্ছে? কিংবা নৈতিক পীড়ন থেকে বাঁচতে শুধু লোক দেখানো উপায় হিসেবে কিছু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে? 

এক দশকেরও কম সময়ে দ্বিতীয়বারের মতো রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের দায়ে। ২০১৪ সালে রাশিয়ার ক্রাইমিয়া দখল এবং পূর্ব ইউক্রেনে অনুপ্রবেশের জের ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দেশটির ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, যার লক্ষ্য ‘কার্যকরভাবে রাশিয়াকে জাতিগত বিচ্ছিন্ন’ রাষ্ট্রে পরিণত করা। যদিও এর ফলে তেমন কোনো লাভ হয় না। নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর ক্রেমলিনের আচরণের তেমন কোনো প্রত্যাশিত পরিবর্তন লক্ষ করা যায় না। ইউক্রেন ইস্যুতে পশ্চিমা বিশ্ব নতুন করে দেশটির ওপর নতুন মাত্রায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে কিংবা বলা যায় নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাত্রা অভূতপূর্ব পর‍্যায়ে নিয়ে গেছে।

সাম্প্রতিক আরোপিত বিধিনিষেধের মধ্যে রয়েছে উন্নত প্রযুক্তি বাণিজ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা, ব্যাপক মাত্রায় সম্পদ জব্দ করা ও লেনদেন নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে রাশিয়ার প্রধান প্রধান ব্যাংকের প্রবেশাধিকার স্থগিত, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ও বিশেষ ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে তাদের সম্পদ জব্দ করা এবং আন্তর্জাতিক আকাশসীমা থেকে রাশিয়ার উড়োজাহাজের চলাচল বর্জন। রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ জব্দ করা এবং বিশ্ব আর্থিক ও বাণিজ্য ব্যবস্থা থেকে রাশিয়াকে উচ্ছেদের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করার বিপরীতে এটাও মনে রাখা জরুরি রাশিয়ার অর্থনীতির মূল লাইফলাইন তেল ও গ্যাস; যা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে। 

আপাতদৃষ্টিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়গুলো রাশিয়ার অনাচারের বিপরীতে একগুচ্ছ নৈতিক প্রতিক্রিয়া বলে মনে হতে পারে। তবে যখন এ ধরনের হালকা নিষেধাজ্ঞা জোরালো অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পথ তৈরি করে তখন স্বাভাবিকভাবেই দুটি মূল প্রশ্ন উত্থাপন করা উচিত। এক. কোন পর‍্যায়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ যুদ্ধের বিকল্প না হয়ে বরং যুদ্ধের দিকে ধাবিত হয়? দুই. এ ধরনের পদক্ষেপগুলোর মাধ্যমে আমরা কি অর্জন করতে পারি এবং সেগুলো কতটা কার্যকর হতে পারে?

শক্তিশালী রাষ্ট্র, বিশেষ করে যাদের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের আগে যেকোনো রাষ্ট্র ও সরকারকে প্রথম প্রশ্নটি খুব সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। এ ধরনের শক্তিশালী রাষ্ট্র যদি তার অস্তিত্ব ও টিকে থাকাকে ঘিরে একটি হুমকি অনুভব করে তাহলে বিধিনিষেধ অতিক্রম করতে তাদের লড়াই করার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। যেমন ১৯৪১ সালের আগস্টে আমেরিকা যখন জাপানের তেল ও গ্যাস রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ ও ইন্দোচীন তেলক্ষেত্র বাজেয়াপ্ত করে তখন পার্ল হারবার আক্রমণের মধ্য দিয়ে জাপান তাদের প্রতিক্রিয়া জানায় কিংবা ১৯৭৩ সালে ইয়োম কিপুর যুদ্ধের (আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ) সময় আমেরিকার সেনাবাহিনী কর্তৃক ইসরায়েলকে সহযোগিতার জের ধরে ওপেকভুক্ত দেশগুলো আমেরিকায় তেল রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন প্রশাসন ওপেক সদস্য রাষ্ট্রগুলোর তেলক্ষেত্র আক্রমণ ও দখলের হুমকি দেন। আমেরিকার ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়।

রাশিয়ার ওপর এ পর্যন্ত আরোপিত নিষেধাজ্ঞাগুলো এখনো রাষ্ট্রটির অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলেনি। তবে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন হয়তো পশ্চিমাদের পক্ষ থেকে রাশিয়ার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাধা, বিশেষ করে জ্বালানি শক্তি ঘিরে আরোপিত নিষেধাজ্ঞাকে তার দেশের অস্তিত্বের ওপর হুমকি হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন।

দ্বিতীয় প্রশ্ন প্রসঙ্গে বলা যায়, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য যুক্তিসংগতভাবে পরিষ্কার; অর্থাৎ আগ্রাসী রাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত মাত্রায় খরচ আরোপ করে যুদ্ধ প্রতিরোধ বা বন্ধ করা। এটা নিয়ে চিন্তার অবকাশ নেই, পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞা সাধারণ রাশিয়ানদের দৈনন্দিন ব্যয় অনেক বেশি বাড়িয়ে দিয়েছে, তবে এতে যে পুতিন যুদ্ধ বন্ধ করে দেবেন এমনটা কেউ আশা করে না।

তার চেয়ে বরং পশ্চিমারা আশা করতে পারে রাশিয়ার অভিজাত শ্রেণীর ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে খানিকটা কাজ হতে পারে। নিজেদের সম্পদ হারানোর পরিবর্তে তারা বরং পুতিনকে যুদ্ধ বন্ধের জন্য চাপ দিতে পারেন। রাশিয়ার ওপর পশ্চিমারা যতগুলো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, তার মধ্যে একমাত্র এ বিধিনিষেধ খানিকটা যুক্তিযুক্ত।

তাছাড়া পুতিনের ক্ষমতাচ্যুত হওয়া কিংবা রাশিয়ার নীতিতে আমূল পরিবর্তনের সম্ভাবনা অনেকে যেমনটা চিন্তা করেন, তার চেয়ে ক্ষীণ। এটি মূলত নির্ভর করবে ইউক্রেনে রাশিয়ার পরাজয়, কোনো সমাধান ছাড়াই সংঘাত দীর্ঘায়িত করা বা রাশিয়ার সেনাবাহিনীর মধ্যে এ ধারণা প্রতিষ্ঠিত হওয়া যে পুতিন তাদের ব্যর্থ করেছেন। এক্ষেত্রে অন্তত যুদ্ধবিরতি কিংবা রাশিয়ার বিজয়ের সম্ভাবনা অনেক বেশি। তাই অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা যুদ্ধ থামাতে বা শান্তি রক্ষার জন্য তেমন ভূমিকা পালন করবে না।

যুক্তরাজ্যের হাউজ অব লর্ডসের একটি প্রতিবেদনের উপসংহারে বলা হয়েছে, ‘অন্যান্য নীতি উপকরণ থেকে বিচ্ছিন্নভাবে ব্যবহূত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে লক্ষ্যবস্তুকে (রাষ্ট্র) বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তনে বাধ্য করার সম্ভাবনা খুবই কম।’ এমনকি দক্ষিণ আফ্রিকাকে বর্ণবাদ ত্যাগ করতে বাধ্য করার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞার বিরল সাফল্য দুটি বিশেষ পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। এক. সারা বিশ্ব থেকে বর্ণবাদের অবসানে চাপ প্রয়োগ। দুই. বাহ্যিক চাপ প্রয়োগের বিপরীত ব্যবস্থা গ্রহণে দেশটির প্রয়োজনীয় শক্তি-সামর্থ্যের অভাব। এ দুটোর কোনোটিই আজ রাশিয়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তুরস্ক, চীন ও ভারতের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রগুলো রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপে সম্মতি দেয়নি। তাছাড়া পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার বিপরীতে রাশিয়ার সম্ভাব্য পাল্টা নিষেধাজ্ঞা আরোপের মধ্যে রয়েছে তেল ও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেয়া; ইউরোপ যার ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।

এটাই শেষ নয়, হাউজ অব লর্ডসের প্রতিবেদনে ‘অন্যান্য নীতি উপকরণের’ মধ্যে ‘হুমকিস্বরূপ বা শক্তির প্রকৃত ব্যবহার’-এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অন্য কথায়, কোনো রাষ্ট্রের আচরণ পরিবর্তনের জন্য অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার অকার্যকারিতা যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়া ঝুঁকির মাত্রা বাড়িয়ে তোলে। আর ঠিক এ কারণে পশ্চিমা দেশগুলো এখন পর্যন্ত ইউক্রেনের আকাশকে উড্ডয়ন নিষিদ্ধ এলাকা বা ‘নো ফ্লাই জোন’ ঘোষণার পক্ষে সায় দেয়নি।

রাশিয়ার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ যুদ্ধের বিকল্প বলে মনে করা হয়। তবে তা শুধু কৌশলগত উপাদান হয়ে ক্রেমলিনের আচরণ পরিবর্তন করবে—এমনটা আশা করা যেতে পারে। নির্মম সত্য হচ্ছে, পশ্চিমা দেশগুলো যদি ইউক্রেনকে সহযোগিতা করতে চায় তাহলে রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোর হুমকিকে বাদ দিতে পারবে না। আর এটা স্বীকার করা মানে তাদের নিষেধাজ্ঞা নীতির পুরো যুক্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা।

আরো সহজ করে যদি বলতে হয় তাহলে প্রতিরোধমূলক কূটনীতির ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ব্যবহার করাটা মূলত একটি অস্ত্র হয়ে উঠেছে। তাছাড়া বিশ্বের কিছু দেশকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখে এবং তারা বিরোধী ব্লকের এমনটা প্রচার করার মাধ্যমে বিশ্বায়নের যে সামান্য কিছু প্রতিশ্রুতি আজও টিকে আছে তা ধ্বংসের পটভূমি রচনা করা হয়।

ইংরেজ লেখক স্যামুয়েল জনসন বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন, যেমন অর্থপ্রাপ্তির আশা ছাড়াই একজন মানুষকে নির্মোহভাবে কাজে নামানোর কয়েকটি উপায় রয়েছে। তার সমসাময়িক ফরাসি দার্শনিক মঁতেসকিয়্যু ঘুষ বাণিজ্য নিয়ে বলেছেন। গ্রিক নেতা পেরিক্লিস যেমন স্পার্টান সেনাপতিদের বড় অংকের উেকাচ দিয়ে যুদ্ধ এড়াতে সমর্থ হয়েছিলেন। এটা ঠিক, অনেক বাণিজ্যই অপরাধমূলক এবং যার মাধ্যমে বেশির ভাগ দুর্নীতিগ্রস্ত ও অত্যাচারী সরকারগুলো উপকৃত হয়। কিন্তু দেশগুলোকে প্রাক-আধুনিক অর্থনৈতিক অবস্থার দিকে ফিরে যেতে বাধ্য করা উত্কর্ষ সাধনের কোনো উপায় নয়।

[স্বত্ব:প্রজেক্টসিন্ডিকেট
]

 

রবার্ট স্কিডেলস্কি: ব্রিটিশ হাউজ অব লর্ডসের সদস্য এবং ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল ইকোনমির

ইমেরিটাস প্রফেসর

ভাষান্তর: রুহিনা ফেরদৌস