মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক পার্টির মধ্য থেকে আসন্ন নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসেবে জো বাইডেন কিংবা কমলা হ্যারিস কেউই আমার প্রথম পছন্দের ছিলেন না। কিন্তু গত মাসের শুরুর দিকে বাইডেন যখন, তিনি ততক্ষণে দলের সম্ভাব্য মনোনীত প্রার্থী, ভাইস প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসেবে সিনেটর কমলা হ্যারিসকে বেছে নেয়ার ঘোষণা দেন, খবরটি তখন তাজা বাতাসে নিঃশ্বাস নেয়ার মতো এক অনুভূতির জোগান দেয়।
সদ্য সমাপ্ত গণতান্ত্রিক জাতীয় সম্মেলনে (ডেমোক্রেটিক ন্যাশনাল কনভেনশন) রাজনীতিতে শিষ্টাচার ও সহানুভূতির প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। ওই সম্মেলনে কয়েকজন রিপাবলিকানপন্থীও উপস্থিত ছিলেন, যেমন ওহিওর সাবেক গভর্নর জন ক্যাসিচ। সেখানে অনুপ্রেরণাদায়ক ও গ্রহণযোগ্য বক্তৃতা প্রদানকালে বাইডেন আমেরিকাকে ‘আবারো বিশ্বের জন্য আলোকিত রাষ্ট্র’ হিসেবে গড়ার প্রতি জোর দিয়েছেন। তার কথাগুলো শুনে আমি ভীষণ আশান্বিত বোধ করছি।
নভেম্বর নির্বাচনে যদি বাইডেন ও হ্যারিস জয়ী হন, তাহলে তারা গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত উদ্যোগ প্রবর্তন করবেন। তারা আমেরিকার বিব্রতকর স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতি ঘটাবেন, যা কিনা বর্তমানে জনগণের একটি বড় অংশকে চিকিৎসা-গবেষণা এবং বিশ্বের সেরা স্বাস্থ্য সুবিধা প্রদান করা থেকে বিরত রয়েছে। তাছাড়া তারা আমেরিকার শ্রমজীবী মানুষের করুণ অবস্থার উন্নতি সাধনের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হারানো প্রচেষ্টার পুনরুদ্ধার করবেন। যদিও আমি মনে করি না যে তাদের কেউই বার্নি স্যান্ডার্স কিংবা এলিজাবেথ ওয়ারেনের মতো আমূল সংস্কারের জন্য চাপ দেবেন।
যাই হোক, এখানে আমাদের আশাবাদী হওয়ার দুটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, যেকোনো ডেমোক্রেটিক প্রার্থীর মধ্য থেকে বাইডেন ও হ্যারিসের জয়ের সম্ভাবনা অনেক বেশি। দ্বিতীয়ত, অতীতে যে প্রতিষ্ঠানগুলো আমেরিকাকে বিশ্বে নেতৃত্বদানে সক্ষম করেছিল, তারা ওই প্রতিষ্ঠানকে আবারো শক্তিশালী করবেন এবং বৈশ্বিক নেতৃত্বদানের সক্ষমতাকে পুনরুদ্ধার করবেন। বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও বাইডেন ও হ্যারিসের আমেরিকার জন্য মূলত কী কী করা উচিত, সেসব বিষয় ঘিরে বিস্তর লেখালেখি হয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে যে তাদের কিন্তু বৈশ্বিক কিছু দায়িত্বও রয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে নেতৃত্ব ছেড়ে দেয়ার সবচেয়ে ক্ষতিকারক পরিণতিটি হচ্ছে আন্তর্জাতিকভাবে আমেরিকা তার মর্যাদা খুইয়েছে, যা চূড়ান্ত নেতিবাচক পরিণতি হিসেবে বিশ্বব্যাপী জনতুষ্টিবাদ ও কর্তৃত্ববাদকে উসকে দিয়েছে। এটা নিশ্চিত যে আমেরিকার বৈশ্বিক কার্যক্রমগুলো ত্রুটিমুক্ত নয়। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকের প্রথম দিকে বেশ কয়েকবারই ইতিহাসের ভুল পক্ষে তাদের অবস্থান দেখা যায়; যার মধ্যে ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে শুরু করে রয়েছে চিলির প্রেসিডেন্ট সালভাদর আলেন্দের ক্ষমতাচ্যুতিকে সমর্থন করা এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ। সৌভাগ্যবশত আমেরিকার শীতল ‘বাস্তববাদী’ বৈদেশিক নীতি ধীরে ধীরে খানিকটা নৈতিক পরিধি ও বৈশ্বিক উদ্বেগকে আমলে নিতে শুরু করেছিল। এ ধরনের পরিবর্তনের জন্য সর্বাধিক কৃতিত্বের দাবিদার হলেন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার। যদিও তিনি ভীষণ বিনম্র ও পরিমিত ব্যক্তিত্বের অধিকারী এবং রাজনীতিতে খুব একটা পারদর্শীও ছিলেন না, তবে নৈতিক কারণে নিজের পরাজয়ে প্রস্তুত হওয়ার মতো বিরল গুণাবলির উপস্থিতি ছিল তার চরিত্রে। ২০১৮ সালে স্টিফেন কলবার্টের দ্য লেট নাইট শো-তে বিষয়টি খানিকটা পরিষ্কারও হয়েছে।
বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে আমাদের অবশ্যই উপলব্ধি করা জরুরি যে বিশ্বের সব মানুষ, সব জাতি-গোষ্ঠীই জন্মগতভাবে সমান ও সমপর্যায়ের। উগ্র জাতীয়তাবাদ শুধু অর্থনীতির জন্যই খারাপ নয়, নৈতিকভাবেও ত্রুটিপূর্ণ। আজ বর্ণবাদ বা গোষ্ঠীবাদকে আমরা যেমন নেতিবাচক হিসেবে বিবেচনা করি, আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই যে এমন একদিন আসবে যেদিন উগ্র জাতীয়তাবাদকেও আমরা তেমন নেতিবাচক হিসেবেই বিবেচনা করব। উগ্র জাতীয়তাবাদ, যেখানে বিশ্বাস করা হয় যে বিশেষ কোনো রাষ্ট্রের বাসিন্দা অন্য কোনো দেশের জাতি-গোষ্ঠীর তুলনায় বিশেষভাবে শ্রেয় ও যোগ্য।
এর কারণ বর্তমানে আমরা জাতিগত রাষ্ট্র ব্যবস্থার এক বিশ্বে বাস করি, যেখানে জাতীয়তাবাদকে এড়ানোর উপায় নেই। তবে আমাদের এখন এমন নেতৃত্বের প্রয়োজন, যারা আন্তর্জাতিক মননের পথিকৃৎ হতে পারেন এবং দারিদ্র্য ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠী তারা যেখানেই বসবাস করুক না কেন, সবাইকে নিয়ে সব মানবতার জন্য একটি উন্নত ভবিষ্যৎ গঠনের কাজে সহযোগিতা করতে পারেন। ট্রাম্পের নেতৃত্ব আমেরিকাকে যতটা পিছিয়ে দিয়েছে, তার বিপরীতে বৈশ্বিক নেতৃত্বকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য বাইডেন ও হ্যারিসকে নিজেদের কাঁধে গুরুদায়িত্ব তুলে নিতে হবে।
বিশ্বমানবতার কল্যাণে বাইডেন ও হ্যারিস কিন্তু ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহরুর চিন্তাগুলো বিবেচনায় নিয়ে দেখতে পারেন। অন্য কোনো নেতার তুলনায় নেহরু বিষয়গুলোকে নিয়ে ভীষণ স্পষ্টভাবে কথা বলেছেন। তিনি ভারতের স্বাধীনতার জন্য লড়েছেন, যেখানে জাতীয়তাবাদ পরিষ্কার একটি চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। তবে তিনি এ বিষয়ে সচেতন ছিলেন যে আমাদের এমন একটি বিশ্ব প্রতিষ্ঠার দিকে অগ্রসর হতে হবে, যেখানে বর্ণ, ধর্মীয় ও জাতীয় পরিচয় ছাপিয়ে মানুষ পরিচয়টাই প্রাধান্য পাবে। ১৯৫৩ সালে ভারতের মুখ্যমন্ত্রীদের উদ্দেশে লেখা এক চিঠিতে নেহরু তার অবস্থান পরিষ্কার করেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, ‘জাতীয়তাবাদের অনুভূতি ব্যক্তি ও জাতির জন্য একটি বিস্তৃত ও প্রসারিত অভিজ্ঞতা। বিশেষ করে একটি দেশ যখন বিদেশী আধিপত্যের অধীনে থাকে তখন জাতীয়তাবাদ একটি শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ শক্তি। তবে একটি পর্যায়ে এমন একটি পরিস্থিতি আসে যখন এটির একটি সংকীর্ণ প্রভাব থাকতে পারে
[...]।’
সে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, নেহেরু বিশ্বাস করতেন, কারণ ‘প্রতিটি মানুষই একটি বিচিত্র বিভ্রান্তিতে ভোগে যে তারা অন্য সবার চেয়ে আলাদা ও উন্নত। তাই তারা যখন শক্তিশালী ও ক্ষমতাবান হয়ে ওঠে, তখন তারা নিজেদের মতো করে অন্যের ওপর কর্তৃত্বারোপের চেষ্টা করে কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজেরাই নিজেদের মাত্রা ছাড়িয়ে যায়, হোঁচট খায় এবং পতিত হয়।’
নেহরু তার সদ্য স্বাধীন দেশে সবার প্রতি একটি সতর্কতার নির্দেশনা দিয়ে শেষ করেছিলেন। ‘ভারতে বর্ণ ও বিচ্ছিন্নতার ঐতিহ্যের কারণে আমাদের বিশেষভাবে যত্নবান হতে হবে। কেননা বৃহত্তর ঐক্য ভুলে আমাদের বিভিন্ন গোষ্ঠীতে বিভক্ত হওয়ার প্রবণতা রয়েছে।’
এ পর্যায়ে ভারতের জায়গায় আমেরিকাকে বসানো এবং তা থেকে শিক্ষাগ্রহণের বিষয়গুলো আমি জো বাইডেন ও কমলা হ্যারিসের ওপর ছেড়ে দেব এবং তারা আমেরিকার বৈশ্বিক দায়বদ্ধতাগুলো স্বীকার করার পাশাপাশি নেতৃত্বের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে মানবতার কল্যাণের জন্য কাজ করবেন—এ বিষয়ে অবশ্যই আমি আমার আশা ছেড়ে দেব না।
[স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]
কৌশিক বসু: বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ও আমেরিকার কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক
ভাষান্তর: রুহিনা ফেরদৌস










