(পূর্ব প্রকাশের পর)

আমরা সবাই রেডিও স্টেশনে ঢুকলাম। হান্নান সাহেব তাড়াতাড়ি করার জন্য ইঞ্জিনিয়ারদের অনুরোধ করায় তারা তত্ক্ষণাৎ কাজে লেগে যান। সেদিন ছিল শুক্রবার। এরই মধ্যে ছোবহান সাহেব এসে বললেন যে আপনারা এখন যা বলতে চান, বলতে পারেন। তখন ওই ছাত্র বন্ধুটি হান্নান সাহেবের নির্দেশে ঘোষণা করেন যে চট্টলার বীর হান্নান সাহেব ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র’ থেকে আপনাদের সামনে বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে বেতারে ভাষণ  দেবেন। আ. ছোবহান সাহেবের পরামর্শক্রমে কালুরঘাট ট্রান্সমিশনকে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র নাম দেয়া হয়েছিল। তখন বেলা প্রায় ২টা ১০ মিনিট। হান্নান সাহেব প্রথমবারের মতো বঙ্গবন্ধুর পক্ষে বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণা করে দেশবাসীকে জাগ্রত করেন। তিনি প্রথমে দেশের তখনকার পরিস্থিতি করুণভাবে বর্ণনা করেন। তিনি তার বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঘোষণা ও নির্দেশের কথা বারবার উল্লেখ করেন। ঢাকায় হাজার হাজার নিরস্ত্র বাঙালিকে পাক সেনারা হত্যা করেছে এবং সারা দেশে যে হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে তার বর্ণনা দেন। তার ঘোষণার মর্মকথা ছিল—‘আমি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে তার নামে বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণা করছি। আপনারা যারা এই গোপন রেডিও হতে আমার এই ঘোষণা শুনছেন, তারা অন্যদের কাছে এই বাণী প্রচার করবেন। আর যার নিকট যা কিছু আছে, তা নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করুন এবং দেশকে মুক্ত করুন।’ অতি সংক্ষেপে তিনি এই ঘোষণা পাঠ করেন। এই হলো প্রকৃত ঘটনা। এই ছিল প্রথম উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও প্রথম ঘোষণা। এ সময় হঠাৎ টেলিফোন বেজে ওঠে—আপনারা সরে পরুন। আমরা সবাই হান্নান সাহেবের নির্দেশে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র (কালুরঘাট ট্রান্সমিশন) থেকে বাইরে এসে পড়ি। এরপর হান্নান সাহেব আমাদের সবাইকে নিয়ে আন্দরকিল্লায় চলে আসেন। এরই মধ্যে সারা চট্টগ্রাম ও বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় খবর ছড়িয়ে পড়ে হান্নান সাহেব এক গোপন রেডিও  থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। কোন কেন্দ্র থেকে কিংবা কীভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়েছে তা সাধারণ লোকের জানার কথা নয়। কিন্তু রেডিওর সঙ্গে সংযুক্ত লোকেরা খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারে কালুরঘাট থেকে দ্বিপ্রহরে বঙ্গবন্ধুর নামে স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়েছে। এখানে উল্লেখ্য, বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত অসহযোগ আন্দোলনে চট্টগ্রামে রেডিও অফিসের সব কর্মচারী ও কর্মকর্তা পরিপূর্ণভাবে সমর্থন করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে সবাই কালুরঘাট গিয়ে নিজেদের ওই কর্মের সঙ্গে ক্রমে জড়িত করেন। কিন্তু প্রথম উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে (২টা ১০মিনিট) মির্জা নাছির উদ্দিন, আবদুল ছোবহান ও দেলোয়ার হোসেন ছাড়া রেডিও অফিসের কোনো কর্মচারী বা কর্মকর্তা কেউ এই দুঃসাহসিকতার পরিচয় দিতে পারেননি। যদি তারা সেদিন অর্থাৎ ২৬ মার্চ, ১৯৭১ এবং পরবর্তী সময়ে ইঞ্জিনিয়ার মোসলেম খানসহ পরের তিন-চারদিন ওই কার্যক্রমের সঙ্গে মনেপ্রাণে সহযোগিতা না করতেন, চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র যে ভূমিকা রেখেছিল, তা হয়তো সম্ভব হতো না। আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনে  স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্রের নাম ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। আর যারা বা যেসব কর্মী ওই বেতারকার্যে পরিচালনায় সংযুক্ত ছিলেন তারা বাংলার স্বাধীনতার ইতিহাসে সূর্যসৈনিক হিসেবে চিরকাল জাগ্রত থাকবেন।

সেদিন বিকালে অতিকষ্টে বাসায় পৌঁছে একটু বিশ্রাম নেয়ার পর সন্ধ্যার দিকে আগ্রাবাদ বাদামতলীতে খোঁজখবর নেয়ার জন্য যাই। সেখানে যাওয়ার পর পাঁচ-ছয়জনের রেডিও স্টাফের সঙ্গে পরিচিত হই এবং তাদের একান্ত ইচ্ছানুযায়ী কালুরঘাট ট্রান্সমিশনে যাওয়ার জন্য কষ্টে গাড়ির ব্যবস্থা করেছিলাম। আমার যতটুকু মনে পড়ে ওই দলটি সন্ধ্যার সময় কালুরঘাটে রেডিওর অনুষ্ঠান চালিয়েছিল। রাতে মির্জা সাহেবের বাসায় গিয়ে খোঁজখবর নেয়ার পর তাকে কালুরঘাটে সন্ধ্যার সময় কিছু স্টাফ পাঠানোর কথা বলি এবং তাকে কালুরঘাটে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করি। তিনি আমাকে বললেন, ‘রেডিও ইঞ্জিনিয়ার মোসলেম খানকে ট্রান্সমিশন চালু করার জন্য বলেছি, কোনো অসুবিধা হবে না।’ পরে ছোবহান সাহেবের বাসায় যাই এবং সন্ধ্যার খোঁজখবর দিই। রাতে ফিরে রেডিও অন করতে ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ গান শুনলাম। আনন্দে মন ভরে গেল। আমার যতটুকু ধারণা, দিনের বেলায় রেডিও কালুরঘাট ট্রান্সমিশন স্টেশন থেকে চালু হয়েছে—এ খরব পাওয়ার পর সন্ধ্যার সময় বেলাল মোহাম্মদসহ অন্যান্য রেডিও স্টাফ সেখানে পৌঁছেন এবং রেডিও ট্রান্সমিটার ভবন চালু করার ব্যবস্থা করেন। হান্নান সাহেব সন্ধ্যায় পুনরায় স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ওইদিন ছিল ২৬ মার্চের দ্বিতীয় অধিবেশন। রেডিও ইঞ্জিনিয়ার মোসলেম খানই ট্রান্সমিটার চালু করেছিলেন বলে জানা যায়। এরপর আনুমানিক ৯-১০টার মধ্যে এক ভদ্রলোক খুব সুন্দর গলায়, সুন্দর উচ্চারণে ইংরেজিতে সারা বিশ্বের কাছে সাহায্য কামনা করে জোরালো ভাষায় বক্তৃতা দেন। তার বক্তব্য শুনে খুবই আনন্দিত হয়েছিলাম এবং আমরা দ্বিপ্রহরে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্রের নাম দিয়ে যে ট্রান্সমিশনটি চালু করেছিলাম, তা এখনো চালু আছে বুঝতে পেরে মনে যে কী অনুভূতি হয়েছিল, তা এখন প্রকাশ করা সম্ভব নয়।

২৭ মার্চ সকালবেলা ছোবহান সাহেবের বাসায় খোঁজখবর নেয়ার জন্য যাই, তিনি আমার কথা শুনে তাড়াহুড়ো করে আসেন এবং আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেন, ‘হালিম সাহেব, গতকাল রাতে আপনি যাওয়ার পর পরই বিরাট দেহের অধিকারী এক ভদ্রলোক আমার বাসায় এসে আমাকে একপ্রকার জোর করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের গাড়িতে কালুরঘাট রেডিও সেন্টারে নিয়ে যান এবং ইংরেজিতে দারুণ এক বক্তৃতা দেন। তিনি সারা বিশ্বের কাছে বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশে সাহায্য কামনা করেন। আমাকে আনুমানিক সাড়ে ১০টা-১১টার মধ্যে বাসায় পৌঁছে দেন। পরে জানতে পারি ওই ভদ্রলোকের নাম ছিল মোহাম্মদ হুসেন এবং পরে আগরতলা যাওয়ার পথে পাঞ্জাবিদের গুলিতে তিনি মারা যান। তিনিই ছোবহান সাহেবকে নিয়ে ২৬ মার্চ রাতে তৃতীয়বারের মতো রেডিও ট্রান্সমিশন চালু করেছিলেন এবং যার অবদানে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র চালু হয়েছিল। পরম দুঃখের বিষয় সেই ছোবহান সাহেব আর ইহজগতে নেই। তবে তার কিছু লেখা আমার কাছে এখনো সংরক্ষিত আছে। পরের দিন ২৭ মার্চ কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা ও বেলাল মোহাম্মদের একান্ত সহযোগিতায় মেজর জিয়াউর রহমান পটিয়া থেকে এসে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এখানে উল্লেখ্য, মেজর জিয়াউর রহমান ২৫-২৬ মার্চ একদল সহযোগী নিয়ে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট থেকে পটিয়া চলে যান। ২৮ মার্চ জিয়াউর রহমান সংশোধিত আকারে পুনরায় বঙ্গবন্ধুর নামে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। মেজর জিয়াউর রহমানের এ ঘোষণা নিরস্ত্র সৈনিক ও সাধারণ জনগণকে স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দেয়ার পক্ষে ব্যাপক উৎসাহিত করেছিল। ২৭ মার্চ ডাক্তার আবদুল মান্নান, এমপিও জাতির প্রতি যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য আকুল আবেদন করেন। প্রকৃতপক্ষে রেডিও চালু হয়েছে জানতে পেরে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা ও সাংস্কৃতিক কর্মী দলে দলে এসে কালুরঘাট ট্রান্সমিটার ভবনে স্বাধীনতার পক্ষে গান, কবিতা ও বক্তৃতা দিতে থাকেন। আমরা ছাড়াও অন্য দুই-তিনটি গ্রুপ ট্রান্সমিটার ভবনে কাজ করে, যা স্বীকৃত আছে। এদের মধ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের তখনকার ছাত্রলীগের কর্মকর্তারা ট্রান্সমিটার ভবন থেকে স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলেন, যা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ২৭ মার্চ স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র থেকে ঘোষণা দেয়া হয় যে যার কাছে যা কিছু আছে তা নিয়ে বেলা ৩টার সময় চট্টগ্রাম লালদীঘির ময়দানে হাজির হওয়ার জন্য। আমরা এ ঘোষণার প্রতিবাদ করি এজন্য যে, পাকিস্তানি বাহিনী হয়তো একসঙ্গে সবাইকে আটক করতে পারে। পরে অবশ্য ঘোষণাটি বাতিল করা হয়। এছাড়া দেশবাসীকে উৎসাহিত করার জন্য তখন অনেক সত্য-মিথ্যা খবর প্রচার করা হয়েছিল, যেমন প্রচার করা হয়েছিল মেজর জেনারেল টিক্কা খান মুক্তিবাহিনীর হাতে সদলবলে নিহত হয়েছেন। এ খবর শুনে সবাই আনন্দিত হয়েছিল। দেশবাসী যেন কোনো অবস্থাতেই নিরুৎসাহিত না হয়, সেজন্য শেখ সাহেবকে পাকিস্তানি বাহিনী বন্দি করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে গিয়েছিল, সে খবরকে মিথ্যা বলে প্রচার করা হয় এবং বলা হয়েছিল, শেখ সাহেব এক গোপন আস্তানায় বসে আমাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। পাকিস্তানি বেতারে বারবার ঘোষণা দেয়া সত্ত্বেও কেউ বিশ্বাস করেনি যে শেখ সাহেব বন্দি হয়েছেন। এ ধরনের নানা সত্য-মিথ্যা ঘটনা মানুষকে উৎসাহিত করার জন্য প্রচার করা হয়েছিল। পরে ২৯ মার্চ ট্রান্সমিশনটি রামগড়ের মধ্য দিয়ে ভারতের আগরতলায় পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। ৩০ মার্চ কালুরঘাট ট্রান্সমিটার ভবনে পাক বিমান বাহিনী বোমা ফেলে এর ক্ষতিসাধন করে। এই গেল স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্রের গোড়াপত্তনের ঘটনা। সে সময়ের অবস্থা কেমন ছিল এবং কী প্রকার প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে ওই ঘটনাগুলো ঘটানো হয়েছিল বা স্বাধীনতা ঘোষণার মতো কাজ কীভাবে করা হয়েছিল, তা এখন কাউকে বোঝানো যাবে না। তখনকার কথা মনে হলে এখনো অবাক হতে হয়। অথচ কেউ কেউ ওইদিন অর্থাৎ ২৬ মার্চ শুক্রবার বেলা ২টা ১০ মিনিটের সময় স্বাধীনতা ঘোষণাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে উল্লেখ করেছেন এবং সন্ধ্যায় ৭টা থেকে ৭টা ৪০ মিনিটের অধিবেশনকে প্রথম অধিবেশন বলে বোঝাতে চেয়েছেন।

পরিশেষে বলতে চাই, বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার যদি স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্রের গোড়াপত্তনের সঠিক ইতিহাস উন্মোচন করতে চায় তাহলে ওই ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ব্যক্তিদের সাক্ষাত্কার নিলেই বাস্তব ঘটনা প্রকাশ হবে। তবে এক্ষেত্রে রেডিও ইঞ্জিনিয়ারদের প্রাধান্য দেয়া উচিত। কারণ রেডিও ইঞ্জিনিয়ার ছাড়া কোনো লোকই রেডিও স্টেশন চালু করতে সমর্থ ছিল না বা সম্ভব নয়। তত্কালীন ইঞ্জিনিয়ারদের অনেকে এখনো জীবিত আছেন। মির্জা নাছির উদ্দিন (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত), রেডিও ইঞ্জিনিয়ার দেলোয়ার হোসেন এবং রেডিও ইঞ্জিনিয়ার মোসলেম খান এখনো কর্মরত। আবদুস ছোবহান এরই মধ্যে ইন্তেকাল করেছেন। এখনো সময় আছে। সরকার প্রকৃত ঘটনার মূল উদ্ঘাটন করে জনগণের মনের সন্দেহ দূর করবে—এটাই আমার প্রত্যাশা। (শেষ)

[নিবন্ধটি দৈনিক পূর্বকোণ পত্রিকায় ১৯৯২ সালের স্বাধীনতা দিবসের বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশিত।]

 

এমএ হালিম: মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক কাস্টমস কর্মকর্তা