দেশে আয় বৈষম্য আগে থেকে থাকলেও ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক তত্পরতা দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। এ অবস্থায় করোনার মতো ধ্বংসাত্মক অতিমারীর কারণে অর্থনীতি থমকে দাঁড়ায়। সরকার নানাভাবে ব্যবসাকে চাঙ্গা রাখার জন্য আর্থিক সহযোগিতা করার চেষ্টা করছে। কিন্তু অর্থনৈতিক স্থবিরতা কাটতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার প্রেক্ষাপটে দেশের আমদানি বৃদ্ধিসহ অর্থনীতিতে ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়। ফলে ইউক্রেন যুদ্ধের আগে থেকে এসব কারণে দেশে ডলার সংকট দেখা দেয়।

২০২০-এর মার্চের পর থেকে প্রায় ছয় মাসের লকডাউন থাকায় সব ধরনের অর্থনৈতিক তত্পরতা স্থবির হয়ে পড়ে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমদানি রফতানিও আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়, বিশেষ করে ব্যাপকহারে নিম্ন আয়ের লোকেরা তাদের কর্মংসংস্থান হারায়।

২০২১ সালের দ্বিতীয়ার্ধে করোনা পরিস্থিতি আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হয়। সঙ্গে সঙ্গে দেশের অর্থনীতিও চাঙ্গা হতে থাকে এবং সব ধরনের পণ্যের চাহিদা আবার বাড়ে। উত্পাদনও বাড়তে থাকে। ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যেক্তারা স্থবির বিনিয়োগ কার্যক্রমকে আবার চাঙ্গা করা শুরু করেন। আমদানি রফতানির সঙ্গে কর্মসংস্থানও বাড়ে।

ফলে জ্বালানি তেল, শিল্পের কাঁচামাল, মধ্যবর্তী পণ্য, মূলধনী যন্ত্রপাতিসহ সব ধরনের পণ্যের আমদানি বাড়ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) ২ হাজার ৩৩৮ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে, যা ২০২০-২১ অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৫১ দশমিক ৩৩ শতাংশ বেশি। কম প্রবাসী আয় আসা এবং আমদানির পরিমাণ দ্রুত বাড়ায় ডলারের সংকট তখন থেকেই দেখা দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকগুলোর আমদানি বিলের চাহিদা মিটাতে ডলার বিক্রি অব্যাহত রেখেছে। ফলে ব্যাংকগুলোর নগদ টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে চলে যাচ্ছে।

ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় একই পরিমাণ আমদানীকৃত দ্রব্যের জন্য বেশি দাম পরিশোধ করতে হচ্ছে। ফলে মূল্যস্ফীতিভিত্তিক মুদ্রাস্ফীতি তৈরি হচ্ছে। আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাড়ছে বাণিজ্য ঘাটতি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য জ্বালানি তেল, তরলকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), ভোজ্যতেল, গমসহ অনেক পণ্যের দাম ব্যাপকভাবে বেড়েছে। করোনার সময় হুন্ডির ব্যবসা বন্ধ ছিল। করোনা চলে যাওয়ার পর হুন্ডির ব্যবসা আবার চাঙ্গা। ফলে হুন্ডির মাধ্যমে পুঁজি পাচারও বেড়েছে। আবার বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম বাড়ার সুযোগ নিয়ে ওভার-ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমেও পুঁজি পাচার বেড়েছে। ঊর্ধ্বমুখী জাহাজ ভাড়াসহ আমদানি ব্যয় রফতানি ও প্রবাসী আয় দিয়ে মিটানো যাচ্ছে না। ডলার সংকট সে কারণে আরো তীব্র হয়েছে।

গত বছরের মে মাসে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছে ২১৭ কোটি ডলার এবং গত মে মাসে পাঠিয়েছে ১৮৮ কোটি ডলার, যা গত বছরের তুলনায় ১৩ দশমিক শূন্য শতাংশ কম। গত মাসে কোনো কোনো ব্যাংক ৯৫ টাকার বেশি দামে ডলার কিনে আরো বেশি দামে বিক্রি করে। এ চাপে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলারপ্রতি ৮৯ দশমিক ২০ টাকা বেঁধে দেয় ব্যাংকগুলোর জন্য। রফতানিকারকরাও বিল নগদায়ন করতে দেরি করছে। আমদানি বিল পরিশোধে চাপ বাড়ে। ফলে বৈধ পথে ডলার আসার ওপর চাপ বাড়ে। দামে বড় ধরনের তারতম্যের কারণে বৈধ পথের চেয়ে হুন্ডিতে চলে যাচ্ছে প্রবাসী আয়। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আবারো ডলারের দাম পুনর্নির্ধারণ করে।

খুবই সাধারণ অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিছু ডলার বিক্রয় করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। কিন্তু ডলারের প্রবাহের বড় উত্স প্রবাসী ও রফতানি আয়ের প্রবাহ যদি আমদানি প্রবাহের চেয়ে বেশি তফাত্ হয় এবং তা যদি বেশি দিন অব্যাহত থাকে, অভ্যন্তরীণ বা আন্তর্জাতিক যে কারণই থাকুক না কেন, সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে শুধু রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রয় করে বাজার ঠিক রাখা সম্ভব হবে না। এ অবস্থায় বাজার প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ডলারের চাহিদা ও যোগানের যৌক্তিক সমন্বয় সম্ভব এবং সেক্ষেত্রে চাহিদা-যোগানের প্রবাহই তার মৌলিক মূল্যনির্ধারণ করবে। বাজার প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ডলারের মূল্য নির্ধারিত হলে অতিমাত্রার চাপ মোকাবেলা সম্ভব। এতে দেশে তৈরি হওয়া বৈদেশিক বাণিজ্যের বড় ধরনের ঝুঁকি মোকাবেলা করা সম্ভব হবে।

শুরুতে কৌশল ঠিক থাকলে ডলারের সংকট এত তীব্র হতো না। যে দামে ঋণপণ্যের দাম সমন্বয় হচ্ছে, সে দামকে প্রকৃত দর হিসেবে নিতে হবে এবং সঙ্গে সঙ্গে আশপাশের দেশের মুদ্রার সঙ্গে টাকার মানও ঠিক করে দিতে হবে, যেন কোনো ফটকা কারবারের সুযোগ তৈরি না হয়। আস্তে আস্তে দাম বাড়লে আমদানি বাজারে ডলারের দাম বাস্তবভিত্তিকভাবে সমন্বিত হবে। ফলে আমদানিকারকরা ঋণপত্র খুলতে স্বস্তি বোধ করবে। কভিড-১৯-এর যে ভয়াবহতা এবং তা থেকে উত্তরণের সময় সব দেশের মতো বাংলাদেশও বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে। এর সঙ্গে উত্তরণের প্রভাব শেষ হতে না হতেই যোগ হয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ।

বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে দুয়েকটি পদক্ষেপ না নিয়ে সর্বাত্মক পন্থা অবলম্বন করতে হবে। কয়েকটি বিলাসজাত পণ্যের আমদানিতে বাড়তি করারোপ ও মার্জিন বাড়িয়ে দেয়াই যথেষ্ট নয়। এর আওতা আরো বাড়াতে হবে। পরিস্থিতি উন্নতি হলে আবার তা শিথিল করা যেতে পারে। বিশেষ করে পুঁজি পাচার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে সরকারের অনেক মহত্ প্রচেষ্টাও ভেস্তে যেতে পারে। বড় বড় ব্যবসায়ী, আমলা, রাজনীতিবিদদের অনেকেই পুঁজি পাচারে জড়িত। পররাষ্ট্রমন্ত্রী একবার বলেছিলেন, রাজনীতিবিদদের চেয়ে আমলারাই বেশি পুঁজি পাচার করেছেন। বড় বড় ব্যবসায়ী ব্যাংকের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেন। তারাই বিশেষ করে বড় ঋণখেলাপিরা টাকা বিদেশে পাচার করছে। বাংলাদেশ ব্যাংক শতকরা ২ দশমিক শূন্য টাকা হারে জমা দিয়ে খেলাপি কমানোর সুযোগ দেয়ার অর্থ হলো মূলত ঋণখেলাপি গ্রাহককে আরো সুযোগ করে দেয়। ওয়াশিংটনভিত্তিক গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) হিসাব অনুযায়ী বছরে ৯০ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৭৫ দশমিক শূন্য হাজার কোটি টাকা পাচারের তথ্য দিয়েছে। পোশাক খাতেও কম মূল্য দেখিয়ে (আন্ডার-ইনভয়েসিং) রফতানি হচ্ছে। এখনকার অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বাণিজ্য ঘাটতি কমানো। আমদানি নিয়ন্ত্রণ এবং বৈধ চ্যানেলে প্রবাসী আয়ে উত্সাহিত করে এ ঘাটতি কমানোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তাই রফতানি আয় রফতানিকারকরা যেন দেশে আনতে বাধ্য হয়, এজন্য অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংককে বিশেষ তদারকির ব্যবস্থা করতে হবে।

অব্যাহতভাবে টাকার মূল্যমান কমে যাওয়ায় আমদানি খরচ বাড়ছে। আর রফতানিকারকরা উপকৃত হচ্ছেন। সাধারণত রফতানিকারকদের সুবিধা দিতেই স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন করা হয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে এ পথে যেতে হচ্ছে বাধ্য হয়ে। অনেক আগে থেকেই মুদ্রার অবমূল্যায়নের চাপ ছিল। কমপক্ষে ছয় মাস ধরে আস্তে আস্তে টাকার অবমূল্যায়ন করলে বাংলাদেশ আরো দক্ষতার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে পারত। তবে এখনো অনেক কিছু করার আছে।

যেমন যেকোনোভাবে পুঁজি পাচার রোধে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হরে। ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে দেশ থেকে পাচার করা অর্থ বিনা প্রশ্নে ফেরত আনার সুযোগ রাখা হয়েছে। এ সুযোগকে অনৈতিক, অসাংবিধানিক ও বিদ্যমান আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মন্তব্য করে টিআইবি এমন প্রস্তাবকে ‘এই সুযোগ অর্থ পাচারের মতো অপরাধকে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা দেবার নামান্তর’ বলে মন্তব্য করেছে। এতে অর্থ পাচারসহ সার্বিক দুর্নীতি উত্সাহিত হবে।

টাকা যাতে পাচার না হয়, সেজন্য বাজেটে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া উচিত ছিল। পাচার হওয়া অর্থের বিশাল অংশ দুর্নীতি ও ব্যাংকঋণের টাকা। এখন পাচার হওয়া অর্থ কর দিয়ে বৈধতার সুযোগ দেয়ার অর্থ হলো দুর্নীতিকে উত্সাহিত করা। আমরা সবাই জানি, পুঁজি পাচারের প্রধান গন্তব্য হলো যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, ভারত, মালয়েশিয়া ও ইউরোপের দেশগুলো। এসব দেশে তদন্ত দল পাঠিয়ে কারা পাচার করছে, তা জানা যেত।

যেহেতু ডলারের দাম বাড়িয়েই বাজার নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করতে হচ্ছে, এ পরিস্থিতিতে ব্যাংকিং সেক্টরের ৯-৬ বিনিয়োগ ও আমানতের হারের যে নিষেধাজ্ঞা তা তুলে দেয়া উচিত। ফলে অপ্রয়োজনীয় আমদানি নিরুত্সাহিত হবে। প্রবাসী আয়ের প্রত্যাবাসনের সময়টা কীভাবে কমিয়ে আনা যায় এবং তা তাত্ক্ষণিক হাতের মুঠোয় পাঠানোর ব্যবস্থা করতে পারলে প্রবাসী আয়ের দেশমুখী অভিযাত্রা আরো বেগবান হবে। দেশের অর্থনীতিতে অভিবাসীদের অবদান বিবেচনায় তাদের প্রতি আরো সদয় হতে হবে। রেমিট্যান্সের ওপর আড়াই শতাংশে প্রণোদনার সুযোগ মানি লন্ডাররা পাবে, তাতে প্রবাসীদের অপমান করা হয়। মূল্যস্ফীতি, বাণিজ্য ঘাটতি ও ডলার সংকট প্রভৃতির কারণে দেশের অর্থনীতি একটা বড় চাপের মধ্যে আছে বলে মনে হচ্ছে। 

মো. আব্দুল জব্বার

ব্যবস্থাপনা পরিচালক, আভিভা ফাইন্যান্স লিমিটেড