চলমান মার্কিন নির্বাচনের বৈশ্বিক প্রভাব জলবায়ু পরিবর্তনের মতোই ভয়াবহ কিংবা সমৃদ্ধি বণ্টনকারী বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের প্রতিশ্রুতির মতোই গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটি কিন্তু প্রকৃতির ইচ্ছা কিংবা বৈজ্ঞানিক রহস্যের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং এটি নির্ভর করছে আমেরিকান ভোটারদের ওপর।
২০২০-এর নির্বাচনটি আমেরিকাসহ গোটা বিশ্বের জন্য বড় ধরনের বাঁকবদলের মুহূর্ত। প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদে চার বছরের জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচিত হওয়ার ন্যূনতম যে সুযোগটুকু রয়েছে, তা আমাকে রীতিমতো হতবাক করছে। আমি বুঝে উঠতে পারি না রিপাবলিকান নেতা ও ভোটাররা কেন এ লোকটিকে সমর্থন করবেন?
১৯৯৪ সালে আমি ও আমার সহধর্মিণী দিল্লি থেকে যখন আমেরিকার ছোট শহর ইথিকায় বসবাসের জন্য চলে আসি তখন আমাদের দুই সন্তানের নতুন স্কুল ও নতুন বন্ধু তৈরির বিষয়গুলো ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই আমরা খানিকটা উদ্বিগ্ন ছিলাম। কিন্তু সাধারণ গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের পাশাপাশি থাকার জন্য অল্প সময়ের মধ্যে আমরা যখন একটি বাড়ি খুঁজে পেলাম তখন ভীষণভাবে অবাক হয়েছিলাম। শুধু ইথিকা কিংবা ট্রুম্যানসবার্গের মতো প্রগতিশীল ও মুক্ত (ট্রাম্পের ভাষায় ‘কমিউনিস্ট’) হিসেবে পরিচিত শহরগুলোয় নয়, নিউইয়র্ক, নিউ জার্সি ও পেনসিলভানিয়ার মতো শহর ও শহরতলির অবস্থাও একই ছিল।
ঐতিহ্যগতভাবে এ অঞ্চলগুলো ছিল রিপাবলিকানপন্থী। প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করে কিংবা বিভিন্নভাবে দলটির প্রতি এখানকার সমর্থকদের আনুগত্য প্রকাশের কোনো কমতি খুঁজে পাবেন না কেউই। তবে ছোটখাটো দোকানগুলোয় কেনাকাটা করার সময় কিংবা কোথাও নৈশভোজ খেতে গিয়ে আপনি সবসময় বন্ধুসুলভ প্রতিক্রিয়া পাবেন। রাজনীতি ও অর্থনীতির বিষয়ে কথা বলার সময় হয়তো তাদের সঙ্গে আপনার মতবিরোধ হতে পারে, তবে তারা বন্ধুবৎসল, ভদ্র ও শালীন। পরবর্তী সময়ে আমি যখন ওয়াশিংটন ডিসিতে এসে থাকতে শুরু করি তখন আমার পরিচিত রিপাবলিকান অনেক নেতার সঙ্গে আমার আদর্শিক পার্থক্য ছিল, কিন্তু বিষয়টিকে কখনই আমার সমস্যা মনে হয়নি। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তার ‘দি আর্গুমেন্টেটিভ ইন্ডিয়ান’ বইতে যেমন যুক্তি ও তর্ক গণতন্ত্রের প্রধান বিষয় বলে উল্লেখ করেছেন।
রিপাবলিকানদের সঙ্গে তর্কের সময় আমি দেখতে পেয়েছি তারা তাদের ধারণাগুলোর প্রতি প্রতিশ্রুতিশীল এবং একটি নৈতিক পরিধি অনুসরণ করেন। দলটির একটি দুর্দান্ত ইতিহাস রয়েছে—বিষয়টিকে আমি সমাদর করি এবং পরবর্তী সময়ে ব্যক্তিগতভাবে ও বিশ্বব্যাংকে আমার কাজের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে আমি এ সম্পর্কে আরো নিশ্চিত হই।
মনে আছে, ল্যারি প্রেসলারের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের সময় আমি বেশ উদ্বিগ্ন ছিলাম। তিনি একজন রিপাবলিকান সিনেটর, যিনি ১৯৭৯ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত সাউথ ডাকোটার প্রতিনিধিত্ব করেছেন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, ব্যবসা ও বৈদেশিক নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে এক ধরনের অবস্থান গ্রহণ করেন, যা নিয়ে আমি এখানে কথা বলব না।
কিন্তু আমি যতই তার সম্পর্কে জানতে শুরু করলাম ততই আমি তার শিষ্টাচার, সততা ও নীতি পরিপালনের বিষয়গুলোয় মুগ্ধ হয়েছি। নৈতিক নীতির জন্য তার ব্যক্তিগত ত্যাগ স্বীকার করতে রাজি থাকার বিষয়টিকে আমি প্রশংসার চোখে দেখি। আমি ও আমার সহধর্মিণী ল্যারি ও তার স্ত্রী হ্যারিয়েটের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে উঠি এবং ২০১৬ সালের নির্বাচনে তিনি যখন সবার সামনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরোধিতা করেন তখন আমি মোটেও অবাক হইনি।
তাছাড়া ট্রাম্পের বিষয়ে যতই শুনতে থাকি ততই এ ধারণায় পৌঁছি যে আমি যেমন ধরনের রিপাবলিকানদের চিনি, তিনি মোটেই সে রকমের নন। তিনি অযথাই নিজের পক্ষে দাঁড়ান। ফেডারেল ট্যাক্স পরিশোধ না করার বিষয়ে তার প্রতিক্রিয়া ছিল, ‘আমি এখানে বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছি।’ এ কথার মাধ্যমে তিনি ইঙ্গিত দেন যে কর প্রদান করাটা বোকামি। তার এ ধরনের আরো অনেক মন্তব্যের আলোকে যেকোনো নীতিবান রিপাবলিকান তাকে কীভাবে সমর্থন করতে পারেন?
এটা নিশ্চিত যে একটি দলের দলীয় প্রধানের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখে চলাটা কঠিন। যদিও এমন অসংখ্য রিপাবলিকান নেতা আছেন, যারা এটা করছেন। রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান মিশেল স্টেলা, ওহিওর সাবেক গভর্নর জন ক্যাসিচ, পরিবেশ সংরক্ষণ সংস্থার সাবেক প্রশাসক ক্রিস্টিন টড হুইটম্যান, সাবেক সেক্রেটারি অব স্ট্রেট কলিন পাওয়েল এবং ইউটার বর্তমান সিনেটর মিট রমনির মতো অনেকে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর নৈতিক সাহস দেখিয়েছেন।
কেউ হয়তো ডেমোক্র্যাট টিকিট পছন্দ করেন আবার কেউ তা না-ও করতে পারেন। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং ক্যালিফোর্নিয়ার সিনেটর কমলা হ্যারিস এমন বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব নন। যদিও আমার আরো বেশি প্রগতিশীলতা পছন্দ। তবে তারা অন্তত একটা কিছুর পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। বাইডেন কিন্তু কর প্রদানের বিষয়টিকে এড়িয়ে গিয়ে পরবর্তী সময়ে তা নিয়ে দাম্ভিকতা প্রদর্শন করে বেড়াননি। কথা বলার সময় তিনি বাজে ভাষা ব্যবহার কিংবা কাউকে অবজ্ঞা করেন না। নিয়ম করে বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে আমেরিকাকে বিব্রতও করবেন না তিনি। তাছাড়া বাইডেন ও হ্যারিস উভয়ই সাধারণ মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল। তবে বাইডেন প্রশাসনের কাছ থেকে আমি কিন্তু আশা করি না যে তারা আমেরিকান নীতিগুলো আমূল বদলে দিতে শুরু করবেন। কিন্তু সম্পূর্ণভাবে তারা শোভন, শালীন, শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতার ধারণা ফিরিয়ে আনবেন। এ মুহূর্তে যে বিষয়গুলো জরুরিভাবে প্রয়োজন।
রিপাবলিকানদের উপলব্ধি করা জরুরি যে বাইডেন যদি জিতে যান তাহলে আগামী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার তারা পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে আসতে পারবেন। পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের নির্বাচনে বাইডেন যদি পরাজিত হন, তবে মর্যাদার সঙ্গেই তিনি পদত্যাগ করবেন, গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে যেমনটা ঘটে আরকি। ট্রাম্প যদি জয়ী হন তাহলে আমরা যে ধরনের রিপাবলিকানিজম সম্পর্কে জানি, তা নিঃশেষ হয়ে যাবে। একটা সময় আমি আমেরিকার ছোট ছোট শহরে মানুষের মধ্যে যে মূল্যবোধ প্রদর্শিত হতে দেখেছি এবং রিপাবলিকান পার্টি দীর্ঘদিন ধরে যে নীতিগুলোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলো পরিত্যাজ্য হয়ে যাবে।
অবাক হওয়ার কিছু নেই, বৈশ্বিক নেতৃত্বে আমেরিকার গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে বিশ্বজুড়ে অনেকেই বাইডেনকে সমর্থন করছেন এবং তাকে জয়ী হিসেবে দেখতে চাইছেন। রিপাবলিকানদের মধ্যে যারা ভিন্ন কিছুর পক্ষ নিয়েছেন, তারাও একই ধারণা পোষণ করছেন এবং বাইডেনকে প্রকাশ্যে সমর্থন করছেন। আমেরিকার নৈতিক অবস্থান এ মুহূর্তে একটি ভারসাম্যের ওপর ঝুলে আছে, তাই দেশের প্রতি প্রতিশ্রুতিশীল থাকাটা জরুরি।
[স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]
কৌশক বসু: বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ও আমেরিকার কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক
ভাষান্তর: রুহিনা ফেরদৌস










