আধুনিক ও পরিপূর্ণ না হলেও সেতু নির্মাণে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আলাদা ডিজাইন স্ট্যান্ডার্ড রয়েছে। সেটিও যথাযথভাবে পরিপালন করা হচ্ছে না। এ কারণে দেশের একাধিক সেতুর উচ্চতা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। স্বল্প উচ্চতার কারণে বর্ষার সময় সেতুর তল দিয়ে নৌ-চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেও একাধিক সেতু মানদণ্ড উপেক্ষা করে নির্মাণ করা হচ্ছে। গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এমন কয়েকটি   বাস্তবায়নাধীন সেতুর কথা তুলে ধরা হয়েছে। কয়েকটি সেতুর কাজ ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত শেষ হয়েছে। এখন সেগুলো ভেঙে নতুন করে তৈরি করতে হবে। এছাড়া আগে নির্মিত কিছু সেতুর উচ্চতা নিয়েও জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। ডিজাইন স্ট্যান্ডার্ডে সেতুর উচ্চতা তৈরি করা হয়েছে বিআইডব্লিউটিএর ঠিক করে দেয়া সেতুর উচ্চতা অনুযায়ী। নৌ-রুট ভেদে বিভিন্ন সেতুর উচ্চতা কত হবে, তা নির্দিষ্ট করে দেয়া থাকলেও এটি মানছে না এলজিইডি ও সওজ। এটি সরকারি নীতি-বিধি পরিপালনে সংশ্লিষ্ট সংস্থার উদাসীনতার পরিচয়। দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুতই ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।

১০০ মিটারের বেশি দৈর্ঘ্যের সেতু নির্মাণ করার আগে কী কী করা বাধ্যতামূলক, তার সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেয়া আছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে। নির্দেশনা অনুযায়ী সেতু নির্মাণের আগে অবশ্যই জলবিদ্যুৎ পরিস্থিতি, পানির সংস্থান, পরিবেশগত অবস্থা, নৌ-চলাচল ও আর্থসামাজিক অবস্থা জানার জন্য একটি বিস্তারিত সমীক্ষা করতে হবে। সেই সমীক্ষায় নদীর বৈশিষ্ট্য, নদীর তলদেশ ও পানিপ্রবাহ বিবেচনায় রাখতে হবে। সমীক্ষা প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে তবেই সেতুর নকশা ঠিক করে তারপর খরচ নির্ধারণ করতে হবে। এসব বিধানও মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এজন্য দায়ীদের কোনো ধরনের শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে না, যা এ ধরনের কাজকে আরো উৎসাহিত করছে। একটি সেতুর নকশা প্রণয়নের ক্ষেত্রে নদীর গত ১০০ বছরের সর্বোচ্চ পানির উচ্চতা ও গত ৫০ বছরের স্বাভাবিক পানির উচ্চতা বিবেচনা করতে হয়। এর কোনোটিই মানা হচ্ছে না। ফলে সেতু তৈরি হওয়া বা অর্ধেক হওয়ার পর জানা যাচ্ছে তা ডিজাইন স্ট্যান্ডার্ড মেনে হয়নি। আবার নিয়ম অনুযায়ী যেসব নদীতে লঞ্চ কিংবা বড় জলযান চলাচল করে, সেসব নদীতে সেতু তৈরি করতে হলে বিআইডব্লিউটিএর ছাড়পত্র নিতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে সেটিও নেয়া হচ্ছে না। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আন্তঃসমন্বয়হীনতা প্রকট আকার ধারণ করেছে। এটি দূর

করা প্রয়োজন।

সেতু পরিকল্পনামাফিক নির্মাণ করতে হবে। নির্মাণের সময় উচ্চতা ঠিক রাখতে হবে যেন সেতুর নিচ দিয়ে কার্গো চলাচল করতে পারে। উদ্বেগজনক খবর হলো, নতুন প্রকল্পের আওতায় ৮০৫টি সেতু ভাঙতে হবে। সারা দেশে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং যানজট নিরসনে মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। কিন্তু এর প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অপরিকল্পিত, নিচু সেতু, মেয়াদোত্তীর্ণ আবার রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি রক্ষার সেতু, ভুল পরিকল্পনা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সেতুগুলোর কারণে কার্গোসহ অপেক্ষাকৃত বড় ধরনের জাহাজ চলাচল করতে পারছে না। ফলে নদী তথা পানিপথকেন্দ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন পরিকল্পনা ব্যাহত হচ্ছে। অনেক সেতুর রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, কারিগরি সহায়তা, সম্ভাব্যতা যাচাই এবং নকশা প্রণয়নসংক্রান্ত কাজে ভুল রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দুর্নীতির কারণে নির্মাণ পদ্ধতি কিছুটা জটিল হলেও নিরাপদ ও টেকসই অবকাঠামো হচ্ছে না। সমন্বয়হীনতা ও অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণেই এমনটি হয়েছে, যা বন্ধ করা প্রয়োজন।

নৌ-চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়, এমন ধরনের কোনো সেতু ও স্থাপনা নির্মাণ করার কথা নয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ছাড়পত্র ছাড়া অনেক নদী ও খালের ওপর সেতু নির্মিত হয়েছে। অনেক সংস্থা নৌ মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র ছাড়াই সেতু নির্মাণ করেছে। তাই সেসব স্থানে নৌ-চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এসব সেতু একবার নির্মাণ করা হচ্ছে আবার তা ভেঙে ঠিক করা হচ্ছে। এটা যেন একটি স্বতঃসিদ্ধ নিয়ম। এ ভাঙাগড়ার খেলায় রাষ্ট্রের অর্থের অপচয় হচ্ছে। এ অনাচার রোধ করা জরুরি। সেতু নির্মাণে যারা অনিয়ম ও গাফিলতি করছে, তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক সাজা দিতে হবে। উন্নয়ন পরিকল্পনা সড়ক, রেল ও নৌপথের সঙ্গে সমন্বয় করে বাস্তবায়ন করতে হবে। কোনো একটি সংস্থা বা বিভাগের উন্নয়নের কারণে অন্য কোনো সংস্থা বা বিভাগের পরিকল্পনা কিংবা সম্ভাবনা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে সতর্ক হতে হবে। সেতু নির্মাণে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সমন্বয়ের ভিত্তিতে কাজ করতে হবে। নদীপথের ওপর সেতু নির্মাণে সংশ্লিষ্টদের পরিকল্পনায় গলদ দেখা যায়। এক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী চিন্তার অভাব রয়েছে। নদীপথের ওপর সেতু নির্মাণ করতে হবে সুদূরপ্রসারী চিন্তা ও মানদণ্ড অনুসরণ করে। প্রয়োজনে মানদণ্ড যুগোপযোগী করতে হবে।

সারা দেশে উচ্চতা ঠিক রেখে সেতু তৈরি করতে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যেকোনো জায়গায় সেতু বানানোর আগে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ, এলজিইডি ও বিআইডব্লিউটিএর মধ্যে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে। কিন্তু হতাশার বিষয় হলো সংস্থাগুলো প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাও অমান্য করছে। এক্ষেত্রে দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ ও মানদণ্ড পরিপালন করে সেতু নির্মাণে তদারকি আরো শক্তিশালী করতে হবে।