শিশু তীব্র অপুষ্টিতে
ভোগা সর্বোচ্চ
হারের দিক থেকে বিশ্বে
বাংলাদেশ চতুর্থ।
২০১১ সালের
খানা জরিপের
তথ্যানুযায়ী দেশের
ছয় লাখ শিশু তীব্র
অপুষ্টিতে ভুগছে।
পরিসংখ্যানে দেখা
যাচ্ছে, ২০২১
সালে দেশের
হাসপাতালগুলোয় চিকিৎসা
নিতে আসা মারাত্মক তীব্র
অপুষ্টিতে ভোগা
শিশুর সংখ্যা
বেড়েছে, যা আগের বছরের
তুলনায় ৭২ শতাংশেরও বেশি।
খবরটি চরম উদ্বেগজনক। এখনকার
দিনে মারাত্মক
তীব্র অপুষ্টি
না হলে শিশুর মৃত্যু
হয় না এটা ঠিকই,
কিন্তু অপুষ্টি
অনেক সময়ই
শিশুর শারীরিক
ও মানসিক
বিকাশের ক্ষেত্রে
একটা বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। রোগের
বিরুদ্ধে (বিশেষ
করে সংক্রামক
রোগ) লড়াই
করার শক্তি
কমে যায়, বুদ্ধিবৃত্তির সম্পূর্ণ
স্ফুরণ না হওয়ায় শিশুর
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাগুলোর বিকাশ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। গত দুই দশকে
বাংলাদেশে শিশুমৃত্যুর হার যথেষ্টই কমেছে।
প্রশ্ন হলো, অপুষ্টির হার কেন সেই হারে কমছে
না? তার মানে কি এই যে, জন্মের পরে শিশুদের বেঁচে
থাকার সম্ভাবনা
এখন অনেকটা
বেড়েছে ঠিকই,
কিন্তু তাদের
স্বাভাবিক ও সুস্থভাবে বেড়ে
ওঠাটা এখনো
অনিশ্চিত। বস্তুত,
এটাও একটা
কঠিন ধাঁধা
যে, গত দু-তিন দশকে এত আর্থিক উন্নতি
সত্ত্বেও এখনো
অপুষ্টির হার এত বেশি
কেন?
যথাযথ পুষ্টি পেয়ে স্বাভাবিক ও সুন্দর স্বাস্থ্য নিয়ে বেড়ে ওঠা একজন শিশুর অধিকার। এ অধিকার রক্ষা করার দায়িত্ব পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—এ তিন পক্ষের। শিশুর জন্মের অনেক আগে থেকেই এদের পাহারা শুরু হওয়ার কথা, কেননা শিশুর অপুষ্টির পেছনে বড় কারণ হলো মায়ের অপুষ্টি। কিন্তু দুর্ভাগ্য, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তিন পাহারাদারই এ অধিকার রক্ষা না করার জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দায়ী। বর্তমান ও ভবিষ্যতের মায়েদের অর্ধেকের বেশি রক্তস্বল্পতা ও অপুষ্টিতে ভুগছেন, বয়স কুড়ি পেরোনোর আগেই তাদের অনেককে বিয়ে ও সন্তান ধারণ করতে হচ্ছে, শিশুরা জন্মের পরে অবৈজ্ঞানিক খাদ্যাভ্যাসের মধ্যে বড় হচ্ছে—এসবই অপুষ্টির প্রত্যক্ষ কারণ এবং তার জন্য পরিবার ও সমাজ অনেকটাই দায়ী। ব্যক্তি ও সমাজ যেখানে ব্যর্থ হয়, রাষ্ট্র সেখানে হাল ধরে—এটাই নিয়ম। কিন্তু দুর্ভাগ্য, দেশে শিশু অপুষ্টির গুরুত্ব সরকার কোনো দিন গভীরভাবে ভেবে দেখেনি। এ এক গভীর অসুখ, যা নিঃশব্দে ও ধীরগতিতে মানবসম্পদ তথা উন্নয়নের ভিত দুর্বল করে দেয়। অপুষ্টির মূল লুকিয়ে আছে আমাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের জটিল বিন্যাসে। সুতরাং এ অসুখ সারাতে হলে শিশু এবং তার মায়ের যথাযথ খাদ্যনিরাপত্তা, বিশুদ্ধ পানীয় জল, রোগজীবাণুশূন্য পরিবেশ, পুষ্টিকর খাদ্যের সুষম বণ্টন ও নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্য পরিষেবা নিশ্চিত করতে হবে। অপুষ্টিতে ভুগছে এমন লোকদের উৎপাদনশীলতা কম, দৈহিক শক্তি ও ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম, তাই অপুষ্টির চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে এবং পুষ্টির উন্নতির জন্য আরো বেশি বিনিয়োগ ও বিচক্ষণ উদ্যোগ আবশ্যক। এ ধরনের বিনিয়োগগুলো অপুষ্টি সমস্যা কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সাহায্য করবে।
যেসব রাষ্ট্র দ্রুততার সঙ্গে অপুষ্টি কমিয়ে আনতে সমর্থ হয়েছে, সেসব দেশে এটি সম্ভব হয়েছে সরকারি পর্যায়ের নেতৃত্বের দ্বারা সৃষ্ট সহায়ক রাজনৈতিক পরিবেশের কারণে। এ বিষয়ে ভারতের মহারাষ্ট্রের উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। ২০০৬ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে অন্তত দ্রুতহারে খর্বকায় শিশুর সংখ্যা কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে রাজ্যব্যাপী পরিচালিত পুষ্টি কার্যক্রম বড় ভূমিকা রেখেছে। পেরুতে সুশীল সমাজের নেতৃত্বে সংগঠিত প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রার্থীরা জনসমক্ষে অপুষ্টি প্রতিরোধে তাদের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। ব্রাজিল সরকারের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও নীতিমালার সুফল হিসেবে সেখানে খর্বকায়তার হার কমে এসেছে। এক্ষেত্রে শুধু অঙ্গীকারই যথেষ্ট নয়, প্রকৃত অর্থে সহায়ক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। অপুষ্টি প্রতিরোধে বিনিয়োগ বাড়ানো, বিভিন্ন খাতের অংশীদারদের সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। জনসাধারণের পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিতে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু দেশ ভালোও করেছে। যেমন পেরু, ব্রাজিল, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম। এ তালিকায় আরো আছে ইথিওপিয়া, গুয়াতেমালা, মালাউই, তানজানিয়া, নেপালের মতো দেশ। পুষ্টি উন্নয়নে দেশগুলোর সাফল্যের একটিই রেসিপি। সেটি হলো, নিজস্ব প্রেক্ষাপট উপযোগী যথাযথ ও লক্ষ্যাভিমুখী কৌশল গ্রহণ। প্রতিটি দেশই রাজনৈতিক দৃঢ় অঙ্গীকার, শক্তিশালী নেতৃত্ব, প্রমাণভিত্তিক নীতি হস্তক্ষেপ, নিবিড় তদারকি, পারস্পরিক সমন্বয়, পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও যথাযথ জায়গায় সেটি ব্যবহার এবং জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে পুষ্টি কার্যক্রম বেগবান করেছে।
অপুষ্টিকে গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা বিবেচনা করে বাংলাদেশের সরকার পুষ্টি কার্যক্রম জোরদার করেছে। জাতীয় পুষ্টি নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। তীব্র অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের যথাযথ সেবা প্রদানের জন্য সরকারিভাবে গাইডলাইনও তৈরি করা হয়েছে। সব উপজেলা কমপ্লেক্স, জেলা সদর হাসপাতাল, মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রসহ সব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সমন্বিত অসুস্থ শিশু ব্যবস্থাপনা ও পুষ্টি কর্নার স্থাপন করা হয়েছে। যেসব শিশু জটিলতাসহ তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে, তাদের হাসপাতালে ভর্তি করে নির্ধারিত কর্নারে রেখে জাতীয় অপুষ্টি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা অনুযায়ী নিবিড় সেবা দেয়া হয়। নিউট্রিশন সাপোর্ট অফিসারও রয়েছে জেলা পর্যায়ে। এতে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও এখনো বিপুলসংখ্যক শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে। কারণ এসব কর্মসূচি শিশুজন্মের পরে গ্রহণ করা হয়। কিন্তু অপুষ্টি সমস্যার সমাধান করতে হলে জন্মের আগে থেকেই ব্যবস্থা নিতে হবে। আইসিডিডিআর,বি একটি ফর্মুলাও তৈরি করেছে, যা মাঠ পর্যায়ে সফল হয়েছে। শিশুজন্মের আগে থেকে তিন বছর পর্যন্ত তার বিভিন্ন পর্যায় অনুসরণ করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। এ কার্যক্রম বড় আকারে গ্রহণ করতে পারে সরকার।
জাতীয় পুষ্টিনীতিকে আরো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
অপুষ্টির কিছু মৌলিক কারণ রয়েছে, যেগুলো দূর করতে হলে জাতীয় সম্পদ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তার বণ্টন ব্যবস্থায় বৈষম্য কমাতে হবে। জনগোষ্ঠীর সব অংশের মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণ পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত অপুষ্টি সম্পূর্ণভাবে দূর করা সম্ভব হবে না। তিন-চার বছরের শিশুর পুষ্টির জন্য যেটুকু খাবার প্রয়োজন, তা জোগাড় করা অনেক ক্ষেত্রেই দরিদ্র পরিবারেও সাধ্যাতীত নয়। কিন্তু পুষ্টি বিষয়ে অজ্ঞতা, পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশের অভাবে ঘন ঘন পেটের অসুখ, শিশুর তত্ত্বাবধানে অক্ষমতাসহ এমন অনেক বিষয় শিশুর পুষ্টি ব্যাহত করে। খাদ্য সুরক্ষা শিশুপুষ্টির একটি দিক মাত্র, তবে একমাত্র নয়—এ সত্য স্বীকার করতে হবে। বহু বছর ধরে দরিদ্র পরিবারগুলোকে ভর্তুকিতে চাল-গম দিয়েও অনূর্ধ্ব পাঁচ বছরের শিশুদের পুষ্টি কমেনি, তা এত দিনে প্রতিষ্ঠিত। অতএব, প্রয়োজন শিশুর সার্বিক সুরক্ষা ও তত্ত্বাবধান। শহরে দরিদ্র মায়েরা কাজ করবেনই। শিশুদের দেখাশোনায় সহায়তা করতে হবে সমাজকে। ভারতের তামিলনাড়ুতে অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলো সারা দিন দরিদ্র শিশুদের দেখাশোনা করে। তাতে পুষ্টি, শিক্ষা, মেধার বিকাশ সবই সম্ভব। শিশুপুষ্টির জন্য স্তন্যপান আবশ্যক। শ্রীলংকা ৮০ শতাংশেরও অধিক শিশুর সেই সুরক্ষা নিশ্চিত করছে, অথচ বাংলাদেশ এটি করতে পারেনি।
কিশোর-কিশোরী, শিশু ও নারীদের জন্য পুষ্টির অভাব মোকাবেলায় একটি বাস্তবসম্মত পুষ্টি পরিকল্পনা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্রহণ করা উচিত। করোনার সময়ে দরিদ্র জনগণ তাদের দৈনন্দিন আয় কমিয়ে আনায় এরই মধ্যে খাবারের খরচ কমিয়ে দিয়েছে। এখন তারা প্রাণিজ প্রোটিন কম গ্রহণ করছে বলে খবর মিলছে। তাই দরিদ্র মানুষের জন্য পুষ্টিকর খাবারের সহজলভ্যতা এবং তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে হবে। সব উন্নয়ন কর্মসূচিতে খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। পুষ্টির অভাবসহ দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনতে হবে, যাতে তাদের স্বাস্থ্যকর খাবারের ব্যবস্থা করা যায়। তুলনামূলকভাবে টেকসই সমাধানের জন্য আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক উভয় ক্ষেত্রেই কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে। নিম্ন আয়ের গোষ্ঠীর আয়প্রবাহ এ সংকটের সময়ে ত্বরান্বিত করতে হবে, যাতে তারা খাদ্য ও পুষ্টির জন্য নিজস্ব চাহিদা মেটাতে পারে।
অপুষ্টি দূর করতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২৫ সাল পর্যন্ত একটি বৈশ্বিক পুষ্টি উন্নয়ন লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। এর সঙ্গে সংগতি রেখে অপুষ্টির প্রাধান্য থাকা দেশগুলো নিজেদের পুষ্টি কার্যক্রম ও নীতি-পরিকল্পনা সাজিয়েছে। জনসাধারণের পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিতে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু দেশ ভালোও করেছে। মানব উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশ যথেষ্ট এগিয়েছে। স্বাস্থ্য ও পুষ্টির ক্ষেত্রেও অগ্রগতি কম নয়। জাতীয় অর্থনীতির ধারাবাহিক অগ্রগতি সত্ত্বেও বাংলাদেশ কেন অপুষ্টির চক্র থেকে মুক্ত হতে পারছে না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সরকার ২০৪১ সালে
বাংলাদেশকে উন্নত
রাষ্ট্রে পরিণত
করার লক্ষ্য
নিয়েছে। কভিডের
অভিঘাত বাদে
এ লক্ষ্য
অর্জনে দেশ ধারাবাহিকভাবে এগোচ্ছে।
কিন্তু বর্তমানে
জনসংখ্যার একটি
উল্লেখযোগ্য অংশ যেভাবে বহুমাত্রিক মারাত্মক তীব্র অপুষ্টিতে
ভুগছে, তাতে
একটি রূপান্তরশীল অর্থনীতির উপযোগী জনশক্তি
পাওয়াটা অনেক
ক্ষেত্রে কঠিন
হয়ে পড়বে।
অপুষ্টির সঙ্গে
উৎপাদনশীলতার সংযোগ
প্রত্যক্ষ। অপুষ্টি
দূর হলে শ্রমশক্তির উৎপাদনশীলতা আরো বাড়বে। অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়বে
গুণিতক হারে।
সুতরাং উন্নয়ন
ডিসকোর্সের জায়গা
থেকেও অপুষ্টি
মোকাবেলার কাজটি
জরুরি। একটি
সুসংহত পরিকল্পনার মাধ্যমে রাষ্ট্র মানুষের
পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিতে
আরো সক্রিয়
হবে, এটিই
প্রত্যাশা।










