বণ্টনভিত্তিক পরিকল্পনা প্রণয়নে নাগরিকদের আয়ভিত্তিক ডাটাবেজ খুবই জরুরি। কিন্তু বাংলাদেশ এখনা আয়ভিত্তিক সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ তথ্যভাণ্ডার তৈরি করতে পারেনি। এ কারণে নিম্ন আয়ের সব মানুষ সরকারি সহায়তার আওতায় আসে না। বিশেষত দরিদ্র মানুষের সঠিক তালিকার প্রয়োজনীয়তা কভিডে খুব ভালোভাবে উপলব্ধি করা গেছে। অতিদরিদ্রদের চিহ্নিত করতে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ‘ডেভেলপমেন্ট অব বাংলাদেশ পভার্টি ডাটাবেজ’ নামে একটি প্রকল্প একনেকে অনুমোদন করা হয় ২০১৩ সালে। পরে প্রকল্পের নতুন নামকরণ হয় এনএইচডি-‘ন্যাশনাল হাউজহোল্ড ডাটা’। এরই মধ্যে প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে চার গুণ। তার পরও দেশে দরিদ্র মানুষের তালিকা চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি। করোনায় ৭০০ কোটি টাকার এ প্রকল্পের উপযোগিতাও হারিয়েছে। এর জন্য প্রকল্পের ডিজাইন ত্রুটি থেকে সংগ্রহ প্রক্রিয়া, ডাটা সংরক্ষণ ইত্যাদির দুর্বলতার কথা বলা হলেও মূলত সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতা ও আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতাই দায়ী। এতে সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সরকারের অন্যান্য সহায়তা কর্মসূচির আওতায় যাতে দরিদ্ররা আসতে পারে, সেই উদ্দেশ্যেই দরিদ্রদের একটি সঠিক তালিকা প্রণয়ন জরুরি।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় সরকার দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দিয়ে থাকে। এজন্য বহু প্রকল্প হাতে নেয়া হয়, যাতে দরিদ্রদের জীবনযাত্রা সহজ হয় এবং কার্যত দারিদ্র্য হ্রাস পায়। কিন্তু সরকারি এ কর্মসূচিতে প্রকৃত দরিদ্রদের কতজন উপকৃত হচ্ছে, সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। কারণ এখন পর্যন্ত দেশে দরিদ্র মানুষের চূড়ান্ত এবং নির্ভুল একটি তালিকা প্রস্তুত করা সম্ভব হয়নি। ফলে প্রকৃত দরিদ্রদের প্রতিনিয়ত সুবিধাবঞ্চিত হতে হচ্ছে। করোনা মহামারীর আগে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ২০ শতাংশ। করোনাকালে সরকারি হিসাবেই বেড়ে হয়েছে ২৫ শতাংশ। সে অনুযায়ী, দেশে এখন দরিদ্র মানুষ প্রায় সাড়ে চার কোটি। কিন্তু এর পরও ১০ টাকা কেজিতে চাল দিতে মাত্র ৪৭ হাজার দরিদ্র পরিবার ‘খুঁজে পায়নি’ সরকারি কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিরা। ৫০ লাখ দরিদ্র পরিবারকে প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত আড়াই হাজার টাকাও দেয়া যায়নি। অভিযোগ রয়েছে, সরকারের ১৪৫টি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বদলে বেশকিছু সচ্ছল ব্যক্তি ভাতা পাচ্ছে। সরকারের নীতিনির্ধারকদের মতে, এ অনিয়মের প্রধান কারণ হলো, দেশে ধনী ও দরিদ্রের কোনো তালিকা না থাকা। দারিদ্র্য বিমোচনে সরকার বেশকিছু কর্মযজ্ঞ অব্যাহত রেখেছে। এর মধ্যে রয়েছে সামাজিক নিরাপত্তামূলক নানা কর্মসূচি। কিন্তু অনিয়ম, দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সেসব কর্মসূচির সুবিধা শতভাগ পাচ্ছে না মানুষ। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, দরিদ্রদের একটি সঠিক তালিকা তৈরি করতেই ব্যর্থ হচ্ছে সংশ্লিষ্টরা। এ তালিকা তৈরিতেই যেখানে এত অব্যবস্থাপনা, সেখানে দারিদ্র্য বিমোচন কীভাবে সম্ভব, সেটাই বড় প্রশ্ন।

মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, এমনকি ভিয়েতনামে জনসংখ্যার আয়ভিত্তিক তথ্য শুমারির সময়ই সংগ্রহ করা হয়। ভারতেও কিছু রাজ্যে এমন তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলা হয়েছে। আধার কার্ডের মাধ্যমে নিম্ন আয়ের মানুষকে সরকার বিভিন্ন ভর্তুকি ও সুযোগ দিয়ে আসছে। বাংলাদেশের সরকারও দারিদ্র্য বিমোচনে বিপুল অর্থ ব্যয় করলেও দরিদ্র ব্যক্তি সঠিকভাবে চিহ্নিত না হওয়ায় সহায়তার অপচয় হচ্ছে বলে সরকারি গবেষণায়ই উঠে এসেছে। তাই বিদ্যমান পরিস্থিতিতে দরিদ্রদের চিহ্নিত করা জরুরি। চলমান আদমশুমারির মাধ্যমেও প্রত্যেক নাগরিকের আয়ভিত্তিক ডাটাবেজ তৈরি করা কঠিন কিছু নয়। এক্ষেত্রে কিছু বাড়তি তথ্য সংগ্রহ করতে হবে বিবিএসকে। এটি সম্পন্ন হলে দারিদ্র্য বিমোচনে অর্থের অপচয় রোধ করা যাবে আবার সঠিক ব্যক্তির কাছে সঠিক সময়ে সহায়তাও পৌঁছে দেয়া যাবে।

দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচিগুলো চরম দরিদ্রদের কাছে পৌঁছে দেয়া জরুরি। যারা চরম দরিদ্রাবস্থার মধ্যে থাকে, তারা স্বাভাবিকভাবেই সামাজিক কার্যক্রম ও পরিষেবাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রেও বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়। কেননা তাদের অনেকেরই ব্যাংক হিসাব, স্থায়ী ঠিকানা কিংবা আনুষ্ঠানিক পরিচয়পত্র নেই। সরকারি সাহায্যপ্রাপ্তির ক্ষেত্রেও অনেক সময় তারা সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হয়ে থাকে। তাছাড়া প্রায়ই সরকারি কর্মসূচি সম্পর্কিত তথ্যগুলো তারা পায় না, যদিও কর্মসূচিগুলো তাদের জন্যই নেয়া হয়। তাই যাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সাহায্যগুলো তাদের কাছেই পৌঁছে দিতে হবে। সরকার ও তার অংশীজনদের অবশ্যই এমন নীতি ও কর্মসূচি গ্রহণ করা চাই, যার মাধ্যমে সরকারি সাহায্যপ্রাপ্তির বাধাগুলো দূর করে চরম দরিদ্রদের সামাজিক সুরক্ষাজালে অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। আর এর জন্য চাই নির্ভুল ডাটাবেজ। দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিস্থাপকতা তৈরিতে কর্মসূচিগুলোর মাধ্যমে অবশ্যই চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাসকারীদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। শুধু মৌলিক চাহিদা পূরণ নয়, সরকার এবং তার অংশীজনদের এক্ষেত্রে অবশ্যই করণীয় রয়েছে অনেক কিছু। পুনরায় দারিদ্র্যের ফাঁদে পড়া থেকে বাঁচাতে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ প্রদানের মাধ্যমে তাদের সক্ষমতা বাড়াতেও বিনিয়োগ করতে হবে। বিশেষ করে সংকটের সময় এ পদ্ধতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দেশে কার্যকরভাবে দারিদ্র্য হ্রাস করতে হলে সবার আগে সারা দেশে দরিদ্র মানুষের ইউনিয়নভিত্তিক নির্ভুল তালিকা তৈরি করতে হবে। এরপর সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় কোনো কর্মসূচি চালু হলে তালিকা অনুযায়ী সুবিধা পাবেন। এক্ষেত্রে ডিজিটাল তালিকা করলে প্রতি মুহূর্তে উপকারভোগীদের নাম সংযোজন-বিয়োজন করা সহজ হবে। তখন কোটি কোটি গরিব মানুষের দেশে সরকারি সুবিধার অনুমোদন থাকার পরও আর কেউ বঞ্চিত হবেন না। কিন্তু ইউনিয়ন পর্যায়ে দরিদ্রদের তালিকা না থাকায় যখন কোনো কর্মসূচি শুরু হয় তখন দরিদ্র মানুষ খুঁজতে হয়। অনেক সময় একই ব্যক্তি একাধিক সুবিধা পায়। যারা পাওয়ার যোগ্য নয়, তারাও সুবিধাভোগী হচ্ছে। এতে করে প্রকৃত দরিদ্ররা সুবিধাবঞ্চিত হচ্ছে। এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। তাই দেশে দরিদ্র মানুষ যাচাই-বাছাই করতে আমলাতান্ত্রিক প্রতিবন্ধকতা দূর করা আবশ্যক। পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা দরকার, যাতে তারা দরিদ্র তালিকা করতে স্বচ্ছতার পরিচয় দেন।

প্রকল্পের মাধ্যমে যদি বর্তমান দরিদ্র ব্যক্তিদের আসল চিত্র না উঠে আসে, তাহলে প্রকল্পটি অর্থহীন। আর এর মাধ্যমে যদি মূল দরিদ্রের সঙ্গে সরাসরি সংযোগের ব্যবস্থা না হয়, তাহলে এ প্রকল্পে কোনো লাভ হলো না। তাই সরকারের সুযোগ-সুবিধা যাতে একজন দরিদ্র সরাসরি পেতে পারে সে ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী সুযোগ নিতে না পারে। এজন্য দরিদ্রের সঠিক চিত্র উঠে আসা উচিত। কাজটা শুধু পরিসংখ্যান ব্যুরোর নয়, এর সঙ্গে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, অর্থ মন্ত্রণালয়সহ অনেক সংস্থা জড়িত। আর যে প্রতিষ্ঠান জরিপের কাজ করছে, তাদের সঙ্গে বিবিএসের চুক্তি নেই। প্রতিষ্ঠানটি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ। তারা সময়মতো কাজ করতে পারেনি। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় থাকা দরিদ্র সব মানুষকে ডাটাবেজে আনা সরকারের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সেটি বাস্তবায়ন হয়নি। সরকারিভাবে মাঠ পর্যায়ে ত্রাণ বিতরণের সময় বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। পুরনো ধাঁচে ত্রাণ বিতরণ প্রক্রিয়ার কারণে এমনটি হচ্ছে। তাছাড়া যাদের এখন ত্রাণ খুব প্রয়োজন, তাদের নাম সঠিক জায়গায় যাচ্ছে না। বিবিএস যদি তালিকাটি করতে পারত, তাহলে ত্রাণ নিয়ে এমন বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হতো না। বর্তমান পরিস্থিতিতে যাচাই-বাছাই করে স্বচ্ছ তালিকা প্রনয়ণ কঠিন নয়। এজন্য সবাইকে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। তালিকা যেন বস্তুনিষ্ঠ হয়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। কারণ এ দুর্যোগ সবার জন্য। আর দরিদ্রদের জন্য তালিকা করা হলে নিয়মিত সেটি হালনাগাদ করতে হবে। তা যেন রাজনৈতিক বা দলীয় বিবেচনায় না হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।