চট্টগ্রামে ১৬টি শিল্পগোষ্ঠী ও প্রতিষ্ঠানের ১৯টি বেসরকারি কনটেইনার ডিপো সচল রয়েছে। এগুলোর অধিকাংশই রয়েছে অগ্নিনিরাপত্তার বড় ঝুঁকিতে। গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১০টি ডিপোয় ডিজেল পাম্প চালু থাকলেও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কোনো ধরনের অনুমতি বা অনুমোদন নেই। এমনকি পাম্পের নিরাপত্তায় কোনো প্রটোকলও মানা হচ্ছে না। ফলে যেকোনো সময়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। পেট্রল পাম্পগুলো নিয়ম মেনে স্থাপন ও পরিচালিত হচ্ছে কিনা, তা দেখার দায়িত্ব বিপিসির। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, এক্ষেত্রে তারা উদাসীনতার পরিচয় দিয়েছে। শুধু তা-ই নয়, বেসরকারি কনটেইনার ডিপোগুলো বিদ্যমান আইন ও নীতিমালা সঠিকভাবে পরিপালন করছে কিনা, সেটি দেখার দায়িত্ব একাধিক সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের। তারা কেউই পরিপূর্ণ তদারক করেনি বলেই এমন অনিয়ম করে যাচ্ছে ডিপোগুলো। ফলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। বিএম ডিপোয় ভয়াবহ বিস্ফোরণে বিপুল প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতির পর প্রশাসন সচেতন হবে বলে প্রত্যাশা করা হলেও সেটির দেখা মিলছে না। এক্ষেত্রে দ্রুতই বেসরকারি সব কনটেইনার ডিপোর জন্য অগ্নিনিরাপত্তা প্রটোকল পরিপালনে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।
কম-বেশি সব ডিপোতেই অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থায় ঘাটতি রয়েছে। এসব ডিপোর কোনো কোনোটি শর্ত পূরণ না করায় তাদের লাইসেন্স নবায়নের বিষয়টিও আটকে আছে বলেও খবর মিলছে। এছাড়া বিপজ্জনক পণ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও প্রতিটি ডিপোতেই ঘাটতি রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, ডিপোতে নিজস্ব ব্যবহারের জন্য ডিজেল পাম্প বসাতে হলে বিপিসির অনাপত্তিপত্র প্রয়োজন। কোনো কনটেইনার ডিপোই সেটি নেয়নি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের দুটি নীতিমালায় থাকা বিভিন্ন শর্ত মানার পর কনটেইনার ডিপো পরিচালনার লাইসেন্স দেয়া হয়। অবশ্য দুটি নীতিমালায় ডিপোর ভেতরে ডিজেল পাম্প বসানো যাবে কিনা, তা নিয়ে কিছু বলা নেই। আবার ডিজেল পাম্প বসানো যাবে কিনা, সেটি লাইসেন্স প্রদানকারী সংস্থা কাস্টমসকে অবহিত করেনি ডিপোগুলো। এক্ষেত্রে প্রথমেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে কনটেইনার ডিপোর ভেতরে পেট্রল পাম্প বসানো যাবে কিনা। যদি পেট্রল পাম্প বসানো যায়, তাহলে সেটির ব্যবস্থাপনা কেমন হবে বা অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা কেমন হবে, সেটিও নির্ধারণ করতে হবে। সর্বোপরি পেট্রল পাম্প স্থাপনের অনুমতিপ্রাপ্ত সবাই সেটি মানছে কিনা, সেটিও তদারক করতে হবে। প্রাইভেট কনটেইনার ডিপোর অনুমোদন দেয় নৌ-পরিবহণ মন্ত্রণালয়। তবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের একটি বড় ভূমিকা আছে। স্থানীয় শুল্ক কর্তৃপক্ষ চূড়ান্ত অপারেশনাল অনুমোদন দেয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে এটা স্থাপনের যে নীতিমালা তাতে ১৩ ধরনের অনুমতি ও ডকুমেন্টের কথা বলা হয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে ফায়ার ও অগ্নিনিরাপত্তা ছাড়পত্র, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, অগ্নি ও দুর্যোগ বীমা সনদ, বন্ড লাইসেন্স, হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্স, হালনাগাদ মূসক ও আয়কর সনদ, কর্মচারীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা, সব ধরনের নিরাপত্তা যন্ত্রপাতি ইত্যাদি। কিন্তু কোন কনটেইনার ডিপো মালিক এ নিয়ম মানছেন না, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।
বিদ্যমান পরিপ্রেক্ষিতে ডিপোগুলোয় একটি নিরাপদ কাজের পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। কনটেইনার ডিপোর মতো ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাবিষয়ক স্ট্যান্ডার্ড বাস্তবায়ন করা অবশ্যকর্তব্য। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, এখন পর্যন্ত অধিকাংশ ডিপো সেটা নিশ্চিত করছে না। বেসরকারি ১৯টি কনটেইনার ডিপোতে যে নিয়ম মানা হয় না, তার বড় প্রমাণ মেলে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) এক পরিদর্শন প্রতিবেদনে। প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের অধীন এ সংস্থা ২০২১ সালে পরিদর্শন করে গত মার্চে প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে শুধু বিএম কনটেইনার ডিপোতেই ব্যাপক অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, অনুমোদনবিহীন, মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্সসহ ১৭টি অনিয়ম খুঁজে পায়। এর মধ্যে নকশাবিহীন স্থাপনা নির্মাণ, আগুন নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা না থাকা, বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রতিষ্ঠানের সনদ না থাকা, পরিবেশ দপ্তর, জেলা প্রশাসন, এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের লাইসেন্স ছাড়াই পরিচালনা অন্যতম। সে সময়ে বিএম ডিপো মোট ১০২ সূচকের মধ্যে ৩৪ পয়েন্ট পেয়েছিল, শতাংশের হিসাবে তা ৩৩। অথচ বেসরকারি কনটেইনার ডিপোগুলোর মধ্যে দেশী-বিদেশী যৌথ বিনিয়োগে গড়ে ওঠা একমাত্র প্রতিষ্ঠান হলো বিএম কনটেইনার ডিপো। বাংলাদেশ-নেদারল্যান্ডসের বেসরকারি খাতে বড় বিনিয়োগে সর্বশেষ গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানের যদি এই হাল হয় তাহলে অন্যগুলোর কী অবস্থা তা অনুমেয়। বিডার পরিদর্শন প্রতিবেদনে অন্তত অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত, দক্ষ প্রশিক্ষিত জনবল, লাইসেন্স অনুমোদন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতের তাগাদা দিয়ে ১৭টি সুপারিশ করা হয়। সেগুলো বাস্তবায়নের সময়ও বেঁধে দেয়া হয়, কিন্তু সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি। সুপারিশ বাস্তবায়ন হলে আজ এত বড় দুর্ঘটনা সংঘটিত হতো না বা হলেও এত মানুষের প্রাণহানি ঘটত না। দেশের কনটেইনার ডিপোগুলোয় রাসায়নিক রাখার ব্যাপারে কোনো আইন বা নীতিমালা তৈরি করা হয়নি। শুধু বন্দর কর্তৃপক্ষ মৌখিকভাবে এসব কেমিক্যাল ভর্তি কনটেইনার রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে ডিপো মালিকদের সতর্ক করেছে। যে কারণে ডিপোতে অন্যান্য সাধারণ পণ্যের সঙ্গে কেমিক্যাল ভর্তি কনটেইনার একসঙ্গে রাখা হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ-সংক্রান্ত আইন ও নীতিমালা সুস্পষ্ট থাকলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। আমদানি করা কেমিক্যাল ভর্তি কনটেইনার চট্টগ্রাম বন্দরে নামানোর সময় তেমন কোনো সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়া হয় না। কনটেইনারগুলোর গায়ে কেমিক্যাল থাকার সতর্কতামূলক কোনো নির্দেশনা থাকে না। নীতিমালা না হলে ভবিষ্যতে এ-সংক্রান্ত আরো বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
১০টি ডিপো নিজেদের ব্যবহারের জন্য ডিসপেন্সিং মেশিন (গাড়িতে ডিজেল ভরার ব্যবস্থা) ও স্টোরেজ ট্যাংক (মাটির নিচে যেখানে ডিজেল রাখা হয়) স্থাপন করে ফিলিং স্টেশনের মতো কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বিষয়টি নিয়ে বেসরকারি ডিপোর কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিদিন কনটেইনার পরিবহনের যন্ত্রপাতি চালানোর জন্য বিপুল পরিমাণ জ্বালানি দরকার হয়। এজন্য বিস্ফোরক অধিদপ্তর থেকে লাইসেন্স নিয়েই ডিপোর ভেতরে ডিজেল পাম্প বসানো হয়েছে। ডিপোতে ডিজেল পাম্প বসানোর জন্য বিপিসির কাছে কোনো ডিপোই আবেদন করেনি। গত বছর ২২ জুন বিস্ফোরক অধিদপ্তরের কাছে একটি চিঠি দেয় বিপিসি। চিঠিতে বিপিসির অনুমোদন ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে ডিজেল পাম্প বসানোর লাইসেন্স ইস্যু না করতে অনুরোধ করা হয়। ডিপোর ভেতরে ডিজেল পাম্প রাখা ঝুঁকিপূর্ণ। দেশের রফতানি বাণিজ্যের স্বার্থেও ডিপোগুলোয় আন্তর্জাতিক মান ও দেশীয় আইন অনুযায়ী কর্মসহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা দরকার।
আইএমডিজি কোড অনুযায়ী, কোনো দুর্ঘটনার পরপরই বিপজ্জনক পণ্য আগে সরিয়ে ফেলার নির্দেশনা রয়েছে। এ কোড বাস্তবায়নের জন্য প্রশিক্ষণের কথাও বলা আছে। বিপজ্জনক পণ্য পরিবহন থেকে শুরু করে সংরক্ষণে কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে, সেটি বলা আছে আইএমডিজি কোডে। কনটেইনার ডিপো পরিচালনা নীতিমালায় লাইসেন্স অনুমোদন দেয় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। আর বন্ড প্রতিষ্ঠান হিসেবে পণ্যের তদারক করে রাজস্ব বোর্ড প্রতিনিধি হিসেবে চট্টগ্রাম কাস্টমস। এ দুই সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতার সুযোগ পুরোপুরিভাবে নিচ্ছে কনটেইনার ডিপোগুলো। ফলে কখনো বন্দর, কখনো কাস্টমস পৃথকভাবে তদারকির উদ্যোগ নিলেও তদবিরের কারণে শেষ পর্যন্ত সুফল মেলেনি। শাস্তি পর্যন্ত নিশ্চিত করা যায়নি।
কারখানা হোক, ডিপো হোক, বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থ নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের উচিত সেগুলোর ব্যাপারে ব্যাপকভাবে জনসংযোগ করা। ফায়ার সার্ভিস, বিস্ফোরক পরিদপ্তরসহ তদারকি সংস্থাগুলোকে এ সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য জানাতে হবে। তাদের অংশীজন যারা আছে, তাদেরও নিয়মিত এ তথ্য জানানোর ওপর জোর দিতে হবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে কনটেইনার ডিপোগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা জোরদার ও তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা জরুরি। বন্দরসংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলো খুবই স্পর্শকাতর। বেসরকারি কনটেইনার ডিপোগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা, কনটেইনার পৃথক্করণ, ‘আইএমডিজি’ নীতিমালা পরিপূর্ণভাবে অনুসরণের উদ্যোগ নিতে হবে। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বিএম কনটেইনার ডিপোতে অগ্নিকাণ্ড থেকে বিস্ফোরণ এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন রানা প্লাজা বিপর্যয়ের নেতিবাচক ভাবমূর্তি কাটিয়ে বাংলাদেশের শিল্প খাত উত্তরণের পথে চলছিল। বাংলাদেশের অনেক খাতেই এখন পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা গেছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার করা বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষণায় দেখা যায়, এখানকার বেশির ভাগ নিরাপত্তা ঝুঁকি প্রতিরোধযোগ্য। মালিকপক্ষ ও কর্মচারীরা কিছু সাধারণ নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ নিলে বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব।










