জানুয়ারি মাসের প্রথম দিকে আমেরিকান ইকোনমিক অ্যাসোসিয়েশনের (এইএ) বার্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের সাবেক প্রধান জেনেট ইয়েলেন, ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (ইসিবি) সাবেক সভাপতি মারিও দ্রাঘি এবং অন্য খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে পশ্চিমা অর্থনীতিগুলো ‘জাপানীকরণের’ (জাপানিফিকেশন)
ঝুঁকিতে রয়েছে। জাপানীকরণ বলতে তারা বুঝিয়েছেন ভবিষ্যৎ শ্লথ প্রবৃদ্ধি, নিম্ন মূল্যস্ফীতি এবং দীর্ঘস্থায়ীভাবে কম সুদহার বিরাজমান থাকা। শুধু পশ্চিমা অর্থনীতি নয়, আরো বিস্ময়ের বিষয় হলো, মনে হচ্ছে এ অসুখ-অস্থিরতাবোধ (জাপানীকরণ) পূর্ব এশিয়ার অর্থনীতিগুলোকেও হুমকিতে ফেলতে পারে।
একসময়ের
‘এশিয়ান টাইগার’ নামে পরিচিত হংকং, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ান এখন ধীর প্রবৃদ্ধি এবং মূল্যসংকোচনমূলক চাপের মুখোমুখি। গত বছর হংকংয়ের অর্থনীতি ১ দশমিক ২ শতাংশ পর্যন্ত সংকুচিত হয়েছে। অন্য তিনটি দেশের অর্থনীতি কেবল সামান্যই বেড়েছে। এর মধ্যে সিঙ্গাপুরের অর্থনীতি শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ (০.৬%) এবং
দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের অর্থনীতি উভয়ই প্রায় ২ শতাংশ বেড়েছে। উল্লিখিত তিনটি দেশের প্রতিটিতে গেল বছরে মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ। প্রধান শিল্পায়িত দেশগুলোয় এবং চীনে ধীর প্রবৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট বহিঃস্থ দুর্বলতর চাহিদা, অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত ও সরবরাহ ফ্যাক্টর দ্বারা পূর্ব এশিয়ার অর্থনীতিগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তদুপরি তাদের প্রবৃদ্ধি সম্ভাবনাও এখন নিম্নমুখী প্রবণতায় বিরাজ করছে।
এদিকে
অর্থনৈতিক ও জনমিতিকভাবে পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো মনে হচ্ছে জাপানের পদাঙ্ক অনুসরণ করছে। স্টার্টারদের জন্য জাপান এখন বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বুড়িয়ে যাওয়া সমাজ (এইজিং সোসাইটি)। ৬৫ বছর এবং তদূর্ধ্ব বয়সী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ১৯৯৪ সালের ১৪ শতাংশ থেকে ২৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। হংকং, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানেও এখন এই বয়স্ক দলের গড় অংশ ১৪ শতাংশ। ধারণা করা হচ্ছে, সামনের দশকগুলোয় ওইসব দেশে এ সংখ্যা জোরালোভাবে বাড়বে। বিপরীতে একটি সংকোচনশীল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী জনমিতিক লভ্যাংশের সুবিধায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে, যা আগে শক্তিশালী আঞ্চলিক প্রবৃদ্ধিতে বড় ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা জুগিয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, ২০২০ থেকে ২০৪০ সময়পর্বের মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ায় বার্ষিক গড় জিডিপি প্রবৃদ্ধি অনুমান করা হচ্ছে প্রায় এক শতাংশীয় পয়েন্ট, যা এখনকার চেয়ে কম।
উল্লেখ
করা দরকার, জাপানের মতো সাম্প্রতিক দশকগুলোয় পূর্ব এশিয়ার চার অর্থনীতি মন্থর উৎপাদনশীলতা প্রবৃদ্ধির অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েও যাচ্ছে। দেশগুলোর রফতানিমুখী শিল্পগুলো চীনের নিম্ন ব্যয়ের প্রতিষ্ঠানগুলোর দিক থেকে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে। অন্যদিকে সেবা খাতের নিম্ন উৎপাদনশীলতাও সার্বিক উৎপাদনশীলতা উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। আবার দেশগুলো এরই মধ্যে হাই-টেক ফ্রন্টিয়ারে উন্নীত হওয়ায় ভবিষ্যতে তাদের জন্য নতুন প্রযুক্তি উন্নয়নের পথ অন্বেষণও কঠিন হতে পারে।
বিদ্যমান
বাস্তবতায় পূর্ব এশিয়ার নীতিনির্ধারকরা এসব চ্যালেঞ্জ কীভাবে মোকাবেলা করবে, সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, ৩০ বছর আগে দেশটির আবাসন খাতের বিপর্যয়ে ব্যাংক অব জাপানের সন্ত্রস্ত সাড়া অর্থনীতির দুর্দশা বাড়িয়েছিল, যা পরবর্তী দশকগুলোয়ও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। এ দৃষ্টান্ত বা নজিরের প্রতি সজাগ থেকে ইউএস ফেডারেল রিজার্ভ ও ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের পর থেকে আগ্রাসীভাবে সুদহার হ্রাস করেছে এবং বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ (লিকুইডিটি) অর্থনীতিতে জোগান দিয়েছে। যেমনটা জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে প্রশাসনের অধীনে ব্যাংক অব জাপান করেছিল।
এ
বৈঠকে কথা বলার সময় ফেডারেল রিজার্ভের সাবেক প্রধান বেন বার্নানকে কোয়ান্টিটেটিভ ইজিং ও সম্মুখদর্শী নির্দেশনার মতো নতুন নীতি হাতিয়ার ব্যবহারের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রণোদনা আরো বৃদ্ধিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামর্থ্য ও সক্ষমতা বিষয়ে আস্থা প্রকাশ করেছেন। কিন্তু অনেক অর্থনীতিবিদই এক্ষেত্রে সংশয়প্রবণ। তাদের মধ্যে মার্কিন সাবেক অর্থমন্ত্রী লরেন্স সামার্স উল্লেখ করেছেন, ব্যাপক আর্থিক (পড়ুন মুদ্রাগত) সম্প্রসারণ সত্ত্বেও শীর্ষ কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো নিজেদের মূল্যস্ফীতি অভীষ্ট (ইনফ্লেশন টার্গেট) অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে এবং এরই মধ্যে সুদহার রেকর্ড পরিমাণ নিম্নে থাকায় অধিকতর আগ্রাসীভাবে সুদহার হ্রাসের মাধ্যমে পরবর্তী সংকট মোকাবেলা করা তাদের জন্য কঠিন হবে বৈকি।
অধিকন্তু,
আর্থিক-মুদ্রাসংক্রান্ত ইজিং একাই কাঠামোগত প্রধান প্রধান অর্থনৈতিক দুর্বলতা ঠেকাতে পারে না। উদারণস্বরূপ, সামার্স বলেছেন, অত্যধিক সঞ্চয় ও কম বিনিয়োগ শিল্পায়িত অর্থনীতিগুলোয় ‘দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতা’ (সেকুলার
স্টেগনেশন) ঘটাতে পারে। মোহাম্মদ আল-এরিয়ান অবশ্য বয়স্ক জনগোষ্ঠীর আধিক্য, অসমতা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থাহীনতা সৃষ্টির মতো ‘কাঠোমোগত মূল্যসংকোচনমূলক শক্তিগুলোর’ ওপর অধিক জোর দিয়েছেন। অন্যদিকে রবার্ট জে গর্ডনসহ অনেক অর্থনীতিবিদ শ্লথ উৎপাদনশীলতা প্রবৃদ্ধির ওপর বেশি গুরুত্বারোপ করেছেন।
কাজেই
নিজেদের তাত্পর্যজনক কাঠামোগত সমস্যার বাস্তবতায় পূর্ব এশীয় অর্থনীতিগুলো এককভাবে মুদ্রানীতি শিথিল করার মাধ্যমে জাপানীকরণের প্রভাব এড়াতে পারবে না। প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের পদক্ষেপ সময়ান্তরে এমনকি হিতে বিপরীতও হতে পারে। যদিও এসব অর্থনীতি জাপানের মতো সম্পদ-বুদ্বুদ পতনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়নি, তবুও অব্যাহত আর্থিক নীতি শিথিলকরণ এ ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। গত বছরজুড়ে হংকংয়ের আর্থিক কর্তৃপক্ষ ও ব্যাংক অব কোরিয়া কয়েক দফায় তাদের নীতি সুদহার হ্রাস করে যথাক্রমে ২ শতাংশ ও ১ দশমিক ২৫ শতাংশে রেখেছে। সিঙ্গাপুর ও তাইওয়ানেও নীতি সুদহার কম রাখা হয়েছে। দেশ দুটির আলোচ্য হার যথাক্রমে ১ দশমিক ৬৪ ও ১ দশমিক ৩৭৫ শতাংশ। কেননা জাপানের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে যে সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতি অর্থনীতিকে সচল রাখতে পারে বটে, তবে তা সম্পদের দামের বুদ্বুদ এবং অনেক অলাভজনক (জম্বি ফার্ম) সৃষ্টি অব্যাহত রাখার বিনিময়ে।
জাপানীকরণের
প্রভাব প্রতিহত করতে পূর্ব এশিয়ার চার অর্থনীতিকে নিজেদের কাঠামোগত দুর্বলতা মোকাবেলায় ব্যাপকভিত্তিক একগুচ্ছ নীতি নিতে হবে। প্রথমত, সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধি চাঙ্গা করতে সরকারগুলোর উচিত উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখা অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও শিক্ষায় অধিক বিনিয়োগ করা। উৎপাদনশীল খাতগুলোয় এ ধরনের সরকারি বিনিয়োগ দুর্বল ব্যক্তি চাহিদা পুষিয়ে দেয়া এবং সরবরাহ সামর্থ্য বাড়াতে পারে। সরকারগুলো এই বর্ধিত ব্যয় কম সুদহারের বন্ড ইস্যু করার মাধ্যমে অর্থায়ন করতে পারে। তবে তাদের অবশ্যই এক্ষেত্রে মাত্রাতিরিক্ত সরকারি ঋণ পরিহার করতে হবে, বিশেষ করে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ঋণ নেয়ার অংশ লক্ষণীয় মাত্রায় কমাতে হবে। আন্তর্জাতিক মুদ্রার সবল সঞ্চিতি ছাড়া অত্যধিক ঋণ নেয়া দেউলিয়া ও বিনিময় হার সংকট সৃষ্টি করতে পারে।
দ্বিতীয়ত,
পূর্ব এশিয়ার সরকারগুলোকে আবশ্যিকভাবে জনসংখ্যার বিরাট অংশের বুড়িয়ে যাওয়া এবং সংকুচিত হয়ে আসা কর্মক্ষম জনশক্তির বিষয়টি মোকাবেলা করতে হবে। সেক্ষেত্রে দেশগুলোকে নারী ও বয়োবৃদ্ধদের শ্রমশক্তিতে অধিক হারে অংশগ্রহণ উৎসাহিত করা, জীবনব্যাপী শিক্ষা ও দক্ষতা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মীদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা এবং সক্রিয়ভাবে অভিবাসীদের আসার সুযোগ করে দেয়া প্রয়োজন। শিশু-স্বাস্থ্যসেবার প্রবেশগম্যতা বাড়ানো এবং নমনীয় কর্ম আয়োজন ব্যবস্থা বা কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা প্রজননের হার বৃদ্ধিতে সাহায্য করতে পারে। উৎপাদনশীলতা প্রবৃদ্ধি উন্নয়নে আর্থিক খাত ও নিয়ন্ত্রণমূলক নীতি উভয় ক্ষেত্রেই সরকারগুলোকে অকার্যকারিতা, অদক্ষতা প্রতিরোধ করতে হবে।
চূড়ান্তভাবে
পূর্ব এশিয়ার সরকারগুলোকে অবশ্যই অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমতা বৃদ্ধি এবং প্রতিষ্ঠানগুলোয় জনসাধারণের আস্থা জোরদারে মনোযোগ দিতে হবে। জাপানের প্রলম্বিত অর্থনৈতিক স্থবিরতা সত্ত্বেও একটি দৃঢ় ভিত্তি প্রদানের মাধ্যমে দেশটির সমাজ ঐক্যবদ্ধ, সমন্বয়পূর্ণ, সমরূপধর্মী ও স্থিতিশীল থেকেছে, যা টেকসই প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। অবশ্য পূর্ব এশিয়ায় চিত্রটি ভিন্ন। আলোচ্য অঞ্চলের দেশগুলোয় বেড়ে চলা অর্থনৈতিক অসমতা ও দুর্বল প্রবৃদ্ধি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থায় চিড় ধরাচ্ছে। গত বছরজুড়ে হংকং ও দক্ষিণ কোরিয়ায় গণবিক্ষোভ ও আন্দোলন তীব্রতর হওয়া তারই প্রমাণ। শক্তিশালী গণ-আস্থা ও বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা ছাড়া পরবর্তী অর্থনৈতিক বিপর্যয়, হোক তা জাপানের মতো শ্লথগতি কিংবা আরেকটি বৈশ্বিক আর্থিক সংকট—মোকাবেলা করা কঠিন হবে।
জাপানীকরণের
ঝুঁকি খুব স্পষ্ট। এটি পশ্চিম ইউরোপের সঙ্গে পূর্ব এশিয়ায়ও ঘনায়মান। আলোচ্য হুমকি মোকাবেলা করতে হলে পূর্ব এশিয়ার বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া দেশগুলোকে নিজেদের অর্থনৈতিক প্রাণশক্তি ও তেজস্বিতা ফিরিয়ে আনতে অবশ্যই জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
লি
জং ওয়া:
অর্থনীতির
অধ্যাপক, কোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এশিয়াটিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক ও ‘এডুকেশন ম্যাটার্স: গ্লোবাল স্কুলিং গেইনস ফ্রম দ্য নাইনটিনথ টু দ্য টোয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি’ গ্রন্থের সহলেখক
ভাষান্তর:
হুমায়ুন
কবির










